Search This Blog

FCO Travel Advice

Bangladesh Travel Advice

AFRICA Travel Widget

Asia Travel Widget

Wednesday, October 24, 2012

ভ্রমণ : গগনচুম্বী পর্বত ও রূপবৈচিত্র্যে অনন্য নেপাল

ভ্রমণ : গগনচুম্বী পর্বত ও রূপবৈচিত্র্যে অনন্য নেপাল

রা কি ব হো সে ন
বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবেশী দেশ নেপাল। ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে নেপাল একটি ব্যতিক্রমী দেশ। যেখানে জীবনের ছন্দ বিনম্র, ধীরস্থির এবং জীবনধারা ঐতিহ্যবাহী ও সাবলীল। এখানে প্রকৃতি ভারী চমত্কার। ভ্রমণের জন্য নেপালের উঁচু গগনচুম্বী পর্বত ও প্রশস্ত উপত্যকাগুলো খুবই আদর্শ স্থান। নেপালের রূপবৈচিত্র্য কেবল মনোলোভাই নয়, অনন্যও বটে। নেপালের পর্বত যেন আকাশ ছুঁয়েছে। তাই এখানকার অসংখ্য পর্বত প্রকৃতিপ্রেমীদের ব্যাপকভাবে হাতছানি দেয় অবকাশ যাপনের জন্য। এক কথায় বলা যায়, গগনচুম্বী পর্বত ও রূপবৈচিত্র্যে অনন্য নেপাল। এ কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের ভ্রমণ পিপাসুদের প্রিয় গন্তব্যের দেশ হচ্ছে নেপাল। বাংলাদেশে মে মাসের রোদের তাপদাহে চিড়িয়াখানার বানরকুলেরাও যখন গরমে ওষ্ঠাগত, পানিতে নেমে থাকা মহিষকুল ও অন্যান্য প্রাণীর ছবি যখন পত্রিকার পাতায় স্থান পাচ্ছে, তখন নেপালের আবহাওয়া যথেষ্ট ঠাণ্ডা।
হাতে কিছু সময় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নেপালের উদ্দেশে। আমার সফরসঙ্গী হাসান রকিব নামের এক সুদর্শন যুবক। আমরা দু’জনই নতুন। এর আগে কখনও নেপাল যাওয়া হয়নি। তাই ভরসা করতে হয়েছে শামসুল আলম বাবু ভাইয়ের ওপর। বাবু তখন নেপালে অবস্থান করছেন। একদিন আগে এই সুসংবাদটি হাসান রকিবই আমাকে দিয়েছে। এর আগে শামসুল আলম বাবু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে আমার বিজয়নগরের অফিসে। রকিব তাকে অফিসে নিয়ে এসেছিল। পরিচিত হওয়ার সময় জেনেছি, তিনি একজন পর্বতারোহী। নেপালে যাচ্ছেন এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার জন্য। তখন তাকে বলে রেখেছিলাম, এভারেস্ট জয়ের পর নেপালে থাকা অবস্থায় দেশে আসার আগে আমাদের জানাবেন। আমরা নেপালে চলে আসব। বাবু ভাই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পর্বতের চূড়ায় উঠতে না পারলেও কথা রেখেছেন। পর্বত থেকে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে আমাদের জানালেন। তাই যে কথা সেই কাজ। শুরু হলো নেপাল যাত্রা। মতিঝিলের ভার্সেন্টাইল ট্রাভেলস থেকে বাংলাদেশ বিমানের টিকিট নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নেপাল যাত্রা শুরু করলাম। দুপুর ১টায় বিমান ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় থাকলেও বিমানবন্দরে পৌঁছতে হয়েছে বেলা ১১টায়। বিমান ছাড়ার ২০ মিনিট আগে বিমানে ওঠার সুযোগ হয়েছে।
যাত্রী কিছু কম থাকায় নিজ দায়িত্বে বসে পড়লাম জানালার পাশে। এয়ারপোর্ট থেকে বিমান ছাড়ার ১৫ মিনিট পর দূরের এক প্রান্তে দেখতে পেলাম মেঘে ঢাকা ধূসর পাহাড়। তুলোর মতো থোকা থোকা মেঘের কণা ভাসতে থাকে আকাশ পানে। চোখের দৃষ্টি এড়াতে পারল না এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। ক্ষণিকের জন্য হলেও ভ্রমণের সঙ্গী হলো বরফে ঢাকা হিমালয়ের উঁচু পাহাড়গুলো। যেন স্বপ্নের মাঝে বিলীন হয়ে গেলাম, হারিয়ে গেলাম অন্য জগতে। স্বপ্ন ভাঙল ঠিক দেড় ঘণ্টা পর, যখন বিমান নিচে নামতে শুরু করছে। নিচে তাকিয়ে দেখলাম একটু পরে বিমান ল্যান্ড করবে নেপালের ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের রানওয়েতে।
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। কোনো হৈ-হুল্লোড় নেই, কুলি-মজুর বা লাল-নীল বাহিনীর টানা-হেঁচড়া নেই, একেবারে শান্ত পরিবেশ। বিশাল এলাকা নিয়ে বিমানবন্দরের লাউঞ্জ। দেয়াল ও থামে প্রাচীন ঐতিহ্যের সাজসজ্জা। আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীন ঐতিহ্যের সমন্বয়ে সাজানো বিমানবন্দর এলাকা। বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে সব মিলে সময় ব্যয় হলো এক ঘণ্টা। ইমিগ্রেশন থেকে দেয়া হলো পোর্ট এন্ট্রি, এক মাসের ট্যুরিস্ট ভিসা। কার্য সম্পাদন, এগিয়ে চলছি, এবার বের হওয়ার পালা। এক্সিট গেটের সামনে অনেকেই আসছে তাদের প্রিয়জনদের এগিয়ে নিয়ে যেতে। যাদের নেপালে কোনো প্রিয়জন নেই, আমাদের মতো ট্যুরিস্ট, যারা আগেই দেশ থেকে নেপালের হোটেলে রুম বুকিং দিয়ে এসেছেন অথবা কোনো ট্যুরিজম কোম্পানির প্যাকেজে যারা আসছেন—তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন কিছু লোক। হাতে, বুকে বা গলায় ঝোলানো প্ল্যাকার্ড অথবা আর্ট কোডে ইংরেজিতে বড় বড় করে লেখা আগমনকারীর নাম। দেখলেই বোঝা যায় এরা হোটেল বয়, কর্মচারী। তবে তাদের মধ্যে আমাদের পরিচিত কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না। বাবু ভাই বলেছিলেন আমাদের এগিয়ে নিতে বিমানবন্দরে আসবেন, এমনকি আমাদের জন্য হোটেলে রুম বুকিং করা পর্যন্ত কনফার্ম করেছিলেন বিমানে ওঠার আগে মোবাইলে। তাহলে এলেন না কেন? আবার পরক্ষণে সাহসের ওপর নির্ভর হয়ে ভাবছি, আমদের যখন হাতছানি দিয়ে ডাকছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, ঘন নিরক্ষীয় বনাঞ্চল, সমৃদ্ধ প্রাণীজগত, খরস্রোতা নদী, গাছ-গাছালি ঘেরা পাহাড় ও বরফজমা উপত্যকা—তাহলে ভয় কিসের?
গেট পার হয়ে যখন ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ভবনের বাইরে, তখন তাকিয়ে দেখি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন শামসুল আলম বাবু ও মি. দাওয়া। সঙ্গে ড্রাইভারসহ মাইক্রোবাস। তার মানে মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। তাও আবার নেপালে। পরিচিত হয়ে নিলাম বাবড়ি চুলওয়ালা নেপালি যুবক মি. দাওয়ার সঙ্গে। এবার গাড়িতে চেপে রুমে যাওয়ার পালা। রুম মানে কোনো একটি হোটেলের কক্ষ। এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি চলছে থামেলের উদ্দেশে। জেনে নিলাম আমদের গন্তব্য নেপালের ট্যুরিস্ট এরিয়া থামেলের নরবোলিংকা গেস্ট হাউস। বিকাল চারটা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম থামেলের নরবোলিংকা গেস্ট হাউসে। এরই মধ্যে আলাপচারিতা করে দাওয়ার সঙ্গে আমি কিছুটা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম। বুঝতে আর কষ্ট হলো না যে, নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে আগত পর্যটকদের কাছে থামেল নামক স্থানটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। জনসংখ্যার দিক দিয়ে এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ হলেও যাবতীয় কেনাকাটা ছাড়াও এখানে বিভিন্ন ট্যুরিস্ট এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, ভ্রমণ উপকরণের বৈচিত্র্য রয়েছে। এ কারণে বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান থামেল। সস্তা থেকে শুরু করে মধ্যম ব্যয়ের পর্যটকদের জন্য এই স্থানের কোনো বিকল্প নেই। এছাড়াও স্বল্প দূরত্বের ভেতর আছে সুপার মার্কেট, নাইট ক্লাব, ড্যান্স বার, নেপালি লোকজ সঙ্গীতের আসর, বিভিন্ন ঘরানার রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি। তাই থামেল জুড়ে সব সময় থাকে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা।
হোটেল রুমে ঢুকতেই এক নতুন অভিজ্ঞতা। রুমের কোথাও কোনো সিলিং ফ্যান বা এসি নেই। বোঝা গেল নেপালে সারা বছর ঠাণ্ডা লেগে থাকে, তাই এসি-ফ্যানের প্রয়োজন হয় না। ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাথরুমে প্রবেশ করতেই আরেক বিপত্তি। গরম পানির কল দিয়ে ঠাণ্ডা পানি বের হচ্ছে। রুমটি ঘোলাটে, ফকফকা আলো নেই, তার মানে এখানে এনার্জি বাল্ব ঠিকই আশি পার্সেন্ট বিদ্যুত্ সেভ করছে, তখন বুঝতে আর দেরি হলো না, হোটেলটি সৌর বিদ্যুত্চালিত। শুধু এই হোটেলটিই নয়, পুরো কাঠমান্ডু শহর জুড়ে রয়েছে সৌর বিদ্যুতের সাপ্লাই। সারা দিন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে একটানা চৌদ্দ ঘণ্টাই লোডশেডিং, বাকি দশ ঘণ্টা বিদ্যুত্ থাকে। তবে আমাদের দেশের মতো বিদ্যুত্ আসে আর যায় না। এক টানা দশ ঘণ্টাই বিদ্যুত্ থাকে। সন্ধ্যা নাগাদ আমাদের বের হওয়ার কথা। এটি আগের নির্ধারণ করা সময়। বাইরে মাঘ মাসের ঘন কুয়াশার মতো অবস্থা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আগের অভিজ্ঞতা না থাকায় ছাতা নিয়ে যাওয়া হয়নি। ব্যাগে গিন্নির গুঁজে দেয়া মাফলারটি মাথা ও দু’কানে পেঁচিয়ে বের হব, এসময় শামসুল আলম বাবু ভাই বললেন—এই মিয়া এইটা কী পরছেন? এখানে কেউ মাফলার পরে না। পরলে সমস্যা কী? ভারতীয়দের মতো মনে হয়। ভারতীয়দের নেপালিরা ঘৃণার চোখে দেখে। মাফলার পরে বের হলে আপনার সঙ্গে কেউ ভালো ব্যবহার করবে না।
কারণ হিসেবে অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেল, তা এরকম—বিশাল এলাকা নিয়ে নেপালের অবস্থান। যার শুরুটা আফগানিস্তান এবং শেষটা আসাম। যার আয়তন ১,৪৭,১৮১ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ। এই মানুষগুলোর ভাগ্য কেড়ে নিয়েছে নেপালের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। শোষণ করে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। বছরের পর বছর। যে কারণে এখনও নেপাল বিশ্বের মানচিত্রে গরিব দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশ্বের অন্যতম পর্যটনের দেশ হিসেবে নেপালিদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্রে ভারতীয় মুদ্রা চালু থাকার প্রথা না থাকলেও নেপালকে বাধ্য করা হয়েছে। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ লোক কৃষি পেশার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও তাদের কৃষিপণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় ভারতের কাছে। ভারত যেসব নদী থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন করছে, তার বেশিরভাগই হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল থেকে উত্পন্ন এবং অধিকাংশ নদীর উত্পত্তিস্থল নেপালের বিভিন্ন পর্বতের হিমবাহ থেকে। এজন্য ভারত নেপালকে বঞ্চিত রেখেছে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা থেকে। আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারত নেপালকে বাধ্য করছে তাদের রুট ব্যবহারের জন্য। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে নেপালকে ভারতীয় পোর্ট ব্যবহার করতে হয়। অথচ ভারতের পরিবর্তে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পোর্ট ব্যবহার করে নেপাল খুব সহজে কম সময়ের মধ্যে পণ্য আমদানি-রফতানি করতে পারে। নেপালের জাতীয় আয়ের প্রধান উত্স পর্যটন। কিন্তু ভারতীয়দের নেপালে যেতে কোনোরকম ভিসা-পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না। এমনকি তাদের নেপাল ভ্রমণে ডলার বেচাকেনার ঝামেলাও পোহাতে হয় না। নেপালে ভারতের মুদ্রা চালু রাখতে বাধ্য করায় ভারতীয়রা নির্বিঘ্নে নেপাল ভ্রমণে ভারতীয় মুদ্রা খরচ করে। এতে লাভবান হয় ভারতীয় সরকার। আর ঝুটঝামেলা পোহাতে হয় নেপালকে। মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ১ ডলার সমান ৭৮-৮০ নেপালি রুপি। (চলবে)

Source http://www.amardeshonline.com

Tuesday, January 24, 2012

নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেকটি হতে পারে আরো আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র

সরজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক সবুজ বৃষ্টিত নাইক্ষ্যংছড়ি প্রাণ কেন্দ্রে জেলা পরিষদ ডাক বাংলো ঘোঁষে প্রায় আধা কিলো মিটার দীর্ঘ কার্পোটিং সড়ক যুক্ত প্রাকৃতির অপরূপ শোভায় শোভিত উপরণ লেক রয়েছে। একে আরো সৌন্দর্য্যমন্ডিত করে তোলেছে দৃষ্টিনন্দন সারি সারি বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ পাতার গাছ গুলো। উপজেলা সদর প্রাণ কেন্দ্র থেকে ১/২ কিলোমিটার দক্ষিণে উত্তরবিছামারা এলাকায় এম.এ.কালাম ডিগ্রি কলেজ, শৈল শক্তি শিশু বাগ কে.জি স্কুল, মদিনাতুল উলুম ইনস্টিটিউট দাখিল মাদরাসা ঘোঁষে স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের সর্ব প্রথম গয়াল গবেষনা কেন্দ্রের বাংলাদেশ পশুসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বি.এল.আর.আই) আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র। সদর উপজেলার উত্তরে আধ কিলোমিটারে রয়েছে নাইক্ষ্যংছড়ি বি.জি.বির জোন কেন্টেলমেন্ট। শীত মৌসুমে প্রতিদিন পিকিনক পাটি, দেশী-বিদেশী পর্যটক, স্কুল,কলেজের ছাত্র/ছাত্রীরা শিক্ষা সফরে আসেন। সাংবাদ কর্মীরা এখানে গয়াল গবেষণা কেন্দ্রে কিভাবে গয়াল প্রজনন প্রক্রিয়া হয়, তা দেখতে আসেন। এতোসব সমৃদ্ধতার কারণে প্রাকৃতিক সবুজ বেষ্টিত উপবন লেক্ অপার সম্ভাবনাময় অপরূপ সৌন্দর্যের রানী নাইক্ষ্যংছড়িতে প্রতিদিন ভ্রমন ও প্রাকৃতিক সম্পদ পাহাড় নিজ নামে লিজ নিতে অথবা ক্রয় করতে আসেন বিভিন্ন জেলার অসংখ্য পর্যটক ও ব্যবসায়ী শিল্পপতি। স্থানীয়দের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও উপজাতীয়দের স্বভার এবং অতিথি পরায়নতা দেখে তারা অবাক হয়ে যান।পার্বত্য বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র পরিনত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের এক মাত্র গয়াল প্রজনন কেন্দ্র, বৈদেশিক রপ্তানিকৃত চা পাতার বাগান, রাবার বাগান, ভূগর্ভস্থ বাংলাদেশের সর্বব্রহত্র সম্ভাবনাময়ী তৈল ক্ষেত্র ও সীমান্তবর্তী মায়ানমার বাংলাদেশ মৈত্রী বানিজ্য বন্দর সমৃদ্ধ এ পর্যটনে পয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হলে বাংলাদেশ তথা বিশ্বের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব এমন ব্যাখ্যা বিশেষজ্ঞ মহলের।

এলাকাবাসীর পক্ষে উত্তর বিছামারা গ্রামের সমাজ সর্দার আব্দুর রহমান জানান, নাইক্ষ্যংছড়ির মতোই বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এ রকম প্রাকৃতিক সবুজ বেষ্টিত পর্যটন কেন্দ্রটি আজ তিন পার্বত্যের মধ্যেই বিখ্যাত। তাই এলাকাবাসীসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন গুলো দীর্ঘদিন ধরে এখানে আকর্ষনীয় মডেল পর্যটন কেন্দ্র গড়ার দাবি জানিয়ে আসছে। অধজ এ উপকস লেক্ টি উন্নয়নের কোন পদক্ষেপ এ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্দ্যোগে নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেক্ টি মডেল পর্যটন কেন্দ্রে পরিনত করার ঘোষনার পয়োজনে জরিপ কাজ চালানোর মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করার দাবি জানিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব ডা: সিরাজুল হক আরো মনে করেন নাইক্ষ্যংছড়ি পার্বত্য এলাকার সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকে আরো প্রসারিত করে, পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে তুলে ধরার পাশা পাশি অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ইতি মধ্যে বিভিন্ন প্রিন্টমিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদ কর্মীরা এসে বিভিন্ন তথ্য, ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ধারন করে নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেকটি আরো আকর্ষনীয় মডেল পর্যটন কেন্দ্র ঘোষনার দাবি জানিয়েছেন।

Source: http://dailylalgolap.com

Sunday, September 4, 2011

রূপময়ী কাপ্তাই পাহাড়-নদীর হাতছানি

রূপময়ী কাপ্তাই পাহাড়-নদীর হাতছানি

-মো. রেজাউল করিম



প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে ঈদ আনন্দ উপভোগ করার জন্য যে কোনো পর্যটককে আকৃষ্ট করতে পারে কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা অনাবিল আনন্দ বিনোদনের দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কের ‘প্রশান্তি’। আনন্দময় ঈদ আয়োজনকে আরও আনন্দময় করতে পর্যটকদের জন্য এখন উন্মুখ রয়েছে ন্যাশনাল পার্ক। সবুজ বৃক্ষ আর পাহাড় ঘেরা কর্ণফুলী নদী বেষ্টিত ন্যাশনাল পার্ক প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের মন ভরিয়ে দিতে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য সব রকম আয়োজনে সেজে আছে।
কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কের পাশাপাশি কাপ্তাই ৪ ওয়াগ্গা বিজিবি জোন পরিচালিত প্যানারোমা জুম রেস্তোরাঁ এবারের ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের সরব পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে বলে বিজিবি সদস্যরা জানান। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের পাহাড়ের পাদদেশে কর্ণফুলী নদীর তীরে ওয়াগ্গাছড়া, কাপ্তাইয়ে ৯০’র দশকে স্থাপিত হয় এই পর্যটন স্পটটি। এছাড়া ২০০০ সালে স্থাপিত হয় কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক। ন্যাশনাল পার্ক ও জুম রেস্তোরাঁর চতুর্দিকে রয়েছে প্রাকৃতিক নানা জীববৈচিত্র্য। একটু নিরিবিলিতে দাঁড়ালেই দেখা যাবে বানর, হরিণ ও নানা প্রজাতির পশু-পাখির অবাধ বিচরণ। ন্যাশনাল পার্ক ও জুম রেস্তোরাঁয় পিকনিক কর্নার এবং শুটিং স্পটসহ সব ধরনের বিনোদন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে চা বাগান ভ্রমণ, নৌ-বিহার, পিকনিক ও শুটিং স্পট, নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা।
কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কের পাশাপাশি কাপ্তাই ৪ ওয়াগ্গা বিজিবি জোন পরিচালিত প্যানারোমা জুম রেস্তোরাঁ এবারের ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের সরব পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে বলে বিজিবি সদস্যরা জানান। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের পাহাড়ের পাদদেশে কর্ণফুলী নদীর তীরে ওয়াগ্গাছড়া, কাপ্তাইয়ে ৯০’র দশকে স্থাপিত হয় এই পর্যটন স্পটটি। এছাড়া ২০০০ সালে স্থাপিত হয় কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক। ন্যাশনাল পার্ক ও জুম রেস্তোরাঁর চতুর্দিকে রয়েছে প্রাকৃতিক নানা জীববৈচিত্র্য। একটু নিরিবিলিতে দাঁড়ালেই দেখা যাবে বানর, হরিণ ও নানা প্রজাতির পশু-পাখির অবাধ বিচরণ। ন্যাশনাল পার্ক ও জুম রেস্তোরাঁয় পিকনিক কর্নার এবং শুটিং স্পটসহ সব ধরনের বিনোদন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে চা বাগান ভ্রমণ, নৌ-বিহার, পিকনিক ও শুটিং স্পট, নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা।
কাপ্তাইয়ের প্রাকৃতিক শ্যামল সবুজে সৌন্দর্যভরা দুইদিকে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া নিবিড় শান্ত শীতল জলের কর্ণফুলী নদী ভ্রমণের সব আয়োজন। এছাড়া সমুদ্রের বেলাভূমির আমেজে কর্ণফুলী নদীতে নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা আছে। নামাজের জন্য আলাদা ঘরসহ পুরুষ-মহিলাদের জন্য টয়লেট ও প্রসাধনীর ব্যবস্থা রয়েছে। নাট্যানুষ্ঠানসহ যাবতীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য মনোরম পরিবেশে পাহাড়ের ঢালে রয়েছে সাংস্কৃতিক মঞ্চ। উক্ত মঞ্চে যে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান পরিচালনা করা যায়। এছাড়া রয়েছে গাড়ি পার্কিং সুবিধাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধাদি। প্যানোরমা জুম রেস্তোরাঁ সপরিবারে ভ্রমণের একটি চিত্ত আকর্ষণীয় বিনোদনমূলক প্রতিষ্ঠান।


কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক জাহিদুর রহমান মিয়া জানান, ঈদকে সামনে রেখে কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কে নিরাপদে পর্যটকদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। এমনিতেই প্রতি বছর ঈদ মৌসুমে এখানে বিপুলসংখ্যক পর্যটক সমাগম ঘটে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। পর্যটকরা এখানে এসে একই সঙ্গে পাহাড়, নদী, বৃক্ষ আর সবুজের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি স্বচক্ষে দেখতে পাবেন পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যের অন্যরকম সৌন্দর্য। কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কে রয়েছে সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। এখানে উঠে সমগ্র কাপ্তাই উপজেলার সবুজ পাহাড়ের সৌন্দর্য এক নজরে উপভোগ করা যায়। চট্টগ্রাম কাপ্তাই সড়ক ধরে কাপ্তাই উপজেলার শীলছড়ি এলাকা অতিক্রম করলেই ন্যাশনাল পার্কে সুবিশাল দুটি হাতি (কৃত্রিম) পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানায়। এর পর থেকেই শুরু হয় পর্যটকদে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের যাবতীয় অনুষঙ্গ।
কাপ্তাই ৪ ওয়াগ্গা বিজিবি জোন কমান্ডার লে. কর্নেল আকতার শহীদ পিএসসি জানান, ঈদ উপলক্ষে বিজিবি পরিচালিত জুম রেস্তোরাঁকে বর্ণীল আয়োজনে সাজানো হয়েছে। কাপ্তাইয়ে জুম ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় মনোরম পর্যটন স্পট। এখানে এলেই যে কোনো পর্যটকের মনে প্রকৃতি প্রেম জাগ্রত হবেই। জুম রেস্তোরাঁ নাম হলেও এটি কাপ্তাই উপজেলার একটি বৃহত্তম পর্যটন স্পট। এখানে এলেই উপভোগ করা যাবে শান্ত শীতল কর্ণফুলী নদীর অপার সৌন্দর্য, আকাশ, পাহাড়, নদী প্রকৃতির একই সমান্তরালে অপরূপ মিলন।
Source: Daily Amardesh

Sunday, August 7, 2011

বর্ষায় বাংলার দার্জিলিং

বর্ষায় বাংলার দার্জিলিং

- রফিকুল আমীন খান
রাজধানীর ফকিরাপুলের দূরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলোতে সারাদিনই যাত্রীদের ভিড় লেগে থাকে। তবে এই বৃষ্টির দিনেও যাত্রীর এত সমাগম হবে ভাবিনি। টানা তিন দিনের বর্ষণে মালিবাগ ও রাজারবাগের কোমর সমান পানি কেটে যখন ফকিরাপুলের শ্যামলীর কাউন্টারে পৌঁছলাম তখন রাত ১০টা। বান্দরবানের একমাত্র গাড়িটি ছাড়ার এখনও ৩০ মিনিট বাকি। আমাদের পনের জনের গ্রুপটির এখনও অনেকেই এসে পৌঁছেনি। মুঠোফোনে খোঁজ নিয়ে জানা গেল দু’তিনজন যাচ্ছে না। এরকম খারাপ আবহাওয়ায় বান্দরবান যেতে দিতে কিছুতেই তাদের বাবা-মা রাজি নন। সে যাই হোক, ১০টা ২৫ মিনিটে আমাদের গ্রুপটি বাসে উঠতেই চালক ঠিক সময়েই বাস ছেড়ে দিলেন।
এত খারাপ আবহাওয়ার মাঝেও যাদের উত্সাহে আমরা এবারের গ্রীষ্মের ছুটিটা বান্দরবানে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেই নোঙর ট্যুরিজমের কামরুল ভাই কথামত ঠিক সামনের দিকের ১৫টি সিট আমাদের জন্য আগেই বুকিং করে রেখেছিলেন। ফলে এরকম খারাপ আবহাওয়ার মাঝে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে বাসের চাকার হঠাত্ লাফিয়ে ওঠার ঝাঁকুনি থেকে সামান্য হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে ভেবে ভালো লাগল। এরকম ভাবনার মাঝে কখন যে বাস চলতে শুরু করেছে খেয়াল করিনি। খোলা জানালা দিয়ে ফকিরাপুল থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত খানাখন্দে ভরা সড়কের জায়গায় জায়গায় হাঁটু সমান কাদাপানি কেটে বাসের ছুটে চলা দেখতে দেখতে কখন যে দু’চোখজুড়ে ঘুম চলে এসেছে খেয়াল করিনি। মাঝে দু’একবার ঘুম ভাঙলেও অন্যদের বেঘোরে ঘুমোতে দেখে খানিক জেগে থেকে আবার ঘুমিয়ে পড়ি। সকালের বৃষ্টিভেজা সতেজ আলোতে যখন ঘুম ভাঙল তখন আমাদের বহনকারী বাসটি দু’পাহাড়ের মাঝ দিয়ে ছুটে চলেছে। আমরা এখন কোথায়, কামরুল ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলে জানালেন, সাতকানিয়ার কেরানিহাট থেকে বান্দরবান শহরে যাওয়ার মাঝামাঝি রাস্তায়। শহরে পৌঁছতে আরও ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে।
বাস টিলা-উপটিলার মতো ছোটখাটো পাহাড় ডিঙিয়ে ছুটে চলছে। হঠাত্ অঝোরে বৃষ্টি নামল। খানিক বাদে চালকের গিয়ার পরিবর্তনের শব্দে সামনে তাকালাম। দেখলাম সামনের রাস্তা আকাশ ছুঁয়েছে। পাহাড় বেয়ে নামা বৃষ্টির পানি তীব্রবেগে সোজা বাসের দিকে ছুটে আসছে। চালকের একটু ভুল ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ পরিণতি। ভেজা সড়ক থেকে চাকা পিছলে সোজা কয়েকশ’ ফুট নিচে... ভাবতেই মেরুদণ্ডের মাঝখান দিয়ে শীতল রক্তস্রোত বয়ে গেল। তবে চালক বেশ সতর্ক। দক্ষ হাতে কয়েক মিনিটের মধ্যে গাড়ি পাহাড় চূড়ায় নিয়ে পৌঁছলেন। চূড়ায় পৌঁছতেই চারপাশের প্রকৃতি বেশ পরিচিত লাগল। বাম পাশে মেঘলা পর্যটন মোটেলকে পেছনে ফেলে বাস যখন আরেকটু উপরে উঠল, তখন বুঝতে বাকি রইল না এটা কোন জায়গা। আমরা মেঘলা পাহাড়ের উপর। বান্দরবান ভ্রমণকারীদের অন্যতম পছন্দের জায়গা। এ পাহাড় চূড়ায় রয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স, যা সারা বছরই পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত থাকে। বান্দরবান বেড়াতে এসে কেউ এর সৌন্দর্য না দেখে ফেরেন না। এর আসল সৌন্দর্য পাহাড়ঘেরা সর্পিলাকার স্বচ্ছ পানির লেক ও দু’টি ঝুলন্ত ব্রিজ। অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ব্রিজ দুটির কাছাকাছি যেতে হয়। ব্রিজ পার হওয়া অনেক আনন্দের। পাশে প্রিয়জন থাকলে কথা নেই, তার হাতে হাত রেখে যখন ওপারে চলবেন তখন স্মৃতির ফ্রেমে বাসা বাঁধবে নানা বর্ণের স্বর্গীয় সুখের অনুভূতি।
বান্দরবানে আমাদের দুই দিনের সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনের বিকালটা রাখা হয়েছে এই মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স দর্শনের জন্য। তাই এ নিয়ে ভাবনার বেশি সময় না দিয়ে চালক বাস নিয়ে ছুটে চললেন সোজা শহরের দিকে। মেঘলার চূড়া থেকে সমতলের দিকে তাকালে মনে হবে বিশাল এক অজগর এঁকে-বেঁকে নেমে গেছে শহরের দিকে। আসলে এটি শহরে যাওয়ার রাস্তা। মেঘলা চূড়া থেকে সবুজ বেষ্টনীর মাঝে দু’একটি দালান-কোঠায় ভরা শহরটিকে বেশ ছোটই মনে হয়। শহরের মতো বাসস্ট্যান্ডটিও বেশ ছোট। এখানে বাস থেকে নেমে কাছেই হোটেলের উদ্দেশে ছুটে চললাম আমরা। হোটেলে পৌঁছে ঝটপট নাস্তাসহ প্রয়োজনীয় কাজ সেরে শুরু হলো বান্দরবানে আমাদের এবারের ভ্রমণ।
সকালের শিডিউলে রয়েছে নীলগিরি, চিম্বুক ও পাহড়ি ঝরনা শৈলাপ্রপাত দর্শন। তিনটিই একই পথে। তবে সব শেষে নীলগিরি। ঠিক হলো সবার আগে নীলগিরি, ফিরতি পথে বাকি দু’টি দর্শন। পরিকল্পনামত সাড়ে নয়টার দিকে চান্দের গাড়িতে চড়ে বসলাম। পাহাড়ের কোলঘেঁষে বহু চড়াই-উতরাই, ছড়া-ঝরনা পেছনে ফেলে ছুটে চললাম নীলগিরির অপার সৌন্দর্যের টানে। দু’পাশের সবুজ ছাউনি আর দূর-বহুদূরে পাহাড়ের চূড়ায় খেলা করা মেঘেদের মেলা দেখছিলম বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে। হঠাত্ বাঁয়ে পাহাড়ি নদ সাঙ্গুর মাথার ওপর কোথা থেকে যেন একদলা কালোমেঘ এসে জমাট বেঁধেছে। বুঝতে বাকি রইল না কী হতে চলেছে। মেঘ ফুঁড়ে শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। বলা নেই কওয়া নেই, খানিক বাদে সেই বৃষ্টি ধেয়ে এসে পাহাড়ের উপর আমাদের ভিজিয়ে দিয়ে গেল। এই হলো বর্ষায় বান্দরবানের রূপ। এই রোদ, এই বৃষ্টি। রোদ-বৃষ্টির এরকম বিচিত্র খেলা আর সাঙ্গু নদের চোখজুড়ানো সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম স্বপ্নের নীলগিরিতে, যেখানে পাহাড় ছুঁয়েছে আকাশকে। মনে পড়ল কবিগুরুর সেই বিখ্যাত কবিতার কথা—
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু।
ভূমি থেকে নীলগিরির উচ্চতা ৩ হাজার ফুট। উচ্চতার কারণে বর্ষায় বান্দরবান বেড়ানোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা এই নীলগিরি। এর চারপাশে মেঘেরা খেলা করে। যারা প্রকৃতির এই খেলা খুব কাছে থেকে দেখতে চান তারা একটা রাত থেকে যেতে পারেন সেনাবাহিনী পরিচালিত কটেজে। এর পাশে খাবারের জন্য রয়েছে ভালোমানের রেস্টুরেন্ট। এখানে বসে পেট পুরে খেতে খেতে ডানে-বাঁয়ে চোখ বুলালে দূর-বহুদূরে দেখতে পাবেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় কেওক্রাডং, পাহাড় চূড়ার বগা লেক, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর।
নীলগিরির সৌন্দর্য লিখে শেষ করার নয়। আমাদের লক্ষ্য এবার বাংলার দার্জিলিং চিম্বুকের দিকে। শহর থেকে এর দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার। এর ২৫শ’ ফুট উচ্চতায় না উঠলে বান্দরবান ভ্রমণের মূল আনন্দই অধরা থেকে যাবে আপনার। বর্ষা মৌসুমে এর পাশ দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘ দেখে মনে হয় মেঘের স্বর্গরাজ্য। মেঘের হালকা হিম ছোঁয়া মেঘ ছোঁয়ার অনুভূতি এনে দেয় মনে। পর্যাপ্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ আরও উন্নত করা গেলে চুম্বকের সৌন্দর্য ভারতের দার্জিলিংয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম হতো না মনে করেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। তাই একে তারা বাংলার দার্জিলিং বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আমরা এর চূড়ায় পৌঁছে ম্রোদের হাতে তৈরি এক কাপ চা খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা করে ফের হোটেল অভিমুখে রওনা দিলাম। পথে পাহাড়ি ঝরনা শৈলাপ্রপাতে ১০ মিনিটের যাত্রাবিরতি। স্থানীয় কয়েক বাম উপজাতি তরুণ জানালেন, বর্ষায় শ্যাঁওলাধরা এ পাথুরে ঝরনায় নামা খুবই বিপজ্জনক।
বিকালের পুরো সময়টা আমরা হোটেল ও এর আশপাশে কাটিয়ে দিলেও বন্ধু হালিম তার নববধূকে নিয়ে এক ফাঁকে স্বর্ণমন্দির ঘুরে এলো। আমাদের মধ্যে ওরাই একমাত্র নবদম্পতি। আমরা চেয়েছিলাম ওদের নিজেদের মতো ঘোরার জন্য আলাদা একটা সময় বের করে দিতে। প্রথমে ওরা একটু ইতস্তত করলেও পড়ন্ত বিকালে আসমা ভাবীর ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি দেখে মনে হলো ওরা সময়টা ভালোই কাটিয়েছে।
দ্বিতীয় দিন রাতে আমাদের ফেরার পালা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। নিজেদের এদিন কোনো শক্ত শিডিউলে বেঁধে রাখতে মন চাইল না। সকালের সময়টা যে যার মতো কাটিয়ে বিকালে নীলাচল ও মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স ঘুরে রাতে ঢাকার পথ ধরলাম। পেছনে রয়ে গেল বর্ষাস্নাত দু’টি দিনের সেই বিমুগ্ধ স্মৃতি। যে স্মৃতিতে বর্ষা এলে বারবার হারিয়ে যায় মন। আবার ছুটে যেতে চায় বাংলার দার্জিলিংয়ের টানে।
বান্দরবানের পথে ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ থেকে শ্যামলী, সৌদিয়া, ডলফিন পরিবহনের কয়েকটি গাড়ি রাতে ছেড়ে যায়। ভাড়া ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। যারা সেখানে যেতে যান, নিজেরা উদ্যোগী হয়ে কিংবা বেড়ানোর জন্য কোনো ভ্রমণ আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানের প্যাকেজে নাম লেখাতে পারেন। আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া, সাইট সিং সব ব্যবস্থাই করে এ প্রতিষ্ঠানগুলো। নোঙর ট্যুরিজম এ ধরনের একটি প্যাকেজের আয়োজন করেছে।

Source: Daily Amardesh

Sunday, March 20, 2011

হোয়াইকংয়ের কুদুম গুহা

হোয়াইকংয়ের কুদুম গুহা

সেলফোনে ‘দে ছুট’ ভ্রমণ সংঘের বন্ধুদের জানিয়ে দিলাম সামনের ছুটিতে কুদুম গুহায় যাব। বন্ধুদের প্রশ্ন, ওরে বাবা এ আবার কোনো জায়গা। উত্তর না দিয়ে শুধু ভ্রমণের তারিখটি জানিয়ে দিলাম। দুর্গম অঞ্চল, প্রতিনিয়ত বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। তাই বাছাই করে শুধু দুঃসাহসী অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় বন্ধুদের ‘গুহায়’ যাওয়ার সঙ্গী করলাম। বেশ কয়েকবার মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা টাইগার জসিম, নাসিরুদ্দিন কচি ও এমরান এবারের অভিযাত্রী। ২৫ তারিখ রাতে রওনা হয়ে সকাল ১১টায় পৌঁছলাম পর্যটন নগরী কক্সবাজার। রুম বুকিং করা ছিল, তাই বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। সে দিনটি নীল জলরাশির নোনা জলে সাঁতার আর বিশালাকৃতির ঢেউয়ে ডুব দিয়ে আনন্দে কাটিয়ে দিলাম। রাতে পূর্ণিমার আলোতে বীচের অ্যাঞ্জেল ড্রপ রেস্টুরেন্টে কাঁকড়া ভাজা খাওয়ার স্বাদ নিলাম। পরের দিন সকালে টেকনাফের হোয়াইকংয়ের উদ্দেশে যাত্রা। কক্সবাজার থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা পথ বাস জার্নি করে পৌঁছলাম হোয়াইকং বাজার। সেখান থেকে সিএনজি করে হাড়িখোলা। হাড়িখোলার কর্তব্যরত পুলিশ বাধা দিল সিকিউরিটি ছাড়া কুদুম গুহায় না যাওয়ার জন্য। কোনোভাবেই তখন তাদের কাছ থেকে অনুমতি মিলল না, যখন বিকল্প চিন্তা শুরু করলাম। কারণ ভ্রমণে গিয়ে অভিযান অসমাপ্ত রেখে ফিরেছি এমন রেকর্ড আমার ঝুলিতে নেই। হাড়িখোলার কিছুক্ষণ অবস্থান করে যা দেখলাম তা রীতিমত শিউরে ওঠার মতো। হাড়িখোলা লোক শাপলাপুর বাজারে গিয়ে পুলিশ স্কটে জনগণ ও মালবাহী গাড়িতে যেতে হয়, অন্যথায় দিন-দুপুরেই নির্ঘাত দুর্ধর্ষ ডাকাতের সম্মুখীন। কুদুম গুহা পর্যবেক্ষণের আকুল বাসনা দেখে পুলিশ ফাঁড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। নব উদ্দীপনায় ছুটলাম ফাঁড়ির পানে, ফাঁড়ির ইনচার্জ দ্বারা যেন কোনো বাধা না আসে সে জন্য ত্বরিত গতিতে অবহিত করলাম আমার শ্রদ্ধেয় সচিবালয়ের সহকারী কর্মকর্তা শরফুদ্দিন আহম্মেদ রাজু ভাইকে। ফোনে তিনি আমাকে নিরাশ না করে শুধু ফাঁড়ি পৌঁছতে কতক্ষণ সময় লাগবে তা জেনে নিলেন। এরই মধ্যে ফাঁড়ি পৌঁছে ইনচার্জ জাহের সাহেবের শরণাপন্ন হলাম। ঢাকা থেকে এসেছি জেনেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোর্স রেডি করে আমাদের সঙ্গে গুহা যাত্রায় পাঠিয়ে দিলেন। আমাদের চারজন সদস্যের সঙ্গে চারজন অস্ত্রধারী পোশাক পরা পুলিশ, সঙ্গে আরও দুজন সিভিল পুলিশ। আমাদের ভাবসাবই এখন অন্যরকম। বীরদর্পে চান্দের (স্থানীয় ভাষায়) গাড়িতে চড়ে আবার বাংলাদেশের একমাত্র মাটির গুহা কুদুম অভিমুখে যাত্রা। হাড়িখোলায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে হাতের বামে প্রায় দুই কিলোমিটার পাহাড়, গিরি পথ, বিশালাকৃতির সেগুন, চন্দন বৃক্ষের শীতল ছায়া; কখনও বা ভয়ঙ্কর জঙ্গলের পাশ দিয়ে হেঁটে চলা। হঠাত্ হাতির পায়ের চিহ্ন দেখে থমকে দাঁড়ালাম। পুলিশ সদস্যরা অভয় দিলেন, বন্যহাতি সাধারণত কাউকে ক্ষতি করে না। ওরা মানুষের ভালোমন্দ বোঝে। একজন জানালেন, ইউনিফর্ম পরা পুলিশের ওরা শুঁড় তুলে সালাম জানায় এবং সাধারণ মানুষ মন থেকে হাতিকে মামা বললে ওরা ক্ষতি করে না। ওদের কথায় এখন বন্যহাতি দেখারও স্বাদ জাগল। কিন্তু এক উদ্দেশ্যে বের হয়ে অন্য উদ্দেশ্য যোগ হলে তাতে দুটিই ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা। তাই পরবর্তী ভ্রমণে বন্যহাতি দেখার ইচ্ছা সুপ্ত করলাম। পাহাড় থেকে পাহাড় কাঠের পাটাতনের কয়েকটি ব্রিজ পার হতেই হাজির হলাম এই মাহেন্দ্রক্ষণে। গুহার মুখে এসে আশ্চর্যে আমাদের চোখ বড় হয়ে গেল। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাঁটু পানিতে গুহার ভেতর প্রবেশ করলাম। পানির ভাপসা গন্ধ, এরপরও আনন্দ। অন্ধকারে বাস করা পাখিদের উড়ে চলা, চামচিকার কিচিরমিচির, ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে এক অন্যরকম রোমাঞ্চ। আমাদের সঙ্গে নেয়া টর্চ সেখানে অকেজো। ভাগ্য ভালো পুলিশ সদস্যরা তাদের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টর্চলাইট সঙ্গে নিয়েছিল। গুহার ভেতরের ওপরের অংশে টর্চের আলো পড়তেই বিস্ময়ে অবাক, ওহ্! আল্লাহ এত সুন্দর প্রাকৃতিক নিদর্শন তুমি আমাদের দিয়েছ অথচ তার সদ্ব্যবহার আমরা করতে জানি না। গুহার অন্দকারে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে মনের আনন্দে বের হয়ে এলাম। এবার চারপাশ ঘুরে দেখা হলো পাইথনের খোলস। কথা প্রসঙ্গে জানা হলো পাইথনের অন্যতম প্রিয় খাবার চামচিকা। তাই গুহার ভেতর প্রবেশ মুহূর্তে টর্চ ও শক্ত লাঠি রাখা জরুরি। গলা শুকিয়ে কাঠ, কিন্তু সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি নেই। তখন মনে পড়ে গেল ‘দে ছুট’ ভ্রমণ সংঘের প্রথম সদস্য বন্ধু শেখ মো. মোক্তার আলীর কথা। দুর্গম অঞ্চলে ভ্রমণে যাওয়ার প্রাক্কালে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিতে কখনও ভুল হয়নি তার। তাই বন্ধুদের কিঞ্চিত্ ভর্ত্সনা করে মোক্তারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম।
যেতে চাইলে
ঢাকা থেকে কক্সবাজার। নিজস্ব বাহনে অথবা লিংক রোড থেকে টেকনাফের গেটলক বাসে। নামতে হবে হোয়াইকং বাজার। স্থানীয় ফাঁড়ি থেকে পুলিশ স্কট নিয়ে যেতে হবে কুদুম গুহা। জনপ্রতি সর্বমোট খরচ যাই হোক কক্সবাজারে কাঁকড়া ভাজার স্বাদ নিতে কিন্তু ভুলবেন না। পরিশেষে বলতে হয়, প্রকৃতির দান কুদুম গুহার প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি সুদৃষ্টি দেয় তাহলে দার্জিলিংয়ের রক গার্ডেনের চেয়ে আমাদের হোয়াইকংয়ের কুদুম গুহার নয়ন জুড়ানো অপার সৌন্দর্যের প্রাকৃতিক দৃশ্য কোনো অংশে কম হবে কি?
Source: Daily Amardesh

সী মা ন্ত দী পু
বন্যহাতির পাহাড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গুহা



গোটা দুনিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আর কোনো সৈনিক জীবিত আছে কী-না সন্দেহ, তবে সেই যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নগুলো এখনও মুছে যায়নি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির জাদুঘর হয়ে মানুষকে মনে করিয়ে দেয় সেই বিভীষিকার রূপকথা। শ্রদ্ধেয় মরহুম শেখ আইনউদ্দিনের কাছ থেকে এ গুহা সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। তিনি ছিলেন রয়েল ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের একজন সাহসী সৈনিক। গত হয়েছেন ১৯৯৮ সালে। তিনিই আমাকে এক গভীর গুহার খবর দিয়েছিলেন। পরে জেনেছি এ গুহাটিই নাকি ব্রিটিশ সৈন্যদের বাঁচিয়েছিল তখন। দুর্গম এ গুহার অবস্থান এক গভীর জঙ্গলের উঁচু পাহাড়ে। বর্তমান টেকনাফ শহরের কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এ পাহাড়টির নাম নাইক্ষ্যং পাহাড়। নাফ নাদীর মোহনা থেকে মস্তবড় এ পাহাড়ের দিকে তাকালে চমকে ওঠে হৃদয়। পাহাড়টির চূড়া থেকে নদীর বেয়ে চলা যেন প্রকৃতির এক অপরূপ চাহনি। মিয়ানমারের সঙ্গে এই নদী দিয়েই এক সংযোগরেখা অঙ্কন হয়েছে বাংলার।
নাইক্ষ্যংকে চিনি বহুদিনের। মূলত বন্যপ্রাণীর টানেই ভবঘুরের মতো বারবার ছুটে যাওয়া হয় সেখানে। বন্যহাতি, প্যারাইল্লা বানর আর সাম্বার হরিণের জন্য সবাই নাইক্ষ্যংকে আলাদা করে চেনেন। এখন বানর আর হরিণের জাতটির দেখা বেশ কষ্টকর হলেও হাতির পাল দেখা যায় সহজেই। হাতি হিংস্র আর ভয়ঙ্কর বলেই সবাই জানেন। ওই নাইক্ষ্যং-এ যাওয়া হয়েছে বহুবার। কত রকমের পথ বেয়ে যে তাকে উপভোগ করেছি তা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু যতবারই গেছি সবসময়ই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই গুহার কথা মনে পড়েছে। চক্কর দিয়েছি, পথের সন্ধান করেছি, তবে খুঁজে পাইনি। সবশেষে শেখ আইনউদ্দিনের কথার সুর ধরে চলতে থাকলাম এবং পথ শেষে ঠিকানা ঠিকই মিলল গুহাটির। বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে একটি দুর্গম পাহাড়ে বিশ্বযুদ্ধের চিহ্ন খুঁজে পেয়ে বহুদিনের দেখার স্বাদ পূরণ হলো। গুহাটি কীভাবে আজও দরজা ফাঁক করে জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে আছে মিয়ানমারের দিকে তা ভাবতেই অবাক লাগে। যুদ্ধের দাবানল যখন তুঙ্গে তখন মিয়ানমারের দিক থেকে এক্সিস বাহিনী বাংলার সীমানার দিকে ধেয়ে আসছিল। জার্মানি, ইতালি, জাপানিজসহ অন্যরা এ দলে ছিল। এর আগে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনের মতো আরও কিছু দেশ এ বাহিনীর কাছে ধরাশায়ী হয়েছিল। সেসময় ভারতবর্ষজুড়ে ব্রিটিশ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করলেও তাদের সঙ্গে ইউএসএসহ অন্য মিত্ররা মিলে স্পেশাল অ্যালাইড বাহিনী গঠন করেছিল। এক্সিস বাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণের ভয়ে পাহাড়ি এলাকার অ্যালাইড গ্রুপ নাইক্ষ্যং পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। মিয়ানমারের দিক থেকে নাইক্ষ্যংয়ের দিকে ছুটে আসা এক্সিস সৈনিকদের সামনে তখন শুধুই ছিল নাফ নদী। ঠিক এমন সময় আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমা মেরে যুদ্ধের মোড় পুরো ঘুরিয়ে দেয়। যুদ্ধ চলে যায় অ্যালাইডদের হাতে। নাফ থেকে পিছু হঠতে থাকে এক্সিস বাহিনী। এ সময় অ্যালাইডের সৈন্যরা নাইক্ষ্যংয়ের গুহার ভেতর থেকে মুখ খুলে গর্জন ছাড়ে। জয় হয় নাইক্ষ্যংয়ের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এ গুহাটি তাই পাহাড়টিকে এনে দিয়েছে বাড়তি এক মর্যাদা। নাইক্ষ্যংয়ের আশপাশের আরও দুটি আশ্চর্য আকর্ষণ হলো তৈগা চূড়া ও কুদুমের গুহা। ভয়ঙ্কর কুদুম গুহার ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর রয়েছে হাজারও চামচিকার ভিড়।
নাইক্ষ্যং পাহাড়ের চূড়া স্বপ্নের মতো সুন্দর। এখন থেকে মিয়ানমারের পর্বতশ্রেণী দেখার মজা আরও আনন্দের। আর এই দুই পর্বতের মধ্য দিয়ে বেয়ে গেছে এ দেশে সবচেয়ে সুন্দর নদী নাফ। নাফের বেয়ে চলা, সাগরের সঙ্গে তার মিলন দেখলে সবাই পাগল হবেন তার রূপের মোহনায়। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো দু'দেশের জেলেরা এ নদীতে ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে মিলেমিশে মাছ ধরে, দেখা হলে কুশল বিনিময় হয়। নদীতে আছে হরেক রকমের পরিযায়ী পাখি। আরও আছে গানজেজ ও ইরাবতি ডলফিনের দল। শুধু এই একটি পাহাড়কে ঘিরেই কত যে স্বপ্ন সমষ্টিবদ্ধ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
খুঁজে পাওয়া নাইক্ষ্যং পাহাড়ের। গুহার দরজায় দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের পর্বতশ্রেণী দেখে মুগ্ধ হওয়ার মতো। পেয়েছিলাম। সে যুগে জয় হয়েছিল নাইক্ষ্যংয়েরই। পাহাড়টি এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, অ্যালাইড বাহিনী চলে গেছে। তৈরি হয়েছে দুটি দেশের আলাদা মানচিত্র। এখন এর একপাশের পাহারাদার বিডিআর, অন্যপাশে আছে নাসাকা বাহিনী। দু'দেশের সীমানার ভেতর চাইলেই আর কেউ ঢুকতে পারেন না। অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, আছে আইন মেনে চলার কঠোর সিদ্ধান্ত। তবে সে যুগের আদিপ্রথা এখনও টিকে আছে পাহাড়ি বন্যহাতিদের বেলায়। তাদের কোনো পাসপোর্ট লাগে না। মাঝেমধ্যে মিয়ানমার পাহাড় থেকে হাতির পাল খাবার সন্ধানে চলে আসে নাইক্ষ্যংয়ের দিকে। একটা বিশেষ সময় পার করে আবার ফিরে যায় নিজ দেশে। বন্যপ্রাণীর মতো এই সম্প্রীতি সবার মধ্যে তৈরি হলেই কেবল যুদ্ধের মতো ক্ষতচিহ্নগুলো আর হবে না।
লেখক : বন্য প্রাণী গবেষক ও লেখক
Source: Daily Samakal

জীববৈচিত্র্যে কক্সবাজার

জীববৈচিত্র্যে কক্সবাজার

মোহাম্মদ ইব্রাহিম
নানা প্রজাতির মাছ আর জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এক জনপদের নাম কক্সবাজার। এখানকার জলে স্থলে সর্বত্র নানা জাতের মাছ, শামুক, ঝিনুক, পাখি আর কীটপতঙ্গ। পানির ওপর খেলা করে গাংচিলেরা। প্রকৃতি সেখানে মুহূর্তে মুহূর্তে রং বদলায়।
জেলেরা গভীর সমুদ্রে গিয়ে আহরণ করে নানা প্রজাতির মাছ। এগুলোর কিছু নাম পরিচিত, আর কিছু অপরিচিত। কোরাল, রূপচাঁদা, শাপলা, চিংড়ি, ছুরি, হাঙর, জেলিশিসসহ অসংখ্য প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পরিবেশের ইকো সিস্টেমের ভারসাম্যহীনতার কারণে অনেক মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া গভীর সমুদ্রে বড় বড় হাঙরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় অনেক মাছ উপকূলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এতে সাগরে মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। জেলের জালেও আর আগের মতো মাছ আসে না।
ফিশারিজ সংশ্লিষ্টরা জানান, পারস্পরিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় বঙ্গোপসাগর আগামীতে মত্স্যশূন্য হয়ে পড়তে পারে। কারণ এক সময় (১০-১৫ বছর আগে) ফিশারিঘাটে একেকটি নৌকায় ২০ থেকে ৩০ মণ নানা জাতের সামুদ্রিক মাছ আসত। বর্তমানে একটি নৌকা কয়েক মাসেও ২০ থেকে ৩০ মণ মাছ ধরতে পারে না।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সমুদ্রজুড়ে আধুনিক ফিশিং ট্রলারের অপ্রতিরোধ্য মত্স্য আহরণের কারণে সাগর মাছশূন্য হয়ে যাচ্ছে। এসব বোট মালিক বেশিরভাগ প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাই এরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। সমুদ্রসীমার ৪০ ফুট গভীর জলসীমার ভেতরে এসেও এসব ফিশিং বোট মাছ ধরছে। ফলে ছোট আকারের মাছগুলোও এসব ট্রলারের মাধ্যমে মেরে নিয়ে আসা হচ্ছে। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের ফিশিং গ্রাউন্ডে ১৩০টির বেশি আধুনিক ফিশিং ট্রলার চলছে। বর্তমান সরকারের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে নামে-বেনামে আরও ২০টি ফিশিং ট্রলারের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, থাইল্যান্ডসহ বহু দেশ অত্যাধুনিক ফিশিং বোটে মাছ শিকার নিষিদ্ধ করেছে। কারণ এক সময়ে থাইল্যান্ডের সমুদ্রসীমার ফিশিং জোনে যথেচ্ছ মত্স্য আহরণ করায় বর্তমানে থাইল্যান্ডের সমুদ্রসীমার ফিশিং গ্রাউন্ড প্রায় মত্স্যশূন্য হয়ে পড়েছে। আধুনিক ফিশিং বোট ব্যবহার করলে যে কোনো সময় আমাদের সমুদ্রসীমা মত্স্যশূন্য হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে মত্স্য আইনের সঠিক প্রয়োগ সব ফিশিং ট্রলারের ওপর কার্যকর প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
ছবি : মোহাম্মদ ইব্রাহিম
Source: Daily Amardesh

বেড়িয়ে এলাম কক্সবাজার
-

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিনের জেলা হচ্ছে কক্সবাজার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ সমারোহ এখানে। কয়েকদিন আগে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলাম। এই ভ্রমনে কক্সবাজার সম্পর্কে যা যা জানতে পেরেছি তা সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরছি।

http://i1230.photobucket.com/albums/ee492/Shanto_Balok/Coxsbazarseabeach.jpg

কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যাবস্হা খুব ভাল। সড়ক ও আকাশ পথে যাওয়া গেলেও রেল যোগাযোগ এখনও হয়নি। তবে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে তারপর বাসে যাওয়া যায়। তাছাড়া ঢাকা ও অন্যান্য জেলা থেকে সরাসরি বাসচলাচল করে। কক্সবাজারে রিক্সা-অটোরিক্সা সবই রয়েছে। পর্যটন এলাকা তাই তুলনামূলক ভাড়াটা একটু বেশীই। তবে চালকরা অত্যন্ত নম্র-ভদ্র, অতিথিকে যথাযথ সম্মান দিতে জানেন তাঁরা।

http://i1230.photobucket.com/albums/ee492/Shanto_Balok/CoxsbazarSunset.jpg

কক্সবাজারে থাকা-খাওয়ার সুব্যাবস্হাপনা রয়েছে। নিম্ন আয় থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত সব ধরনের মানুষের জন্য রয়েছে বিভিন্ন রেট এ আবাসিক থাকার ব্যাবস্হা। এখানে যা দেখলাম, বলতে গেলে সব হোটেলেই দরদাম করে ভাড়া ঠিক করা। কলাতলী রোডের বেশীরভাগ হোটেলের জানালা থেকেই সমুদ্র দেখা যায়।

কক্সবাজারে খাবারের দাম তুলনামূলক বেশ বেশী। প্রায় প্রতিটা আবাসিক হোটেলের সাথেই/গ্রাউন্ডে রয়েছে রেষ্টুরেন্ট। ব্যতিক্রমধর্মী কয়েকটি রেষ্টুরেন্ট রয়েছে কলাতলী মোড়ের কাছে। এগুলো উচু করে সমুদ্রের/বিচের উপর নির্মিত। এখানে বসে সমুদ্রের অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করার সাথে খাওয়ার মজাটাই অন্যরকম। সব রেষ্টুরেন্টে বলতে গেলে মুরগী-গরু-ইলিশ-চিংড়ি-রুঁপচাদা-লইট্যা কমন আইটেম। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের ভাজি-ভর্তা ও শুটকির আইটেমতো রয়েছেই।

মার্কেট এলাকায় প্রধান ব্যবসা হচ্ছে বার্মিক কাপড়। শহরের মার্কেট এলাকায় রাস্তার দুধার দিয়ে রয়েছে সারিসারি বার্মিজ মার্কেট। এখানে বার্মিজ বিছানার চাদর. গায়ে দেবার চাদর, ড্রেস, তোয়ালে, শীতের পোশাক ছাড়াও পাওয়া যায় বার্মিজ খাবার, শোপিচ ও রুপ সৌন্দর্যের প্রসাধন। তবে এখানে অনেক দরদাম করে জিনিস কিনতে হয়।

দর্শনীয় স্হান:
কক্সবাজারের প্রধান আকর্ষন হচ্ছে সমুদ্র সৈকত। সবচেয়ে জাঁকজমক হচ্ছে লাবনী বিচ এলাকা। পরিস্কার ঝকঝকে পরিবেশ আর নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এখানে। বিচের তীর ঘেষে রয়েছে ইজিচেয়ারে শোবার ব্যাবস্হা। চা-কফি-ডাব-মুড়ি-বাদাম সবই পাওয়া যায় এখানে কিন্তু কোন কিছু নিচে ফেলা যাবে না। এছাড়া স্পীডবোট, বিচকার, ঘোড়ায় চড়ার ব্যাবস্হা এসব তো রয়েছেই। তবে বিচে সবচেয়ে বিরক্তিকর পেশাদার ফটোগ্রাফারদের উৎপাত।

http://i1230.photobucket.com/albums/ee492/Shanto_Balok/CoxsbazarSunseteasychair-Final.jpg

***
এছাড়া একটু দূরে ইনানী বিচের সৌন্দর্যও অবশ্যই প্রশংসনীয়। এখানে পানির মধ্যে রয়েছে বড় বড় সব পাথর। ভাটার সময় তাই উকি দেয়া পাথরই সৌন্দর্য ফুঁটিয়ে তোলে এখানকার। ইনানী বিচের লাল ডাবের স্বাদই অন্যরকম। ইনানী যাবার পথে দীর্ঘ সি-ড্রাইভ অবশ্যই মুগ্ধ করবে আপনাকে। রাস্তার একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে সুদীর্ঘ সমুদ্র সৈকত পুরোটা পথ সঙ্গ দিবে আপনাকে।

http://i1230.photobucket.com/albums/ee492/Shanto_Balok/Inani.jpg

***
ইনানী বিচে যাবার পথেই দেখা মেলে হিমছড়ির। এখানে রয়েছে মনোমুগ্ধকর এক ঝর্না। সিড়ি বেয়ে অনেক উঁচু পাহাড়ে উঠে কক্সবাজারের ভিউ দেখার সুযোগ রয়েছে এখানে। সিড়ি দিয়ে উঠতে প্রথম দিকে মনে হয় এতো অল্প, পরে যেন ওঠার পথ আর শেষ হতে চায় না। অবশেষে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বিমোহিত হয়ে যেতে হয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে। এছাড়াও এখানে ছোট মার্কেট ও সুন্দর করে সাজানো বিচ রয়েছে যা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষন।

http://i1230.photobucket.com/albums/ee492/Shanto_Balok/Himchorifalls-.jpg

***
এই পথেই রয়েছে সামুদ্রিক জীব-জন্তুর মিউজিয়াম। বেশ কিছু কমন-আনকমন জীবিত-মৃত প্রানী রয়েছে তাদের সংরক্ষনে। মিউজিয়ামটা সম্প্রসারনের কাজ চলছে।

http://i1230.photobucket.com/albums/ee492/Shanto_Balok/Animelmuseum.jpg

বন্যপ্রানীদের নির্বিঘ্নে চলাফেলার মুক্ত পরিবেশ রয়েছে সাফারী পার্কে। সেখানে আমার যাওয়া হয়নি।

***
কক্সবাজারের মহেশখালী বেশ সুন্দর একটা জায়গা। এখানে খুঁজে পাওয়া যায় অন্যরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তবে এখানকার রিক্সাচালকেরা ধান্দাবাজ। ভাড়া মিটাতে গেলে বলে আপনি খুশি হয়ে যা দিবেন তাই মাথা পেতে নেবো, কোন অসুবিধা নাই। অথচ শেষে বিপদে ফেলবে অনেক টাকা ভাড়া চেয়ে। আমার কাছে ১০০০/= চেয়েছিল আমি ৫০০/= দিয়ে তারপরও না মানায় স্হানীয় লোকদের কাছে বিচার দিয়েছিলাম এবং বিচারে রায় হলো যে, আমি যা ভাড়া দিয়েছি প্রকৃত ভাড়া তার চেয়ে অনেক অনেক কম। একদম মাঠে শুকানো তরতাজা শুটকি পাওয়া যায় এখানে। শুটকির ফিল্ড ছাড়াও এখানে রয়েছে লবনের ফিল্ড। এখানকার মিষ্টি পান অতি বিখ্যাত।

http://i1230.photobucket.com/albums/ee492/Shanto_Balok/Moheshlhali.jpg

***
কক্সবাজারে বেড়াতে গেছে অথচ টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে বেড়াতে যাননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে আমি টেকনাফ বেড়াতে গেলেও সামুদ্রিক সিগন্যাল না থাকায় সেন্টমার্টিনে যাওয়া হয়নি। টার্মিনাল থেকে সারাদিনই টেকনাফ-কক্সবাজার যাওয়া-আসার বাস রয়েছে। অনেকে মাইক্রোবাস সার্ভিসেও যাতায়াত করেন। টেকনাফ যেন প্রাকৃতিক রুপ-সৌন্দর্যের পুরোটায় কেড়ে নিয়েছে। এখানকার সমুদ্র সৈকত সম্পূর্ন নীলাভ। এতো সুন্দর তা ভাষায় প্রকাশ করে বলা যায় না। টেকনাফের আরেক সৌন্দর্য নাফ নদীতে। এখানে গেলে সুইজারল্যান্ড কিংবা নিউজিল্যান্ডের দেখা প্রাকৃতিক ছবিগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানে আরও রয়েছে মনোমুগ্ধকর এক ঝর্না আর উঁচু পাহাড়ের সাথে রয়েছে বন্যপ্রানীদের অবাধ বিচরন। এই পাহাড়ে রয়েছে বন্য হাতীও।

http://i1230.photobucket.com/albums/ee492/Shanto_Balok/Teknafbeach.jpg

আপনিও বেড়িয়ে আসুন কক্সবাজার, ভাল লাগবে সেটা আমি নিশ্চিত।

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন শান্ত বালক (১১-১২-২০১০ ২১:৫১)

Source: http://forum.projanmo.com

Thursday, March 10, 2011

কাঁপতে কাঁপতে কাপ্তাই!!!

কাঁপতে কাঁপতে কাপ্তাই!!!

আ হ মে দ কি শো র
পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই যাচ্ছি। কাঁপতে কাঁপতে। কারণ আমাদের হাতে অস্ত্র। মারণাস্ত্র। ভয়ে আছি। রাত ১২টা বাজে। আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১-এর জন্য চারদিকে সতর্ক প্রহরা, নজরদারি চলছে। যে কোনো সময় ধরা পড়ে যেতে পারি। তবু নিরাপত্তার এই ঘেরাটোপ এড়িয়ে আমাদের যেতে হবে কাপ্তাই। কারণ সেখানে সুইডেন বাংলাদেশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ১৮ এবং ২০ ফেব্রুয়ারি আমাদের একটি অস্ত্র প্রদর্শনীর কথা ঠিক হয়ে আছে। আমাদের হাফ প্লাটুনের দলে আছেন আমি কিশোর নামের যুবক, ভুঁড়িগির রক ওরফে রকি, পার্ট টাইম ইয়ো এবং ‘আমরা ভালো আমরা কালোর’ সভাপতি ও আহ্বায়ক মাহবুব মুন্না, এলেমদার ওরফে আলমগীর রাসেল, ঐতিহাসিক শামস্ বিশ্বাস এবং নারায়ণগঞ্জ নিবাসী নব্য ভাবুক কবি ইন্দ্রজিত্ ইমন। সবাই আতঙ্কিত। এই আতঙ্ককে বাস্তবে প্রাথমিকভাবে রূপ দিলেন ভুঁড়িগির রকি। রিকশায় চেপে কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার শুরুতেই রকি, মাহবুব মুন্না এবং শামস্ বিশ্বাসকে বহনকারী রিকশার চাকা পাংচার! রিকশাওয়ালা যাবেন না! রকি তাকে অনুনয় করে বোঝাতে সক্ষম হলো যে ভুঁড়িটাতে যে পরিমাণ গ্যাস ছিল, চাকা পাংচারের সঙ্গে টেনশনে সেটাও পাংচার হয়ে গেছে!
আমাদের সঙ্গের অস্ত্রগুলো সাদা কাপড়ে মোড়া। দেখতে অনেকটা কাফনে মোড়া লাশের মতো আকার ধারণ করেছে। শামস্ বিশ্বাস একাই সেটি কাঁধে করে নিয়ে রিকশায় চেপেছেন। পুলিশ ধরলে তাকে ধরবে। শামস্ মনে মনে উত্তরও ঠিক করে রেখেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলবেন, ভাই এইটা একটা ইভ টিজারের লাশ। কবর দিতে যাচ্ছি কাপ্তাই!
সবকিছু ঠিকঠাক মতো কাপ্তাইগামী বাসের লাগেজ বক্সে দিয়ে আপাতত আমরা বাসে আরোহণ করতেই শুরু হলো আসল কাঁপাকাঁপি! বাসের ড্রাইভার রিখটার স্কেলের ৪ নম্বর শেকিং এম্পটিটিউড গতিতে বাস টানতে শুরু করলেন। এ পরিবহনের ড্রাইভাররা নাকি এমন স্কেলেই গাড়ি টানেন। শামস্ মন্তব্য করলেন-‘এই পরিবহনের গাড়িতে আসহাব কাহাফ কিংবা রিপ ভ্যান উইঙ্কল ঘুমাইলে হয়তো ইতিহাস অন্যরকম হইতো!’ গাড়ির ভেতরে লাইটস অফ হলো যেই মাত্র, অমনি মুন্না নিখোঁজ! অন্ধকারে তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আরেক পোচ কালি চড়াইলে যে তাকে নিগ্রো বলিয়া চালান যায়!
গাড়ি চলছে, বাসের ভেতরে বাজছে গান। বলাবাহুল্য হিন্দি। এলেমদার আলমগীর রাসেল বাসের হেলপারের উদ্দেশে বলে বসলেন, ‘ভাই বাসররাইতের গান ছাড়া আর কিছু নাই! এমনিতেই যে ভূমিকম্পের স্কেলে গাড়ি টানতে আছেন তাতে অটো মিলন হয়ে যাবেরে ভাই! এই গানের দরকার নাই!’ গান বন্ধ হলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শুরু হলো আর কত দিন একা থাকব....
মাঝপথে বিরতি মিলল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। সেখানে ১০ টাকা দামের পরোটা আর ষাট টাকা দামের ভাজি খেয়ে সবার ‘দশেহাল’ অবস্থা। চায়ের পরিবর্তে ‘ছা’ খেয়ে তো শামস্ বিশ্বাস এবং রক রক রকি যথাক্রমে নিতম্ব এবং ভুঁড়ির ওজন কিছুটা হালকা করে এলেন। মাহবুব মুন্নাকে নোকিয়া ১১০০ টর্চ মেরে ফের শনাক্ত করে বাসে ওঠানো হলো। সে কালো এবং ভালো ছেলের মতোই বাসে উঠে আবহাওয়ার সতর্কবাণী দিতে লাগলেন একের পর এক। যা অন্ধকার ছাপিয়ে নাকের কাছে ফকফকে সাদা হয়ে বাতাসে ভেসে রইল!
বাসের ড্রাইভার একের পর এক ওভার টেকিং করে এবং সব যাত্রীকে নির্ঘুম আতঙ্কিত একটি রাত উপহার দিয়ে পৌঁছে গেলেন কাপ্তাই। আমরা বাস থেকে জিনিসপত্র নামাতে নামাতে দেখি সুইডেন বাংলাদেশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বেশ কয়েকজন ছাত্র আমাদের গার্ড অব অনার এবং শেল্টার দিতে লগ গেটে দাঁড়িয়ে। অস্ত্র এবং আনুষঙ্গিক বয়ে নিয়ে তারা পৌঁছে দিলেন কাছেই বিএফআইডিসির রেস্ট হাউসে। সেখানের কেয়ারটেকার পাওয়ারফুল চশমা পরিহিত চার চোখ মিলন বড়ুয়া আমার পূর্বপরিচিত। সরকারি রেস্ট হাউসের ততোধিক সরকারি কাস্টমসে বিশেষজ্ঞ তিনি। তাকে চারবার না ডাকলে তিনি সাড়া দেন না! আমাদের বরাদ্দ রুম দেখিয়ে দিলেন মিলন। একতলার দুটো রুমের বরাদ্দ হয়েছে আমাদের। সবকিছু ভালোই কেবল পুলসিরাত পাড়ি দিয়ে বাথরুমে যেতে হয়। মানে রুমের ভেতরে একটা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে টয়লেট করতে যেতে হবে এই আরকি!
আমরা অস্ত্রের হেফাজত করে বেরুলাম নাস্তা করতে। পেটে ভূমিকম্পে নাড়িভুঁড়ি নড়ে চড়ে হয়ে গেছে। সেটাকে ঠিক করা চাই। কাপ্তাইতে ভালো খাবার হোটেল নেই বললেই চলে। ঠিক তেমনি থাকার জন্যও। ফরেস্টের রেস্ট হাউসগুলোই ভরসা। যদিও অধিকাংশ সময় তা সরকারি লোকেদের বুকিং এ থাকে। তবে আগে থেকে জানালে ব্যবস্থা হতে সময় নেয় না। বাজারে নাস্তা করতে গিয়ে ডুবো তেলে ভাজা পরোটা আর ডিম দেখে সবাই তাই খেতে চাইল। কিন্তু অর্ডার দিলেও যখন আসতে দেরি হচ্ছে, তখন আমাদের হয়ে একজন হোটেল স্টাফকে যেই ওই হা ... পো... বলে ডাক দিলেন অমনি সব হাজির। সার্ভ করতে করতে হা... পো... জানালো তার আসল নাম কুদ্দুস!
আমরা খেয়ে-দেয়েই শুক্রবারকে কাজে লাগাতে ছুটে গেলাম কাপ্তাইর বিখ্যাত বাংলাদেশের একমাত্র পানি বিদ্যুত্ প্রকল্প দেখতে। সেখানে সেনাবাহিনীর জনৈক উচ্চপদস্থ অফিসারের বদৌলতে দুটি জিপে আমরা ছুটলাম মনুষ্য সৃষ্ট কৃত্রিম কাপ্তাই বাঁধ দেখতে। ১৯৫৬ সালে তত্কালীন পূর্ব-পাকিস্তান সরকার আমেরিকার আর্থিক সহায়তায় এই বাঁধ নির্মাণ করে। এটির কাজ শেষ হয় ১৯৬২ সালে। প্রায় ৬৭০ মিটার দীর্ঘ বাঁধটির ১৬টি স্পিলওয়ে গেট আছে, যা প্রায় সাড়ে বাহান্নো লাখ কিউসেক পানি পরিবাহিত করে বিদ্যুত্ উত্পাদনে। বাঁধের আশপাশে ছবি তোলা বিধিবদ্ধভাবে নিষিদ্ধ। যদিও আমাদের কয়েকজন ভাবছিলাম কেন গুগল আর্থ আছে না!
কাপ্তাই লেক দেখতে ইংরেজি এইচ অক্ষরের মতো। কাপ্তাই লেকের এই বৈশিষ্ট্যের দু’টি হাতের একটি কর্ণফুলী নদী, সুভলংয়ের কাছে একটি ক্যানিওন/ফাঁকায় মিলেছে। কর্ণফুলীর একটি পুরনো অংশ, কাসালং, মাইনী, চেঙ্গি এবং রিখ্যয়ং নদীই মূলত কাপ্তাই লেকের পানির ব্যবস্থা করে। বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম লেক তৈরি হলে পানিতে ডুবে যায় হাজারো একর কৃষি জমি। লেকের পানিতে ডুবে যায় সমৃদ্ধ চাকমা রাজার বাড়ি। এই নিয়ে হাহাকার আজও নাকি প্রবহমান।
সবাই জানালো ক্লান্তি নেই। আর তাই কাপ্তাই ড্যাম থেকে ফিরে হালকা রেস্ট নিয়ে ছুটলাম চিত্মরমে। কাপ্তাই মূল শহর থেকে সামান্য দক্ষিণে ওয়াগ্গাছড়া পেরুলেই নয়নাভিরাম এই গ্রামটি। এখানেই পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো বৌদ্ধ বিহার জুমল্যান্ড চিদমুরঙ ক্যায়াঙ অবস্থিত। পার্বত্য আদিবাসীদের প্রিয় বৈসাবি উত্সবে এখানে মেলাসহ নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। অনুষ্ঠানের নিমিত্তে এখানে একটি স্থায়ী বেদী আছে। সেখানে বৈসাবি উত্সবে, বৈশাখে মারমা/চাকমা মেয়েরা দল বেঁধে নাচের সঙ্গে গেয়ে ওঠে—‘মুই তোমারে লই বেরেম, তোমারে মুই সোনেম গান; হাজি হাজি নাজি নাজি, সোনেম পজ্জন নানাগান... (তোমাদের নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াব, গান শোনাবো, হেসে খেলে গান গেয়ে, তোমাদের শোনাবো রূপকথার কাহিনী)’ রেস্ট হাউসে ফিরে আসার আগে বাজার থেকে গরুর দুধের চা আর গরম গরম পিঁয়াজু খেতে ভুললাম না। রাতে সুইডেন পলিটেকনিকের অসাধারণ সুন্দর ক্যাম্পাসের মাঠে আড্ডা জমলো। আমাদের আড্ডায় দারুণ সঙ্গ দিল পূর্ণিমার চাঁদ।
এ সুযোগে অস্ত্র প্রদর্শনের স্থানটি বেছে নিলাম। মাঠের আড্ডায় সুইডেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র শুভ আমাদের শোনালো নূপুর ভাবীর কথা। তাকে নিয়ে প্রচলিত মিথটি সংবেদনশীল হওয়ায় তা অনুল্লেখই রাখলাম। নূপুর ভাবীর অস্বাভাবিক মৃত্য হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর এই ক্যাম্পাস এবং এর আশপাশের অঞ্চলে প্রায়ই রাতে সাদা শাড়ি পরা নারী দেহের চলাচল এবং নূপুরের শব্দ পাওয়া যায়! ঘটনা শুনে আমরা রেস্ট হাউসে ফিরছি এ সময় আমাদের মাঝে প্রথম নূপুরের শব্দ শুনলেন কবি ইন্দ্রজিত্ ইমন। এমনিতেই বেচারা ফেসবুকের নূপুরদের নিয়ে টানা-হেঁচড়ায় আছেন এর মাঝে কাপ্তাইয়ের নূপুর ভাবী তার আত্মায় কাপন লাগিয়ে দিয়ে গেল! নূপুর ভাবীর ভয়েই কিনা জানি না, রাতে ৬ জনে একরুমে জড়ো হয়ে সবাই মিলে কার্ড খেলতে বসেছি ওমনি শুরু হলো নূপুরের আওয়াজ, তাও যেন কাচের তৈরি! ভয়ে ভয়ে সবাই ঘুমুতে গেলাম। সকালে কেয়ারটেকার মিলন বড়ুয়া জানাল রাতে কাচের জানালা ভালো করে বন্ধ করে শুতে না হলে হনুমানেরা দলবেঁধে জানালার ধারে বসে গান ধরে। হায় এই কি তবে নূপুর ভাবী মিস্ট্রি!!
শনিবার আমাদের অস্ত্র প্রদর্শনীর কথা থাকলেও ভারত-বাংলাদেশের ম্যাচের কারণে তা পিছিয়ে পরের দিন রোববার অর্থাত্ ২০ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হয়। সকাল-সকাল তাই মাইক্রোবাস ভাড়া করে কাপ্তাই রাঙামাটির অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য সংবলিত বাইপাস সড়ক হয়ে রাঙামাটি ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লাম।
বাইপাস ঝাগড়াবিল বড়াদম সড়কের প্রতিটি পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অসাধারণ এক পাহাড়ি সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্য গিলে খেতে খেতে চলেছি। মাঝে মাঝে চলা থামিয়ে সেইসব অসাধারণ সুন্দরকে সাধারণ ক্যামেরায় ধরে রাখার অতি আন্তরিক চেষ্টা। রকি’তো পা ছড়িয়ে বসে গেল রাস্তার ওপর। তাকে অনুসরণ করে অন্যরা। আওলাদপাড়ায় ঢোকার মুখে ব্রিজে সেকি উল্লাস সবার। গাড়িতে গান বাজছে-ন চাং যেবার এ জাগান ছাড়ি, ইদু আগং জনমান পুরি, এ জাগাগান রইয়েদে। ম মানান জুড়ি। (এদেশ ছেড়ে আমি যেতে চাই না, এখানে আমি রয়েছি সারা জনম ধরে, এ আবাস ভূমিতেই, আমার মনপ্রাণ মিলেছে এখানে, ঠিক এখানে) মাইক্রোবাস রাঙামাটি শহরতলীর ভেতর দিয়ে আসামবস্তি, ভেদভেদি, কলেজগেট, বনরূপা হয়ে রাজবাড়ি ঘাটে। রাজবাড়ি ঘুরে বেড়াতে যাওয়ার আগে রাজবন বৌদ্ধ বিহার, চতুর্থমহারাজিক স্বর্গ আর কঠিন চিবরদানের স্থানটি দেখে নিলাম। সেখানে যুগ যুগ ধরে বাদাম বিক্রেতা মুসলিম এক লোকের সঙ্গে খাতির হয়ে গেল কবি ও কার্টুনিস্ট ইমনের। তার বাদাম মানুষ না বিহারের বানরগুলো খায়, তা নিয়ে এন্তার গবেষণা করে ফেলল সে।
আমাদের অনেকের ভাগ্যেই রাজার বাড়ির সেই অপরূপ আঙিনা আর জৌলুস দেখার সৌভাগ্য হবে না। গত বছর (১১ নভেম্বর ২০১০) রাজার বাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পুড়ে যাওয়ার আগে একবার ঘুরে গিয়েছিলাম। সেই সময় তোলা কয়েকটি ছবি স্মৃতি হিসেবে আমাদের গাইড ও বন্ধু অশোক চক্রবর্তীকে উপহার হিসেবে দিলাম। পুড়ে ছাই রাজবাড়ীর আঙিনায় দেখলাম জনৈক চাকমা ‘প্রবেশ নিষেধ’ লেখা একটি নোটিশ ঝুলাচ্ছেন। সেই সুযোগে রাজবাড়ির দোড়গোড়ায় সিমেন্টের সিংহের পিঠে চড়ে নিতে ভোলেনি মুন্না ও শামস্। রাজবাড়ির সামনে ফতে খাঁর কামানটি দেখে ইতিহাসের মজার বিষয়টি জানাল শামস্-শাহ সুজাউদ্দৌলা, ভাই আওরঙ্গজেবের ধাওয়া খেয়ে আরাকানের কাছে চাকমা রাজা ধামানার আশ্রিত হন। সে সময় সখ্যের নিদর্শন হিসেবে সুজার কন্যার সঙ্গে ধামানার পুত্র ধরম্যার বিয়ে দেয়া হয়। ১৬৬১-এর ধরম্যা রাজা হওয়ার পর অনেক চাকমা প্রভাবশালীরা মুসলমান নাম ধারণ করেন। যেমন জুবল খাঁ, জল্লাল খাঁ, ফতে খাঁ। আর তাই ফতে খাঁকে মুসলমান ভাবার কোনো কারণ নেই।
অশোকদা আগে থেকেই আমাদের জন্য একটি বোট ঠিক করে রেখেছিলেন। সেই বোটে রওনা হলাম অপরূপা ‘শিলার ডাক’ খ্যাত শুভলং ঝরনা দেখতে। সেই পথে যেতে মনের ভেতর থেকে কে যেন গেয়ে উঠল—‘কর্ণফুলী দুলি দুলি কদু যেবে কনা যেদুং চাং, মুই ত সমারে, মরে নেযানা।।’ (কর্ণফুলী দুলে দুলে কোথায় যাবে বলো না, আমিও যাব তোমার সাথে, আমাকে নাও না তোমার সাথে)। শুভলং ঝরনায় বৃষ্টির মতো ঝিরঝিরে পানি পড়ছে তাতে কি। আমরা ঝরনা ছুঁয়ে দেখতে উঠে গেলাম হাজার ফুট ওপরে। ভিজিয়ে নিলাম তৃপ্তিকে। থেকে বোটে ছুটলাম পর্যটনের ঝুলন্ত ব্রিজ দর্শনে। সেখানে ডারউইনের প্রতি কৃতজ্ঞতা শুভলং প্রদর্শনপূর্বক ঝুল তার ধরে টেনে টুনে ঝুলে বেশ ফটোসেশন হলো।
কাপ্তাই ফিরে রেস্ট হাউসে বিশ্রাম নিয়ে ছুটলাম আগামীকালের অস্ত্র প্রদর্শনীর জন্য প্রিন্সিপ্যাল জনাব বারী স্যারের সঙ্গে আলাপ করতে। তিনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে সাহায্য ও পরামর্শ দিলেন। ২০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার মধ্যে আমরা আমাদের সিআরএনবির (কার্টুনিস্ট রাইটস নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ) অস্ত্র প্রদর্শনী মেলে ধরলাম ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীদের জন্য। হ্যাঁ, আমাদের আঁকা কার্টুন। ইভ টিজিং নামক সামাজিক অভিশাপের বিরুদ্ধে অন্যরকম এক অস্ত্রের প্রদর্শনী দেখল পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ের বিএসপিআই সাধারণ শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা। প্রদর্শনী উদ্বোধন করলেন অধ্যক্ষ। দুশো পাতার ভিজিটরস বুকে মতামতে মুহূর্তেই ভরে গেল সব পাতা। সেখানে বেলী নামের এক শিক্ষার্থী লিখেছেন—‘আপনাদের কার্টুন নামের এই অস্ত্রের আঘাতে পরাজিত হোক নারীর প্রতি সব অবিচার, সে হোক ইভ টিজিং নামের পাশবিকতা!’
কোলাহল মুখরিত যান্ত্রিক নগরীতে ফিরে এলাম আবারও, তখন ঊষার আলো ফুটছে কেবল আর মনের মধ্যে এক বুক আশায় সামাজিক সব অনাচারের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেরা সাহস হয়ে আঁকড়ে ধরে আছে আমাদের অস্ত্রগুলোকে—আমাদের আঁকা ইভ টিজিং বিরোধী কার্টুনগুলোকে।

Source: Daily Amardesh

Tuesday, March 8, 2011

মৌয়ালদের সঙ্গে সুন্দরবন

মৌয়ালদের সঙ্গে সুন্দরবন

০০ লেখা মুস্তাফিজ মামুন

সুন্দরবনের অফুরন্ত সম্পদের একটি মধু। সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন বনে পয়লা এপ্রিল থেকে শুরু হয় মধু সংগ্রহ অভিযান। বহুকাল ধরে মৌয়ালরা নিজস্ব পদ্ধতিতে বাঘের ভয়কে জয় করে মধু নিয়ে আসেন সুন্দরবনের গহীন থেকে। সুন্দরবন ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ দেখা হতে পারে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

রহস্যে ঘেরা সুন্দরবন। এ বনের একেকটি রেঞ্জ পর্যটকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আমেজে ধরা দেয়। জালের মতো বিছানো লবণাক্ত নদী আর খালের পাড়ে ঠাসবুনোট জঙ্গল। সুন্দরবনের সুন্দরী, বাইন, পশুর, গেওয়া, কেওড়া, হেতাল, কাঁকড়া, গর্জন, ধুন্দল আরো কতশত গাছ। গ্রীষ্মের শুরুতে এসব গাছে ফুল ফোটে, ঘ্রাণ ছড়ায় জঙ্গলের বাতাসে বাতাসে।

মৌমাছিরা এসব ফুল থেকে মধু নিয়ে চাক বাঁধে গাছে গাছে। গাছের ডালে জমা হয় প্রকৃতির অমূল্য দান মধু।

পশ্চিম সুন্দরবনের লাগোয়া লোকালয়ে এই মধুর উৎসকে কেন্দ্র করে লোকেরা বাস গড়েছে বহুকাল ধরে। যুগ যুগ ধরে জঙ্গলের এই মধু 'মৌয়াল' নামের এক শ্রেণীর পেশাদারের জীবিকা নির্বাহের খোরাক জুগিয়ে আসছে।

বন বিভাগ তিন মাসের জন্য মৌয়ালদের বনের ভেতরে ঢুকে মধু সংগ্রহের অনুমতি দিয়ে থাকে। সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জ কার্যালয় থেকে মেলে এ অনুমতি। পয়লা এপ্রিল যাত্রা শুরুর আগে মৌয়ালদের বনের রাজস্ব আদায়সহ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই নৌকা ছুটাতে হয় বনের উদ্দেশে। যাত্রার শুরুতে একটি প্রার্থনা সভার মাধ্যমে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ শেষে নিরাপদে ফিরে আসার আকুতি জানান উপরওয়ালার কাছে। প্রার্থনা শেষে প্রত্যেক মৌয়ালের হাতে বেঁধে দেওয়া হয় লাল কাপড়। তাদের বিশ্বাস, এ কাপড় বিপদ-আপদ বিশেষ করে বনের রাজার হাত থেকে রক্ষা করবে তাদের। প্রার্থনা শেষে মৌয়ালরা তাদের নৌকা নিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে অপেক্ষা করেন। বন কর্মকর্তা আকাশে গুলি ছোঁড়েন, মৌয়ালরা জোরসে বৈঠায় হাত লাগান। কার আগে কে পেঁৗছুতে পারেন বনের পানে। লোনা পানি কেটে বৈঠা টানেন জোরেসোরে।

সাত থেকে তেরজন মৌয়াল থাকেন সাধারণত একেকটি দলে। বনে পৌঁছে একজনকে নৌকা পাহারায় রেখে সবাই ঢুকে পড়েন ভেতরে। গামছা দিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে নেন হুল ফোটার ভয়ে। মৌয়ালদের চোখ থাকে গাছে, গাছের ডালে ডালে। সবাই-ই ডালে ডালে খুঁজে ফেরেন মধু ভরা মৌচাক। তবে, চাক ভাঙার সিদ্ধান্তটি নেন দলনেতা, মৌয়ালরা যাকে বলেন বহরদার। সবার হাতে দা, ধামা। বহরদার অভিজ্ঞ মৌয়াল। বাতাসের গতি ও মৌমাছির উপস্থিতি ইত্যাদি লক্ষ্য করে মৌচাকের অবস্থান খুঁজে বের করেন তিনি। সাধারণত তারা মৌচাকের অস্তিত্ব টের পান গাছের পাতায় মৌমাছির মল কিংবা মৌমাছির উড়াউড়ি দেখে। বহরদারের অনুমতি মিললে গাছে চড়ে মৌচাকে আগুনের ধোঁয়া দেন একজন, একজন দা দিয়ে কাটেন চাক, নিচে বেতের তৈরি ধামা পেতে কাটা চাক ধরেন অরেকজন। এভাবেই জঙ্গলে জঙ্গলে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন মৌয়ালরা। সারা দিনের সংগ্রহ নিয়ে সন্ধ্যায় নৌকায় ফেরেন তারা। মাটির বড় মটকিতে পুরে ফেলেন দিন শেষের সংগ্রহ।

মৌয়ালদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সুন্দরবনের ভেতরে এসব রোমাঞ্চকর মধু সংগ্রহের দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা করেছে বেসরকারী ভ্রমণ সংস্থা বেঙ্গল টু্যরস। সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ দেখতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন অভিজ্ঞ এ ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে। প্রতিবছরের মতো এবারও বেঙ্গল টু্যরস মধু সংগ্রহের বিশেষ প্যাকেজের ব্যবস্থা করেছে। যে কেউ তাই কাছে থেকে দেখে আসতে পারেন সুন্দরবনের মৌয়ালদের জীবনযাপন ও মধু সংগ্রহের রোমাঞ্চকর সব দৃশ্য। ৩১ মার্চ থেকে শুরু হবে এ ভ্রমণ। ৪ রাত ৩ দিনের এ প্যাকেজে জনপ্রতি খরচ হবে ৮ হাজার ৫০০ টাকা, বিদেশিদের জন্যে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে তাপনিয়ন্ত্রিত বাসে করে সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনী। সেখান থেকে বেঙ্গলের নিজস্ব জলযানে চেপে পশ্চিম সুন্দরবনের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানো আর মধু সংগ্রহ দেখা। যোগাযোগ :বাড়ি-৪৫, রোড-২৭, বস্নক-এ, বনানি, ঢাকা। ফোন :৮৮৫৭৪২৪, ৮৮৩৪৭১৬।

কিছু তথ্য

সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের জন্য সাধারণত মৌয়ালরা প্রতিবারে পনের দিনের অনুমতি পান। সুন্দরবনের সবচেয়ে ভালো মানের মধু হলো খোলসী ফুলের 'পদ্ম মধু'। মানের দিক থেকে এরপরেই গরান ও গর্জন ফুলের 'বালিহার মধু'। মৌসুমের একেবারে শেষে আসা কেওড়া ও গেওয়া ফুলের মধু অপেক্ষাকৃত কম সুস্বাদু। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে ঐতিহ্যবাহী মৌয়াল পেশা এখন হুমকির মুখে। আরো আছে নানারকম সাপ আর বাঘের ভয়। প্রতিবছর গড়ে আট থেকে দশজন মৌয়াল বাঘের আক্রমণের শিকার হন। মৌয়ালরা তাদের সংগৃহীত মধু বিক্রির পসরা সাজান সাতক্ষীরার গাবুরা গ্রামে। খাঁটি মধু চেনার সহজ উপায় হলো, এক টুকরা কাপড় কিংবা কাগজ মধুতে ডুবিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেখা। মধু ভেজানো কাপড় টুকরা ভালোভাবে জ্বললে মধু খাঁটি, না জ্বললে ভেজাল।