Search This Blog

FCO Travel Advice

Bangladesh Travel Advice

AFRICA Travel Widget

Asia Travel Widget

Saturday, November 27, 2010

নীলগিরি বান্দরবান, মেঘের রাজ্যে বাংলার রূপ

ছবি ব্লগ: নীলগিরি বান্দরবান, মেঘের রাজ্যে বাংলার রূপ

পাহাড়ের বুকে যদি মেঘ ছুয়ে যায় আর সে মেঘ যদি ছোয়া যায় তবে কেমন লাগবে?

ছবিগুলো বর্ষাকালে তোলা , যদি কেউ কবিতা লিখতে চান তাহলে তার জন্য এটা হবে দারুন এক স্থান। খুব সকালের ক্ষীন আলোতে নীলগিরি ধারুন আবেগ দিবে আশা করি । পাহাড়, মেঘ, বৃষ্টি, পাহাড়ি মেয়ে, পাহাড়ি জীবন দেখতে আর ছুতে পারবেন হাত দিয়ে হ্রদয় দিয়ে

বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের নীলগিরি যেখানে মেঘের খেলা পাহাড়ের বুকে। যেন মেঘ পাহাড়ের প্রেম মিতালী চলে সারাক্ষন। এখানে আকাশের মেঘ আসবে আপনার পাশে, আপনারর চারদিকে, আপনার হাতের খুব নাগালে। এখানে মেঘ ছোয়া যায় হাত দিয়ে, মুখ দিয়ে, সমস্ত দেহ দিয়ে, হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ।





























যেতে চাইলে:
ঢাকা থেকে এস আলম বা ইউনিক বাসে করে বান্দরবন।
বান্দরবন শহরে জীপ পাওয়া যায় ভাড়ায়। চিম্বুক পর্বতমালা দিয়ে নীলগিরি ।
পথে পরবে শৈলপ্রভাত, বিভিন্ন আধিবাসী গ্রাম বা পাড়া। বান্দরবানে আরো আছে স্বর্ন মন্দির, নীলাচল, মেঘলা, সাঙ্গু নদী সহ অনেক চমৎকার স্থান যা ভাল লাগবেই ।
পথে যেতে যেতে সারাক্ষনই মুগ্ধ হবেন।
সকালে থানচি বাসস্টপ থেকেও বাসে চিম্বুক পার হয়ে নীলঘিরি নেমে যেতে হবে। বাসের সংখ্যা খুবই কব এবং টাইম মিলনো দুরহ আর সিট পাওয়া চাদ হাতে পাওয়ার মত তাই জীপ উত্তম যদি বাজেট থাকে ।
-
লেখক: মাইন রানা
Source: Prothom-Alo Blog


Friday, November 19, 2010

রূপসী ও রহস্যময়ী সুন্দরবন

রূপসী ও রহস্যময়ী সুন্দরবন

আ জা দু র র হ মা ন
বিরলের লিচুবনে ঘুরে ঘুরে এক মনমরা বিকালে সুন্দরবনকে মনে করে আরও গ্রামাঞ্চলে চলে যাই। কোথাও জলাভূমি নেই। বেতনা, কাঁকশিয়ালি, চুনকুঁড়ি খুঁজতে গিয়ে ছ্যাবলাখালের দেখা মেলে। নদী নয়, নদীর কঙ্কাল। চারদিক থেকে করাল থাবা বসিয়েছে মানুষেরা। সাপের মাথায় পা পড়লে যেমন এঁকে বেঁকে কুঁকড়ে যায়, নদীটাও সেরকম কুঁকড়ে আছে। আহ্! কতো নির্মমভাবে মানুষ একে হত্যা করেছে! করুণমুখ পানে চেয়ে মায়া লাগে। নদীর নাম জানতে ইচ্ছে করে না, বরং ওর তলপেট দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে ওপাড়ের অন্য গ্রামে ঢুকে যাই। মাঝে মাঝে ধানী জমিতে সার করে লাগানো লিচুগাছ খানিক মন ভোলালেও সুন্দরবনের ছবি এসে আমাকে নোনা গন্ধের গল্প শোনায়।
সুন্দরবন—আহা মধুময় নীলডুমুর, কলাগাছিয়া। মনে আছে, সাতক্ষীরা পৌঁছে পরদিনই বাসে চেপে চলে গেছি মুন্সীগঞ্জ। তারপর শ্যামলাবাজার থেকে ভাড়ার মোটরসাইকেলে মালিককে পেছনে রেখে নিজেই খাল ধরে বন বরাবর গাবুরার দিকে চলে গেছি। দুপুরবেলা টংদোকানে বসে চা খেতে খেতে শুনেছি বাঘ, চিংড়ি আর কাঁকড়ার গল্প। গত এক বছরে বহুবার সুন্দরবনে যেতে হয়েছে কাজে কিংবা আনন্দে। খেজুরময় সাতক্ষীরার নোনা হাওয়াকে ভালোবেসে বোহেমিয়ান হয়ে চলে গেছি হরিনগর গ্রামে। মনে পড়ে বনঘেঁষা বাঘের ভয় ভরা হরিনগরের মৌয়ালদের কথা। মৌয়াল প্রধান সাঁজুনি সুন্নত গাজীর মুখটা এখনও ঝুলে আছে আমার সামনে।
সুন্দরবনগামী বাসগুলো পদে পদে থামে না বরং ৯০ কিলোমিটার দূরের মুন্সীগঞ্জকে মনে রেখে একটানা দক্ষিণে চলতে থাকে। সাতক্ষীরা থেকে কালীগঞ্জ। তারপর দেবহাটা পার হয়ে শ্যামনগরের শেষপাতে এসে লাস্ট স্টপেজ। গোটাকয়েক ঝাঁপতোলা দোকান এবং ছোট একটা বুনো বাসস্ট্যান্ড নিয়ে শ্যামলাবাজার-মুন্সীগঞ্জ। বাজার আর বনের ফারাক শুধু খোলপেটুয়া নদী। মুন্সীগঞ্জ হরিনগর কলাগাছিয়া নীলডুমুরের মতো গ্রামগুলো এতোই বনবর্তী যে, ক্ষুধার্ত বাঘেরা হামেশাই নদী সাঁতরে গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়ে। তারপর সুযোগমত দু’একজনকে হত, আহত করে তাদের হাড় মাংস চিবিয়ে আবার বনে ফিরে যায়। দু’চার ঘর বাদেই পাওয়া যায় বাঘে খাওয়া মানুষের গল্প। ‘বিধবাদের গ্রাম’ একটি অনন্য উদাহরণ। এ গ্রামে যেসব বিধবা আছেন তাদের স্বামীদের কোনো না কোনো সময় বাঘে খেয়েছে। মাসে ছয় মাসে দু’একজনকে বাঘে ধরে, কেউ মারা পড়ে কিংবা কদাচিত্ কেউবা আহত আধখাওয়া হয়ে ফিরে আসে—এরকম ঘটনা এখানে খুব বেশি আমল পায় না।
এত কিছু জেনেও অরণ্য—পিয়াসীরা জীবন হাতে হরদম মুন্সীগঞ্জ কিংবা পার্শ্ববর্তী নীলডুমুর ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ে। তারপর যেরকম যার সামর্থ্য ও সাহস, সেইমতো ঢুকে পড়ে ম্যানগ্রোভের রহস্যবনে। বনবাহিত নদীগুলো ডালে ডালে গিয়ে একসময় গভীর বনের অলিগলিতে হারিয়ে গেছে। বুনোগলিতে বয়ে বেড়ানো বাতাস একসময় নদীতে ঢেউ তোলে। বাওয়ালি মাঝি মৌয়ালদের নৌকোগুলো ভয়হীন চলে গেলেও ভয়ভরা চোখে আগন্তুকরা চেয়ে থাকে ঘন হেতাল বনের দিকে। নোনামাটিতে জ্বলে থাকা ম্যানগ্রোভ, থোকা থোকা শ্বাসমূলের ফলার ফাঁকে ঝাঁক ঝাঁক হরিণের পায়ের ছাপ আর বাঘের চামড়ার ডোরাকাটা হলুদ কল্পনারা যেন তাদের একেকটা মর্মাহত বিকালকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
বনজ আলোর অপার্থিব মুগ্ধরসে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পর্যটকমন। বাঘের কামড়ে দলের কেউ মারা পড়লে বাঘের তল্লাটে সঙ্গী বাওয়ালিরা গাছে লাল কাপড় বেঁধে দেয়। সেসব লাল কাপড়ের সিগনাল এবং কলাগাছিয়ার ফরেস্ট গার্ডদের ঝোলানো সতর্কবাণী সংবলিত সাইনবোর্ড অবহেলা করে পর্যটকরা আরও গভীরে যেতে চায়। ঘোরের মধ্যেই ঢুকে পড়ে নোনামাটির জঙ্গলে। নিশিতে পাওয়া প্রকৃতি-প্রেমীদের সামনে কেওড়া, গরান, গোলপাতা, পশুর, সুন্দরীরা জবান খোলে বোধহয়। তারপর বাঘের জলজ্যান্ত পদছাপ তাদের শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে তোলে। তখন হুঁশ হয়। সুন্দরবনের সব সুন্দরকে একটানে দেখা হয় না। রহস্য আর আকাঙ্ক্ষা বুকে ফিরে আসে বনপিপাসুরা।
বনজীবী ছাড়াও সাতক্ষীরাজুড়ে আছে বিবিধবর্ণের মানুষ। ঘোনার চৌদালি সম্প্র্রদায় কিংবা গাংনিয়ার রাজবংশী অথবা দৌলুইপুরের ভগবানিয়া—কার কথা বলব! লাবসার পাশে বয়ে চলে বেতনা। নরম বেতনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে লেখা হয় গাজী-কালু-চম্পাবতী। দেবহাটার মধ্যপথে সখিপুরের দুধ-চায়ের কথা ভাবতে ভাবতে টাউন শ্রীপুরের ইছামতি থেকে দুই বাংলার হাওয়া এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আমাকে। মন চলে যায় আশাশুনির দরগাপুর পার হয়ে বেহারা গ্রামে। বিচিত্র জাতি, উপজাতি আর প্রাচীন নানাবিধ পুরাকীর্তিতে পরিপূর্ণ এই সুন্দরবনী অঞ্চল—সাতক্ষীরা। আদিবাসীদের মধ্যে মুণ্ডা কিংবা নিদেনপক্ষে গাছিদের কথাই ধরা যাক। খুব সম্ভব বৈশাখের দিকে একবার আশাশুনির পিচপথে ঢুকে পড়েছিলাম। অফুরন্ত খেজুর দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। মোটরসাইকেলে যতোই এগুচ্ছি, ততই পথের দু’পাশে নিয়ম করে দেখা মিলছে শত শত খেজুর গাছের। পাথারের খাঁজে খাঁজেও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে খেজুর গাছ। মাথায় মাথায় ঝুলে আছে কমলা রংয়ের ঝুড়ি ঝুড়ি খেজুরের ঝোপা। অনবরত কমলা থোকা খেজুর দেখতে গিয়ে চোখে হলুদের ঘোর লাগে। এতদিন যেসব পাথারি গাছ চোখে ধরেনি, এখন তারাও হলুদ মাথায় জমির খাঁজে খাঁজে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তারপর আনন্দিত মনেই একদিন গাছিদের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। পথের লোকজনকে গাছি বললে উত্তর না দিয়ে মুখপানে চেয়ে থাকে। পরে দু’চারজনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল এ অঞ্চলে গাছি মানে শিবলি। একটানা গেরুয়া আবাদের পরে শিবলিপাড়ার ছেলেমেয়ে এবং গ্রাম্য গাছিদের নিয়ে পুকুরপাড়ে আনন্দ-বেদনার গল্পগুলোর সঙ্গে রমজান শিবলির মুখটা এখনও ছবি হয়ে আছে।
সাতক্ষীরার গ্রামগুলো মায়াময়। কোনো কোনো গ্রাম নিবিড় ছায়াঘেরা। যেমন হরিণখোলা কিংবা ভোমরার ঘোনার কথাই ধরা যাক। দ্বিতীয়বারের মতো হরিণখোলা পার হয়ে মুণ্ডাদের গ্রাম আসনানগরে গিয়েছিলাম গত বর্ষায়। নেপাল, গোপাল, তেজান মুণ্ডাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বেলা গড়িয়ে গেল। তারপর বেদম কাদাপথে সাতক্ষীরা শহরের দিকে ফিরতে থাকি। পাশের গ্রামের কিছু হিন্দু পোলাপানও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে। একজন বলল, ওরা গুলকে কী বলে জানেন? বলে গিরগিল্লা, আর গুল খাওয়া মানে হলো গিরগিল্লা খাতুন। গিরগিল্লা বলেই একে অপরের গায়ে ধাক্কা মেরে হাসতে লাগল। ওরা ডাকে কেমন করে শোনেন, মনে করেন গোবিন্দকে ডাকবে, বলবে ‘গোবিন্দ কুত কুত’—মানে গোবিন্দ এদিকে আয়। ছেলেগুলো ফের আগের মতো হি হি করে ওঠে।
ওদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম মুণ্ডারা ইঁদুরকে বিলখাসি এবং কেঁচোকে ‘উঠোন বরবটি’ বলে। মুণ্ডাপাড়া থেকে আধা কিলোমিটার দূরে বাঁকের মুখের ব্রিজ পেতে গিয়ে মাগরেবের আজান পড়ে গেল। ব্রিজের পর থেকেই মূলত মূলকাদার শুরু। আগেরবার ফেরার পথেই স্থির করেছিলাম, এবারই শেষ। এরকম বিটকেল কাদার পথে আর নয়। কিলো খানেক আসার পর আমরা বাধ্য হয়েই মূল রাস্তা ছেড়ে দিলাম। বাইপাস করে গ্রামের গলিতে ঢুকে পড়লাম। সম্ভবত নিম্নবর্গের হিন্দুপাড়া। উঠোন, গোয়াল, বারান্দা, আঙিনা যেখানে যেরকম সুযোগ টালমাটালে হাঁটছি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ভেতর একতাল চাঁদও উঠেছে। পাড়ার খাঁজে খাঁজে কুয়াশা নয়; সান্ধ্যপূজার ধূপের ধোঁয়া। নীরবতার মধ্যে হঠাত্ হঠাত্ দূরবর্তী লঞ্চের ভেঁপুর মতো উলুধ্বনি শোনা যাচ্ছে । উলুধ্বনির মাঝে মাঝে কেউ শঙ্খ বাজাচ্ছে। সহযাত্রী সাংবাদিক সুমন অনেকটা ভূত দেখার মতো আমাকে থামিয়ে দিল, ‘শুনতে পাচ্ছেন, কে যেন কাঁদছে’। কান্নার সঙ্গে খুব ধীরলয়ে ঢোল, হারমনি বাজছে। কৌতূহল আর ভয় নিয়ে আমরা কান্নার দিকে এগিয়ে গেলাম। কাছাকাছি যাওয়ার পর দেখা গেল প্রায় শ’দুয়েক নারী-পুরুষ মনসামঙ্গল পালা শুনছে। জটলার মাঝখানে লালসালু কাপড়ের রাজপোশাক গায়ে মুকুট মাথায় চাঁদ সওদাগর দাঁড়িয়ে আছে আর তার সামনে দিলীপ কেঁদে কেঁদে পাট করছে।
মনসামঙ্গল পালা
দিলীপের পাট নেয়া কালো ছেলেটা সত্যি সত্যিই কাঁদছে। চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে। কোনো মেডিসিন ছাড়া এরকম অভিনয় দিয়ে চোখে পানি আনা এই প্রথম দেখলাম। খানিক আগে আমরা দিলীপের কান্নাই শুনেছিলাম। বটগাছের নিচে পালা হচ্ছে। পাশের ভাঙা ঘরকে ড্রেসিংরুম বানানো হয়েছে। এক মহিলাকে দেখলাম সেজেগুজে বসে আছে মনসাদেবীর পাট করার জন্য। বেহুলার ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য একজন ছোকরাকে পাউডার মাখিয়ে মেয়ে সাজানো হয়েছে । তার পাট বোধহয় পরের সিকোয়েন্সে হবে । সে বসে বসে বিড়ি টানছে।
সুমন ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলে নিল। এরপর ড্রেসিংরুমের পাট নেয়া অভিনেতাদের নাম টুকে নিয়ে বলল, ‘চলেন’। আমরা যখন পিচের রাস্তায় উঠলাম তখন রাত আটটা। বৃষ্টি থেমে গেছে। পাথারের মধ্যে সুতোর মতো পিচপথ। চাঁদের আলোর ভিতর হু হু করে হাওয়া বইছে। এবার সুমন নিজেই ড্রাইভ করছে। আজকের অভিজ্ঞতার পর সুমন হয়তো আর আসতে চাইবে না। নানান ওজর দেখাবে। আসার সময় কার্তিক মুণ্ডা আমাকে তার মোবাইল নাম্বার দিয়েছে। বলেছে, ভাদ্র মাসের শেষ সপ্তাহে আমি যেন রিং করি। খুব নাকি মজা হয়। ব্যাপক গান-বাজনার সঙ্গে হাড়িয়া মচ্ছব। কার্তিক হাঁটতে হাঁটতে দুই লাইনের বেশি গাইতে পারল না। বলল, এখন হবে না; হাড়িয়া খেলে দেখবেন এমনি এমনি গান বের হচ্ছে। কী যেন গানটা, মনে পড়েছে
আটোল পাতে গিলেই হামার নাতি
টেংরা মাছের ঝাল লেলায় রাতি।
একটা বুনো হাওয়া এসে উড়ে যায় পাথার থেকে পাথারে। আমরা হরিণখোলার সরু পিচ ছেড়ে সদর পিচে উঠে যাই।

নিঝুম দ্বীপের হাতছানি

নিঝুম দ্বীপের হাতছানি

বঙ্গোপসাগর ও মেঘনার মোহনায় গড়ে ওঠা নিঝুম দ্বীপ প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার। প্রাকৃতিক পরিবেশে পশু-পাখির জন্য দেশের একমাত্র অভয়ারণ্য এ দ্বীপটি। ৩ হাজার ৯৫২ একর জমির এই দ্বীপদেশে ৩০ হাজার মানুষের সঙ্গে বসবাস করে ৪০ হাজার হরিণ, ৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির পাখি ও ১৬ প্রজাতির সরিসৃপ। ঝিনুক সংগ্রাহকদের এ দ্বীপটি একটি জীবন্ত মিউজিয়াম। এখানে কৃষি, মত্স্যচাষ ও ভেড়া পালনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া দ্বীপের বিশাল জলসীমায় রয়েছে বিপুল পরিমাণ মাছের ভাণ্ডার। এখানে মূল্যবান সোনালি খনিজ বালু রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন গবেষকরা। নিঝুম দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অপার সম্ভাবনা ও আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন জাহিদুল করিম কচি ও সোহাগ কুমার বিশ্বাস
মায়াময় স্বপ্নিল প্রকৃতির নিসর্গ নিঝুম দ্বীপ। বাংলাদেশের স্থলসীমার শেষপ্রান্তে বঙ্গোপসাগর আর মেঘনার মোহনায় গড়ে ওঠা খনিজ, প্রাণিজ আর উদ্ভিদ সম্পদে পরিপূর্ণ এই দ্বীপটি যেন আরেক খণ্ড বাংলাদেশ। দ্বীপে বসবাসকারী মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে রয়েছে নিবিড় বন্ধুত্ব। পশু-পাখির জন্য এটিই দেশের একমাত্র অভয়ারণ্য। মাত্র ৩ হাজার ৯৫২ একর জমির এই দ্বীপদেশে ৩০ হাজার মানুষের সঙ্গে ৪০ হাজার হরিণের বাস। এছাড়া সরকারি হিসাবে এই দ্বীপে সাত প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির পাখি আর ১৬ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। ২১ প্রজাতির বৃক্ষরাজির সঙ্গে ৪৩ প্রজাতির লতাগুল্ম দিয়ে সাজানো প্রকৃতির এক অপার লীলাভূমি। ঝিনুক সংগ্রাহকদের কাছে নিঝুম দ্বীপের বিস্তীর্ণ সমুদ্রতট এক জীবন্ত মিউজিয়াম। চারপাশে বঙ্গোপসাগরের লোনা পানির মধ্যে দ্বীপের ভেতরকার জলাশয় ও খালগুলো আবার মিঠাপানির সংরক্ষণাগার, যেন স্রষ্টার রহস্যময় সৃষ্টি। বিভিন্ন কলকারখানা আর যান্ত্রিক যানের কালো ধোঁয়া, বিকট শব্দ, অসহ্য যানজট কিছুই নেই এখানে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি কোনো ধরনের সন্ত্রাসের সঙ্গে পরিচিত নয় এখানকার মানুষ। সাগরের গর্জন আর পাখির কিচিরমিচির, ডাকাডাকিই নিঝুম দ্বীপের নির্জনতা ভাঙায়।
নোয়াখালী জেলার সর্বদক্ষিণের বিচ্ছিন্ন উপজেলা হাতিয়া। প্রমত্তা মেঘনা আর বঙ্গোপসাগরের ভাঙাগড়া খেলায় বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপটি দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথক। হাতিয়ার জাহাজমারা ইউনিয়নের ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নিঝুম দ্বীপের অবস্থান। মানচিত্রে দেখলে চোখের মতো দ্বীপ হাতিয়া আর চোখ থেকে ঝরেপড়া একফোঁটা অশ্রুই যেন নিঝুম দ্বীপ। সম্প্রতি মেঘনার ভাঙনে সর্বস্ব হারানো হাতিয়ার কিছু মানুষ বসতি গড়ে তুলেছে নিঝুম দ্বীপে।
২০০১ সালের জরিপ থেকে জানা যায়, নিঝুম দ্বীপের ভূমির পরিমাণ ৩ হাজার ৯৫২ একর। তবে গত ৯ বছরে পলি জমে দ্বীপের জমির পরিমাণ আরও বেড়েছে।
নিঝুম দ্বীপের উত্পত্তির ইতিহাস বেশ চমত্কার। আজ থেকে একশ’ বছরেরও বেশি সময় আগে গভীর রাতে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেরা এই দ্বীপ জাগতে দেখেন। গভীর রাতে বঙ্গোপসাগর আর মেঘনার মোহনায় হঠাত্ সাগরের উথাল-পাতাল ঢেউ দেখে প্রথমে জেলেরা ভাবেন—হয়তো সাগর মোহনা দিয়ে অতিকায় তিমির বিশাল ঝাঁক পথ হারিয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে। পানির তাণ্ডব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সাহসী জেলেরা রাতেই সেদিকে এগিয়ে যায় এবং বিশাল এক ডুবোচরের সন্ধান পান। সেই ডুবোচরেই ধীরে ধীরে পলি জমে সৃষ্টি হয় আজকের নিঝুম দ্বীপ। কিছুদিন পর মত্স্যশিকারি পাখির আনাগোনা দেখে স্থানীয় জেলেরাও মাছ ধরতে এই এলাকায় যাওয়া-আসা শুরু করেন। জেলেরা এই বিশাল চরের নাম দেন বালুয়ার চর। নিঝুম দ্বীপের বালুর রঙ স্বর্ণের রঙের মতো হওয়ায় কিছুদিন পর এর নামকরণ করা হয় স্বর্ণদ্বীপ। ১৯৬৯ সালে একদল জরিপকারী এই চরে জরিপ করতে আসেন। তখন ওসমান নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা জরিপকারীদের সহযোগিতা করেন। জরিপকারী দলটি এই চরের নামকরণ করেন চর ওসমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরাজির বীজ ভেসে আসায় দ্বীপটিতে গড়ে ওঠে এক বিশাল প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। দ্বীপজুড়ে নেমে আসে গভীর নির্জনতা। পরে লোকের মুখে মুখে ফেরে একটিই নাম, তা হলো—নির্জন দ্বীপ। ১৯৭৯ সালে প্রয়াত সংসদ সদস্য তত্কালীন প্রতিমন্ত্রী আমিরুল ইসলাম পরিদর্শনে এসে নির্জন দ্বীপের শান্ত ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়ে দ্বীপটির নামকরণ করেন নিঝুম দ্বীপ।
দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদের তালিকা প্রণয়নের কাজ আজও শেষ হয়নি। ১৯৯৬ সালের এক জরিপে সাত প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির পাখি আর ১৬ প্রজাতির সরীসৃপের সন্ধান পাওয়া যায়। এছাড়া সুন্দরী, কেউড়া, গেওয়া, গোলপাতাসহ অন্তত ২১ প্রজাতির গাছ ও ৪৩ প্রজাতির লতাগুল্ম দিয়ে প্রকৃতি সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে তুলেছে নিঝুম দ্বীপকে। তবে এখন প্রাণী ও উদ্ভিদের পরিমাণ বহুগুণে বেড়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে সবুজে ঘেরা এই দ্বীপটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় বৃহদাকারের কোনো সবুজ তিমি পিঠ উঁচিয়ে রোদের তাপ নিচ্ছে। দ্বীপের দক্ষিণপাশে রয়েছে সাগরের বিস্তীর্ণ বেলাভূমি। গহিন অরণ্যে গাঢ় সবুজের ক্যানভাস। কোথাওবা ফুটে আছে নীলাভ হিজল-জারুলসহ নানা অজানা-অচেনা বাহারি বনফুল। সমুদ্রতটেই দেখা মেলে সাগরের পানিতে ভেসে আসা নানা প্রজাতির বীজের অদ্ভুত রহস্যময় বংশবিস্তার প্রক্রিয়া। তবে ইদানীং বন বিভাগ নিঝুম দ্বীপের বনাঞ্চল সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।
দ্বীপের চারপাশ ঘিরে আছে সমুদ্র। দ্বীপের মধ্যে রয়েছে অন্তত ৮টি খাল ও বেশকিছু মিঠাপানির জলাশয়। মেঘনার পানি খালগুলো ভরে রাখে। কোনো কোনো সময় নদীর পানি টান দিলে সাগরের নোনা পানি এসে সেই ঘাটতি পূরণ করে। সমুদ্রের ডাক শুনতে আমরা ছুটে যাই কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটায়। সমুদ্র সৈকত বলতে আমরা কক্সবাজার ও কুয়াকাটাকেই বুঝি। অথচ নিঝুম দ্বীপের বিস্তীর্ণ সমুদ্রতট আর মায়াবী হাতছানি এখনও পর্যটকদের চোখের আড়ালে। অদ্ভুত এক নির্জনতা ঘিরে আছে নিঝুম দ্বীপের ভেতরে-বাইরে। সাগরের বুকের ওপর বসে গর্জন শুনতে হলে নিঝুম দ্বীপই আদর্শ স্থান। দু-এক রাত এই দ্বীপে কাটালে সেই আনন্দ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। গভীর রাতে সমুদ্রের ডাক কান্না হয়ে আসে। যারা এ দ্বীপে কখনও রাত কাটাননি, তাদের কাছে এই অভিজ্ঞতা ভিন্ন।
সম্প্রতি নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন আরও কয়েকটি চর জেগেছে। চরজব্বার, চররশিদ, চরআজমল, চরআমানত—যেদিকেই তাকান না কেন, দিগন্তবিস্তৃত মাঠ—যেন সবুজ ঘাসের শ্যামল এক পৃথিবী চোখে পড়বে। নভেম্বরে প্যারাগনের ফাঁকে ফাঁকে বুনোফুলের সমাহার সহজেই যে কাউকে কাছে টানে। খালের দুই পাড়ে নদীর কূলে আর সমুদ্রতটে রয়েছে বিশাল বনভূমি, বনে রয়েছে হাজার হাজার চিত্রল হরিণ। এই দ্বীপে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে হরিণের দেখা পাওয়া। শত শত হরিণ একসঙ্গে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য একমাত্র নিঝুম দ্বীপেই দেখা যায়। গহিন অরণ্য থেকে প্রায় প্রতিদিনই দু-একবার হরিণের দল আসে লোকালয়ে। তারা বিভিন্ন ফসলি জমি ও সবুজ ঘাসের মাঠে চরে বেড়ায়। তবে কার্তিক মাসে হরিণের দেখা পাওয়া দুষ্কর। এ সময় ফসলের মৌসুম হওয়ায় কৃষকরা দল বেঁধে মাঠে কাজ করেন। আর খালবিলের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় শিশু-কিশোররা এখানে মাছ শিকার ও খেলাধুলা করে। তারা হরিণ দেখলেই ধাওয়া করে। ফলে এ মৌসুমে হরিণ একেবারেই নিরাপদ পরিবেশ না পেলে দিনের বেলায় বন থেকে বের হয় না। তবে রাতে বের হয়। বড় টর্চলাইট নিয়ে রাতে একটু ঘোরাফেরা করলেই দল বেঁধে হরিণ দেখার সাধ মিটবে। হরিণের ঝাঁক নিঝুম দ্বীপের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
নির্জন এই দ্বীপে হরিণ কীভাবে এলো : এই ইতিহাস আরও আকর্ষণীয়। টমাসথন নামে এক ব্রিটিশ পর্যটক একজোড়া পোষা হরিণ সঙ্গে নিয়ে এই দ্বীপে ভ্রমণে আসেন। একপর্যায়ে তার হরিণদুটি ছুটতে ছুটতে গভীর অরণ্যে চলে যায়। আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই থেকে ক্রমান্বয়ে বংশবিস্তার। পরে অবশ্য বন বিভাগ আরও কিছু হরিণ অবমুক্ত করে দ্বীপটিকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করে। এছাড়া লাখ লাখ অতিথি পাখির জন্য দ্বীপটি এক বিরাট আকর্ষণ। শীতের সময় খাদ্যের অন্বেষণে এসব পাখি উড়ে আসে এই দ্বীপে। ঝাঁক বেঁধে এরা চলাফেরা করে, কাদাপানিতে বাসা বাঁধে। গ্রীষ্মকালে যখন যাযাবর পাখিরা বিদায় নেয়, তখন আকাশে নীল ঠোঁটওয়ালা কয়েক হাজার লাজুক ও দুর্লভ প্রজাতির সাদা মাথা হাঁস কোত্থেকে যেন উদয় হয়। এরা এখানকার ঝোপঝাড়ে ডিম পেড়ে বাচ্চা ফোটায়। পাখিদের মোহনীয় কূজন শুনে মনে হয় এ এক রূপকথার পক্ষীরাজ্য। হাজার হাজার হরিণের সঙ্গে বনমোরগের ঝাঁক নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায় গোটা দ্বীপে। দ্বীপের বাসিন্দারাও এসব প্রাণীরক্ষায় বদ্ধপরিকর। এ দ্বীপে শিকারির প্রবেশাধিকার একেবারেই নিষিদ্ধ। এছাড়া বাঘ ও কুকুরের মতো কোনো হিংস্র প্রাণীও নেই। গোধূলিলগ্নে পাখির কুহুতান প্রাণী আর সমুদ্রের লোনা বাতাসের গন্ধ মিলে তৈরি হয় এক মোহনীয় ইন্দ্রজাল।
দ্বীপের ৩০ হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগই ভয়ঙ্কর মেঘনা ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু গভীর সাগরে মাছ ধরার আধুনিক উপকরণ তাদের নেই। ইঞ্জিনবিহীন সাম্পানে করে তারা চলে যায় গভীর সমুদ্রে। আস্ত গাছ চেরাই করে দু-তিন ইঞ্চি পুরু তক্তা দিয়ে তৈরি করা হয় সাম্পান। সাম্পানে জাল, রশি, ফ্লোট, টোম, রেডিও ও প্রয়োজনীয় খাবার নিয়ে শুরু হয় জেলেদের সমুদ্রযাত্রা ও মত্স্য আহরণ অভিযান। গভীর সাগরে কয়েকদিন মাছ ধরে ফিরে এসে ট্রলার ভিড়ান মত্স্যবন্দর রহমত বাজার, চৈতন্য বাজার, বাংলা বাজার, লাম্বিয়ার বাজার, কামাল বাজার, রামচরণ, তমরুদ্দি, চরচোঙ্গা, জাহাজমারা, মোক্তারিয়া, বালুয়া, চরআমান প্রভৃতি ঘাটে। এসব ঘাট থেকে পাইকারের আড়ত হয়ে মাছ চলে যায় দেশ-দেশান্তরে। তবে এখানকার জেলেরা উপযুক্ত টাকা পান না। আবার বিধি বাম হলে ট্রলার আর সাগর থেকে ফেরে না, মুছে যায় কিছু নাম। তবু সাহসী জেলেরা জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রেখে চলেছেন।
ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন একটি করে বড় তিনতলা লঞ্চ হাতিয়ার তমরুদ্দি ঘাট পর্যন্ত যাতায়াত করে। অপরদিকে চট্টগ্রাম থেকে সপ্তাহে পাঁচদিন একটি করে স্টিমার হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে যাতায়াত করে। নোয়াখালী থেকে প্রতিদিন একটি করে সি-ট্রাক ও দুটি বেসরকারি লঞ্চ হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে যাতায়াত করে। এছাড়া হাতিয়ার তমরুদ্দি চেঙ্গাঘাট থেকে প্রতিদিন দুটি ট্রলার নিঝুম দ্বীপের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তবে এসব ট্রলার ছাড়ার শিডিউল ঠিক থাকে না। এছাড়া হাতিয়ার নলচিরা ঘাট বা চেঙ্গাঘাট থেকে জাহাজমারা ঘাটে গিয়ে সেখান থেকে ট্রলারযোগে নিঝুম দ্বীপে যাওয়া যায়। কিন্তু এসব ট্রলারে জীবন রক্ষাকারী উপকরণ নেই। ঝুঁকি নিয়েই যেতে হয় নিঝুম দ্বীপে।

Thursday, November 18, 2010

নিঝুম দ্বীপের খনিজ বালু

নিঝুম দ্বীপের খনিজ বালু

প্রকৃতির সৃষ্টি আর রহস্যঘেরা নিঝুম দ্বীপে কী পরিমাণ খনিজসম্পদ আছে, তার সঠিক অনুসন্ধান আজও হয়নি। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এসব ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। তবে এই দ্বীপের সোনালি বালু যে অতি মূল্যবান খনিজসম্পদ তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগ, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন ও একাধিক উত্সুক গবেষকের গবেষণা প্রতিবেদন এই দ্বীপের বালুতে মূল্যবান খনিজ পদার্থের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
নিঝুম দ্বীপের যে বালুর ঢিবি একসময় ডুবোচরের জন্ম দিয়েছিল, বালুর সঙ্গে নদীর প্রবহমান স্রোতের ধাক্কায় সৃষ্ট পানির তাণ্ডব দেখে জেলেদের হৃদয় আঁতকে উঠেছিল, সেই বালু আসলে সোনার চেয়েও দামি খনিজসম্পদ। বর্তমানেও নিঝুম দ্বীপের বুকজুড়ে ছোট-বড় অসংখ্য বালুর ঢিবি লক্ষ্য করা যায়। দ্বীপের মানুষ বিশ্বাস করে, নিঝুম দ্বীপে অনেক সম্পদ আছে। এর মধ্যে উর্বর ফসলি জমি। দ্বীপের চারধারে রয়েছে বিপুল মত্স্যভাণ্ডার। বনের গাছগাছালিও বড় সম্পদ। তবে বালুর প্রতি তাদের নজর নেই। বালুর কোনো গুরুত্ব এই দ্বীপে এখনও নেই। নিঝুম দ্বীপের সোনালি বালু সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগ এবং বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন এই দ্বীপের বালু নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে। এছাড়া নিঝুম দ্বীপের বালু নিয়ে গবেষণা করছেন বন বিভাগের কর্মকর্তা অসিত্ রঞ্জন পাল। তিনি জানান, নিঝুম দ্বীপের বালুর সঙ্গে রয়েছে মূল্যবান খনিজসম্পদ। এই বালুতে রয়েছে গধমহপষরফ, এধত্হবষ তরত্পড়হ, জঁঃঢ়ষব জাতীয় অতি মূল্যবান পদার্থ যা লৌহশিল্প, গ্লাসশিল্প ও নিউক্লিয়ার প্লাটের জন্য জরুরি ও মূল্যবান উপকরণ।

কৃষি মত্স্য ও ভেড়া পালনের অপার সম্ভাবনার নিঝুম দ্বীপ

কৃষি মত্স্য ও ভেড়া পালনের অপার সম্ভাবনার নিঝুম দ্বীপ

কৃষি, মত্স্যচাষ ও ভেড়া পালনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে নিঝুম দ্বীপে। দ্বীপের বিশাল জলসীমায় রয়েছে বিপুল পরিমাণ মাছের ভাণ্ডার। উর্বর মাটি খুঁড়লেই মিঠাপানির সংরক্ষণাগার কৃষিতে এক বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। কৃষি বিভাগ বা সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থা উদ্যোগ নিয়ে দ্বীপবাসীকে আধুনিক চাষ পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেই এই দ্বীপ থেকে প্রতি বছর বিপুল রাজস্ব জমা হতে পারে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে।
দেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে নিঝুম দ্বীপের অবস্থান বঙ্গোপসাগরের মত্স্যচারণ এলাকার প্রবেশপথে। এখানেই রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বিশাল ভাণ্ডার। কিন্তু আমাদের জেলেরা প্রযুক্তিগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকায় আধুনিক থাই ও ভারতীয় ট্রলার আমাদের সীমানা থেকে প্রতিনিয়ত টন টন ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
ইলিশ মৌসুমে নিঝুম দ্বীপের জলরাশি থেকে ধরা পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ। প্রাচীনকাল থেকে এই ইলিশের কারণে জেলেদের কাছে নিঝুম দ্বীপের আরেক নাম ইলিশ নগরী। যদিও এখন আগেরমত ব্যাপক ইলিশ জালে পড়ে না। তবু যে ইলিশ পাওয়া যায়, তার পরিমাণও একেবারে কম নয়। এই দ্বীপের ইলিশ শিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, বছর দশেক আগেও প্রতি রাতে কমলার খালের শেষ মাথায় বিশাল জেনারেটর বসিয়ে গোটা এলাকা আলোকিত করে চলত ইলিশ ও জাটকা ধরার মহোত্সব। সে সময় নির্বিচারে জাটকা ধরায় মাছের পরিমাণ কমে গেছে। তবে স্থানীয় জেলেরা এখন অনেক সচেতন। তারা আর জাটকা বা কারেন্ট জালে মাছ ধরে না। এভাবে চললে অল্প সময়ের মধ্যে আবারও ইলিশ নগরীর ঐতিহ্য ফিরে আসবে বলে বিশ্বাস করেন স্থানীয় জেলেরা। এছাড়া দ্বীপের উপকূল ও চরাঞ্চলগুলো চিংড়ি চাষের জন্যও অত্যন্ত উপযোগী। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে সাগরের লোনা জোয়ারের সঙ্গে প্রচুর পোনা ভেসে আসে। এ সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মত্স্য ব্যবসায়ীরা শত শত ট্রলার নিয়ে এসে এখান থেকে চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। নদীর জোয়ারের পানি থেকে চিংড়ি পোনা ধরার জন্য দ্বীপের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নেটের জাল সরবরাহ করে তারা। এসব চিংড়ি পোনা ধরে দেয়ার জন্য প্রতি একশ’ পোনার বিপরীতে ২০-২৫ টাকা করে দেয়া হয়। অথচ খুলনায় একশ’ চিংড়ি পোনা বিক্রি হয় ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। সরকার খুলনাকে চিংড়ি জোন হিসেবে ঘোষণা করেছে। অথচ খুলনার ব্যবসায়ীরা ৬০ ভাগ চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করে নিঝুম দ্বীপ থেকে। দ্বীপ সংলগ্ন চরকমলা, চরকামার, চরমোহাম্মদপুর, দমার চর, শুইনার চর, চরবেহানিয়া, চরনুরুল ইসলাম, চরপিয়া, ঢাল চর, মৌলভীর চর, চরগিয়াস উদ্দিন, তেলিয়ারচর, বয়ার চর, চররশিদ, চরআজমল ও সাগরদি এলাকায় প্রচুর চিংড়ি পোনার ভাণ্ডার রয়েছে। এসব চরে বেড়িবাঁধের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ করলে খুব সহজেই দেশের বৃহত্তর চিংড়ি জোন হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে নিঝুম দ্বীপ।
দ্বীপের ভেতরকার খাল ও জলাশয়গুলোতে বিপুল পরিমাণ মিঠাপানির উত্স কৃষিতে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কিন্তু দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপবাসী আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এখানে জমি চষা হয় গবাদিপশু দিয়ে। আবার অনেকে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়েও চাষাবাদ করেন। বিভিন্ন ধরনের সার, বালাইনাশক ব্যবহার সম্পর্কেও অজ্ঞ। উন্নত বীজের সরবরাহ ব্যবস্থাও অপ্রতুল। এককথায় মান্ধাতা আমলের চাষাবাদ পদ্ধতিতেই চাষ করে এখানকার কৃষকরা। চাষাবাদে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সচেতনতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসছে না। কৃষি বিভাগ বা সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থা উদ্যোগ নিয়ে এখানকার কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ সম্পর্কে একটু সচেতন করে তুললেই কৃষিখাতে স্বনির্ভরতা আসবে বলে মনে করেন চাষাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দ্বীপবাসী।
মাছ ধরার পাশাপাশি ভেড়া পালনকেও এই দ্বীপের বাসিন্দাদের অনেকেই একরকম পেশা হিসেবে নিয়েছেন। দ্বীপবাসীর বেশিরভাগের ঘরেই ভেড়া পালন করতে দেখা যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় গৃহপালিত পশুর মধ্যে ভেড়াই এই দ্বীপে উপযোগী প্রাণী। কারণ মানুষের মতো এসব ভেড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সংগ্রাম করতে জানে। এছাড়া অন্যান্য পশুর তুলনায় রোগবালাইও কম হয়। তোলা খাবার দেয়ার ঝামেলা নেই বললেই চলে। সারাদিন বনে-বাদাড়ে, ফসলি জমির আশপাশে এমনকি খাবারের সন্ধানে পানিতে নামতেও দ্বিধা করে না ভেড়ার দল। দ্বীপের অবস্থাসম্পন্ন পরিবারগুলো আর্থিকভাবে আরও সচ্ছলতা আনতে ভেড়া পালন করে। বিক্রির উপযোগী ভেড়া হাতিয়াসহ নোয়াখালীর বিভিন্ন হাটে ট্রলারে নিয়ে বিক্রি করে তারা। আবার ভেড়ার মাংসও সুস্বাদু। স্থানীয় বাজারগুলোতে ভেড়ার মাংসও বেশ চড়া দামে বিক্রি হয়। ভেড়া পালন শর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা স্বল্পসুদে দ্বীপবাসীর মধ্যে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করলে ভেড়া পালনের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে পারে নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দারা

Wednesday, November 17, 2010

ঐতিহ্যময় সুন্দরবন - সুজন মজুমদার

ঐতিহ্যময় সুন্দরবন - সুজন মজুমদার

sundarbanদক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এই বনভূমি বিশ্ব পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় অপরিসীম। শুধু তাই নয়, এই সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর প্রায় অর্ধ লাখ মানুষ জীবন জীবিকার একমাত্র নির্ভরশীল করে থাকে।

কেউ গাছ কাটে, কেউ মধু আহরণ করে, কেউ মাছ ধরে, কেউ গোলপাতা কাটে, কেউ বা কাঁকড়া ধরে এবং শুঁটকিও রফতানি করে থাকে কেউ কেউ। বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষে জেগে ওঠা বিশাল এই সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক ঘাতক সিডর, আইলার নামক ঝড়ের তা-বে ল-ভ- করে দিয়ে গেছে। যার কারণে যারা নদীর বুক থেকে বিভিন্ন রকম উপার্জনের একমাত্র সম্বল তারা আজ ভীষণ দুর্ভিৰের সঙ্গী। তাদের বেঁচে থাকা হয়ে পড়েছে আজ অসম্ভব দায়। শুধু তাই নয়, মৎস্যজীবীদের প্রাণও কেড়ে নিচ্ছে এই আইলার-সিডর। কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করে দিয়ে গেছে। দক্ষিণবঙ্গের খুলনা, মংলা, বাগেরহাট ও সাতৰীরাজুড়ে বিশাল অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা এই সুন্দরবন প্রায় ২ হাজার ৩০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যময় সুন্দরবনের লীলাভূমি। ৬০ মাইল লম্বা সুন্দরবনে শীত মৌসুমে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ হাজার, হাজার মানুষ ভিড় জমায় তাদের জীবন-জীবিকার খোঁজে। তাছাড়া বার মাসই এই সুন্দরবনে মানুষ তাদের কর্মতৎপরতা চালায় বেঁচে তাকার তাগিদে। সাগরকূলে দুবলারচরসহ বিভিন্ন চরে বিভিন্ন জেলার হাজার, হাজার জেলে তাদের আনুষঙ্গিক সামগ্রী নিয়ে অস্থায়ীভাবে বসতি করে। তারা ৪/৫ মাসের জন্য ৫০ থেকে ৬০ হাজার জেলে সারিবদ্ধভাবে ছোট ছোট ঘর করে জীবনযাপন করে। ছোট-বড় ট্রলার নিয়ে সাগর ও বনের ভেতর ঢুকে তারা মাছ, কাঁকড়া, হরিণ, পাখি, মধু গোলপাতাসহ আরও অনেক কিছু আহরণ করে। সুন্দরবনে আহরিত মাছ থেকে প্রতিবছর প্রায় চলতি মৌসুমে এক শ' থেকে সোয়া শ' কোটি টাকা আহরণ করা হয়। ৫ মাসের আয় দিয়ে প্রায় সারা বছরই জেলেরা সুন্দরভাবে জীবন-জীবিকা করে থাকে। প্রতি জেলের পরিবারে কমপৰে ৫ জন সদস্য থাকে। গড় প্রতি ৩০-৩৫ হাজার জেলের হিসাবও যদি করা হয় তাহলে ধরা যায় অনত্মত দেড় লাখ থেকে শোয়া লাখ লোকের জীবিকা নির্ধারণ হয় এই দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন থেকে। ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় সুন্দরবনে প্রবেশ বাওয়ালীদের। এসময় বাওয়ালীদের মূলত সুন্দরবনে প্রবেশের উত্তম মৌসুম। বন বিভাগ এসময় প্রতিবছর বনের প্রকৃতি আহরণের সুযোগ দিয়ে থাকে। তাই বাওয়ালীরা এসময় ফরেস্টারের কাছ থেকে বনের মধ্যে যাওয়ার পারমিশন বা পাস নিয়ে কাঠ, গোলপাতা, মধু আহরণসহ বিভিন্ন কাজের তাগিদে তারা বনের মধ্যে প্রবেশ করে থাকে এবং এই কাজের মধ্যে তাদের জীবন-জীবিকা নির্ভর বলে এদের এক কথায় বলা হয়ে থাকে বনজীবী। প্রতিবছর ডিসেম্বরে সুন্দরবনে প্রায় ৩০-৩৫ হাজার বাওয়ালী আসে। বন রৰাকারীরা বাওয়ালীদের কাছ থেকে আবার নৌকার আকৃতি দেখে মানে ছোট বড় অনুমান করে মোটামুটি একটা নির্ধারিত রাজস্ব আদায় করে থাকে। সুন্দরবনের প্রশাসন সুন্দরবনে বাওয়ালীদের সুবিধার জন্য জায়গায় জায়গায় প্রশাসনিক ভাগ করে টহল দেয়ার কাজ করে। ২ হাজার ৩০০ বর্গ মাইলজুড়ে রয়েছে দুটি বিভাগ। একটি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ আর অপরটি সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ। সুন্দরবন বিভাগে বিভিন্ন রফতানি পণ্যের মাধ্যমেই দৰিণাঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ জীবন-জীবিকায় বেঁচে আছে এবং গোটা সুন্দরবন রাজস্ব আয় প্রতি বছরে প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা। সুন্দরবনের হিসাব অনুযায়ী গত (২০০৬-২০০৭) বছরে সুন্দবনের ৪টি রেঞ্জ এলাকা থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ২৩ হাজার ৪১০ টাকা। (২০০৫-২০০৬) এ বন বিভাগ থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫ কোটি ৮২ লাখ ১৩ হাজার ৩২৬ টাকা। আর গত (২০০৪-২০০৫) অর্থবছরে সুন্দরবনের রাজস্ব আয় হয়েছিল ৬ কোটি ৭২ লাখ ৩৮ হাজার ১২০ টাকা। কিন্তু বিধ্বস্ত সিডর, আইলার নির্মম কান্ডযজ্ঞে ১৫ নবেম্বর বিশ্ব ঐতিহ্যের এ সুন্দরবনকে একেবারেই ধূলিসাত করে দিয়ে গেছে। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না দানব সিডর, আইলার। তারা নির্দ্বিধায় কেড়ে নিয়েছে কয়েক হাজার জেলের প্রাণ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই সিডর, আইলার কারণে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ৰয়ৰতি হয়েছে সুন্দরবনের। বাংলাদেশের সর্বশেষ দৰিণে পশ্চিমাঞ্চলে তীরঘেঁষে বঙ্গোপসাগরের ৮৯.০০৮৯.৫৫ পূর্ব অক্ষাংশ এবং ২১.৩০.২২.৩০ উত্তর দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভূখ-জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশের ভূখন্ডের এ বনের আয়তন ৫৫,৭৮৫ হেক্টরের মধ্যে ৪১,১৬৮৫ হেক্টর বনভূমি। বাকি ১৫,৫৬০০ হেক্টর নদী খাল খাড়ি এবং মোহনার অঞ্চল। সুন্দরবনে এরকম অসংখ্য মোহনার জলাভূমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

ম্যানগ্রোভ সম্পদ : অন্যান্য বৈশিষ্ট্যধর্মী সুন্দরবনের বিশেষ একটি সম্পদ। এই ঐতিহ্যময় সুন্দরবনে রয়েছে এক বিশাল বনজ সম্পদ। যা থেকে আমরা কাঠ এবং কাজগের মন্ড তৈরির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি হয়ে থাকে। বর্তমানে অর্থমূলক সুন্দরবনে মোট ৩৩৪ প্রজাতির গাছ পাওয়া যায়। উলেস্নখযোগ্য যেমন সুন্দরী, গেওয়া, বাইন, উড়া, কেওড়া, মেহগনি, জির, গড়ান, গোলপাতা, হেতাল ইত্যাদি। রফতানির ভিত্তিতে আহরিত অন্যান্য দ্রব্য হচ্ছে মধু, মোম, কাঁকড়া, বাগদা এবং গলদা চিংড়ির পোনা, ঝিনুকের শেল, বড় বাগদা এবং গলদা চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছ। এই সুন্দরবনে ৪.২৫ রকম বন্যপ্রাণী, ৩১৫টি পাখি, ৫৩টি সরীসৃপের প্রজাতি এবং ৮টি উভচর প্রাণীর প্রজাতি রয়েছে। এসবের বন্য প্রাণী যথারীতি সারা বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর শতকরা ৩৪ ভাগ, পাখি ৩৫ ভাগ এবং সরীসৃপ প্রাণীর প্রজাতির শতকরা ২৯ ভাগ রয়েছে। সবচেয়ে সত্য কথা যে, বাংলাদেশের দৰিণাঞ্চলে নদী উপকূলে এলাকাজুড়ে হাজার, হাজার মানুষ বসবাস করে থাকে। যেমন মংলা, চানপাই, খেজুরে শরণখোলা, জয়খাঁ, বুড়ির ডাঙ্গা, পেড়িখালি, হুড়কা, রামপালসহ জেলা থানা গ্রামজুড়ে হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষাকারী প্রাকৃতিক বন্ধু এই একমাত্র সুন্দরবন। কারণ দৰিণ, পশ্চিম, পূর্ব এলাকাজুড়ে ঝড়ের তান্ডব থেকে ধ্বংসযজ্ঞে একমাত্র প্রথমেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় এই দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন। যার কারণে দৰিণ অঞ্চলের মানুষ এখনও বেঁচে আছে। তাই বন বিভাগ ও সরকারের সমন্বয় উদ্যোগে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে এই সুন্দরবন বৃৰ নিধনে সাবাড় না হয়ে যায়। তাহলে বাঁচবে দৰিণাঞ্চলের হাজার, হাজার প্রাণ, বাঁচবে বন, বাঁচবে পরিবেশ, বাঁচবে আমাদের প্রজন্ম।

Sunday, November 14, 2010

সুন্দরবন ভ্রমন : সম্পূর্ণ

সুন্দরবন ভ্রমন : সম্পূর্ণ

১লা ডিসেম্বর সোমবার বিকেল ৬টায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এর ক্যামপাস্ থেকে আমরা ৫০ জন ছাত্র শতাব্দী পরিবহনের গাড়ীতে রওনা দিলাম মংলা বন্দরের উদ্দেশে। চট্টগ্রাম হতে ঢাকা হয়ে মাওয়া ফেরীঘাট পার হয়ে দীর্ঘ ১৫ঘন্টা লাগলো মংলা বন্দরে পৌছাতে। মাওয়া ফেরীঘাট পার হতেই লাগলো দীর্ঘ ৪ঘন্টা। পদ্মা নদীর এপার থেকে ওপারে নেওয়ার ফেরীতে অবশ্য ৪ঘন্টা সময় কাটাতে তেমন কষ্ট হয়নি। কারণ একেতো সুন্দরবন যাওয়ার উত্তেজনা,তার উপর বিশাল ৫তলা ফেরী। আর পদ্মার সৌন্দর্য্যতো আছেই। ফেরী যখন পদ্মা নদীর মাঝামাঝি তখন কেবল ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটছিল।সে এক অসাধারণ দৃশ্য। ২রা ডিসেম্বর ৯টায় আমরা মংলা বন্দরে পৌছালাম।ওখান থেকেই মূলত আমাদের মূল ভ্রমন শুরু। তবে মংলা বন্দরের দূরাবস্থা দেখে খারাপ লাগলো খুব।

মংলা বন্দরে আমরা...
আগে থেকেই ঠিক করে রাখা রেডসান-১ লঞ্চ এ করে আমরা রওনা দিলাম সুন্দরবন এর দিকে।
ঢাংমারী ফরেষ্ট ষ্টেশন থেকে সুন্দরবন ঢুকার মুখেই নিতে হলো প্রয়োজনীয় অনুমতি এবং সুন্দরবন ঘোরার জন্য গানম্যান। তারপর আমরা রওনা দিলাম ভৌগলিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিরইন পয়েন এর দিকে।মংলা বন্দর থেকে হিরইন পয়েন এ যেতে লাগলো প্রায় ৫ঘন্টা। এই ৫ঘন্টা পশুর নদীর দু পাশের সুন্দরবনের দৃশ্য ও সবাই মিলে গল্প করে কাটালাম।মাঝে দুপুরের খাওয়াটা ও শেষ করে নিলাম লঞ্চ এর ডাইনিং এ।
৪টার দিকে আমরা হিরইন পয়েন এ পৌছালাম।


ড়াইনিং এ...
চট্টগ্রাম থেকে সুন্দরবনের হিরইন পয়েন দীর্ঘ ২০-২১ ঘন্টার ভ্রমন । দীর্ঘ এই ভ্রমন শেষে লঞ্চ যখন হিরইন পয়েন ঘাটে ভিড়লো তখন দিনের আলো প্রায় শেষের পথে।নিরাপত্তা জনিত কারণে কাউকে লঞ্চ থেকে নামার অনুমতি দিলেন না শিক্ষকরা। দু পাশে সুন্দরবন আর আমরা নদীর মাঝে,সূর্যের পড়ন্ত আলোয় চারদিকে এক মায়াবী পরিবেশ। সবাই তখন নিশ্চুপ বসে বসে কেবল উপভোগ করছে প্রকৃতি। সূর্যের আলো পশ্চিম আকাশে মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই লঞ্চের বৈদ্যতিক আলো জলে উঠলো আর সাথে সাথেই সবাই ছুঠলো যার যার নির্ধারিত কেবিন এ।কারণ আর কিছুই নই,সবাই মোবাইল চার্জ দিয়ে নিচ্ছিলো। যদি ও হিরইন পয়েন এ আসার অনেক আগে থেকেই কোন মোবাইলেই নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছিলোনা। রাতের আধারে বাইরের কিছুই যেহেতু স্পষ্ট নয়,তাই ঐ দিন লঞ্চের ভিতরে সবাই গানবাজনা আর গল্প করেই কাটিয়ে দিলাম। স্যারেরাও আমাদের সাথে অংশ নিলেন।রাত ৯টার দিকে আমরা রাতের খাবার খেয়ে সবাইকে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর সুযোগ করে দিলাম যাতে পরদিন সূর্যদোয় মিস্ না হয়।তাছাড়া সবাই দীর্ঘ ভ্রমনজনিত ক্লান্তও ছিল।


রাতের আধারে হিরইন পয়েনে ...
৩রা ডিসেম্বর বুধবার, ভোর ৪.৩০ এ ঘুম ভাঙ্গলো।উঠেই কেবিন থেকে বের হয়ে দেখি সবাই প্রায় উঠে গেছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি চারপাশ কুয়াশার চাদরে ঢাকা।তারপর মুখহাত ধুয়ে সবাই যখন তৈরী হয়ে এলো ততোক্ষণে সূর্য পূব আকাশে উকিঁ দেয়া শুরু করছে।

ভোরের আলো ফুটছে...

লঞ্চের সাথে থাকা ইন্জ্ঞিন চালিত নৌকায় করে আমরা ৫০ জন রওনা দিলাম ভোর রাতের সুন্দরবন দেখার উদ্দেশ্যে।
দুই পাশে ঘন বন,গোলপাতা,সুন্দরী সহ আরও অনেক নাম না জানা গাছগাছালি দেখতে দেখতে এগুচ্ছে আমাদের নৌকা।দুই তীরে এবং গাছের ডালে অলস বসে আছে বিভিন্ন জাতের বক ও নাম না জানা পাখিরা।নানান রঙের,নানান সৌন্দর্যের মাছরাঙাগুলোই কেবল ব্যস্ত সময় পার করছিল মাছ শিকার করে। নদীর দুই পাড়ে স্থানীয় জেলেরা ব্যস্ত ছিল তাদের লাগানো জাল থেকে মাছ ছড়ানোতে।আমরা সবাই তখন ব্যস্ত প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য্য অবলোকন করায়।

জেলেদের মাছ ধরা...

এমন সময় হঠাৎ হামিদ স্যার এর চিৎকারে আমরা অবাক হয়! ব্যাপার কি? আর কিছুই না,গাছের ফাঁকে সুন্দরবনের এক মায়াবী হরিণ।আমরা সবাই অবাক চোখে হরিণটাকে দেখছি,ঠিক তেমনি হরিণটিও অবাক হয়ে আমাদের দেখছে! তারপর আবার চিৎকার... আরও হরিণ... অসাধারণ সেই অনুভূতি। আমাদের নেওয়া ডিজিটাল ক্যামরাগুলোর তথ্য ভান্ডার দ্রুত সমৃদ্ধ হচ্ছিল হরিণ,পাখি এবং নাম না জানা অচেনা সব গাছের ছবি তুলে ও ভিড়িও করে। এইভাবে কখন যে সূর্য পূব আকাশে সম্পূর্ণ উঠে গেছে খেয়ালি করেনি কেউ। এরপর আমরা ইন্জ্ঞিন নৌকায় গেলাম হিরইন পয়েন এর জেঠিতে।উদ্দেশ্য হিরইন পয়েন ঘুরে দেখা।হিরইন পয়েন এ ঢোকার মুখেই ছিল বিশ্ব ঐতিয্য ফলক।আগে-পিছে ২জন নিরাপত্তা রক্ষী নিয়ে আমাদের পুরো দলটাই প্রথমবারের মত সুন্দরবনের ভিতরে প্রবেশ করলো। অবশ্য হিরইন পয়েন এ আমরা তেমন কোন প্রাণীই দেখিনি।তবে গানম্যান যখন আমাদের ডেকে বাঘ মামার পায়ের ছাপ দেখালো তখন যে সবার মনে অজানা ভয় এসে ভর করলো তা সবার চোখেমুখেই ভেসে উঠলো।কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর আমরা উঠলাম হিরইন পয়েন এর পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এ। এই টাওয়ারটির বর্তমান অবস্থা খুবই নাজুক।৫ তলা বিশিষ্ট এই টাওয়ার এ ৫ জনের বেশী একসাথে ওঠা নিষেধ।
টাওয়ার এর উপর থেকে তেমন কিছু দেখাও যায়নি।


বিশ্ব ঐতিয্য ফলকের সামনে...
হিরইন পয়েন দেখে লঞ্চ এ ফিরে এসেই সবাই সকালের নাস্তা শেষ করলো।তারপর আমাদের লঞ্চের ক্যাপ্টেন ঘোষণা দিলেন,আমরা হিরইন পয়েন থেকে লঞ্চ ছেড়ে দুবলার চরের উদ্দেশ্যে রওনা করছি।এভাবেই শেষ হলো আমাদের হিরইন পয়েন এর অভিযান। লঞ্চ এখন দুবলার চরের পথে... বাতাসে শুটকির গন্ধ পেয়েই বুঝলাম আমরা দুবলার চরে পৌছে গেছি।দুবলার চরে পৌছাঁলাম তখন সকাল ১০.৩০। সবাই নামলাম।স্যারেরা সময় বেধে দিলেন আধা ঘন্টা।কারণ আমাদের পরের গন্তব্য কটকায় পৌছাতে হবে দ্রুত।


দুবলার চর...
দুবলার চরে নেমেই ছুটে গেলাম শুটকি পরিদর্শনে। নানা জাতের নানা ধরনের শুটকি শুকানো হচ্ছে।সবচেয়ে ভালো লাগলো যখন জানলাম,ওখানে কাজ করা মানুষগুলো বেশীর ভাগই চট্টগ্রাম জেলার।নিজেদের জেলার মানুষ পেয়ে তারাও খুব খুশি, এই সুযোগ এ আমরাও কিছুটা কম দামে শুটকি পেয়ে গেলাম তাদের কাছে!অনেকেই শুটকি কিনলাম আমরা।ফাকেঁ ফাকেঁ ছবি তুলছিল সবাই।বেশ কিছু গ্রুপ ছবি তুললাম।আমার ক্যামেরাও থেমে ছিল না। আরও কিছুক্ষণ এদিক সেদিক হেটেঁ সবাই লঞ্চ এ ফিরে এলাম।এরপর লঞ্চ আবার যাত্রা শুরু করলো কটকার উদ্দেশ্যে।
আবার সেই লঞ্চের একঘেয়ে বটবট আওয়াজ। কিন্তু নদীর দু পাশের প্রকৃতি সেই একঘেয়েমি দূর করে দেয় নিমেষেই।তার সাথে ছাত্রদের গীটারের টুংটাং আওয়াজ ও দরাজ গলায় গাওয়া গান
ওরে..নীল দরিয়া...
আমায়... দে রে দে... ছাড়িয়...
সে এক দারুন অনুভূতি...
এভাবে কখন যে সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো খেয়ালই করিনি।হঠাৎ লঞ্চের হুইসেল এ সম্বিত ফিরে পেলাম সবাই।বুঝতে পারলাম কটকা চলে এসেছি আমরা।
তাড়াতাড়ি দুপুরের খাবার সেরে নিলাম সবাই।তারপর সবাই দ্রুত তৈরী হয়ে নিলাম কটকা ভ্রমনের জন্য।লঞ্চ ঘাটে ভিড়লে ধীরে ধীরে সবাই নেমে পড়লাম কটকার মূল ভূমিতে।শুরু হলো কটকা অভিযান... সুন্দরবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জায়গা কটকা.... লঞ্চ থেকে কটকা ঘাটে নামার পূর্বেই বুঝতে পারলাম কেন কটকা এতো আকর্ষনীয় পর্যটন স্পট।নদীর দু পাশেই ঘন জঙ্গল,তার ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির বানর,পাখি ও হরিণ।আমাদের আসার আওয়াজ পেয়ে তারা লুকাতে থাকে বনের গভীরে।
সবাই নামলাম লঞ্চ থেকে।তারপর স্যারেরা আমাদের ৭টি গ্রুপে ভাগ করে দিলেন,প্রতি গ্রুপে একজন গ্রুপ লিডারও ঠিক করে দিলেন যাতে গ্রুপ লিডার সবার প্রতি নজর রাখতে পারে ।সুন্দরবনের অন্য সব জায়গা থেকে কটকায় অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন এর ব্যাপারে আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল।অতঃপর কটকা অভিযান শুরু...


কটকা প্রবেশ...

সবার সামনে নিরাপত্তা রক্ষী তারপর আমরা এবং সবশেষেও আর একজন নিরাপত্তা রক্ষী,এভাবেই আমরা শুরু করি কটকার অভ্যন্তরে যাত্রা।কটকায় ঢুকার মুখেই পর্যবেক্ষণ টাওয়ার।তাই ৭দলে ভাগ হয়ে আলাদা আলাদা ভাবে টাওয়ার এ উঠলাম। সে এক অসাধারণ দৃশ্য! চারপাশে সবুজ আর তার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে হরিণের দল।আমরা যে হরিণের এত কাছে তা টাওয়ার এ উঠার আগ পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি।ঐ মূহুর্তে সবাইকে প্রকৃতি যেন যাদু করে রেখেছিল তার সৌন্দর্য দিয়ে। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে নেমে সবাই বনের গভীরে রওনা দিলাম। কারও মুখে আওয়াজ নেই... নিঃশব্দ... যেন সবাই বাকহারা...
আসলে সবাই চুপ করেছিল হরিণের দল যাতে পালিয়ে না যায় সেজন্য।
হরিণগুলো দলবল সহ ঘুরছিল ।কিন্ত যখনই আমাদের অস্থিত্ব বুঝতে পেলো তখন পালিয়ে গেলো এদিক সেদিক...কিন্তু পালালে কি হবে আমাদের ক্যামেরাগুলোর শক্তিশালী লেন্স ঠিকই তাদের বন্দি করে ফেলেছে ! ততোক্ষণে আমাদের ছাত্রদের দলগুলো মিলেমিশে একাকার।যে যার মত উপভোগ করতে লাগলো এইসব দূর্লভ দৃশ্য।অবশ্য দল ভাঙ্গলেও আমরা সবাই একত্রে ছিলাম সবসময়।তাই স্যারেরাও তেমন বাধাঁ দিলেন না।


হরিণ দর্শন...
এভাবে প্রকৃতি ও হরিণ দেখতে দেখতে কখন যে আমরা গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করেছি বুঝতেই পারিনি। যখন খেয়াল করলাম দেখি দু পাশেই ঘন জঙ্গল। হাজারো গাছ। একটু ভালোভাবে খেয়াল করতেই দেখলাম শত শত ভাঙ্গাঁ গাছ।
ঘূর্ণিঝড় সিডরের তান্ডব। সিডর এর ভয়াবহ তান্ডব থেকে পুরো দেশকে রক্ষা করতে সুন্দরবন নিজেকে বিলিয়ে কীভাবে দেশকে রক্ষা করেছে তা নিজে না দেখলে বোঝা অবিশ্বাস্য...! কিন্তু আশার কথা আবারও জেগে উঠেছে সুন্দরবন । নতুন নতুন গাছগাছালিতে ভরে উঠেছে পুরো সুন্দরবন।যেন এই শীতেই বসন্তের আগমন শোনাচ্ছে সুন্দরবন।সুন্দরবনের এই নতুন জাগরণ সুন্দরবনকে নিয়ে গেছে অন্য এক মাত্রায়।তাই এখনকার সুন্দরবন আগের চেয়ে আরও বেশী সুন্দর,আরও বেশী আকর্ষনীয়।

সিডরের তান্ডব...

আমরা এগিয়ে চলছি ঘন জঙ্গলের মধ্যখান দিয়ে.... দুপাশে হাজারো গাছ,নানা প্রজাতির পাখির আওয়াজ এবং গাইডের মুখে বাঘের লোমহর্ষক ঘটনা শুনতে শুনতে আমরা এগুচ্ছি ঘন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে।
সবাই চুপচাপ,অজানা আতংক মনে, কখন আবার বাঘ মামার শিকার হতে হয় ! হঠাৎ শো শো গর্জন কানে এলো...বাঘ যেন ছুটে আসছে এইদিকে !!
তারপরেও সবাই এগিয়ে যায় সামনের দিকে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠে গর্জন।হঠাৎ করেই পুরো দৃশ্যপঠ বদলে গেল!! সুন্দরবন তার রূপ যেন বদলে ফেললো নিমেষেই।আমাদের সামনে এখন বিশাল জলরাশি।সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে সুন্দরবনের উপর।সে এক অন্যরকম সৌন্দর্য্য,ভাষায় প্রকাশ করার নয়।সাগর জীবনে অনেকবার দেখেছি কিন্তু এমন ভাবে আর কখনো আমার চোখে ধরা পড়েনি।সবাই সাগর দেখে যেন পাগল হয়ে গেল।এতক্ষণের একতাবদ্ধ দলটি ভেঙ্গে,সবাই ছোটাছুটি শুরু করলো।
কেউ গেল পানিতে,কেউ শামুক কুড়াতে,কেউবা গলা ছেড়ে গান ধরলো।


কটকা সমুদ্র সৈকত...
সংবিৎ ফিরে পেলাম যখন গার্ড জানালো ২০০৪ এর এক মর্মান্তিক ঘটনা। ১১ জন ছাত্র-ছাত্রীর পানিতে মৃত্যুবরনের ঘটনা শুনে স্যাররা সবাইকে সাবধান করে দিলেন। এমন সময় দূর থেকে এক ছাত্রের চিৎকারে পরিবেশ আরও ভীতিকর হয়ে উঠে।কাছে গিয়ে দেখি তরতাজা বাঘের পায়ের ছাপ।একটা-দুটা নয় অনেকগুলো।
গার্ড এগিয়ে এসে এই ছাপ পর্যবেক্ষণ শেষে ঘোষণা করলো এই ছাপ অল্প কিছুক্ষণ আগের।কারণ সমুদ্রের পাড়ের প্রচুর বাতাসে বালিতে এই ছাপ আধা ঘন্টার বেশি থাকেনা।আরও বললো অন্তত দুইটি বাঘ এসেছিল।

বাঘের পায়ের চাপ...
আমাদের অবস্থা হলো তখন দেখার মতো।সবাই যেন বাঘ মামার গন্ধ পাচ্ছিলো।এই বুঝি বাঘ মামা এলো!
কিছুক্ষণ পর গার্ডদের পীড়াপীড়ি ও শেষে স্যারদের নির্দেশে আমরা পূণরায় জঙ্গল পার হয়ে ফিরে এলাম লঞ্চে।শেষ হলো সুন্দরবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিযান।আমরা তৈরী হতে থাকলাম পরের দিনের কারমজল অভিযানের জন্য.... সকালে ঘুম ভাঙ্গলো লঞ্চের ভটভট আওয়াজে... উঠেই দেখি লঞ্চ করামজলের উদ্দ্যেশে রওনা দিয়েছে ভোর রাতেই।লঞ্চের পিছনে গিয়ে দেখি কটকা এখনো দেখা যাচ্ছে।মনটা খারাপ হয়ে গেল,প্রিয় কটকা থেকে বিদায় নেওয়া হলোনা বলে।করামজল কটকা থেকে দীর্ঘ ৬-৭ ঘন্টার ভ্রমন
এই দীর্ঘ সময় খুবই আনন্দে কাটালাম আমরা সবাই মিলে।ছোটখাট একটা অনুষ্ঠান হয়ে গেল লঞ্চের ছাদে,যাতে ছাত্র-শিক্ষক সবাই অংশগ্রহন করলো।
গান,কৌতুক,অভিনয় সবই ছিল...

অভিনয়ের একাংশ...


পুরস্কার বিতরণ...

এভাবে কখন যে দিন কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।বিকেল নাগাদ আমরা করামজল পৌছালাম। করামজল আসলে একটা সাফারী পার্ক বলা চলে।এখানে ঢোকার মুখেই সুন্দরবনের একটা বিশাল মানচিত্র।পাশেই আছে বাঘ মামার কঙ্কাল, কুমিরের ডিম ইত্যাদি। একটু সামনে এগুতেই দেখি হরিণ।হরিণগুলো সুন্দরবনের বন্য হরিণের মতো পালালোনা খাবারের লোভে।উম্মুক্ত বানরগুলো খুব মজা দিল সবাইকে। এরপর সবাই ঢুকলাম বনের গভীরে অবশ্য কটকার মতো নয় এখানে বন বিভাগের বানানো সুদৃশ্য পথে আমরা রওনা হলাম ভিতরে। এখানে দেখার তেমন কিছু নাই, তবে গাছের গায়ে নাম লেখা থাকায় গাছগুলো চিনতে পারলাম সবাই।

বনের গহীনে বন্ধুর সাথে আমি...
বন থেকে বের হয়ে গেলাম কুমিরের প্রজনন কেন্দ্র দেখতে।এখানে একটা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে যেখান থেকে পুরো করামজল দৃশ্যমান।অবশেষে সব দেখা শেষে সবাই ফিরে এলো লঞ্চেআসার সময় অবশ্য সবাই সুন্দরবনের মধু কিনতে ভুল করলোনা।
অতঃপর শেষ হলো আমাদের সুন্দরবন ভ্রমন...

বিদায় সুন্দরবন...
গত ৫দিনের সুখ স্মৃতি নিয়ে সবাই রওনা হলাম নিজ গন্ত্যব্যে।
tayub লেখক আবু তৈয়ব
Prothom-alo Blog

Friday, November 12, 2010

পর্যটক হিসাবে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের দেখা

পর্যটক হিসাবে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের দেখা

পর্যটক হিসাবে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের দেখা পেয়েছেন তেমন লোক হাতে গোনা যাবে। আর খপ্পরে পড়েছেন? নাহ্, আমি অন্তত তেমন কিছু শুনিনি কোনদিন। তবে, যতবার গিয়েছি আশেপাশের কেউ তার শিকার হয়েছেন সেকথা শুনেছি প্রতিবার। কখনও লাশ ফিরিয়ে আনা গেছে, কখনও পাওয়া যায়নি। এই যেমন, এবারে তিন জনকে বাঘে ধরার খবর শুনেছি, তিনটাই ছিলো টাটকা। দুজনের লাশ ফিরিয়ে আনা গেছে আর একজনকে আহত অবস্থায়। একটা করে খবর আসে আর আমাদের বাপ্পিদা ফোনে সংবাদ পাঠান, পরদিনের দৈনিকে টাটকা খবর হিসাবে। শেষেরটা ছিলো ভয়াবহ। গামছায় ভরে ছিন্নভিন্ন দেহ বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সেই ট্রলার এসেছে মাঝনদীতে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে আটকে থাকা আমাদের উদ্ধার করতে, ট্রলারের মাঝির লাশদেখে বমি করে দেবার দাগটুকু মোছার আগেই।এবারের ঘোরাঘুরিটা এরকম অনেক কারনেই মনে দাগ কেটে থাকবে আজীবন। গিয়েছিলাম দুবলার চরের রাসমেলা দেখতে। কত শুনেছি এই রাসমেলার কথা। অথচ সেখানে পৌঁছে পূজার আগেই ফিরে এসেছি আশাহত হয়ে। আসলে সুন্দরবন দেখতে হলে সুন্দরবনে থাকাই ভালো।প্রচলিত ধারার ট্যূর কোম্পানীর সাথে বেড়াতে যেয়ে সুন্দরবনের মজা কতটুকু পাওয়া যায়, তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে আমার। মানে আরাম পাইনি কোনদিন। অনেক নিয়মের বেড়াজালে নৌকা ভ্রমনটাইপের একটা ব্যাপার ঘটে সেখানে। তাই গুগুল ম্যাপের কল্যানে প্রতিবারই নুতন জায়গা খুঁজে বের করে সেদিকে ঘুরে আসার ভেতর যে রোমাঞ্চ, তার প্রতি আগ্রহটাই বেশি আমার।

ভয়, উৎকন্ঠা, সাহস আর রোমাঞ্চপ্রিয়তার এক চুড়ান্ত ঘটনার কথা আজ শুনাবো আপনাদের। সুন্দরবনের হিরনপয়েন্ট পুরো বনএলাকার বনেদী অঞ্চলগুলোর অন্যতম। ভারতীয় সীমান্ত থেকে ২৫ মাইল পূবে সুন্দরবনের দক্ষিণে হিরনপয়েন্টে ফরেস্ট অফিস ছাড়াও মংলা পোর্টের শাখা অফিস আর নৌবাহিনীর ডেরা আছে সেখানে। ফরেস্ট অফিসের উত্তরে নদীর ঠিক ওপারে বনটার নাম কেওড়াশুটি, সম্ভবত প্রচুর কেওড়া গাছ আছে বলেই। চারদিকে নদীঘেরা পূবে পশ্চিমে দুমাইল আর উত্তর দক্ষিণে আধামাইলের কিছু বেশী জায়গাটা গুগুলে খুঁটিয়ে দেখতে যেয়ে কিছু বিশেষত্ব খুঁজে পেলাম। যেমন ধরেন, এর মাঝখানে একটা অংশে গাছপালার পরিমান কিছুটা কম, ভেতরে একটা মিঠা পানির পুকুরের মতন আছে এসব। যার সবগুলোই আসলে প্রমান করে ভেতরে প্রচুর হরিনের অবস্থান আর অবধারিত ভাবেই বাঘের উপস্থিতি। ট্যুর কোম্পানীগুলো এসব স্থান এড়িয়ে চলে, এমনকি আমাদের বাপ্পিদাও প্রথম প্রথম নিমরাজি ছিলেন। আমাদের, বিশেষ করে আমার অটল সিদ্বান্তের কারনেই শেষপর্যন্ত এবারের সুন্দরবনযাত্রার প্রথম ভোরে নাস্তা সারবার আগেই ঘন্টা দুয়েকের জন্য ভেতরে এ জায়গায় যাবার অনুমতি দিলেন। আমার বেশ ক’বার বনযাত্রায় যত জায়গা দেখেছি আর যত ছবি তুলেছি তার ভেতরে সবচাইতে সুন্দর যায়গা আর ছবিগুলো এখানকারই।

সেখান থেকে ফিরে এসে সিদ্বান্ত নিলাম দুবলারচরে অবস্থানের সময় কমিয়ে এনে পরদিন বিকেলে আবারো এ জায়গাটাতে আরেকটু বেশী সময় কাটিয়ে যাবো। দুবলারচর থেকে তাই মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগেই দুপুরের দিকে হিরনপয়েন্টের দিকে ফিরতি যাত্রা করলাম। ততক্ষণে ভাটা নেমে এসেছে। হিরনপয়েন্টের প্রায় দুকিলোমিটার দূরে থাকতেই পানির অস্বাভাবিক কমে যাওয়া খেয়াল করছিলাম, আরেকটু কাছে আসতেই আমাদের ট্রলার বালুতে আটকে গেল। নীচের ঢেউ দেখে বোঝার উপায় নেই যে পানি এখানে মাত্র দু / আড়াইফিট। হিসাব করে দেখলাম পরবর্তী জোয়ার আসতে আসতে আরো প্রায় তিন ঘন্টা লাগবে, তাই নেমে গেলাম পানিতে। হিরনপয়েন্টের ওপারের জায়গাটায় হেঁটে যেতে হলে গলা পানি ভাংতে হবে। তাতে সময় বেশী লাগবে আর ক্যামেরাও ভিজে যেতে পারে সেই চিন্তায় নুতন প্ল্যান করলাম। আমরা যেখানে নেমেছি সেখান থেকে সোজা হেঁটে ভেজা বালুর চর পেরিয়ে অল্প একটু কেওড়া আর গর্জনের বন পেরুলেই পৌঁছে যাবো ঐ তিন অফিসের পেছনের ঘন ছন গাছে ছাওয়া বিশাল মাঠের কিনারে। সেখান থেকে মাঠের মাঝদিয়ে ছোট্ট একটা মিঠাপানির জলার পাশদিয়ে পরিত্যাক্ত হেলিপেড পাড়ি দিলেই ছোট্ট মাটির রাস্তা বেয়ে ফরেস্ট অফিসের পুকুর। ঘুরতে ঘুরতে ছবি তুলতে তুলতে সেখানে পৌঁছাতে আড়াইঘন্টার বেশী লাগবার কথা নয়। আমরা পাঁচ সহযাত্রী বনের কাছাকাছি আসতেই রাইফেল হাতে এমদাদ আর রেজাউল নেমে এলেন। পানিতে নেমেছিলাম বলে সবার পা খালি। বনের কাছাকাছি বালুতে ছোট ছোট ঘাস, পায়ে কাটার মত বিঁধে। এরমাঝে শ্বাসমূল, এগুলোর খোঁচাও পায়ে লাগে। অনেকদূর যেতে হবে এই কষ্ট গায়ে মেখে। আমাদের দুজন তাই নৌকায় ফিরে গেলো। আমরা হাঁটছি সাবধানে। খুবকাছে দিয়ে হরিণ ছুটে যায়, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি, ছবি তুলি একটা দুটো। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বনের প্রান্তে। এমদাদ আরেকপ্রস্থ বনের নিয়ম স্মরণ করিয়ে দিলো সবাইকে। সমূহ বিপদের কথা মাথায় রেখে রেজাউল তার রাইফেল তৈরী রাখলো। কেওড়া বনে হালকা পানি, কাদাও আছে। আমার সামনে এমদাদ, পেছনে অন্যরা, সবশেষে রেজাউল। এমদাদ যেখানে পা ফেলে আমিও সেখানে, তাতে কাঁটা ফোটার সম্ভাবনা কম। একশ মিটার পেরোতে আধঘন্টা পেরিয়ে গেলো, সামনে হাতদশেক জুড়ে কাঁটা গাছ আর ঘাস, হাতখানিক লম্বা, অবশেষে ছনে ঢাকা মাঠ। ডানদিকে পোর্ট অফিসের দোতলার ছাঁদ দেখা যায়। উপরদিকে তাকালে টাওয়ার। দুদিন আগেও ছন বাগানের ওদিকটাতে এসেছিলাম একবার, সেদিকে ছেঁটে ফেলায় ছন গাছ দেখাচ্ছিলো ঘাসের মতন। কিন্তু এদিকে ছনের আগা মাথা ছুঁয়ে যায়। কয়েকপা এগিয়ে ডাকলাম ‘এমদাদ’। আমার দিকে ঘুরে মনের কথা পড়ে ফেললো সে। বললো, ‘ঠিকই বস্, এখান দিয়ে যাওয়া নিরাপদ না’। হিরনপয়েন্ট এলেও এমদাদ এদিকে আসেনি। আমার গুগুল জ্ঞান আর এমদাদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে ঠিক করলাম ছনের বন আর কাঁটা গাছের পাশদিয়ে পশ্চিমে হেঁটে মিঠা পানির জায়গাটার পাশদিয়ে পরিত্যাক্ত হেলিপ্যাড দিয়ে উত্তরে উঠবো আমরা। সে অনূযায়ী ঘুরে বেড়িয়ে এলাম, রেজাউল সহ আমাদের একজন তখনও কাঁটা গাছ পেরোচ্ছে পায়ে কাঁটা বিঁধিয়ে। আমার আরেক সহযাত্রী বললো ‘সামনে হরিণ পাওয়া যেতে পারে, টেলি লেন্সটা লাগিয়ে নিই’। সামনে হাতপাঁচেক দূরে কয়েকহাত খোলা জায়গার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম ‘সেখানে যেয়ে করেন’। সেখানে পৌঁছে যেইনা সে নিচু হয়েছে অমনি রক্ত হিম করা ভয়ঙ্কর সে ডাক। আমাদের বামে দশহাতের ভেতর একদেড় হাত উঁচু কাঁটা আর ঘাসের ভেতর থেকে।

মূহুর্তের ভেতর অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেলো একসাথে। এমদাদ ‘এলাট’ বলে (এলার্ট নয়) চিৎকার দিয়ে রাইফেল কক্‌ করে হাটু ভেঙ্গে বামে তাক করে বসলো। আমার বামহাতে ক্যামেরা বামদিকেই তাক করা ছিলো, তাতে ডান হাতের চাপে ছবি উঠলো, আমার পাশের জন একহাতে ক্যামেরা আর অন্য হাতে লেন্স নিয়ে চট করে বসে গেলো। পেছনের দুজন কাছাকাছি ঘেসে দাঁড়ালো আর রেজাউলের রাইফেল নিরবে ঘুরে গেলো শব্দের উৎসের দিকে। কি যেনো দেখলাম মনে হয় নড়ে উঠলো, এরপর চারদিক নিঃশব্দ, কোন আওয়াজ নেই কোথাও। বাতাসও মনে হলো থেমে আছে, শুধু শব্দের উৎসের কাছে ছোট একটা কাঁটা গাছ আস্তে আস্তে দুলতে দুলতে থেমে গেলো। নিরবতা ভেঙ্গে এমদাদ বলে উঠলো চলে গেছে, তাড়াতাড়ি হাঁটেন। ক্যামেরার স্ক্রীনে তাকালাম, দশহাত দূরে গোলপাতা আর সামনে কিছু কাঁটা গাছ আর ঘাসের ছবি। সামনের মাটিতে টাটকা পায়ের ছাপ অভিজ্ঞ এমদাদের চোখ বলে পূর্নবয়স্ক পুরুষ বাঘ এটি, উচ্চতা সাড়েতিন ফুটের কাছাকাছি। অথচ এত ছোট ঘাসের মাঝে নিজেকে এমন ভাবে লুকিয়ে রেখেছিলো আমাদের কারো চোখে পড়েনি।

আর কোন সমস্যা ছাড়াই চলে এলাম ফরেস্ট অফিসে, ছন বনের জলায় মাছ ধরতে থাকা পোর্টের দুজনও চলে এলো আমাদের পিছুপিছু।

...............
স্থানীয় সবাই অভিজ্ঞতার পুরো বিবরণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শোনার পর ঘটনার আকার দাঁড়িয়েছে এরকম...

বালুর মাঠ থেকে বনে আমাদের ঢুকতে দেখে বাঘ আক্রমনের সিদ্বান্ত নেয়। কাউকে বা কিছু আক্রমন করতে গেলে বাঘ অনেক্ষণ ধরে সেটা অনুসরণ করে আচার আচরন খেয়াল করে এরপর আক্রমনের স্থান নির্ধারন করে ওৎ পেতে থাকে। আমরা যখন বনে আস্তে আস্তে হাঁটছি সেসময় সে আমাদের আচরন খেয়াল করে টার্গেট ঠিক করে সেখানে ওৎ পেতে ছিলো। কোন কারনে টার্গেটের অস্বাভাবিক কোন আচরনে বাঘ, বিশেষত রয়েল বেঙ্গল টাইগার তার আক্রমনের সিদ্বান্ত পরিবর্তন করে।

আমাদের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে তিনটি বিষয়, প্রথমত বনে আমরা আস্তে হেঁটেছি কিন্তু বন পেরিয়ে একটু জোরে, দ্বিতীয়ত একবার ঘন উঁচু ছনবনে ঢুকেও আমাদের বেরিয়ে আসা, তৃতীয় কারনটা আমার সাথে থাকা ক্যামেরার লেন্স বদলাতে যাওয়া সহযাত্রী, বেশীরভাগের ধারনা বাঘের টার্গেট ছিলো সে এবং বাঘ লাফ দেবার চুড়ান্ত মুহুর্তে সে লেন্স বদলাতে যেয়ে বসে যাওয়াতেই বাঘ হালকা গর্জন করে বিরক্তি প্রকাশ করে সরে গেয়েছে। তাদের মতামত বাঘ যদি আক্রমনের মুডে না থাকতো তাহলে এত বড় বাঘ অবশ্যই আমাদের নজরে আসতো।
By -Spiritual touch মুস্তাফিজ
www.flicker.com

Thursday, November 11, 2010

উত্তর সুন্দরবন ও বাঘ

উত্তর সুন্দরবন ও বাঘ

লিখেছেন:
দীপেন ভট্টাচার্য
Font size

বাঘের ওপর ফরিদ আহমেদের (ব্যাঘ্র শিকারি সারমেয়) ও কাছিমের ওপর বিপ্লব রহমানের লেখাদুটোতে অনুপ্রাণিত হয়ে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্রের বছর উপলক্ষে এই ফটো-লগটা দিচ্ছি। এই বছরের প্রথম দিকে আমার সুন্দরবন যাবার কিছু ছবি দিলাম, তারপরে বাঘ-সংক্রান্ত কিছু হৃদয় বিদারক তথ্যও দিলাম। যদি সময় না থাকে আমি পাঠকদের অনুরোধ করব, এই লেখা না পড়ে, একদম শেষে আল-জিজিরার লিঙ্কের ভিডিওটা দেখুন। শেষের দুটো গুরুত্বপূর্ণ ছবি (নাইমুল ইসলাম অপুর তোলা) ছাড়া অন্য ছবিগুলো আমার তোলা।

sundarban1
সুন্দরবনের উত্তর প্রান্ত

sundarban2

খুলনা ও মঙ্গলার মধ্যে শুধু হচ্ছে চিংড়ি চাষ। নদী থেকে লবণাক্ত জল পাম্প করে চাষযোগ্য জমিতে জমিয়ে চিংড়ির উপযোগী করা হচ্ছে।

sundarban3

শীতের বকেরা খাবার খুঁজছে শুকিয়ে-যাওয়া চিংড়ির ঘেরে। এই জমিগুলো আর চাষযোগ্য নয়, বরং এই জমি পুরো এলাকার দূষণের উৎস।

sundarban4

মঙ্গলার কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে, শ’য়ে শ’য়ে জেলে খুব সূক্ষ্ম জাল দিয়ে মাছ ধরছে। এই জালের ছিদ্র এতই ছোট যে কোন ধরণের পোনা মাছই বের হতে পারবে না। জেলেরা নিজেরাই জানে এই ধরণের মাছ চাষের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে।

sundarban5

এই কনকনে শীতের ভোরে, এই মহিলা চিংড়ির পোনা (মীন) খুঁজছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। সেই মীন বিক্রী হবে উত্তরের চিংড়ির ফার্মে।

sundarban6

জেলেদের গ্রামগুলোর এই অবস্থা, কোন রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই।

sundarban7

এই দৃশ্যটা খুবই রোমাঞ্চকর মনে হতে পারে, কিন্তু জোয়ার আর ভাটার মধ্যে এটা একটা কর্দমাক্ত অস্তিত্ব। এখানে বনের অবশিষ্টাংশ টিকে আছে।

sundarban8

একটা খাল পেরিয়ে সংরক্ষিত বন শুরু হল। কিন্তু জাহাজ ও বার্জ থেকে নিষ্কাশিত বর্জ্য তেল গোলপাতার ওপর একটা কালিময় রেখা টেনে দিয়েছে।

sundarban9

কিন্তু তার পর একটা কুয়াশায় ঢাকা একটা রহস্যময় বন আমাদের আহ্ববান করে। একটা বাইন গাছ এক কোণায় কোনরকমে দাঁড়িয়ে। জোয়ার দক্ষিণ থেকে পলিভরা জল নিয়ে আসে। ঘোলাটে জলে আমরা একটা শুশুককে লাফাতে দেখি, কিন্তু ক্যামেরায় ধরতে পারি না।

sundarban10

এখানে বন খুবই ঘন, পথ না করে দিলে হাঁটা যাবে না। হারবারিয়ায় আমরা একজন সশস্ত্র রক্ষীকে অনুসরণ করি। সুন্দরী গাছের মূল মাটি থেকে জেগে থাকে। এখানে অনেক সুন্দরী গাছ আগামরা রোগে আক্রান্ত।

sundarban11

অবশেষে বাঘের পদচিহ্ন। নাইমুল ইসলাম অপু বাঘের পায়ের স্কেল বুঝতে চাচ্ছেন।

sundarban12

গোলপাতা ঝোপের মধ্য দিয়ে বাঘের পায়ের ছাপ চলে গেছে। গোলপাতার নাম হয়েছে তার গোল ফলের জন্য। বাওয়ালীরা গোলপাতা দিয়ে ঘরের ছাউনী দেয়।

sundarban13

শেষাবধি আমি এইরকম একটা ছবি মনে রাখার চেষ্টা করি, একটা বন যা কিনা রহস্যময়, কিন্তু খুবই নাজুক। ঐতিহাসিক ভাবে বন থেকে সম্পদ আহরণ করা গেছে চিরাচরিত প্রথায়, কিন্তু তার সীমান্তে জনসংখ্যার চাপে সেই বন আজ ঝুঁকির মুখে।

আমি ফিরে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই একটি বাঘ পার্শ্ববর্তী গ্রামে ঢুকলে তাকে গ্রামবাসীরা ঘেরাও করে। সারাদিন পুলিস ও বিডিআর বাঘটাকে রক্ষা করলেও সন্ধ্যের পর হাজার হাজার গ্রামবাসী জড়ো হলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। লোকেরা দড়ি-দাও-ঢিল-পাটকেল-লাঠি মেরে বাঘটাকে মেরে ফেলে। বাঘ একটা আটক পড়েছে শুনে নাইমুল ইসলাম অপু ঢাকা থেকে চলে যায়, তার পৌঁছানর কিছুক্ষণ আগেই বাঘটা মারা যায়। অপুর তোলা মৃত বাঘের ছবি দিলাম।

sundarban14

মৃত বাঘের ছাল নাকি ছাড়ান হয় কর্তৃপক্ষের তত্বাবধানে। এক বছরে প্রায় ৭টা বাঘ মারা গেল মানুষের হাতে। ধরা হয়ে থাকে এখন ৪০০টির মত বাঘ বাংলাদেশের সুন্দরবনে আছে। কিন্তু এই সংখ্যাটা নিচে ২৫০-২৭৫ থেকে ওপরে ৪৫০ পর্যন্ত হতে পারে।

sundarban15

কিন্তু আপনারা যদি সত্যিই দেখতে চান বাঘকে মানুষ কি ভাবে মারে, তাহলে নিচের লিঙ্কটি দেখতে পারেন (সুন্দরবন টাইগার প্রজেক্টের এডাম বারলোর পাঠান)। শেষ পর্যন্ত দেখবেন, যা দেখবেন তা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। সবাই এটা নাও সহ্য করতে পারেন।