Search This Blog

FCO Travel Advice

Bangladesh Travel Advice

AFRICA Travel Widget

Asia Travel Widget

Showing posts with label SUNDARBAN. Show all posts
Showing posts with label SUNDARBAN. Show all posts

Tuesday, March 8, 2011

মৌয়ালদের সঙ্গে সুন্দরবন

মৌয়ালদের সঙ্গে সুন্দরবন

০০ লেখা মুস্তাফিজ মামুন

সুন্দরবনের অফুরন্ত সম্পদের একটি মধু। সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন বনে পয়লা এপ্রিল থেকে শুরু হয় মধু সংগ্রহ অভিযান। বহুকাল ধরে মৌয়ালরা নিজস্ব পদ্ধতিতে বাঘের ভয়কে জয় করে মধু নিয়ে আসেন সুন্দরবনের গহীন থেকে। সুন্দরবন ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ দেখা হতে পারে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

রহস্যে ঘেরা সুন্দরবন। এ বনের একেকটি রেঞ্জ পর্যটকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আমেজে ধরা দেয়। জালের মতো বিছানো লবণাক্ত নদী আর খালের পাড়ে ঠাসবুনোট জঙ্গল। সুন্দরবনের সুন্দরী, বাইন, পশুর, গেওয়া, কেওড়া, হেতাল, কাঁকড়া, গর্জন, ধুন্দল আরো কতশত গাছ। গ্রীষ্মের শুরুতে এসব গাছে ফুল ফোটে, ঘ্রাণ ছড়ায় জঙ্গলের বাতাসে বাতাসে।

মৌমাছিরা এসব ফুল থেকে মধু নিয়ে চাক বাঁধে গাছে গাছে। গাছের ডালে জমা হয় প্রকৃতির অমূল্য দান মধু।

পশ্চিম সুন্দরবনের লাগোয়া লোকালয়ে এই মধুর উৎসকে কেন্দ্র করে লোকেরা বাস গড়েছে বহুকাল ধরে। যুগ যুগ ধরে জঙ্গলের এই মধু 'মৌয়াল' নামের এক শ্রেণীর পেশাদারের জীবিকা নির্বাহের খোরাক জুগিয়ে আসছে।

বন বিভাগ তিন মাসের জন্য মৌয়ালদের বনের ভেতরে ঢুকে মধু সংগ্রহের অনুমতি দিয়ে থাকে। সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জ কার্যালয় থেকে মেলে এ অনুমতি। পয়লা এপ্রিল যাত্রা শুরুর আগে মৌয়ালদের বনের রাজস্ব আদায়সহ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই নৌকা ছুটাতে হয় বনের উদ্দেশে। যাত্রার শুরুতে একটি প্রার্থনা সভার মাধ্যমে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ শেষে নিরাপদে ফিরে আসার আকুতি জানান উপরওয়ালার কাছে। প্রার্থনা শেষে প্রত্যেক মৌয়ালের হাতে বেঁধে দেওয়া হয় লাল কাপড়। তাদের বিশ্বাস, এ কাপড় বিপদ-আপদ বিশেষ করে বনের রাজার হাত থেকে রক্ষা করবে তাদের। প্রার্থনা শেষে মৌয়ালরা তাদের নৌকা নিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে অপেক্ষা করেন। বন কর্মকর্তা আকাশে গুলি ছোঁড়েন, মৌয়ালরা জোরসে বৈঠায় হাত লাগান। কার আগে কে পেঁৗছুতে পারেন বনের পানে। লোনা পানি কেটে বৈঠা টানেন জোরেসোরে।

সাত থেকে তেরজন মৌয়াল থাকেন সাধারণত একেকটি দলে। বনে পৌঁছে একজনকে নৌকা পাহারায় রেখে সবাই ঢুকে পড়েন ভেতরে। গামছা দিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে নেন হুল ফোটার ভয়ে। মৌয়ালদের চোখ থাকে গাছে, গাছের ডালে ডালে। সবাই-ই ডালে ডালে খুঁজে ফেরেন মধু ভরা মৌচাক। তবে, চাক ভাঙার সিদ্ধান্তটি নেন দলনেতা, মৌয়ালরা যাকে বলেন বহরদার। সবার হাতে দা, ধামা। বহরদার অভিজ্ঞ মৌয়াল। বাতাসের গতি ও মৌমাছির উপস্থিতি ইত্যাদি লক্ষ্য করে মৌচাকের অবস্থান খুঁজে বের করেন তিনি। সাধারণত তারা মৌচাকের অস্তিত্ব টের পান গাছের পাতায় মৌমাছির মল কিংবা মৌমাছির উড়াউড়ি দেখে। বহরদারের অনুমতি মিললে গাছে চড়ে মৌচাকে আগুনের ধোঁয়া দেন একজন, একজন দা দিয়ে কাটেন চাক, নিচে বেতের তৈরি ধামা পেতে কাটা চাক ধরেন অরেকজন। এভাবেই জঙ্গলে জঙ্গলে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন মৌয়ালরা। সারা দিনের সংগ্রহ নিয়ে সন্ধ্যায় নৌকায় ফেরেন তারা। মাটির বড় মটকিতে পুরে ফেলেন দিন শেষের সংগ্রহ।

মৌয়ালদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সুন্দরবনের ভেতরে এসব রোমাঞ্চকর মধু সংগ্রহের দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা করেছে বেসরকারী ভ্রমণ সংস্থা বেঙ্গল টু্যরস। সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ দেখতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন অভিজ্ঞ এ ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে। প্রতিবছরের মতো এবারও বেঙ্গল টু্যরস মধু সংগ্রহের বিশেষ প্যাকেজের ব্যবস্থা করেছে। যে কেউ তাই কাছে থেকে দেখে আসতে পারেন সুন্দরবনের মৌয়ালদের জীবনযাপন ও মধু সংগ্রহের রোমাঞ্চকর সব দৃশ্য। ৩১ মার্চ থেকে শুরু হবে এ ভ্রমণ। ৪ রাত ৩ দিনের এ প্যাকেজে জনপ্রতি খরচ হবে ৮ হাজার ৫০০ টাকা, বিদেশিদের জন্যে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে তাপনিয়ন্ত্রিত বাসে করে সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনী। সেখান থেকে বেঙ্গলের নিজস্ব জলযানে চেপে পশ্চিম সুন্দরবনের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানো আর মধু সংগ্রহ দেখা। যোগাযোগ :বাড়ি-৪৫, রোড-২৭, বস্নক-এ, বনানি, ঢাকা। ফোন :৮৮৫৭৪২৪, ৮৮৩৪৭১৬।

কিছু তথ্য

সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের জন্য সাধারণত মৌয়ালরা প্রতিবারে পনের দিনের অনুমতি পান। সুন্দরবনের সবচেয়ে ভালো মানের মধু হলো খোলসী ফুলের 'পদ্ম মধু'। মানের দিক থেকে এরপরেই গরান ও গর্জন ফুলের 'বালিহার মধু'। মৌসুমের একেবারে শেষে আসা কেওড়া ও গেওয়া ফুলের মধু অপেক্ষাকৃত কম সুস্বাদু। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে ঐতিহ্যবাহী মৌয়াল পেশা এখন হুমকির মুখে। আরো আছে নানারকম সাপ আর বাঘের ভয়। প্রতিবছর গড়ে আট থেকে দশজন মৌয়াল বাঘের আক্রমণের শিকার হন। মৌয়ালরা তাদের সংগৃহীত মধু বিক্রির পসরা সাজান সাতক্ষীরার গাবুরা গ্রামে। খাঁটি মধু চেনার সহজ উপায় হলো, এক টুকরা কাপড় কিংবা কাগজ মধুতে ডুবিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেখা। মধু ভেজানো কাপড় টুকরা ভালোভাবে জ্বললে মধু খাঁটি, না জ্বললে ভেজাল।

Thursday, February 3, 2011

শরণখোলা রেঞ্জের আরণ্যক সৌন্দর্য

শরণখোলা রেঞ্জের আরণ্যক সৌন্দর্য

টিএম মিজানুর রহমান শরণখোলা (বাগেরহাট)
বিশ্ববিখ্যাত বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও নয়নাভিরাম প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জকে ঘিরে রয়েছে পর্যটন শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, ব্যাপক প্রচার ও সদিচ্ছার অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়হীনতার কারণে এই অপার সম্ভাবনাময় খাতটি বিকশিত হতে পারছে না। তবে সাইনবোর্ড-শরণখোলা আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ায় শরণখোলা রেঞ্জ ভিত্তিক পর্যটন শিল্পকে ঘিরে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য এই সুন্দরবনকে এরই মধ্যে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উপকমিটি (ইউনেস্কো) বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। সুন্দরবনকে আকর্ষণীয় করে বিশ্বের বুকে পরিচিত করে তুলতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন সুন্দরবনে পর্যটকদের নিয়ে কাজ করলেও তাদের রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। এরপরও সরকার সুন্দরবনে পর্যটনখাতে প্রতিবছর মোটা অংকের রাজস্ব আয় করছে। সরকারের সদিচ্ছা, বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় সম্ভব হলে এ খাতের রাজস্ব বেড়ে যেতে পারে কয়েকগুণ। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ হবে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির ছোট-বড় বৃক্ষ, ১৬৫ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৩ প্রজাতির পরাশ্রয়ী অর্কিড রয়েছে। সুন্দরী এ বনের প্রধানতম বৃক্ষ, যা মোট বনাঞ্চলের ৭৩ ভাগ। এছাড়া কেওড়া, বাইন, পশুর, ধুন্দল, কাঁকড়া, পশুর, গরান, হেতাল ও গোলপাতা উল্লেখযোগ্য। এ বনের ২৬৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, ১৮৬ প্রজাতির পাখি ও ২১০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। বন্যপ্রাণীর মধ্যে বিশ্বনন্দিত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মায়াবী চিত্রল হরিণ, লোনাপানির ভয়ঙ্কর কুমির, বানর, শূকর ও গুইসাপ প্রধান।
এসব বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ সংরক্ষণ, বৃদ্ধি, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৭৭ সালে সুন্দরবনের ৩টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চিহ্নিত করা হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি এসব অভায়রণ্য জনসাধারণের জন্য বন্যপ্রাণীর বিচরণ পর্যবেক্ষণ ও উপভোগের জন্য উন্মুক্ত। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও সমুদ্রের বিশাল জলরাশির কারণে সুন্দরবনের পূর্ব অভায়ারণ্য সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সুন্দরবনের এ অংশের নৈসর্গিক দৃশ্য ও ভয়াবহ নিস্তব্ধতার সঙ্গে সরকারি ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
এ অংশটি সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত। সমগ্র সুন্দরবনের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় অঞ্চল কটকা ও কচিখালী নিয়ে এ অংশ গঠিত। কটকা, কচিখালী ছাড়াও শরণখোলা রেঞ্জের সুপতি, বাদামতলা, জামতলা, তিনকোনা আইল্যান্ড ও জেলে পল্লী দুবলা পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় স্থান।
কটকা : সুন্দরবন পূর্ব অভয়ারণ্যের পশ্চিমাংশে সাগর তীরে অবস্থিত কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্র। এখানকার নৈসর্গিক ও মনোরম পরিবেশ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। ঘন বনানীর ছায়ায় নির্মিত বিশ্রামাগারের বারান্দায় বসে চোখের সামনে উত্তাল সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ পর্যটকদের উচ্ছ্বসিত করে তোলে। বিকালে বিশ্রামাগারের চারপাশে হাজার হাজার চিত্রল হরিণের ছোটাছুটি, বানরের কোলাহল আর সকালে নদীর পাড়ে কুমিরের রোদ পোহানোর দৃশ্য যেন স্বপ্ন ও সত্যির অপূর্ব সমন্বয়। এখানে বিশ্রামাগার প্রান্তিকে ৪ শয্যাবিশিষ্ট ২টি কক্ষ রয়েছে। বরাদ্দপ্রাপ্তি ও রাজস্ব প্রদান সাপেক্ষ এটা ব্যবহার করা যায়।
কচিখালী : সুন্দরবনের পূর্ব অভয়ারণ্যের দক্ষিণ-পূর্বপ্রান্তে সাগর তীরে গড়ে উঠেছে কচিখালী কেন্দ্র। সুন্দরবনের ভ্রমণকারী এবং পর্যটকদের জন্য এখানে গড়ে উঠেছে একটি বড় ধরনের বিশ্রামাগার। এক শয্যাবিশিষ্ট তিনটি ও দুই শয্যাবিশিষ্ট একটি বেডরুম, ড্রইংরুম ও ডাইনিং রুমের সমন্বয়ে এ বিশ্রামাগারটি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। প্রতি শীত মৌসুম অর্থাত্ অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি এখানে কৌতূহলী পর্যটকদের ভিড় থাকে। তারা এখানকার সাগরপাড় আর ছন ক্ষেতের ভেতর খুঁজে ফেরে বহু প্রত্যাশিত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দর্শন। ঝাঁক বাঁধা চিত্রল হরিণ ছুটে বেড়িয়ে বন্ধুদের জানিয়ে দেয় পর্যটকদের আগমন বার্তা।
জামতলা : কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের নিকটবর্তী পর্যটকদের একটি আকর্ষণীয় স্থান জামতলা। জামতলায় রয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। যেখান থেকে বিস্তীর্ণ ছন ক্ষেতে হাজার হাজার হরিণের ছোটাছুটি, আবার কখনও রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখা যেতে পারে।
বাদামতলা : কচিখালী আর কটকার ঠিক মধ্যবর্তী স্থানের নাম বাদামতলা। বাদামতলা অত্যন্ত নির্জন এক সমুদ্র সৈকত। সেখানে আছড়ে পড়া সামুদ্রিক ঢেউ পর্যটকদের মন কেড়ে নেয়। শীতকালে বাদামতলার সৈকতে অজস্ত্র বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যায়। কচিখালী ও জামতলা থেকে পায়ে হেঁটে বাদামতলা পৌঁছানো সম্ভব।
দুবলার চরে মত্স্যপল্লী : সাগরদ্বীপ দুবলাসহ সন্নিবেশিত ১০টি চরে মাছ আহরণের মৌসুমে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মত্স্যজীবী ভিড় জমায়। অক্টোবরে এরা আসা শুরু করলেও নভেম্বরে রাসমেলা নামক এক ধর্মীয় উত্সবের মধ্য দিয়ে তাদের বছরের কাজ শুরু হয়। দুশ’ বছরের ঐতিহ্যলালিত এ রাস উত্সবেও দেশি-বিদেশি হাজার হাজার পর্যটক ও দর্শনার্থী ভিড় জমায়।
যোগাযোগ : শরণখোলা রেঞ্জের সম্ভাবনা সুন্দরবনের অপরূপ প্রকৃতি, জীববৈচিত্র, গভীর সমুদ্রের অপরূপ দৃশ্য ছাড়াও যোগাযোগ ও যাতায়াতের জন্য এ রেঞ্জ বিশেষ উপযোগী। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বাগেরহাট থেকে বাসযোগে শরণখোলা উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজারে আসতে হবে। মংলা বন্দরের তুলনায় এখানে সাশ্রয়ী ভাড়ায় বিভিন্ন ধরনের লঞ্চ ও ট্রলার ভাড়া পাওয়া যায়। আগে থেকে বনবিভাগের অনুমতি প্রাপ্তিসাপেক্ষে শরণখোলা থেকে কচিখালী ও কটকায় যেতে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। শরণখোলা থেকে এর দূরত্ব যথাক্রমে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার। শরণখোলা রেঞ্জের কটকা ও কচিখালীতে আরামপ্রদ বিশ্রামাগারে পর্যটকরা যেমন রাতযাপন করতে পারেন, তেমনি ইচ্ছা করলে একদিনের মধ্যে সমগ্র এলাকা ঘুরে ফিরে আসতে পারেন, যা নির্ভর করবে পর্যটকদের প্রস্তুতি ও সামর্থ্যের উপর।
প্রস্তাবনা : স্থানীয় বিশেষজ্ঞ ও পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে শরখোলা রেঞ্জকে আকর্ষণীয় করতে বেশ কিছু প্রস্তাবনা পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে রয়েছে শরণখোলা রেঞ্জ অফিস থেকে পর্যটকদের বনে প্রবেশের রাজস্ব গ্রহণ ও অনুমতি প্রদানের ব্যবস্থা। শরণখোলা রেঞ্জভিত্তিক পর্যটকদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নিরাপদ জলযানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রস্তাবিত সাইনবোর্ড-শরণখোলা আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বনদস্যু ও জলদস্যুদের কবল থেকে পর্যটকদের নিরাপদ রাখতে সন্নিবেশিত নিরাপদ রুট চিহ্নিত করতে হবে। নিরাপদ রুটে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করতে হবে। সুন্দরবনের আকর্ষণীয় জায়গা চিহ্নিত করে পরিবেশ উপযোগী অবকাঠামো ও চিত্তবিনোদনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ রেঞ্জের উজ্জ্বলতম পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধি করতে হবে। সুপতি স্টেশনে এবং কচিখালী থেকে জামতলা পর্যন্ত উডেন ট্রেইল তৈরি করে গভীর বনে পর্যটকদের নিরাপদ পথ চলার ব্যবস্থা করতে হবে। শরণখোলা রেঞ্জ অফিস বা তেরাবেকা টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন এলাকায় মংলা করমজলের মতো টুরিস্ট স্পট স্থাপন করতে হবে। এমন অভিমত দিয়েছেন সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্রের দাবিতে আন্দোলনরত শরণখোলা উন্নয়ন ফোরামের প্রধান সমন্বয়ক, সাংবাদিক আসাদুজ্জামান মিলন।
সুন্দরবন পূর্ব-বিভাগের ডিএফও মিহির কুমার দে বলেন, বর্তমানে সুন্দরবন থেকে প্রতিবছর পর্যটন খাতে সরকার এক কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে। ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণা ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারলে রাজস্ব কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে শরণখোলা রেঞ্জ হতে পারে অপার সম্ভাবনাময় এক পর্যটক কেন্দ্র।
এ ব্যাপারে শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার জহিরুল ইসলাম জানান, সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জকে পর্যটন কেন্দ্রের আওতায় আনার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

Monday, January 17, 2011

সুন্দরবনে বানরের ইংরেজি জ্ঞান!

সুন্দরবনে বানরের ইংরেজি জ্ঞান!


আলতাব হোসেন, সুন্দরবন থেকে ফিরে
সবুজ হয়ে উঠেছে সুন্দরবন। বেড়েছে বাঘ, বানর ও হরিণসহ প্রাণিকুলের বিচরণ। তাকালেই চোখে পড়ে উড়ন্ত বিচিত্র প্রজাতির পাখির আনাগোনা। বনের বিভিন্ন প্রান্তে হরিণের পাল, বানরের দল, বকের সারি, ওত পেতে থাকা কুমির। চোখে পড়ল ঝাঁকে ঝাঁকে লাল কাঁকড়াও। সুন্দরী, বাইন, গেওয়া আর কেওড়া গাছে ছেয়ে গেছে পুরো সুন্দরবন। সরেজমিন চাঁদপাই থেকে শুরু করে দুবলার চর, পশ্চিমে চুনকুঁড়ি-হরিণটানা হয়ে সুন্দরবনের শেষ সীমানা কটকার কাছে বলেশ্বর নদ পর্যন্ত ঘনসবুজ বনের দৃশ্য দৃষ্টিকে করে তৃপ্ত। গত বুধবার সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আর প্রাকৃতিক
মনোমুগ্ধকর এসব দৃশ্য দেখে বিমোহিত হলেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লিওনচেন জিগমে ইয়োসার থিনলে। বিশ্বে একক বন হিসেবে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা সর্বাধিক আর বনজুড়ে বাঘের বিচরণের কথা শুনে পুলকিত হন তিনি। নিজেকে বাঘের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আমি নিজে বাঘের মতো গতি ও অটুট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি। বিশ্ব প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে তিনি সুন্দরবনের পক্ষে ভোট দেন। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী তার সফরসঙ্গী মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীদের তার দেশের জনগণকে সুন্দরবনের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতে আহ্বান জানান। স্পিডবোটে করমজলসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। করমজলে তিনি হরিণ, কুমির, বানরসহ নানা প্রজাতির পাখির অবাধ বিচরণ দেখে মুগ্ধ হন। তিনি করমজল সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা আর এগুলোর প্রাকৃতিক উপায়ে বেড়ে ওঠার কথা শুনে অবাক হন। বনের সুন্দরী, গেওয়া, গরান, বাইন, কেওড়া, গোলপাতার ঝাড় দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। এ সময় পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী প্রতীকী একটি বাঘের ক্রেস্ট উপহার হিসেবে তার হাতে তুলে দেন। চলতি বছরকে বিশ্বে 'বাঘ বর্ষ' ঘোষণা করা হয়েছে। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বাঘ রক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেন। করমজলের কুমির প্রজনন কেন্দ্রে কুমিরের জ্যান্ত মুরগি খাওয়া ও বানরের ইংরেজি জ্ঞান দেখে রীতিমতো ভড়কে যান ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। সুন্দরবনের করমজল এলাকার বানরগুলোকে বনকর্মীরা ইংরেজিতে কাছে আসাসহ নানা শব্দ শিখিয়েছে। ফলে বিদেশি অতিথি গেলে ইংরেজিতে তাদের প্রশ্ন করলে অঙ্গভঙ্গিতে বানরগুলো কাছে এসে নির্দেশ অনুসারে কাজ করে।
২০০৭ সালে আড়াইশ' কিলোমিটার গতিতে আঘাত হানা সিডরে বিধ্বস্ত সুন্দরবনের ক্ষতবিক্ষত চেহারা চোখে পড়েছে সে সময়। ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার আঘাতেও ক্ষতবিক্ষত হয় সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকা। এসব দৃশ্যও এ সময় দেখেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কঠোর সিদ্ধান্তে কোনো কিছু স্পর্শ না করায় সুন্দরবন নিজেই নিজের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে। সিডরের পর বনের ভেঙে পড়া গাছ সরাতে দেয়নি বন বিভাগ। ছিল সব ধরনের সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ। স্থানীয়রা বলেন, এ সিদ্ধান্তের সুফল পাওয়া গেছে। সুন্দরবন নিজেকে বদলে ফেলেছে, পুরনো যৌবন ফিরে পেয়েছে।
বনকর্মীরা জানান, সুন্দরবনের প্রাণীরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। গত ১০ বছর ধরে সুন্দরবনে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বনকর্মী হানিফ জানান, শীতের সময় গুলবনের হাঁস, লাল ও নীল মাছরাঙা এবার বেশি দেখা যাচ্ছে। হরিণ, বানর ও বন্য শূকরের সংখ্যাও আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। করমজল এলাকার ঘনসবুজ গাছপালা আবার জেগে উঠেছে। গজিয়েছে নতুন পাতা।
এ বিষয়ে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ জানান, খুব অল্প সময়ে সুন্দরবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের বৃহত্তম এ বনের দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশের সীমানায়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় এ বনের অবস্থান। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে স্থানীয় জমিদার ও বনজীবীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সুন্দরবন বর্তমান আয়তনের দ্বিগুণ ছিল। সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড পাওয়ার তথ্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সুন্দরী, কেওড়া, গরান, গোলপাতা, পশুর, কাঁকড়া, হেতাল, বলা, সিংড়া, খলসী গাছ বেশি জন্মে। এ বনের প্রাণিজগতে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বহুল আলোচিত হলেও ৩৭৫-এরও বেশি প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে এখানে। যার মধ্যে ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৯১ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া ও ৪৩ প্রজাতির মলাস্কা রয়েছে। লোনাপানির কুমির, বন্য শূকর, বানর, ডলফিন, মেছো ও বনবিড়াল এবং বিখ্যাত চিত্রা হরিণ রয়েছে সুন্দরবনে। ২০০৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি_ ইউএনডিপির জরিপ অনুযায়ী, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ৪৪০টি। বাচ্চার সংখ্যা ২১টি। ব্রিটিশ জুয়োলজিক্যাল সোসাইটির হিসাব অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ২০০টি। সিডরের আঘাতে একটি ও মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত তিনটি বাঘ মারা গেছে। তবে এসব তথ্য অনেক আগের।
Source: Daily Samakal, 16th January

Sunday, January 2, 2011

সুন্দরবনে অজগর

সুন্দরবনে অজগর

খসরু চৌধুরী, সুন্দরবন থেকে ফিরে | তারিখ: ৩০-১২-২০১০

গাছে অজগর
বিগত ৫০ বছরে সুন্দরবনে মেঘডম্বুর বা অজগর সাপের সংখ্যা এমন হারে কমেছে যে, বনচারীদের মধ্যে খুব কম মানুষ এই সরীসৃপের দেখা পেয়েছেন। অথচ সুন্দরবন-সংক্রান্ত বহুল প্রচলিত গল্পের একটি এ রকম—একদল গাছকাটা বাওয়ালি জঙ্গলের ভেতর গাছ কুপিয়ে ক্লান্ত হয়ে তামাকের অপেক্ষায় মাটিতে পড়ে থাকা মরা একটি গাছের ওপর বসে ছিল। হাতে হাতে ঘুরে শেষ ব্যক্তিরও হুঁকা টানা হয়ে গেছে। শেষ ব্যক্তি কলকে উপুড় করে বসে থাকা গাছের ওপর আগুনসহ পোড়া তামাক ঝেড়ে ফেলে। আর তাতেই ছ্যাঁকা খেয়ে সেই গাছ জ্যান্ত হয়ে মোচড়ানো শুরু করলে কাঠুরিয়ারা টের পায়, তারা বসে ছিল অজগরের পিঠে।
এটি হয়তো নিছক গল্প, অজগরের বিশালত্ব বোঝাতে তৈরি। দু-একজন পুরোনো বাওয়ালি, বন বিভাগের বনমাঝিদের কাছে শোনা ছাড়া অজগর দেখার কথা কেউ তেমন বলেন না এখন। আমি দেড় শতাধিকবার বিভিন্ন মেয়াদে সুন্দরবনে থেকেও অজগর দেখেছি মাত্র দুবার। বন থেকে ধরা দুটি অজগর দেখেছিলাম করমজল কুমির প্রজননকেন্দ্রে। বেশ কয়েক বছর আগে কচিখালী অভয়ারণ্যের বন কর্মচারীরা মাঠের মধ্যে এক বিশাল অজগরের সন্ধান পান। একটি শিঙেল হরিণ খেয়ে মরণাপন্ন হয়ে পড়ে ছিল সাপটি। হরিণের শিং অজগরের পেট ফুঁড়ে বের হয়ে পড়েছিল। বনরক্ষীরা অজগরটি ধরে শরণখোলা হয়ে সেটিকে খুলনায় নিয়ে ডাক্তারের কাছে সোপর্দ করে। ডাক্তার সাহেব চমৎকার অপারেশন করে মরা হরিণটি বের করে আনেন। অবশ্য অজগরটি অপারেশনের ধকল সহ্য করতে পারেনি।
মেঘডম্বুর বা অজগর মাঝেমধ্যে গাছে জড়িয়ে থাকলেও প্রধানত মাটিতে বা জলার ধারে ঘাপটি মেরে থাকা প্রাণী। সাংবাদিক বন্ধু মোরশেদ আলী খান এ বছর জিউধারার কাছে একটি ছোট খালে এমনই এক অজগর দেখতে পান। প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ প্রাণীটি জলার ধারে গা ডুবিয়ে গ্রামবাসীদের পোষা হাঁস ধরার চেষ্টায় ছিল।
১৯৭০ সালের পর থেকে উপর্যুপরি জলোচ্ছ্বাস, বনের ঘাসের মাঠ, জলাভূমিতে ঘাসকাটা বাওয়ালিদের উৎপাত অজগর কমে যাওয়ার মূল কারণ। নির্বিষ এই সাপটি মারতে বনচারীদের বেশ উৎসাহ। কারণ বোধ হয়, এর চামড়া বিক্রি করা যায়।
আনন্দের কথা, সম্প্রতি কয়েকজন প্রকৃতিবিদ আলোকচিত্রী কচিখালী অভয়ারণ্যে এই সাপটি দেখেছেন, ছবি তুলেছেন। আলোকচিত্রী যিশু সেন কচিখালী খাল বেয়ে নৌকায় চলার সময় উত্তরের হালকা জঙ্গলে গাছে পেঁচানো অবস্থায় অজগরটি দেখতে পান। প্রাণিবিজ্ঞানী মনিরুল খানকে বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, ‘কচিখালীতে গত বছর অজগরের আলামত আমিও পেয়েছি।’
বর্তমানে সুন্দরবনে কচিখালী-কটকা, আন্ধারমানিক, জোংরা, পোড়ামহল, শুবদিগুবদি, তিত্তরকাটি, আলকী, হিরণ পয়েন্ট, মাদারবাড়িয়া ও কালীরচর এলাকায় কিছু অজগর হয়তো আছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Python molurus। বিস্ময়কর এই প্রাণীটি রক্ষা করা প্রয়োজন সুন্দরবনের স্বার্থেই।

Source:

Prothom Alo

Friday, December 31, 2010

ঘুরে আসুন সুন্দরবনে:

ঘুরে আসুন সুন্দরবনে:

সুন্দরবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন রহস্য ও রোমাঞ্চঘেরা। একদিকে অ্যাডভেঞ্চার অন্যদিকে ভয় ও শিহরণ। জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ। প্রকৃতির অকৃপণ হাতের সৃষ্টি। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ, সাপ, বানর, মাছসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী পৃথিবী বিখ্যাত।

পর্যটকদের কাছে সুন্দরবনের আকর্ষণ তাই দুর্নিবার। পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম হতে পারে সুন্দরবন। আর তাই ভোটিংয়ে বার বার সুন্দরবনের নাম চলে আসছে শীর্ষ তালিকায়।

কী আছে সুন্দরবনে?
কী নেই সুন্দরবনে? জগদ্বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ, বনমোরগ, শূকর, হরেক রকম বানর, অজগর, বহু প্রজাতির পাখি, অপরূপ লতাগুল্ম ও বৃক্ষরাজি নদীতে নানা প্রজাতির মাছ রয়েছে। গাছের মধ্যে সুন্দরী, কেওড়া, গরান, বাইন, গেওয়া, পশুর, গোলপাতা, হেতাল, কাঁকড়া, ঝানা, সিংড়া, খলসা ইত্যাদি।

নদীতে নানা প্রজাতির মাঝে কুমির ও ভয়াল অজগরসহ প্রায় ৩৩ প্রজাতির সরীসৃপ বাস করে সুন্দরবনে। এছাড়াও শীতকালে অসংখ্য অতিথি পাখির আগমন ঘটে সুন্দরবন অঞ্চলে। প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া সুন্দরবনের এই অপরূপ সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করে। সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের প্রাচুর্য থেকে বা এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে এর নামকরণ করা হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

সুন্দরবন মানুষের দেওয়া নাম। বাংলাদেশের দক্ষিণসীমায় অবস্থিত সমুদ্রকূলবর্তী জঙ্গলাকীর্ণ ভূভাগই সুন্দরবন। সুন্দরবনের নরখাদক নামের বইতে বলা হয়েছে প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে গাঙ্গেয় বদ্বীপে এ বনের সৃষ্টি। নিকোলাসপাই মেন্টা নামের বিখ্যাত একজন পর্যটকের ভ্রমণ কাহিনীতেও এ বনের নাম উল্লেখ রয়েছে

সুন্দরবনের সীমা ও অবস্থান
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে খুলনা-বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সাতটি থানা এলাকায় সুন্দরবনের মোট আয়তন প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার। বঙ্গোপসাগরের তীরে ৮৯ ডিগ্রি থেকে ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ ও ২১.০৩ ডিগ্রি হতে ২২.৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মাঝে সুন্দরবন অবস্থিত

এর মধ্যে বন প্রায় ৪০১৬.৮৫ বর্গ কিলোমিটার, নদী খাল ও অন্যান্য চ্যানেল ১৭৫৬ বর্গ কিলোমিটার। সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে রায়মঙ্গল, হাড়িয়াডাঙ্গা ও কালিন্দি নদী। উত্তরে বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা, পূর্বে ধলেশ্বর ও হরিণঘাটা নদী, পিরোজপুর ও বরিশাল জেলা।

সুন্দরবনের আকর্ষণ
পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। ক্যামেরার সাহায্যে বন্যজন্তুর ছবি তোলার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পৃথিবী বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ ছাড়াও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর দর্শন সহজলভ্য। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচ্য।

জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালদের সঙ্গে দেখা ও কথা বলার সুযোগ পেতে পারেন অনায়াসেই। রাতে সুন্দরবনের শান্ত স্নিগ্ধ রূপ আর নদী সমুদ্রের সৌন্দর্য অপরূপ। এসব ছাড়াও সুন্দরবনের আশপাশে রয়েছে অসংখ্য পর্যটন আকর্ষক স্থানসমূহ।

হিরণ পয়েন্ট
হিরণ পয়েন্ট পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম স্থান। ভাগ্যে থাকলে এখান থেকে বাঘ, হরিণ ও নানাজাতের পশুপাখি দর্শনের সুযোগ পেতে পারেন। এখানে বানর, কুমির ছাড়াও নানা প্রজাতির পাখি দেখতে পারবেন। প্রকৃতির নানা সৌন্দর্য যেন ছড়িয়ে রয়েছে এর আশপাশে।

কটকা-কচিখালি
কচিখালি এলাকার সংলগ্ন সমুদ্র তীরবর্তী অংশের তৃণভূমি জাতীয় বনভূমি ১২০ বর্গমাইল এলাকায় কটকা-কচিখালি অভয়ারণ্য অবস্থিত। এই বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে প্রায় সারা বছর বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণী নির্ভয়ে বিচরণ করে। এখানে বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে।

দুবলার চর
এটি একটি নয়নাভিরাম দ্বীপ। এখানে চিত্রল হরিণের দল ঝাঁকে ঝাঁকে চরতে দেখা যায়। এই দ্বীপকে দুবলার ট্যাকও বলা হয়। দুবলার মাটি খুঁড়লে মিষ্টি পানি পাওয়া যায়। দুবলার চর কটকা কিংবা হিরণ পয়েন্টের চেয়ে আরও মনোরম জায়গা।

কার্তিক মাসে এখানে মেলা বসে। এখানে এ সময় প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। এই মেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা দেবতা নীলকমল ও গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে থাকে।

অভয়ারণ্য
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে প্রতিবছর সুন্দরবনের অনেক দুষ্প্রাপ্য প্রাণী সম্পদের বিলুপ্তির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকার গাছ ও উদ্ভিদের বিলুপ্তি ঘটেছে। বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ বংশবিস্তার ও নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে বনের নির্দিষ্ট কিছু অংশকে সরকার অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে সুন্দরবনে এরূপ তিনটি অভয়ারণ্য রয়েছে।

এগুলো হলো কটকা রুচিখালি অভয়ারণ্য, নীলকমল অভয়ারণ্য ও পশ্চিম অভয়ারণ্য। নীলকমল অভয়ারণ্য হিরণ পয়েন্ট ও নীলকমল এলাকায় পর্যটকদের খুবই আকর্ষণীয় স্থান। ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণ এ এলাকায় বিচরণ করে। ১১০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে এটি বিস্তৃত। মংলা বন্দর থেকে এখনে যেতে ৬/৭ ঘণ্টা সময় লাগে।

কেওড়াসুটি নামক স্থানে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে। সুন্দরবনের পশ্চিমে ২৪৬ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে পশ্চিম অভয়ারণ্যটির স্থান নির্দিষ্ট রয়েছে। এখানে ভালোমানের কোনো বিশ্রামাগার না থাকায় শীতকালে তেমন লোক সমাগম হয় না। ফলে এই সমুদ্রতটে অসংখ্য বন্যপ্রাণী নির্ভয়ে বিচরণ করে।

কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে সরাসরি খুলনা দূরপাল্লার পরিবহন বাসে। এরপর মংলা বন্দর বা খুলনা নতুন বাজার লঞ্চঘাট থেকে সুন্দরবন যাওয়া যায়। সুন্দরবন যেতে প্রাইভেট মোটর, লঞ্চ, স্পিড বোট, নৌবা বা মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের যান ভাড়া করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
ঢাকা থেকে প্লেনে যশোর, সেখান থেকে সরাসরি খুলনা কিংবা সদরঘাট থেকে গাজী ও শাহীন বেলায়েত নামক রকেটে খুলনা যাতায়াত করা হয়। বাসে ঢাকা থেকে খুলনায় যাওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি আধুনিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন বাস চালু আছে।

কোথায় থাকবেন
হিরণ পয়েন্টে মংলাপোর্ট কর্তৃপক্ষের আরামদায়ক ত্রিতল বিশিষ্ট রেস্টহাউস রয়েছে যেখানে ৮ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। অগ্রিম প্রদান সাপেক্ষে খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অফিস থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এছাড়া ট্যুর অপারেটর নিজেদের উদ্যোগেই থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে থাকেন।

পানীয় জল
খুলনা ও এর দক্ষিণাঞ্চলের সব পানি লবণাক্ত। তাই পূর্বেই পর্যাপ্ত সুপেয় পানীয় জলের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।

প্রবেশাধিকার
সুন্দরবনে ভ্রমণ করতে হলে ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার বাগেরহাট বা ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার খুলনা বরাবরে দরখাস্ত করে অনুমতি নিতে হয় এবং প্রয়োজনীয় ফি প্রদান করতে হয়।

ক্যামেরা ও ট্যুরিস্ট ফি
স্টিল ক্যামেরা (দেশী) ২০ টাকা, বিদেশীদের জন্য ৬০ টাকা প্রতিদিন। ভিডিও ক্যামেরা (অভ্যন্তরীণ) ১০০ টাকা, বিদেশীদের জন্য ২০০ টাকা প্রতিদিন। প্রফেশনাল ফটোগ্রাফির জন্য নিউজ ও টিভি মিডিয়া স্টিল (অভ্যন্তরীণ) ২০০ টাকা বিদেশীদের জন্য ৭০০ টাকা প্রতিদিন। ক্যামেরা ক্রু (অভ্যন্তরীণ) ৫০ টাকা বিদেশীদের জন্য ৭০০ টাকা প্রতিদিন।

যা নেবেন
ট্রাউজার, টি-শার্ট, শর্টস, ক্যানভাস সু, প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্পিলার তোয়ালে, টুথপেস্ট, ব্রাশ, শেভিং ক্রিম, সানস্ক্রিম, বাইনোকুলার, ক্যামেরা, ফিল্ম, টর্চ, ব্যাটারি, হ্যাট অথবা ক্যাপ। কোনো আগ্নেয়াস্ত্র বহন করা যাবে না।

প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর
মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ-৭৬১৮৩০, ৭৬১০৫৬ রকেট স্টিমার রিজার্ভেশন (ঢাকা)- ৯৫৫৯৭৭৯ রকেট স্টিমার রিজার্ভেশন (খুলনা)- ৭২১৫৩২, ৭২৫৯৭৮ ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার (খুলনা)-৭২০৬৬৫ বিমান বুকিং অফিস খুলনা-৭৩১০২০ খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ-০৪১ ৭২০৪৪৪ সদর হাসপাতাল-০৪১ ৭২৩৪৩৩ হোটেল রয়েল-০৪১ ৭২১৬৩৮-৯, ০১৭১৮৬৭৯৯০০ পর্যটন মোটেল মংলা-০৪৬৬২, ৭৫১০০ হোটেল ক্যাসেল সালাম-০৪১ ৭৩০৭২৫, ০১৭১১৩৯৭৬০৭।

খরচ
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সরাসরি খুলনায় পৌঁছে প্রথমে মংলা। এরপর বোটে কিংবা ভাড়া করা লঞ্চে সুন্দরবন যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে ২ দিন ২ রাতের ভ্রমণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গেলে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় ঘুরে আসা যায়। বেশ কয়েকটি ট্যুর অপারেটর সুন্দরবন ভ্রমণের ওপর প্যাকেজ ট্যুরের আয়োজন করে থাকে। জেনে নিন ট্যুর অপারেটরদের কিছু তথ্য।

দ্য বেঙ্গল ট্যুরস
ঢাকা-সুন্দরবন-ঢাকা ৪ রাত ৪ দিনের প্যাকেজ ট্যুরের খরচ নেবে ৯ হাজার টাকা, ফোন : ৮৬২৮৫৭৭। দ্য গাইড ট্যুরস লিমিটেড ঢাকা-সুন্দরবন-ঢাকা তিন রাত ৪ দিনের জন্য নেবে ১০ হাজার টাকা, ফোন : ৯৮৮৬৯৮৩।

রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরস
ঢাকা-সুন্দরবন-ঢাকা ৪ রাত ৩ দিনের প্যাকেজ ট্যুর খরচ নেবে ৮ হাজার ৫০০ টাকা।

অবকাশ পর্যটন লিমিটেড
ঢাকা-সুন্দরবন-ঢাকা ৪ রাত ৪ দিনের প্যাকেজ ট্যুরের খরচ নেবে জনপ্রতি ৮ হাজার ৫০০ টাকা। ভ্রমণের পূর্বে ভালোমতো জেনে যেকোনো ট্যুর অপারেটরকে বুকিং দিন। এবার শীত মৌসুমে বেরিয়ে পড়ুন পৃথিবীর অন্যতম দর্শনীয় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন দর্শনে।
Source: amaderbook.yolasite.com

Friday, December 10, 2010

বর্ষায় সুন্দরবন

বর্ষায় সুন্দরবন

০০ আলোকচিত্র ও লেখা মুস্তাফিজ মামুন ০০

মেঘের লুকোচুরির মধ্যেই মংলা থেকে আমাদের নিয়ে নোঙ্গর তুলল এমভি ভেলা। পশুরের বুক চিড়ে চলছি আমরা। শত শত জেলে নৌকা নদীতে মাছ ধরতে ব্যস্ত। ঢাংমারী ফরেস্ট স্টেশনে প্রয়োজনীয় ফরমালিটিজ সেরে বনরক্ষী নিয়ে চলছি আমরা। চলতে চলতে পশুরকে পেছনে ফেলে ঢুকে পড়ি ছোট খালে। দুই পাশে ঘন জঙ্গল, মাঝে ছোট খাল দিয়ে চলছে আমাদের ভেলা। লঞ্চের আগে আগে লাফিয়ে চলছিল ডলফিনের দল।

বর্ষাকাল। বৃষ্টির ছোঁয়ায় বনের পাতায় প্রাণ ফিরে এসেছে- সবুজ আরো সবুজ হয়েছে। দিনভর অাঁকাবাঁকা খাল পেরিয়ে বিকেলে এসে ভেলা আমাদের নিয়ে পেঁৗছায় কটকা। লঞ্চ থেকে নেমে কটকার বনে হাঁটছি সবাই। চিত্রা হরিণের দল আমাদের আগমন টের পেয়ে গেছে। নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে আমাদের দেখার চেষ্টা করছে। ম্যানগ্রোভের ফাঁকে ফাঁকে হাঁটছি সবাই। সামনে পেছনে বন্দুকহাতে প্রহরী। হঠাৎ বনের মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টি। ক্যামেরায় রেইনকোট লাগিয়ে ছাতা মাথায় বনের মধ্যে বৃষ্টি উপভোগের চেষ্টা। সহযাত্রীদের অনেকেই তড়িঘড়ি করে লঞ্চে ফিরে গেলেও আমরা কয়েক জন বনের ধারে বৃষ্টি উপভোগের জন্য কিছুটা সময় থেকে গেলাম এক প্রহরীকে নিয়ে।

কটকা খালে নোঙ্গর করে রাত কাটালাম আমরা। সারা রাত থেমে বৃষ্টি। সকাল বেলা উঠে দেখি আকাশ পরিষ্কার। সূর্য ওঠার আগেই সবাই বেড়িয়ে পড়ি নৌকাযোগে ওয়াইল্ড লাইফ দেখতে। ছোট খাড়িতে ঢুকে আমাদের নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়া হলো। নিঃশ্বব্দে এবার বৈঠা দিয়ে চালানো হচ্ছে নৌকা। এরই মধ্যে সূর্য উঠেছে। গাছের পাতা ভেদ করে সূর্যের নরম আলো এসে আমাদের শরীরে লাগছে। বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে ডেকে চলছে বন মোরগ। গাছের ডালে বসে থাকা মাছরাঙাগুলো আমাদের উপস্থিতি জানতে পেরে এডাল-ওডাল ওড়াউড়ি করছে। গোলপাতার ফাঁকে মাথা গুঁজে আমাদের দেখতে চেষ্টা করছে ছোট্ট হরিণ শাবক। বাচ্চা কোলে গাছের ডালে বসে আছে বানর। দু ঘণ্টা নৌকায় ঘুরে নানা বন্যপ্রাণী দেখা হলো। লঞ্চে এসে তারাহুড়া করে সকালের নাস্তা সেরে আবারো বেড়িয়ে পড়ি সবাই। টাইগার পটয়েন্ট ধরে হাঁটতে হাঁটতে এবার জামতলা সৈকতে যাবার পালা। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম না যাবার। এ সৈকতে বহুবার এসেছি। তাই আমার কাছে এর আকর্ষণটা একটু কমই। তারচেয়ে পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে চুপচাপ বসে থাকাই আমার শ্রেয় মনে হলো। যদি বাড়তি কিছু ওয়াইল্ডলাইফ চোখে পড়ে। টাওয়ারে উঠে দু চোখ মেলে চুপ চাপ বসে রইলাম। ধীরে ধীরে ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে বের হতে লাগল চিত্রা হরিণের দল। সমুদ্র থেকে ফেরার পথে আমি আবার মিশে গেলাম দলের সঙ্গে।

দুপুরের পরে আমাদের লঞ্চ নোঙ্গর তুলল কচিখালির উদ্দেশ্যে। কটকা থেকে কচিখালি যাবার জন্য বনের ভেতরের পথটিই বেছে নিলেন আমাদের গাইড। চলতে চলতে ক্রমশ আমরা ছোট খালে ঢুকে পড়ি। নির্জন বনের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা চলতে থাকি। হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে আসে। অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়। লঞ্চের মাস্টার গতি কমিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে চলতে থাকেন। আমরা উপভোগ করতে থাকি সুন্দরবনের বৃষ্টি।

সুন্দরবনে কখনো বৃষ্টি দেখিনি। সে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। বনের নির্জনতার মাঝে বৃষ্টি যে কতটা উপভোগ্য হতে পারে তা বুঝতে পারলাম সুন্দরবনের সুন্দর বৃষ্টি দেখে।

বর্ষায় সুন্দরবনে এরকম ভ্রমণের আয়োজন করে থাকে বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থা দ্য বেঙ্গল টু্যরস। বর্ষাকালের সুন্দরবন ভ্রমণের আয়োজনটি তারা সম্পন্ন করে থাকে তাদের ২৬ আসনের দ্বিতল ভ্রমণতরী এমভি ভেলা'র মাধ্যমে। ঢাকা থেকে এসি বাসে খুলনা, সেখান থেকে এমভি ভেলায় করে সুন্দরবন। লঞ্চের কেবিনে দ্বৈতাবাসিক অবস্থান। পাঁচ রাত চারদিনের এ ভ্রমণে জনপ্রতি খরচ নয় হাজার টাকা, বিদেশিদের জন্য এগারো হাজার টাকা। দুই থেকে বারো বছরের শিশুদের জন্য ৩০ ভাগ ছাড়। প্যাকেজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ভ্রমণকালীন খাবার, সুন্দরবনে প্রবেশ, গাইড সার্ভিস, আর্মস গার্ড, ঢাকা-ঢাকা যাতায়াত ইত্যাদি। যোগাযোগ- দ্য বেঙ্গল টু্যরস, বাড়ি ৪৫, সড়ক ২৭, ব্লক এ, বনানী, ঢাকা। ফোন ৮৮৩৪৭১৬, ৮৮৫৭৪২৪।

Friday, November 19, 2010

রূপসী ও রহস্যময়ী সুন্দরবন

রূপসী ও রহস্যময়ী সুন্দরবন

আ জা দু র র হ মা ন
বিরলের লিচুবনে ঘুরে ঘুরে এক মনমরা বিকালে সুন্দরবনকে মনে করে আরও গ্রামাঞ্চলে চলে যাই। কোথাও জলাভূমি নেই। বেতনা, কাঁকশিয়ালি, চুনকুঁড়ি খুঁজতে গিয়ে ছ্যাবলাখালের দেখা মেলে। নদী নয়, নদীর কঙ্কাল। চারদিক থেকে করাল থাবা বসিয়েছে মানুষেরা। সাপের মাথায় পা পড়লে যেমন এঁকে বেঁকে কুঁকড়ে যায়, নদীটাও সেরকম কুঁকড়ে আছে। আহ্! কতো নির্মমভাবে মানুষ একে হত্যা করেছে! করুণমুখ পানে চেয়ে মায়া লাগে। নদীর নাম জানতে ইচ্ছে করে না, বরং ওর তলপেট দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে ওপাড়ের অন্য গ্রামে ঢুকে যাই। মাঝে মাঝে ধানী জমিতে সার করে লাগানো লিচুগাছ খানিক মন ভোলালেও সুন্দরবনের ছবি এসে আমাকে নোনা গন্ধের গল্প শোনায়।
সুন্দরবন—আহা মধুময় নীলডুমুর, কলাগাছিয়া। মনে আছে, সাতক্ষীরা পৌঁছে পরদিনই বাসে চেপে চলে গেছি মুন্সীগঞ্জ। তারপর শ্যামলাবাজার থেকে ভাড়ার মোটরসাইকেলে মালিককে পেছনে রেখে নিজেই খাল ধরে বন বরাবর গাবুরার দিকে চলে গেছি। দুপুরবেলা টংদোকানে বসে চা খেতে খেতে শুনেছি বাঘ, চিংড়ি আর কাঁকড়ার গল্প। গত এক বছরে বহুবার সুন্দরবনে যেতে হয়েছে কাজে কিংবা আনন্দে। খেজুরময় সাতক্ষীরার নোনা হাওয়াকে ভালোবেসে বোহেমিয়ান হয়ে চলে গেছি হরিনগর গ্রামে। মনে পড়ে বনঘেঁষা বাঘের ভয় ভরা হরিনগরের মৌয়ালদের কথা। মৌয়াল প্রধান সাঁজুনি সুন্নত গাজীর মুখটা এখনও ঝুলে আছে আমার সামনে।
সুন্দরবনগামী বাসগুলো পদে পদে থামে না বরং ৯০ কিলোমিটার দূরের মুন্সীগঞ্জকে মনে রেখে একটানা দক্ষিণে চলতে থাকে। সাতক্ষীরা থেকে কালীগঞ্জ। তারপর দেবহাটা পার হয়ে শ্যামনগরের শেষপাতে এসে লাস্ট স্টপেজ। গোটাকয়েক ঝাঁপতোলা দোকান এবং ছোট একটা বুনো বাসস্ট্যান্ড নিয়ে শ্যামলাবাজার-মুন্সীগঞ্জ। বাজার আর বনের ফারাক শুধু খোলপেটুয়া নদী। মুন্সীগঞ্জ হরিনগর কলাগাছিয়া নীলডুমুরের মতো গ্রামগুলো এতোই বনবর্তী যে, ক্ষুধার্ত বাঘেরা হামেশাই নদী সাঁতরে গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়ে। তারপর সুযোগমত দু’একজনকে হত, আহত করে তাদের হাড় মাংস চিবিয়ে আবার বনে ফিরে যায়। দু’চার ঘর বাদেই পাওয়া যায় বাঘে খাওয়া মানুষের গল্প। ‘বিধবাদের গ্রাম’ একটি অনন্য উদাহরণ। এ গ্রামে যেসব বিধবা আছেন তাদের স্বামীদের কোনো না কোনো সময় বাঘে খেয়েছে। মাসে ছয় মাসে দু’একজনকে বাঘে ধরে, কেউ মারা পড়ে কিংবা কদাচিত্ কেউবা আহত আধখাওয়া হয়ে ফিরে আসে—এরকম ঘটনা এখানে খুব বেশি আমল পায় না।
এত কিছু জেনেও অরণ্য—পিয়াসীরা জীবন হাতে হরদম মুন্সীগঞ্জ কিংবা পার্শ্ববর্তী নীলডুমুর ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ে। তারপর যেরকম যার সামর্থ্য ও সাহস, সেইমতো ঢুকে পড়ে ম্যানগ্রোভের রহস্যবনে। বনবাহিত নদীগুলো ডালে ডালে গিয়ে একসময় গভীর বনের অলিগলিতে হারিয়ে গেছে। বুনোগলিতে বয়ে বেড়ানো বাতাস একসময় নদীতে ঢেউ তোলে। বাওয়ালি মাঝি মৌয়ালদের নৌকোগুলো ভয়হীন চলে গেলেও ভয়ভরা চোখে আগন্তুকরা চেয়ে থাকে ঘন হেতাল বনের দিকে। নোনামাটিতে জ্বলে থাকা ম্যানগ্রোভ, থোকা থোকা শ্বাসমূলের ফলার ফাঁকে ঝাঁক ঝাঁক হরিণের পায়ের ছাপ আর বাঘের চামড়ার ডোরাকাটা হলুদ কল্পনারা যেন তাদের একেকটা মর্মাহত বিকালকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
বনজ আলোর অপার্থিব মুগ্ধরসে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পর্যটকমন। বাঘের কামড়ে দলের কেউ মারা পড়লে বাঘের তল্লাটে সঙ্গী বাওয়ালিরা গাছে লাল কাপড় বেঁধে দেয়। সেসব লাল কাপড়ের সিগনাল এবং কলাগাছিয়ার ফরেস্ট গার্ডদের ঝোলানো সতর্কবাণী সংবলিত সাইনবোর্ড অবহেলা করে পর্যটকরা আরও গভীরে যেতে চায়। ঘোরের মধ্যেই ঢুকে পড়ে নোনামাটির জঙ্গলে। নিশিতে পাওয়া প্রকৃতি-প্রেমীদের সামনে কেওড়া, গরান, গোলপাতা, পশুর, সুন্দরীরা জবান খোলে বোধহয়। তারপর বাঘের জলজ্যান্ত পদছাপ তাদের শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে তোলে। তখন হুঁশ হয়। সুন্দরবনের সব সুন্দরকে একটানে দেখা হয় না। রহস্য আর আকাঙ্ক্ষা বুকে ফিরে আসে বনপিপাসুরা।
বনজীবী ছাড়াও সাতক্ষীরাজুড়ে আছে বিবিধবর্ণের মানুষ। ঘোনার চৌদালি সম্প্র্রদায় কিংবা গাংনিয়ার রাজবংশী অথবা দৌলুইপুরের ভগবানিয়া—কার কথা বলব! লাবসার পাশে বয়ে চলে বেতনা। নরম বেতনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে লেখা হয় গাজী-কালু-চম্পাবতী। দেবহাটার মধ্যপথে সখিপুরের দুধ-চায়ের কথা ভাবতে ভাবতে টাউন শ্রীপুরের ইছামতি থেকে দুই বাংলার হাওয়া এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আমাকে। মন চলে যায় আশাশুনির দরগাপুর পার হয়ে বেহারা গ্রামে। বিচিত্র জাতি, উপজাতি আর প্রাচীন নানাবিধ পুরাকীর্তিতে পরিপূর্ণ এই সুন্দরবনী অঞ্চল—সাতক্ষীরা। আদিবাসীদের মধ্যে মুণ্ডা কিংবা নিদেনপক্ষে গাছিদের কথাই ধরা যাক। খুব সম্ভব বৈশাখের দিকে একবার আশাশুনির পিচপথে ঢুকে পড়েছিলাম। অফুরন্ত খেজুর দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। মোটরসাইকেলে যতোই এগুচ্ছি, ততই পথের দু’পাশে নিয়ম করে দেখা মিলছে শত শত খেজুর গাছের। পাথারের খাঁজে খাঁজেও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে খেজুর গাছ। মাথায় মাথায় ঝুলে আছে কমলা রংয়ের ঝুড়ি ঝুড়ি খেজুরের ঝোপা। অনবরত কমলা থোকা খেজুর দেখতে গিয়ে চোখে হলুদের ঘোর লাগে। এতদিন যেসব পাথারি গাছ চোখে ধরেনি, এখন তারাও হলুদ মাথায় জমির খাঁজে খাঁজে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তারপর আনন্দিত মনেই একদিন গাছিদের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। পথের লোকজনকে গাছি বললে উত্তর না দিয়ে মুখপানে চেয়ে থাকে। পরে দু’চারজনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল এ অঞ্চলে গাছি মানে শিবলি। একটানা গেরুয়া আবাদের পরে শিবলিপাড়ার ছেলেমেয়ে এবং গ্রাম্য গাছিদের নিয়ে পুকুরপাড়ে আনন্দ-বেদনার গল্পগুলোর সঙ্গে রমজান শিবলির মুখটা এখনও ছবি হয়ে আছে।
সাতক্ষীরার গ্রামগুলো মায়াময়। কোনো কোনো গ্রাম নিবিড় ছায়াঘেরা। যেমন হরিণখোলা কিংবা ভোমরার ঘোনার কথাই ধরা যাক। দ্বিতীয়বারের মতো হরিণখোলা পার হয়ে মুণ্ডাদের গ্রাম আসনানগরে গিয়েছিলাম গত বর্ষায়। নেপাল, গোপাল, তেজান মুণ্ডাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বেলা গড়িয়ে গেল। তারপর বেদম কাদাপথে সাতক্ষীরা শহরের দিকে ফিরতে থাকি। পাশের গ্রামের কিছু হিন্দু পোলাপানও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে। একজন বলল, ওরা গুলকে কী বলে জানেন? বলে গিরগিল্লা, আর গুল খাওয়া মানে হলো গিরগিল্লা খাতুন। গিরগিল্লা বলেই একে অপরের গায়ে ধাক্কা মেরে হাসতে লাগল। ওরা ডাকে কেমন করে শোনেন, মনে করেন গোবিন্দকে ডাকবে, বলবে ‘গোবিন্দ কুত কুত’—মানে গোবিন্দ এদিকে আয়। ছেলেগুলো ফের আগের মতো হি হি করে ওঠে।
ওদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম মুণ্ডারা ইঁদুরকে বিলখাসি এবং কেঁচোকে ‘উঠোন বরবটি’ বলে। মুণ্ডাপাড়া থেকে আধা কিলোমিটার দূরে বাঁকের মুখের ব্রিজ পেতে গিয়ে মাগরেবের আজান পড়ে গেল। ব্রিজের পর থেকেই মূলত মূলকাদার শুরু। আগেরবার ফেরার পথেই স্থির করেছিলাম, এবারই শেষ। এরকম বিটকেল কাদার পথে আর নয়। কিলো খানেক আসার পর আমরা বাধ্য হয়েই মূল রাস্তা ছেড়ে দিলাম। বাইপাস করে গ্রামের গলিতে ঢুকে পড়লাম। সম্ভবত নিম্নবর্গের হিন্দুপাড়া। উঠোন, গোয়াল, বারান্দা, আঙিনা যেখানে যেরকম সুযোগ টালমাটালে হাঁটছি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ভেতর একতাল চাঁদও উঠেছে। পাড়ার খাঁজে খাঁজে কুয়াশা নয়; সান্ধ্যপূজার ধূপের ধোঁয়া। নীরবতার মধ্যে হঠাত্ হঠাত্ দূরবর্তী লঞ্চের ভেঁপুর মতো উলুধ্বনি শোনা যাচ্ছে । উলুধ্বনির মাঝে মাঝে কেউ শঙ্খ বাজাচ্ছে। সহযাত্রী সাংবাদিক সুমন অনেকটা ভূত দেখার মতো আমাকে থামিয়ে দিল, ‘শুনতে পাচ্ছেন, কে যেন কাঁদছে’। কান্নার সঙ্গে খুব ধীরলয়ে ঢোল, হারমনি বাজছে। কৌতূহল আর ভয় নিয়ে আমরা কান্নার দিকে এগিয়ে গেলাম। কাছাকাছি যাওয়ার পর দেখা গেল প্রায় শ’দুয়েক নারী-পুরুষ মনসামঙ্গল পালা শুনছে। জটলার মাঝখানে লালসালু কাপড়ের রাজপোশাক গায়ে মুকুট মাথায় চাঁদ সওদাগর দাঁড়িয়ে আছে আর তার সামনে দিলীপ কেঁদে কেঁদে পাট করছে।
মনসামঙ্গল পালা
দিলীপের পাট নেয়া কালো ছেলেটা সত্যি সত্যিই কাঁদছে। চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে। কোনো মেডিসিন ছাড়া এরকম অভিনয় দিয়ে চোখে পানি আনা এই প্রথম দেখলাম। খানিক আগে আমরা দিলীপের কান্নাই শুনেছিলাম। বটগাছের নিচে পালা হচ্ছে। পাশের ভাঙা ঘরকে ড্রেসিংরুম বানানো হয়েছে। এক মহিলাকে দেখলাম সেজেগুজে বসে আছে মনসাদেবীর পাট করার জন্য। বেহুলার ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য একজন ছোকরাকে পাউডার মাখিয়ে মেয়ে সাজানো হয়েছে । তার পাট বোধহয় পরের সিকোয়েন্সে হবে । সে বসে বসে বিড়ি টানছে।
সুমন ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলে নিল। এরপর ড্রেসিংরুমের পাট নেয়া অভিনেতাদের নাম টুকে নিয়ে বলল, ‘চলেন’। আমরা যখন পিচের রাস্তায় উঠলাম তখন রাত আটটা। বৃষ্টি থেমে গেছে। পাথারের মধ্যে সুতোর মতো পিচপথ। চাঁদের আলোর ভিতর হু হু করে হাওয়া বইছে। এবার সুমন নিজেই ড্রাইভ করছে। আজকের অভিজ্ঞতার পর সুমন হয়তো আর আসতে চাইবে না। নানান ওজর দেখাবে। আসার সময় কার্তিক মুণ্ডা আমাকে তার মোবাইল নাম্বার দিয়েছে। বলেছে, ভাদ্র মাসের শেষ সপ্তাহে আমি যেন রিং করি। খুব নাকি মজা হয়। ব্যাপক গান-বাজনার সঙ্গে হাড়িয়া মচ্ছব। কার্তিক হাঁটতে হাঁটতে দুই লাইনের বেশি গাইতে পারল না। বলল, এখন হবে না; হাড়িয়া খেলে দেখবেন এমনি এমনি গান বের হচ্ছে। কী যেন গানটা, মনে পড়েছে
আটোল পাতে গিলেই হামার নাতি
টেংরা মাছের ঝাল লেলায় রাতি।
একটা বুনো হাওয়া এসে উড়ে যায় পাথার থেকে পাথারে। আমরা হরিণখোলার সরু পিচ ছেড়ে সদর পিচে উঠে যাই।

Wednesday, November 17, 2010

ঐতিহ্যময় সুন্দরবন - সুজন মজুমদার

ঐতিহ্যময় সুন্দরবন - সুজন মজুমদার

sundarbanদক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এই বনভূমি বিশ্ব পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় অপরিসীম। শুধু তাই নয়, এই সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর প্রায় অর্ধ লাখ মানুষ জীবন জীবিকার একমাত্র নির্ভরশীল করে থাকে।

কেউ গাছ কাটে, কেউ মধু আহরণ করে, কেউ মাছ ধরে, কেউ গোলপাতা কাটে, কেউ বা কাঁকড়া ধরে এবং শুঁটকিও রফতানি করে থাকে কেউ কেউ। বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষে জেগে ওঠা বিশাল এই সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক ঘাতক সিডর, আইলার নামক ঝড়ের তা-বে ল-ভ- করে দিয়ে গেছে। যার কারণে যারা নদীর বুক থেকে বিভিন্ন রকম উপার্জনের একমাত্র সম্বল তারা আজ ভীষণ দুর্ভিৰের সঙ্গী। তাদের বেঁচে থাকা হয়ে পড়েছে আজ অসম্ভব দায়। শুধু তাই নয়, মৎস্যজীবীদের প্রাণও কেড়ে নিচ্ছে এই আইলার-সিডর। কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করে দিয়ে গেছে। দক্ষিণবঙ্গের খুলনা, মংলা, বাগেরহাট ও সাতৰীরাজুড়ে বিশাল অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা এই সুন্দরবন প্রায় ২ হাজার ৩০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যময় সুন্দরবনের লীলাভূমি। ৬০ মাইল লম্বা সুন্দরবনে শীত মৌসুমে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ হাজার, হাজার মানুষ ভিড় জমায় তাদের জীবন-জীবিকার খোঁজে। তাছাড়া বার মাসই এই সুন্দরবনে মানুষ তাদের কর্মতৎপরতা চালায় বেঁচে তাকার তাগিদে। সাগরকূলে দুবলারচরসহ বিভিন্ন চরে বিভিন্ন জেলার হাজার, হাজার জেলে তাদের আনুষঙ্গিক সামগ্রী নিয়ে অস্থায়ীভাবে বসতি করে। তারা ৪/৫ মাসের জন্য ৫০ থেকে ৬০ হাজার জেলে সারিবদ্ধভাবে ছোট ছোট ঘর করে জীবনযাপন করে। ছোট-বড় ট্রলার নিয়ে সাগর ও বনের ভেতর ঢুকে তারা মাছ, কাঁকড়া, হরিণ, পাখি, মধু গোলপাতাসহ আরও অনেক কিছু আহরণ করে। সুন্দরবনে আহরিত মাছ থেকে প্রতিবছর প্রায় চলতি মৌসুমে এক শ' থেকে সোয়া শ' কোটি টাকা আহরণ করা হয়। ৫ মাসের আয় দিয়ে প্রায় সারা বছরই জেলেরা সুন্দরভাবে জীবন-জীবিকা করে থাকে। প্রতি জেলের পরিবারে কমপৰে ৫ জন সদস্য থাকে। গড় প্রতি ৩০-৩৫ হাজার জেলের হিসাবও যদি করা হয় তাহলে ধরা যায় অনত্মত দেড় লাখ থেকে শোয়া লাখ লোকের জীবিকা নির্ধারণ হয় এই দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন থেকে। ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় সুন্দরবনে প্রবেশ বাওয়ালীদের। এসময় বাওয়ালীদের মূলত সুন্দরবনে প্রবেশের উত্তম মৌসুম। বন বিভাগ এসময় প্রতিবছর বনের প্রকৃতি আহরণের সুযোগ দিয়ে থাকে। তাই বাওয়ালীরা এসময় ফরেস্টারের কাছ থেকে বনের মধ্যে যাওয়ার পারমিশন বা পাস নিয়ে কাঠ, গোলপাতা, মধু আহরণসহ বিভিন্ন কাজের তাগিদে তারা বনের মধ্যে প্রবেশ করে থাকে এবং এই কাজের মধ্যে তাদের জীবন-জীবিকা নির্ভর বলে এদের এক কথায় বলা হয়ে থাকে বনজীবী। প্রতিবছর ডিসেম্বরে সুন্দরবনে প্রায় ৩০-৩৫ হাজার বাওয়ালী আসে। বন রৰাকারীরা বাওয়ালীদের কাছ থেকে আবার নৌকার আকৃতি দেখে মানে ছোট বড় অনুমান করে মোটামুটি একটা নির্ধারিত রাজস্ব আদায় করে থাকে। সুন্দরবনের প্রশাসন সুন্দরবনে বাওয়ালীদের সুবিধার জন্য জায়গায় জায়গায় প্রশাসনিক ভাগ করে টহল দেয়ার কাজ করে। ২ হাজার ৩০০ বর্গ মাইলজুড়ে রয়েছে দুটি বিভাগ। একটি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ আর অপরটি সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ। সুন্দরবন বিভাগে বিভিন্ন রফতানি পণ্যের মাধ্যমেই দৰিণাঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ জীবন-জীবিকায় বেঁচে আছে এবং গোটা সুন্দরবন রাজস্ব আয় প্রতি বছরে প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা। সুন্দরবনের হিসাব অনুযায়ী গত (২০০৬-২০০৭) বছরে সুন্দবনের ৪টি রেঞ্জ এলাকা থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ২৩ হাজার ৪১০ টাকা। (২০০৫-২০০৬) এ বন বিভাগ থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫ কোটি ৮২ লাখ ১৩ হাজার ৩২৬ টাকা। আর গত (২০০৪-২০০৫) অর্থবছরে সুন্দরবনের রাজস্ব আয় হয়েছিল ৬ কোটি ৭২ লাখ ৩৮ হাজার ১২০ টাকা। কিন্তু বিধ্বস্ত সিডর, আইলার নির্মম কান্ডযজ্ঞে ১৫ নবেম্বর বিশ্ব ঐতিহ্যের এ সুন্দরবনকে একেবারেই ধূলিসাত করে দিয়ে গেছে। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না দানব সিডর, আইলার। তারা নির্দ্বিধায় কেড়ে নিয়েছে কয়েক হাজার জেলের প্রাণ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই সিডর, আইলার কারণে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ৰয়ৰতি হয়েছে সুন্দরবনের। বাংলাদেশের সর্বশেষ দৰিণে পশ্চিমাঞ্চলে তীরঘেঁষে বঙ্গোপসাগরের ৮৯.০০৮৯.৫৫ পূর্ব অক্ষাংশ এবং ২১.৩০.২২.৩০ উত্তর দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভূখ-জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশের ভূখন্ডের এ বনের আয়তন ৫৫,৭৮৫ হেক্টরের মধ্যে ৪১,১৬৮৫ হেক্টর বনভূমি। বাকি ১৫,৫৬০০ হেক্টর নদী খাল খাড়ি এবং মোহনার অঞ্চল। সুন্দরবনে এরকম অসংখ্য মোহনার জলাভূমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

ম্যানগ্রোভ সম্পদ : অন্যান্য বৈশিষ্ট্যধর্মী সুন্দরবনের বিশেষ একটি সম্পদ। এই ঐতিহ্যময় সুন্দরবনে রয়েছে এক বিশাল বনজ সম্পদ। যা থেকে আমরা কাঠ এবং কাজগের মন্ড তৈরির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি হয়ে থাকে। বর্তমানে অর্থমূলক সুন্দরবনে মোট ৩৩৪ প্রজাতির গাছ পাওয়া যায়। উলেস্নখযোগ্য যেমন সুন্দরী, গেওয়া, বাইন, উড়া, কেওড়া, মেহগনি, জির, গড়ান, গোলপাতা, হেতাল ইত্যাদি। রফতানির ভিত্তিতে আহরিত অন্যান্য দ্রব্য হচ্ছে মধু, মোম, কাঁকড়া, বাগদা এবং গলদা চিংড়ির পোনা, ঝিনুকের শেল, বড় বাগদা এবং গলদা চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছ। এই সুন্দরবনে ৪.২৫ রকম বন্যপ্রাণী, ৩১৫টি পাখি, ৫৩টি সরীসৃপের প্রজাতি এবং ৮টি উভচর প্রাণীর প্রজাতি রয়েছে। এসবের বন্য প্রাণী যথারীতি সারা বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর শতকরা ৩৪ ভাগ, পাখি ৩৫ ভাগ এবং সরীসৃপ প্রাণীর প্রজাতির শতকরা ২৯ ভাগ রয়েছে। সবচেয়ে সত্য কথা যে, বাংলাদেশের দৰিণাঞ্চলে নদী উপকূলে এলাকাজুড়ে হাজার, হাজার মানুষ বসবাস করে থাকে। যেমন মংলা, চানপাই, খেজুরে শরণখোলা, জয়খাঁ, বুড়ির ডাঙ্গা, পেড়িখালি, হুড়কা, রামপালসহ জেলা থানা গ্রামজুড়ে হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষাকারী প্রাকৃতিক বন্ধু এই একমাত্র সুন্দরবন। কারণ দৰিণ, পশ্চিম, পূর্ব এলাকাজুড়ে ঝড়ের তান্ডব থেকে ধ্বংসযজ্ঞে একমাত্র প্রথমেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় এই দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন। যার কারণে দৰিণ অঞ্চলের মানুষ এখনও বেঁচে আছে। তাই বন বিভাগ ও সরকারের সমন্বয় উদ্যোগে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে এই সুন্দরবন বৃৰ নিধনে সাবাড় না হয়ে যায়। তাহলে বাঁচবে দৰিণাঞ্চলের হাজার, হাজার প্রাণ, বাঁচবে বন, বাঁচবে পরিবেশ, বাঁচবে আমাদের প্রজন্ম।

Sunday, November 14, 2010

সুন্দরবন ভ্রমন : সম্পূর্ণ

সুন্দরবন ভ্রমন : সম্পূর্ণ

১লা ডিসেম্বর সোমবার বিকেল ৬টায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এর ক্যামপাস্ থেকে আমরা ৫০ জন ছাত্র শতাব্দী পরিবহনের গাড়ীতে রওনা দিলাম মংলা বন্দরের উদ্দেশে। চট্টগ্রাম হতে ঢাকা হয়ে মাওয়া ফেরীঘাট পার হয়ে দীর্ঘ ১৫ঘন্টা লাগলো মংলা বন্দরে পৌছাতে। মাওয়া ফেরীঘাট পার হতেই লাগলো দীর্ঘ ৪ঘন্টা। পদ্মা নদীর এপার থেকে ওপারে নেওয়ার ফেরীতে অবশ্য ৪ঘন্টা সময় কাটাতে তেমন কষ্ট হয়নি। কারণ একেতো সুন্দরবন যাওয়ার উত্তেজনা,তার উপর বিশাল ৫তলা ফেরী। আর পদ্মার সৌন্দর্য্যতো আছেই। ফেরী যখন পদ্মা নদীর মাঝামাঝি তখন কেবল ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটছিল।সে এক অসাধারণ দৃশ্য। ২রা ডিসেম্বর ৯টায় আমরা মংলা বন্দরে পৌছালাম।ওখান থেকেই মূলত আমাদের মূল ভ্রমন শুরু। তবে মংলা বন্দরের দূরাবস্থা দেখে খারাপ লাগলো খুব।

মংলা বন্দরে আমরা...
আগে থেকেই ঠিক করে রাখা রেডসান-১ লঞ্চ এ করে আমরা রওনা দিলাম সুন্দরবন এর দিকে।
ঢাংমারী ফরেষ্ট ষ্টেশন থেকে সুন্দরবন ঢুকার মুখেই নিতে হলো প্রয়োজনীয় অনুমতি এবং সুন্দরবন ঘোরার জন্য গানম্যান। তারপর আমরা রওনা দিলাম ভৌগলিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিরইন পয়েন এর দিকে।মংলা বন্দর থেকে হিরইন পয়েন এ যেতে লাগলো প্রায় ৫ঘন্টা। এই ৫ঘন্টা পশুর নদীর দু পাশের সুন্দরবনের দৃশ্য ও সবাই মিলে গল্প করে কাটালাম।মাঝে দুপুরের খাওয়াটা ও শেষ করে নিলাম লঞ্চ এর ডাইনিং এ।
৪টার দিকে আমরা হিরইন পয়েন এ পৌছালাম।


ড়াইনিং এ...
চট্টগ্রাম থেকে সুন্দরবনের হিরইন পয়েন দীর্ঘ ২০-২১ ঘন্টার ভ্রমন । দীর্ঘ এই ভ্রমন শেষে লঞ্চ যখন হিরইন পয়েন ঘাটে ভিড়লো তখন দিনের আলো প্রায় শেষের পথে।নিরাপত্তা জনিত কারণে কাউকে লঞ্চ থেকে নামার অনুমতি দিলেন না শিক্ষকরা। দু পাশে সুন্দরবন আর আমরা নদীর মাঝে,সূর্যের পড়ন্ত আলোয় চারদিকে এক মায়াবী পরিবেশ। সবাই তখন নিশ্চুপ বসে বসে কেবল উপভোগ করছে প্রকৃতি। সূর্যের আলো পশ্চিম আকাশে মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই লঞ্চের বৈদ্যতিক আলো জলে উঠলো আর সাথে সাথেই সবাই ছুঠলো যার যার নির্ধারিত কেবিন এ।কারণ আর কিছুই নই,সবাই মোবাইল চার্জ দিয়ে নিচ্ছিলো। যদি ও হিরইন পয়েন এ আসার অনেক আগে থেকেই কোন মোবাইলেই নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছিলোনা। রাতের আধারে বাইরের কিছুই যেহেতু স্পষ্ট নয়,তাই ঐ দিন লঞ্চের ভিতরে সবাই গানবাজনা আর গল্প করেই কাটিয়ে দিলাম। স্যারেরাও আমাদের সাথে অংশ নিলেন।রাত ৯টার দিকে আমরা রাতের খাবার খেয়ে সবাইকে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর সুযোগ করে দিলাম যাতে পরদিন সূর্যদোয় মিস্ না হয়।তাছাড়া সবাই দীর্ঘ ভ্রমনজনিত ক্লান্তও ছিল।


রাতের আধারে হিরইন পয়েনে ...
৩রা ডিসেম্বর বুধবার, ভোর ৪.৩০ এ ঘুম ভাঙ্গলো।উঠেই কেবিন থেকে বের হয়ে দেখি সবাই প্রায় উঠে গেছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি চারপাশ কুয়াশার চাদরে ঢাকা।তারপর মুখহাত ধুয়ে সবাই যখন তৈরী হয়ে এলো ততোক্ষণে সূর্য পূব আকাশে উকিঁ দেয়া শুরু করছে।

ভোরের আলো ফুটছে...

লঞ্চের সাথে থাকা ইন্জ্ঞিন চালিত নৌকায় করে আমরা ৫০ জন রওনা দিলাম ভোর রাতের সুন্দরবন দেখার উদ্দেশ্যে।
দুই পাশে ঘন বন,গোলপাতা,সুন্দরী সহ আরও অনেক নাম না জানা গাছগাছালি দেখতে দেখতে এগুচ্ছে আমাদের নৌকা।দুই তীরে এবং গাছের ডালে অলস বসে আছে বিভিন্ন জাতের বক ও নাম না জানা পাখিরা।নানান রঙের,নানান সৌন্দর্যের মাছরাঙাগুলোই কেবল ব্যস্ত সময় পার করছিল মাছ শিকার করে। নদীর দুই পাড়ে স্থানীয় জেলেরা ব্যস্ত ছিল তাদের লাগানো জাল থেকে মাছ ছড়ানোতে।আমরা সবাই তখন ব্যস্ত প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য্য অবলোকন করায়।

জেলেদের মাছ ধরা...

এমন সময় হঠাৎ হামিদ স্যার এর চিৎকারে আমরা অবাক হয়! ব্যাপার কি? আর কিছুই না,গাছের ফাঁকে সুন্দরবনের এক মায়াবী হরিণ।আমরা সবাই অবাক চোখে হরিণটাকে দেখছি,ঠিক তেমনি হরিণটিও অবাক হয়ে আমাদের দেখছে! তারপর আবার চিৎকার... আরও হরিণ... অসাধারণ সেই অনুভূতি। আমাদের নেওয়া ডিজিটাল ক্যামরাগুলোর তথ্য ভান্ডার দ্রুত সমৃদ্ধ হচ্ছিল হরিণ,পাখি এবং নাম না জানা অচেনা সব গাছের ছবি তুলে ও ভিড়িও করে। এইভাবে কখন যে সূর্য পূব আকাশে সম্পূর্ণ উঠে গেছে খেয়ালি করেনি কেউ। এরপর আমরা ইন্জ্ঞিন নৌকায় গেলাম হিরইন পয়েন এর জেঠিতে।উদ্দেশ্য হিরইন পয়েন ঘুরে দেখা।হিরইন পয়েন এ ঢোকার মুখেই ছিল বিশ্ব ঐতিয্য ফলক।আগে-পিছে ২জন নিরাপত্তা রক্ষী নিয়ে আমাদের পুরো দলটাই প্রথমবারের মত সুন্দরবনের ভিতরে প্রবেশ করলো। অবশ্য হিরইন পয়েন এ আমরা তেমন কোন প্রাণীই দেখিনি।তবে গানম্যান যখন আমাদের ডেকে বাঘ মামার পায়ের ছাপ দেখালো তখন যে সবার মনে অজানা ভয় এসে ভর করলো তা সবার চোখেমুখেই ভেসে উঠলো।কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর আমরা উঠলাম হিরইন পয়েন এর পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এ। এই টাওয়ারটির বর্তমান অবস্থা খুবই নাজুক।৫ তলা বিশিষ্ট এই টাওয়ার এ ৫ জনের বেশী একসাথে ওঠা নিষেধ।
টাওয়ার এর উপর থেকে তেমন কিছু দেখাও যায়নি।


বিশ্ব ঐতিয্য ফলকের সামনে...
হিরইন পয়েন দেখে লঞ্চ এ ফিরে এসেই সবাই সকালের নাস্তা শেষ করলো।তারপর আমাদের লঞ্চের ক্যাপ্টেন ঘোষণা দিলেন,আমরা হিরইন পয়েন থেকে লঞ্চ ছেড়ে দুবলার চরের উদ্দেশ্যে রওনা করছি।এভাবেই শেষ হলো আমাদের হিরইন পয়েন এর অভিযান। লঞ্চ এখন দুবলার চরের পথে... বাতাসে শুটকির গন্ধ পেয়েই বুঝলাম আমরা দুবলার চরে পৌছে গেছি।দুবলার চরে পৌছাঁলাম তখন সকাল ১০.৩০। সবাই নামলাম।স্যারেরা সময় বেধে দিলেন আধা ঘন্টা।কারণ আমাদের পরের গন্তব্য কটকায় পৌছাতে হবে দ্রুত।


দুবলার চর...
দুবলার চরে নেমেই ছুটে গেলাম শুটকি পরিদর্শনে। নানা জাতের নানা ধরনের শুটকি শুকানো হচ্ছে।সবচেয়ে ভালো লাগলো যখন জানলাম,ওখানে কাজ করা মানুষগুলো বেশীর ভাগই চট্টগ্রাম জেলার।নিজেদের জেলার মানুষ পেয়ে তারাও খুব খুশি, এই সুযোগ এ আমরাও কিছুটা কম দামে শুটকি পেয়ে গেলাম তাদের কাছে!অনেকেই শুটকি কিনলাম আমরা।ফাকেঁ ফাকেঁ ছবি তুলছিল সবাই।বেশ কিছু গ্রুপ ছবি তুললাম।আমার ক্যামেরাও থেমে ছিল না। আরও কিছুক্ষণ এদিক সেদিক হেটেঁ সবাই লঞ্চ এ ফিরে এলাম।এরপর লঞ্চ আবার যাত্রা শুরু করলো কটকার উদ্দেশ্যে।
আবার সেই লঞ্চের একঘেয়ে বটবট আওয়াজ। কিন্তু নদীর দু পাশের প্রকৃতি সেই একঘেয়েমি দূর করে দেয় নিমেষেই।তার সাথে ছাত্রদের গীটারের টুংটাং আওয়াজ ও দরাজ গলায় গাওয়া গান
ওরে..নীল দরিয়া...
আমায়... দে রে দে... ছাড়িয়...
সে এক দারুন অনুভূতি...
এভাবে কখন যে সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো খেয়ালই করিনি।হঠাৎ লঞ্চের হুইসেল এ সম্বিত ফিরে পেলাম সবাই।বুঝতে পারলাম কটকা চলে এসেছি আমরা।
তাড়াতাড়ি দুপুরের খাবার সেরে নিলাম সবাই।তারপর সবাই দ্রুত তৈরী হয়ে নিলাম কটকা ভ্রমনের জন্য।লঞ্চ ঘাটে ভিড়লে ধীরে ধীরে সবাই নেমে পড়লাম কটকার মূল ভূমিতে।শুরু হলো কটকা অভিযান... সুন্দরবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জায়গা কটকা.... লঞ্চ থেকে কটকা ঘাটে নামার পূর্বেই বুঝতে পারলাম কেন কটকা এতো আকর্ষনীয় পর্যটন স্পট।নদীর দু পাশেই ঘন জঙ্গল,তার ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির বানর,পাখি ও হরিণ।আমাদের আসার আওয়াজ পেয়ে তারা লুকাতে থাকে বনের গভীরে।
সবাই নামলাম লঞ্চ থেকে।তারপর স্যারেরা আমাদের ৭টি গ্রুপে ভাগ করে দিলেন,প্রতি গ্রুপে একজন গ্রুপ লিডারও ঠিক করে দিলেন যাতে গ্রুপ লিডার সবার প্রতি নজর রাখতে পারে ।সুন্দরবনের অন্য সব জায়গা থেকে কটকায় অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন এর ব্যাপারে আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল।অতঃপর কটকা অভিযান শুরু...


কটকা প্রবেশ...

সবার সামনে নিরাপত্তা রক্ষী তারপর আমরা এবং সবশেষেও আর একজন নিরাপত্তা রক্ষী,এভাবেই আমরা শুরু করি কটকার অভ্যন্তরে যাত্রা।কটকায় ঢুকার মুখেই পর্যবেক্ষণ টাওয়ার।তাই ৭দলে ভাগ হয়ে আলাদা আলাদা ভাবে টাওয়ার এ উঠলাম। সে এক অসাধারণ দৃশ্য! চারপাশে সবুজ আর তার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে হরিণের দল।আমরা যে হরিণের এত কাছে তা টাওয়ার এ উঠার আগ পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি।ঐ মূহুর্তে সবাইকে প্রকৃতি যেন যাদু করে রেখেছিল তার সৌন্দর্য দিয়ে। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে নেমে সবাই বনের গভীরে রওনা দিলাম। কারও মুখে আওয়াজ নেই... নিঃশব্দ... যেন সবাই বাকহারা...
আসলে সবাই চুপ করেছিল হরিণের দল যাতে পালিয়ে না যায় সেজন্য।
হরিণগুলো দলবল সহ ঘুরছিল ।কিন্ত যখনই আমাদের অস্থিত্ব বুঝতে পেলো তখন পালিয়ে গেলো এদিক সেদিক...কিন্তু পালালে কি হবে আমাদের ক্যামেরাগুলোর শক্তিশালী লেন্স ঠিকই তাদের বন্দি করে ফেলেছে ! ততোক্ষণে আমাদের ছাত্রদের দলগুলো মিলেমিশে একাকার।যে যার মত উপভোগ করতে লাগলো এইসব দূর্লভ দৃশ্য।অবশ্য দল ভাঙ্গলেও আমরা সবাই একত্রে ছিলাম সবসময়।তাই স্যারেরাও তেমন বাধাঁ দিলেন না।


হরিণ দর্শন...
এভাবে প্রকৃতি ও হরিণ দেখতে দেখতে কখন যে আমরা গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করেছি বুঝতেই পারিনি। যখন খেয়াল করলাম দেখি দু পাশেই ঘন জঙ্গল। হাজারো গাছ। একটু ভালোভাবে খেয়াল করতেই দেখলাম শত শত ভাঙ্গাঁ গাছ।
ঘূর্ণিঝড় সিডরের তান্ডব। সিডর এর ভয়াবহ তান্ডব থেকে পুরো দেশকে রক্ষা করতে সুন্দরবন নিজেকে বিলিয়ে কীভাবে দেশকে রক্ষা করেছে তা নিজে না দেখলে বোঝা অবিশ্বাস্য...! কিন্তু আশার কথা আবারও জেগে উঠেছে সুন্দরবন । নতুন নতুন গাছগাছালিতে ভরে উঠেছে পুরো সুন্দরবন।যেন এই শীতেই বসন্তের আগমন শোনাচ্ছে সুন্দরবন।সুন্দরবনের এই নতুন জাগরণ সুন্দরবনকে নিয়ে গেছে অন্য এক মাত্রায়।তাই এখনকার সুন্দরবন আগের চেয়ে আরও বেশী সুন্দর,আরও বেশী আকর্ষনীয়।

সিডরের তান্ডব...

আমরা এগিয়ে চলছি ঘন জঙ্গলের মধ্যখান দিয়ে.... দুপাশে হাজারো গাছ,নানা প্রজাতির পাখির আওয়াজ এবং গাইডের মুখে বাঘের লোমহর্ষক ঘটনা শুনতে শুনতে আমরা এগুচ্ছি ঘন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে।
সবাই চুপচাপ,অজানা আতংক মনে, কখন আবার বাঘ মামার শিকার হতে হয় ! হঠাৎ শো শো গর্জন কানে এলো...বাঘ যেন ছুটে আসছে এইদিকে !!
তারপরেও সবাই এগিয়ে যায় সামনের দিকে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠে গর্জন।হঠাৎ করেই পুরো দৃশ্যপঠ বদলে গেল!! সুন্দরবন তার রূপ যেন বদলে ফেললো নিমেষেই।আমাদের সামনে এখন বিশাল জলরাশি।সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে সুন্দরবনের উপর।সে এক অন্যরকম সৌন্দর্য্য,ভাষায় প্রকাশ করার নয়।সাগর জীবনে অনেকবার দেখেছি কিন্তু এমন ভাবে আর কখনো আমার চোখে ধরা পড়েনি।সবাই সাগর দেখে যেন পাগল হয়ে গেল।এতক্ষণের একতাবদ্ধ দলটি ভেঙ্গে,সবাই ছোটাছুটি শুরু করলো।
কেউ গেল পানিতে,কেউ শামুক কুড়াতে,কেউবা গলা ছেড়ে গান ধরলো।


কটকা সমুদ্র সৈকত...
সংবিৎ ফিরে পেলাম যখন গার্ড জানালো ২০০৪ এর এক মর্মান্তিক ঘটনা। ১১ জন ছাত্র-ছাত্রীর পানিতে মৃত্যুবরনের ঘটনা শুনে স্যাররা সবাইকে সাবধান করে দিলেন। এমন সময় দূর থেকে এক ছাত্রের চিৎকারে পরিবেশ আরও ভীতিকর হয়ে উঠে।কাছে গিয়ে দেখি তরতাজা বাঘের পায়ের ছাপ।একটা-দুটা নয় অনেকগুলো।
গার্ড এগিয়ে এসে এই ছাপ পর্যবেক্ষণ শেষে ঘোষণা করলো এই ছাপ অল্প কিছুক্ষণ আগের।কারণ সমুদ্রের পাড়ের প্রচুর বাতাসে বালিতে এই ছাপ আধা ঘন্টার বেশি থাকেনা।আরও বললো অন্তত দুইটি বাঘ এসেছিল।

বাঘের পায়ের চাপ...
আমাদের অবস্থা হলো তখন দেখার মতো।সবাই যেন বাঘ মামার গন্ধ পাচ্ছিলো।এই বুঝি বাঘ মামা এলো!
কিছুক্ষণ পর গার্ডদের পীড়াপীড়ি ও শেষে স্যারদের নির্দেশে আমরা পূণরায় জঙ্গল পার হয়ে ফিরে এলাম লঞ্চে।শেষ হলো সুন্দরবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিযান।আমরা তৈরী হতে থাকলাম পরের দিনের কারমজল অভিযানের জন্য.... সকালে ঘুম ভাঙ্গলো লঞ্চের ভটভট আওয়াজে... উঠেই দেখি লঞ্চ করামজলের উদ্দ্যেশে রওনা দিয়েছে ভোর রাতেই।লঞ্চের পিছনে গিয়ে দেখি কটকা এখনো দেখা যাচ্ছে।মনটা খারাপ হয়ে গেল,প্রিয় কটকা থেকে বিদায় নেওয়া হলোনা বলে।করামজল কটকা থেকে দীর্ঘ ৬-৭ ঘন্টার ভ্রমন
এই দীর্ঘ সময় খুবই আনন্দে কাটালাম আমরা সবাই মিলে।ছোটখাট একটা অনুষ্ঠান হয়ে গেল লঞ্চের ছাদে,যাতে ছাত্র-শিক্ষক সবাই অংশগ্রহন করলো।
গান,কৌতুক,অভিনয় সবই ছিল...

অভিনয়ের একাংশ...


পুরস্কার বিতরণ...

এভাবে কখন যে দিন কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।বিকেল নাগাদ আমরা করামজল পৌছালাম। করামজল আসলে একটা সাফারী পার্ক বলা চলে।এখানে ঢোকার মুখেই সুন্দরবনের একটা বিশাল মানচিত্র।পাশেই আছে বাঘ মামার কঙ্কাল, কুমিরের ডিম ইত্যাদি। একটু সামনে এগুতেই দেখি হরিণ।হরিণগুলো সুন্দরবনের বন্য হরিণের মতো পালালোনা খাবারের লোভে।উম্মুক্ত বানরগুলো খুব মজা দিল সবাইকে। এরপর সবাই ঢুকলাম বনের গভীরে অবশ্য কটকার মতো নয় এখানে বন বিভাগের বানানো সুদৃশ্য পথে আমরা রওনা হলাম ভিতরে। এখানে দেখার তেমন কিছু নাই, তবে গাছের গায়ে নাম লেখা থাকায় গাছগুলো চিনতে পারলাম সবাই।

বনের গহীনে বন্ধুর সাথে আমি...
বন থেকে বের হয়ে গেলাম কুমিরের প্রজনন কেন্দ্র দেখতে।এখানে একটা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে যেখান থেকে পুরো করামজল দৃশ্যমান।অবশেষে সব দেখা শেষে সবাই ফিরে এলো লঞ্চেআসার সময় অবশ্য সবাই সুন্দরবনের মধু কিনতে ভুল করলোনা।
অতঃপর শেষ হলো আমাদের সুন্দরবন ভ্রমন...

বিদায় সুন্দরবন...
গত ৫দিনের সুখ স্মৃতি নিয়ে সবাই রওনা হলাম নিজ গন্ত্যব্যে।
tayub লেখক আবু তৈয়ব
Prothom-alo Blog

Friday, November 12, 2010

পর্যটক হিসাবে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের দেখা

পর্যটক হিসাবে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের দেখা

পর্যটক হিসাবে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের দেখা পেয়েছেন তেমন লোক হাতে গোনা যাবে। আর খপ্পরে পড়েছেন? নাহ্, আমি অন্তত তেমন কিছু শুনিনি কোনদিন। তবে, যতবার গিয়েছি আশেপাশের কেউ তার শিকার হয়েছেন সেকথা শুনেছি প্রতিবার। কখনও লাশ ফিরিয়ে আনা গেছে, কখনও পাওয়া যায়নি। এই যেমন, এবারে তিন জনকে বাঘে ধরার খবর শুনেছি, তিনটাই ছিলো টাটকা। দুজনের লাশ ফিরিয়ে আনা গেছে আর একজনকে আহত অবস্থায়। একটা করে খবর আসে আর আমাদের বাপ্পিদা ফোনে সংবাদ পাঠান, পরদিনের দৈনিকে টাটকা খবর হিসাবে। শেষেরটা ছিলো ভয়াবহ। গামছায় ভরে ছিন্নভিন্ন দেহ বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সেই ট্রলার এসেছে মাঝনদীতে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে আটকে থাকা আমাদের উদ্ধার করতে, ট্রলারের মাঝির লাশদেখে বমি করে দেবার দাগটুকু মোছার আগেই।এবারের ঘোরাঘুরিটা এরকম অনেক কারনেই মনে দাগ কেটে থাকবে আজীবন। গিয়েছিলাম দুবলার চরের রাসমেলা দেখতে। কত শুনেছি এই রাসমেলার কথা। অথচ সেখানে পৌঁছে পূজার আগেই ফিরে এসেছি আশাহত হয়ে। আসলে সুন্দরবন দেখতে হলে সুন্দরবনে থাকাই ভালো।প্রচলিত ধারার ট্যূর কোম্পানীর সাথে বেড়াতে যেয়ে সুন্দরবনের মজা কতটুকু পাওয়া যায়, তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে আমার। মানে আরাম পাইনি কোনদিন। অনেক নিয়মের বেড়াজালে নৌকা ভ্রমনটাইপের একটা ব্যাপার ঘটে সেখানে। তাই গুগুল ম্যাপের কল্যানে প্রতিবারই নুতন জায়গা খুঁজে বের করে সেদিকে ঘুরে আসার ভেতর যে রোমাঞ্চ, তার প্রতি আগ্রহটাই বেশি আমার।

ভয়, উৎকন্ঠা, সাহস আর রোমাঞ্চপ্রিয়তার এক চুড়ান্ত ঘটনার কথা আজ শুনাবো আপনাদের। সুন্দরবনের হিরনপয়েন্ট পুরো বনএলাকার বনেদী অঞ্চলগুলোর অন্যতম। ভারতীয় সীমান্ত থেকে ২৫ মাইল পূবে সুন্দরবনের দক্ষিণে হিরনপয়েন্টে ফরেস্ট অফিস ছাড়াও মংলা পোর্টের শাখা অফিস আর নৌবাহিনীর ডেরা আছে সেখানে। ফরেস্ট অফিসের উত্তরে নদীর ঠিক ওপারে বনটার নাম কেওড়াশুটি, সম্ভবত প্রচুর কেওড়া গাছ আছে বলেই। চারদিকে নদীঘেরা পূবে পশ্চিমে দুমাইল আর উত্তর দক্ষিণে আধামাইলের কিছু বেশী জায়গাটা গুগুলে খুঁটিয়ে দেখতে যেয়ে কিছু বিশেষত্ব খুঁজে পেলাম। যেমন ধরেন, এর মাঝখানে একটা অংশে গাছপালার পরিমান কিছুটা কম, ভেতরে একটা মিঠা পানির পুকুরের মতন আছে এসব। যার সবগুলোই আসলে প্রমান করে ভেতরে প্রচুর হরিনের অবস্থান আর অবধারিত ভাবেই বাঘের উপস্থিতি। ট্যুর কোম্পানীগুলো এসব স্থান এড়িয়ে চলে, এমনকি আমাদের বাপ্পিদাও প্রথম প্রথম নিমরাজি ছিলেন। আমাদের, বিশেষ করে আমার অটল সিদ্বান্তের কারনেই শেষপর্যন্ত এবারের সুন্দরবনযাত্রার প্রথম ভোরে নাস্তা সারবার আগেই ঘন্টা দুয়েকের জন্য ভেতরে এ জায়গায় যাবার অনুমতি দিলেন। আমার বেশ ক’বার বনযাত্রায় যত জায়গা দেখেছি আর যত ছবি তুলেছি তার ভেতরে সবচাইতে সুন্দর যায়গা আর ছবিগুলো এখানকারই।

সেখান থেকে ফিরে এসে সিদ্বান্ত নিলাম দুবলারচরে অবস্থানের সময় কমিয়ে এনে পরদিন বিকেলে আবারো এ জায়গাটাতে আরেকটু বেশী সময় কাটিয়ে যাবো। দুবলারচর থেকে তাই মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগেই দুপুরের দিকে হিরনপয়েন্টের দিকে ফিরতি যাত্রা করলাম। ততক্ষণে ভাটা নেমে এসেছে। হিরনপয়েন্টের প্রায় দুকিলোমিটার দূরে থাকতেই পানির অস্বাভাবিক কমে যাওয়া খেয়াল করছিলাম, আরেকটু কাছে আসতেই আমাদের ট্রলার বালুতে আটকে গেল। নীচের ঢেউ দেখে বোঝার উপায় নেই যে পানি এখানে মাত্র দু / আড়াইফিট। হিসাব করে দেখলাম পরবর্তী জোয়ার আসতে আসতে আরো প্রায় তিন ঘন্টা লাগবে, তাই নেমে গেলাম পানিতে। হিরনপয়েন্টের ওপারের জায়গাটায় হেঁটে যেতে হলে গলা পানি ভাংতে হবে। তাতে সময় বেশী লাগবে আর ক্যামেরাও ভিজে যেতে পারে সেই চিন্তায় নুতন প্ল্যান করলাম। আমরা যেখানে নেমেছি সেখান থেকে সোজা হেঁটে ভেজা বালুর চর পেরিয়ে অল্প একটু কেওড়া আর গর্জনের বন পেরুলেই পৌঁছে যাবো ঐ তিন অফিসের পেছনের ঘন ছন গাছে ছাওয়া বিশাল মাঠের কিনারে। সেখান থেকে মাঠের মাঝদিয়ে ছোট্ট একটা মিঠাপানির জলার পাশদিয়ে পরিত্যাক্ত হেলিপেড পাড়ি দিলেই ছোট্ট মাটির রাস্তা বেয়ে ফরেস্ট অফিসের পুকুর। ঘুরতে ঘুরতে ছবি তুলতে তুলতে সেখানে পৌঁছাতে আড়াইঘন্টার বেশী লাগবার কথা নয়। আমরা পাঁচ সহযাত্রী বনের কাছাকাছি আসতেই রাইফেল হাতে এমদাদ আর রেজাউল নেমে এলেন। পানিতে নেমেছিলাম বলে সবার পা খালি। বনের কাছাকাছি বালুতে ছোট ছোট ঘাস, পায়ে কাটার মত বিঁধে। এরমাঝে শ্বাসমূল, এগুলোর খোঁচাও পায়ে লাগে। অনেকদূর যেতে হবে এই কষ্ট গায়ে মেখে। আমাদের দুজন তাই নৌকায় ফিরে গেলো। আমরা হাঁটছি সাবধানে। খুবকাছে দিয়ে হরিণ ছুটে যায়, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি, ছবি তুলি একটা দুটো। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বনের প্রান্তে। এমদাদ আরেকপ্রস্থ বনের নিয়ম স্মরণ করিয়ে দিলো সবাইকে। সমূহ বিপদের কথা মাথায় রেখে রেজাউল তার রাইফেল তৈরী রাখলো। কেওড়া বনে হালকা পানি, কাদাও আছে। আমার সামনে এমদাদ, পেছনে অন্যরা, সবশেষে রেজাউল। এমদাদ যেখানে পা ফেলে আমিও সেখানে, তাতে কাঁটা ফোটার সম্ভাবনা কম। একশ মিটার পেরোতে আধঘন্টা পেরিয়ে গেলো, সামনে হাতদশেক জুড়ে কাঁটা গাছ আর ঘাস, হাতখানিক লম্বা, অবশেষে ছনে ঢাকা মাঠ। ডানদিকে পোর্ট অফিসের দোতলার ছাঁদ দেখা যায়। উপরদিকে তাকালে টাওয়ার। দুদিন আগেও ছন বাগানের ওদিকটাতে এসেছিলাম একবার, সেদিকে ছেঁটে ফেলায় ছন গাছ দেখাচ্ছিলো ঘাসের মতন। কিন্তু এদিকে ছনের আগা মাথা ছুঁয়ে যায়। কয়েকপা এগিয়ে ডাকলাম ‘এমদাদ’। আমার দিকে ঘুরে মনের কথা পড়ে ফেললো সে। বললো, ‘ঠিকই বস্, এখান দিয়ে যাওয়া নিরাপদ না’। হিরনপয়েন্ট এলেও এমদাদ এদিকে আসেনি। আমার গুগুল জ্ঞান আর এমদাদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে ঠিক করলাম ছনের বন আর কাঁটা গাছের পাশদিয়ে পশ্চিমে হেঁটে মিঠা পানির জায়গাটার পাশদিয়ে পরিত্যাক্ত হেলিপ্যাড দিয়ে উত্তরে উঠবো আমরা। সে অনূযায়ী ঘুরে বেড়িয়ে এলাম, রেজাউল সহ আমাদের একজন তখনও কাঁটা গাছ পেরোচ্ছে পায়ে কাঁটা বিঁধিয়ে। আমার আরেক সহযাত্রী বললো ‘সামনে হরিণ পাওয়া যেতে পারে, টেলি লেন্সটা লাগিয়ে নিই’। সামনে হাতপাঁচেক দূরে কয়েকহাত খোলা জায়গার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম ‘সেখানে যেয়ে করেন’। সেখানে পৌঁছে যেইনা সে নিচু হয়েছে অমনি রক্ত হিম করা ভয়ঙ্কর সে ডাক। আমাদের বামে দশহাতের ভেতর একদেড় হাত উঁচু কাঁটা আর ঘাসের ভেতর থেকে।

মূহুর্তের ভেতর অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেলো একসাথে। এমদাদ ‘এলাট’ বলে (এলার্ট নয়) চিৎকার দিয়ে রাইফেল কক্‌ করে হাটু ভেঙ্গে বামে তাক করে বসলো। আমার বামহাতে ক্যামেরা বামদিকেই তাক করা ছিলো, তাতে ডান হাতের চাপে ছবি উঠলো, আমার পাশের জন একহাতে ক্যামেরা আর অন্য হাতে লেন্স নিয়ে চট করে বসে গেলো। পেছনের দুজন কাছাকাছি ঘেসে দাঁড়ালো আর রেজাউলের রাইফেল নিরবে ঘুরে গেলো শব্দের উৎসের দিকে। কি যেনো দেখলাম মনে হয় নড়ে উঠলো, এরপর চারদিক নিঃশব্দ, কোন আওয়াজ নেই কোথাও। বাতাসও মনে হলো থেমে আছে, শুধু শব্দের উৎসের কাছে ছোট একটা কাঁটা গাছ আস্তে আস্তে দুলতে দুলতে থেমে গেলো। নিরবতা ভেঙ্গে এমদাদ বলে উঠলো চলে গেছে, তাড়াতাড়ি হাঁটেন। ক্যামেরার স্ক্রীনে তাকালাম, দশহাত দূরে গোলপাতা আর সামনে কিছু কাঁটা গাছ আর ঘাসের ছবি। সামনের মাটিতে টাটকা পায়ের ছাপ অভিজ্ঞ এমদাদের চোখ বলে পূর্নবয়স্ক পুরুষ বাঘ এটি, উচ্চতা সাড়েতিন ফুটের কাছাকাছি। অথচ এত ছোট ঘাসের মাঝে নিজেকে এমন ভাবে লুকিয়ে রেখেছিলো আমাদের কারো চোখে পড়েনি।

আর কোন সমস্যা ছাড়াই চলে এলাম ফরেস্ট অফিসে, ছন বনের জলায় মাছ ধরতে থাকা পোর্টের দুজনও চলে এলো আমাদের পিছুপিছু।

...............
স্থানীয় সবাই অভিজ্ঞতার পুরো বিবরণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শোনার পর ঘটনার আকার দাঁড়িয়েছে এরকম...

বালুর মাঠ থেকে বনে আমাদের ঢুকতে দেখে বাঘ আক্রমনের সিদ্বান্ত নেয়। কাউকে বা কিছু আক্রমন করতে গেলে বাঘ অনেক্ষণ ধরে সেটা অনুসরণ করে আচার আচরন খেয়াল করে এরপর আক্রমনের স্থান নির্ধারন করে ওৎ পেতে থাকে। আমরা যখন বনে আস্তে আস্তে হাঁটছি সেসময় সে আমাদের আচরন খেয়াল করে টার্গেট ঠিক করে সেখানে ওৎ পেতে ছিলো। কোন কারনে টার্গেটের অস্বাভাবিক কোন আচরনে বাঘ, বিশেষত রয়েল বেঙ্গল টাইগার তার আক্রমনের সিদ্বান্ত পরিবর্তন করে।

আমাদের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে তিনটি বিষয়, প্রথমত বনে আমরা আস্তে হেঁটেছি কিন্তু বন পেরিয়ে একটু জোরে, দ্বিতীয়ত একবার ঘন উঁচু ছনবনে ঢুকেও আমাদের বেরিয়ে আসা, তৃতীয় কারনটা আমার সাথে থাকা ক্যামেরার লেন্স বদলাতে যাওয়া সহযাত্রী, বেশীরভাগের ধারনা বাঘের টার্গেট ছিলো সে এবং বাঘ লাফ দেবার চুড়ান্ত মুহুর্তে সে লেন্স বদলাতে যেয়ে বসে যাওয়াতেই বাঘ হালকা গর্জন করে বিরক্তি প্রকাশ করে সরে গেয়েছে। তাদের মতামত বাঘ যদি আক্রমনের মুডে না থাকতো তাহলে এত বড় বাঘ অবশ্যই আমাদের নজরে আসতো।
By -Spiritual touch মুস্তাফিজ
www.flicker.com

Wednesday, November 10, 2010

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা সুন্দরবন রক্ষা করে চলেছে তাদের নেই ঝুঁকি ভাতা, রয়েছে লোকবল ও জলযান সংকট

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা সুন্দরবন রক্ষা করে চলেছে তাদের নেই ঝুঁকি ভাতা, রয়েছে লোকবল ও জলযান সংকট

Abu Hossain Sumon
November 22, 2010, 3:30 am
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা সুন্দরবন সংরক্ষণ করার দায়িত্ব পালন করে তাদের কোন ঝুঁকি ভাতা নেই। নেই যাতায়াতের সুব্যবস্থা। দুর্গম অঞ্চলের বেশির ভাগ লোকজনই থাকেন মারাত্মক ঝুঁকিতে। রয়েছে হিংস্র প্রাণীর ভয়। তার ওপরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সব মিলে দুর্বিষহ এক জীবন যাপন তাদের। এই বন সংরক্ষনকারীদের নূন্যতম চাহিদাটুকুও পূরণ হয় না তাদের বেতন-ভাতায়।

সুন্দরবন ঘুরে বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা শুধু বেতনই পান। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করেও ঝুঁকি ভাতা পান না। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে এই বন সংরক্ষণকারীদের হিল এলাউন্স রয়েছে। যদিও পার্বত্য এলাকার চেয়ে অনেক বেশি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সুন্দরবন। অসংখ্য নদী-খাল দিয়ে ঘেরা সুন্দরবন পাহার দেয়ার জন্য যে পরিমাণ নৌযানের প্রয়োজন সেই পরিমান নৌকা নেই তাদের।

একটা বিট অফিসে মাত্র ৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। আর ক্যাম্পগুলোতে ৩ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। কিন্তু এই ক্যাম্প, বিট ও রেঞ্জ অফিসের আওতায় রয়েছে বনের বিশাল এলাকা। বনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা পাহারা দিতে অন্তত ১০ হাজার লোকবলের প্রয়োজন। কিন্তু গোটা সুন্দরবন সংরক্ষণ করছে মাত্র ১ হাজার লোকবল।

পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ সাহাবুদ্দিন বলেন, চাঁদপাই রেঞ্জের আওতায় ৪টি ষ্টেশন ও ২১টি টহল ফাঁড়িতে কর্মরত লোকবলের সংখ্যা ২'শ। কিন্তু এ রেঞ্জের প্রায় ১ লাখ হেক্টরের বিশাল সুন্দরবনে কম হলেও ৩ শতাধিক জনবলের প্রয়োজন। এছাড়া প্রতিটি টহল ফাঁড়িতে ২টি করে ট্রলার ও ১টি করে ডিঙ্গি নৌকার প্রয়োজন থাকলে ২১টির মধ্যে ১০টিতেই কোন জলযান নেই। আর যে সকল ষ্টেশন ও ক্যাস্পে ১টি করে ট্রলার রয়েছে সেগুলোতে রয়েছে তীব্র জ্বালানী সংকট। প্রতি মাসে ১টি ট্রলারের বিপরীতে সাড়ে ৩শ থেকে ৫শ লিটার জ্বালানী তেলের চাহিদা থাকলেও কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করে থাকে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ লিটার। সুন্দরবনের একটি ষ্টেশনে ১৫ জন আর একটি টহল ফাঁড়িতে ৮ জন করে লোক থাকার কথা থাকলেও রয়েছে অর্ধেক। একজন বনরক্ষীর বেতন ২ হাজার টাকা। দুর্গম এলাকায় যারা আছেন তাদের খাবার খেতেই দেড় হাজার টাকার ওপর খরচ হয়। বেশির ভাগ বন প্রহরী তাদের বাড়ীতে কোন টাকা পাঠাতে পারে না।

কয়েকজন বন কর্মচারী বলেন, যে বেতন পাই তাতে নিজেদেরই চলে না- সংসার চালব কি করে। আমাদের যদি ঝুঁকি ভাতা থাকত, স্যালাইন ভাতা ও রেশন দেয়া হতো তাহলে বনজ সম্পদ রক্ষা ও গাছ চোরদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করতাম। কেউ কোন গাছ কাটতে পারত না। আমাদের একজন বনরক্ষী আবু সাইদ সিডরের আঘাতে মারা গেছেন। তাকে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে চাঁদা তুলে। সরকারীভাবে তার জন্য কিছুই করা হয়নি। দেয়া হয়নি তার পরিবারকে আর্থিক কোন সুবিধা। যে চাকরিতে জীবনের নিরাপত্তা প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন সেই চাকরি করে আমাদের কোন সঞ্চয় থাকেনা।

এমনও জায়গা আছে যেখান থেকে মংলা বা খুলনা আসাতে ১১ থেকে ১৩ ঘন্টা সময় লেগে যায়। এই যাতায়াতের জন্য বন সংরক্ষকদের অনেক টাকা লাগে। বনকে রক্ষা করতে বনবিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আকর্ষনীয় বেতন ভাতা দিতে হবে। চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা সাহাবুদ্দিন আরো বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনের বিভিন্ন ষ্টেশন ও টহল ফাঁড়িগুলোতে যারা কর্মরত রয়েছেন তাদের অধিকাংশই পঞ্চাশোর্ধ। ফলে বনের দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। দীর্ঘ বছরের পর বছর বনবিভাগে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ না থাকায় যারা কর্মরত আছেন তারা অনেকটা ঠেকেই দায় এড়াচ্ছেন। এ সকল সমস্যা নিরসনে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছেন ভুক্তভোগী বন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

এমনই এক পরিস্থিতির মধ্যে সুন্দরবন সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুগের পর যুগ চলে আসছে। এখান থেকে উত্তরনের কোন পদক্ষেপ রাজনৈতিক সরকারগুলো নেয়নি।

Source: www.bangladeshfirst.com

Tuesday, November 9, 2010

সাকিন সুন্দরবন

সাকিন সুন্দরবন
- মাহবুব লীলেন

- দেও দিকিনি। এইটাতে কিছু চার দেও তো

বাপ্পী ভাই একটা গামলা ছুঁড়ে মারল লোকটার নৌকায়। গামলাটা তার কোলের কাছে পড়লেও অনেকক্ষণ সেদিকে তাকালই না লোকটা। হাঁটুতে মাথা গুঁজে থাকলেও বাপ্পী ভাইর তার দিকে তাকিয়ে থাকা অনুভব করছিল সে। এবার বাপ্পী ভাইর দিকে তাকিয়ে গামলাটা টেনে নিজের গামলা থেকে বেছে বেছে কেজি দেড়েক চিংড়ি আর বারোয়ারি মাছ তুলে দিয়ে বাপ্পী ভাইর হাতে দেবার জন্য যখন উঠে দাঁড়াল তখনই- অ্যাহ। এইটাতে কী হবে? ওর ওখান থেকেও কিছু দেও...

লোকটা হাত গুটিয়ে বসে পড়ার আগেই আমরা তাকে গামলা ধরে পোজ দিতে বললাম। জেলের হাতে তরতাজা মাছ। দারুণ সমৃদ্ধির প্রতীক... ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে দিয়ে ছবির পোজ দেয়ালাম। তারপর ছেড়ে দিলে লোকটা নিজের জায়গায় বসে গামলাটা নৌকার ভেতর দিয়ে ঠেলে দিল অন্য গলুইয়ে বসা গোঁয়ার ছেলেটার দিকে- দ্যাও। কী দেবা দেও। স্যাররা কিছু চার চায়...

একটু পরে আরো কিছু মাছ নিয়ে গামলাটা তিন মাথার কাছে ফিরে এলে সে বাড়িয়ে দিলো বাপ্পী ভাইকে। খেঁকিয়ে উঠল বাপ্পী ভাই- কী দিলা এইসব? আরো কিছু দেও। আমারাও তো মাছ ধরব...

লোকটা নিজের গামলা থেকে আরো কয়েকটা মাছ তুলে দিলো আমাদের গামলায়। বাপ্পী ভাই অতগুলা মানুষের মাছ ধরার জন্য আরো কিছু চার চায়। লোকটা এবার আর নড়ে না। আমাদের গামলা আর তার নিজের গামলার দিকে তাককায়। তার গামলায় টোপের পরিমাণ আমাদের গামলার অর্ধেক। লোকটা মরিয়া হয়ে উঠে আতঙ্কে- স্যার। আর দিলি আমাগের চার হবে না স্যার...

বহুক্ষণ সে আর নিজের বঁড়শিগুলোতে চার গাঁথার সুযোগই পায় না। নৌকা সামনে নিয়ে- পেছনে ঠেলে- সোজা-ব্যাঁকা বানিয়ে চাহিদামতো পোজ দিতে থাকে আমাদের ছবির...

- মাছ নাই তোমাদের সাথে?
সুন্দরবনের মাঝির বৈঠাধরা হাতও কি কেঁপে উঠে এবার?

লোকটা চমকে উঠে একটা হাসি দেয় শুধু
- কই দেখি। কী মাছ দেখাও তো?

লোকটা মুখের বঁড়শিগাঁথা হা-টাকে আরো বড়ো করে এবার- এই নৌকায় নাই স্যার। পেছনের নৌকায়
- ওরা কই?
- এখানেই আসবে স্যার...

ওর কাছ থেকে পাওয়ার মতো সবগুলো ফ্রেম শেষ হয়ে যাওয়ায় ফটোগ্রাফাররা ওকে ছাড়ে আর আর বাপ্পী ভাইর চোখ পড়ে আইলাভাঙা ফরেস্ট ছাউনির দিকে- এই ওহাব। যা তো দেখি ওখান থেকে কিছু জ্বালানি কাঠ নিয়ে আয়

ওহাব কুড়াল নিয়ে ছাউনির আড়াল থেকে একটা ঘুণে ধরা শুকনো খুঁটি ভেঙে নিয়ে আসে
- বাড়া একটা ভূতে চুদা তুই। কী নিয়া আসছিস এইটা?

- মাছ কোন নৌকায়?

কেউ উত্তর দেয় না। তিনমাথা নতুন নৌকায় ইশারা দেয়। একটা ছেলে নামে। দীর্ঘ সুঠাম আর টানটান। কালো টিশার্টের নিচে প্রায় স্কিনটাইট একটা শর্টস। ছেলেটা কাছে এলে তিনমাথা কানে কানে কিছু বলে। একটা গামলা নিয়ে ছেলেটা এগিয়ে যায় বিড়ালের পাশে ভেড়ানো অন্য নৌকার দিকে...

শুনেছি বাঘের গতিকে ক্ষিপ্রগতি বলে। গামলা হাতে ছেলেটা যখন ঝপাস ঝপাস পানি ভেঙে এগোচ্ছিল তখন একবারও মনে হয়নি তার পায়ের নিচে পা কামড়ানো কাদাও আছে হাঁটু সমান। একটু সামনে ঝুঁকে ছেলেটার এগিয়ে যাওয়া আমাকে মনে করিয়ে দেয় ছোটবেলায় পড়া গালিভারের গল্প। আমি পরিষ্কার দেখি বিপক্ষ দেশের যুদ্ধ জাহাজগুলোকে সুতায় বেঁধে হাঁটুপানি সমান সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে গালিভার। সুন্দরবনের সব নদীই এই টানটান ছেলের হাঁটুপানি সমান...

কিন্তু বিড়াল নৌকার পাশে গিয়ে হঠাৎ ছেলেটা তিনমাথা হয়ে যায়। শরীরটাকে মুচড়ে কুঁকড়ে গামলা হাতে ঢুকে পড়ে ছইয়ের ভেতর

কিছুক্ষণ পর গামলাসহ একটা হাত বের হয় নৌকার বাইরে। হাত দেড়েক লম্বা চারটা আইড় জাতীয় লোনাপানির মাছ। দুই থেকে আড়াই কেজি ওজন একেকটা অনুমান। বরফের বাষ্প উড়ছে মাছগুলো থেকে। খোলের ভেতরে বরফ দিয়ে রাখ ছিল মাছগুলো

- এইটা কী দিলা। অতগুলান মানুষ আমরা...
ছেলেটা বের হতে হতে আবার ঢুকে যায়। আরেকটু বড়ো সাইজের আরেকটা মাছ রাখে গামলায়। সেখানে বসেছিল আরেকজন। একটু মোটাসোটা কিন্তু চেহারা সেই তিন মাথাওয়ালার। কিছুই দেখছিল না সে অতক্ষণ। এবার কোঁকিয়ে উঠে- স্যার মাছ পাই নাই তেমন। মাহাজনের ট্রলার আসলি দিতি পারব না কিছুই...

ঠিক তখনই কেউ আবিষ্কার করে বিনিমাগনায় মাছগুলো উঠছে আমাদের ট্রলারে...

- এই মাছগুলোর দাম কত?

বোকার মতো তাকায় মোটা তিনমাথা। গামলাটা সেখানেই রেখে সেই ছেলেটা ঝপঝপ পানি ভেঙে আবার চলে গেছে নিজের নৌকায়। কিন্তু মাছের দাম বলে না কেউ
- এই মাছ আমরা খাবো না। বলেন মাছের দাম কত?
- আপনারা এইসবে নাক গলান কেন? পয়সা দিতে হলে আমি দেবো। আপনারা আপনাদের ছবি তোলেন

নেংটি পরা শরীরের উপর আধা সেকেন্ডের জন্য ঝিলিক দিয়ে চোখদুটো আবার মরা ইলিশের চোখ হয়ে যায়। হাতদুটোকে জোড়হাতে মাপ চাওয়ার মতো প্রশ্নকারীর দিকে তুলে মুখ খোলে- না না দাদ-দাদ-দাম ককককিসের? এই মাছ আপনাগের পাপ-পাপ-পাওনা। ফফফরেস্টারের পাপ-পাওনা এই মাছ

হয়ত বা লোকটা এমনিতেই তোতলা। অথবা তোতলাচ্ছে সে। তোতলাতে তোতলাতেই যোগ করল- এই মাছের দাম নেয়া তাদের জন্য পাপ। তারা গিয়ে মহাজনকে বলবে আমাদের মাছ দেয়ার কথা। কারণ ফরেস্টের লোক হিসেবে এই মাছ আমাদের পাওনা...

মাছের দাম নেয়া পাপ। সততার এই শব্দগুলো শুনতে পায় সবাই। কারো ফ্রেমেই ধরা পড়ে না দাম জিজ্ঞেস করার সময় জেলেটার দিকে বাঘের চোখ রাঙানি করা দুইজোড়া চোখের ছবি। ফরেস্টারের কাছে টাকা চাইলে সুন্দরবনে জেলের জীবন কতটা পানির নিচে ডুবতে পারে জেলেটার সেই ভয় পড়তেও পারে না কেউ। জানতেও পারে না ওজন করে ট্রলারে তুলে দেবার আগে পর্যন্ত কোনো মাছের হিসাবই উঠে না মহাজনের খাতায়। এই মাছ দাদনে বান্ধা খাওয়া জেলের বাঘ- কুমির- কামটের ঘর থেকে তুলে আনা মাছ। এই মাছ দিয়ে দাদনের দায় শোধ হয় তার...

....

আগেরদিন লুকিয়ে রাখা আধা বোতল ভদকায় পানি ঢেলে এক পেগ করে খেয়ে আমরা অপেক্ষা করতে থাকি রান্নার। খাবার তৈরি হলে ভাতের সাথে আসে সব্জি। সবজির সাথে আঙুল সাইজের চিংড়ি। ছোটমাছ। আমরা খাই। বড়ো বড়ো টুকরো মাছ আসে। আমরা খাই। খেতে খেতে লোনা পানির মাছের টেস্ট শরীরের চর্বি আর মাছেদের নাম নিয়ে আলাপ করি আমরা

সন্ধ্যার পরে ক্যামেরাগুলো অকেজো তাই ফটোগ্রাফাররা বেকার। তখন তালে মাতালে বিভিন্ন গল্প। তারপর সবার ঘুম। শুধু নিজের জায়গায় শুয়ে বিড়ি টানছি আমি। আর জেগে আছেন আপনি। কথা বলার নেশায় পেয়েছে আপনাকে। আপনার ভার্সিটি লাইফ... রউফুন বসুনিয়া...

বসুনিয়া গুলি খাওয়ার সময় তার ঠিক পাশেই ছিলেন আপনি। মরার আগের শেষ কথাটা আপনিই শুনেছেন শুধু। আমরা তাকে চিনতাম সে স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিথ হয়ে যাবার পরে। তার নামে বক্তৃতা ছড়া কবিতা কলাম শ্লোগান ব্যানার দেয়ালের চিকা করে নিজেদের শহীদ হবার বাসনা প্রমাণ করতাম আমরা। মোহন রায়হানের মধুর ক্যান্টিনে যাই কবিতা আমাদের মুখে মুখে সবার। নিজেও লিখে ফেলি একটা; শেষ বাক্যে বসুনিয়া- বন্দুকের একটা গুলি পাল্টাতে যতটা সময় লাগে/ততটা সময়ে এই বাংলা দিতে পারে জন্ম লক্ষ বসুনিয়া/ আমি যাচ্ছি হে স্বৈরাচার কিন্তু তুমি ঠিক করে রাখো/ এর পরে কয় লক্ষ বসুর বুকে তাক করবে তোমার একটা বন্দুক....

আমি ঝিম মেরে শুনছিলাম আপনার কথা। বসুনিয়াকে না চিনেই তার মুখে বসিয়ে দেয়া আমার কথাগুলোর সাথে মিলাচ্ছিলাম সত্যি সত্যি বসুনিয়ার শেষ বাক্য- শুয়োরের বাচ্চা গুলি করছে...

হা হা মুস্তাফিজ ভাই। যতই পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন বসুনিয়ার শেষ কথা হিসেবে এই কথাটাকে পাবলিককে খাওয়াতে পারবেন না আপনি। বসুনিয়া বীর। বীরের মুখ থেকে আমরা বীরত্ব কিংবা ত্যাগের কথা শুনতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি বাচ্চাপোলা ক্ষুদিরাম ফাঁসির দড়িতে দাঁড়িয়ে গেয়েছিল তত্ত্বকথার গান- একবার বিদায় দে মা...

পাবলিকের খাদ্য তালিকাটাই এরকম। জীবনী থেকে কিংবদন্তিতে রুচি বেশি আমাদের। সুন্দরবনের জেলেদের সততাই খাবে পাবলিকে বেশি। কিন্তু বসুনিয়ার শেষ সময়ে পাশে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়েও আপনি কি অনুমান করতে পারেন যখন বাধ্য হয়ে তাঁরা দাঁড়িয়ে ছিল কিংবা মাছগুলো তুলে দিচ্ছিল তখন মনে মনে ঠিক কী বলতে পারে এইসব মাঝিরা?

পরেরদিন সকালে শুরু হলো গণ-ডায়রিয়া আমাদের। দুবার টয়লেট-প্যারেড করে একটা ঘুম দিয়ে দুপুরে খেতে বসলাম ভাত। এখনও সেই গতকালের মাছ। এক কোষ ভাত মুখে তুলেই প্লেট রেখে দিয়ে উঠে গেলাম নৌকার কোনায়। আপনি তাকালেন- কী হলো?
- কিছু না। আসছি

দৌড়ে নৌকার কোনায় গিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেই- ওয়াক...

ভেতর থেকে বের হয়ে এলো নাড়িভুঁড়ি ছেঁড়া বমি- ওয়াক...

গতকালের যা কিছু সকালেই তা অবিরল ধারায় কমোড বেয়ে সুন্দরবনের নদীতে গেছে। বাকি যে গন্ধটুকু ছিল তাও বের হয়ে এলো। কিন্তু আমি বুঝলাম না কিছুই। কুলি করে আবার এসে খেতে বসলাম। পাশের টুলে রেখে গিয়েছিলাম ভাতের প্লেট। প্লেটটা তুলতে গিয়ে দেখি প্লেটটা ওখানে নেই। পড়ে গেছে। বোকার মতো আমি জিজ্ঞেস করলাম- প্লেটটা কি আমিই ফেলেছি?

আমি ছাড়া আর ফেলবে কে। এটাই ছিল সবার চোখের উত্তর। কিন্তু আমি জানি টুলের ওপরে রাখা প্লেটটায় আমার স্পর্শও লাগেনি একবার...। প্লেটটা আমি ফেলিনি। সুন্দরবনের প্রকৃতি ফেলেছে এই প্লেট। এই ডায়রিয়া- এই বমি- এই ভাতের পাত ফেলে দিয়ে সুন্দরবনের প্রকৃতি আমাকে বারবার জানিয়ে দিচ্ছিল- মাছ নয়; মাছ নয়; মাঝিদের মাংস এইসব খাবার...

হাঃ হাঃ হাঃ মুস্তাফিজ ভাই

আপনারা কেউ সাক্ষী না থাকলে আমি কিন্তু ডায়রিয়া-বমি-ভাত তিনটাকে একই ব্লেন্ডারে ফেলে একখান সততা-শিক্ষার মডেল বানিয়ে ফেলতে পারতাম নিজেকে। কিন্তু এক টয়লেটে সবার ঠেলাঠেলিতে সকালেই আবিষ্কার হয়ে গেছে গতরাতের প্রচুর মসলামাখা তরকারিই ছিল ঝামেলার কারণ

পড়ে যাওয়া ভাত গলুইয়ের নিচে আটকানো মুরগিগুলোকে দিয়ে ওহাব আবার ভাত এনে দেয় আমাকে। ...সেই মাছ। খেলাম আবার...

তখন নৌকা এসে দাঁড়াল ভুলে যাওয়া নামের আরেকটা ফরেস্ট ফাঁড়ির সামনে। প্রায় আট দশ ফুট বেজের উপরে ইটের বাংলো টাইপ দালান। ওখানে মোবাইলের অ্যান্টেনা আছে। ফোন করার জন্য হুড়মুড় করে নেমে গেলো সবাই। কেউ ফোন করল আর কেউ বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে গেলো যাদের ফোনের তাড়া নেই। আমিও বসলাম বারান্দায়। এবং এক দৌড়ে নেমে গেলাম নিচে। ঘাসের কাছে- ওয়াক...

দ্বিতীয়বারে খাওয়া পুরো ভাত ঢেলে দিলাম ঘাসে। ভরা পেটে বমি করা বেশ আরাম। প্রতিটা ধাক্কায় শ্যালো পাম্পের মতো মুখ ভরে বের হয়ে আসে বমি। কিন্তু খালি পেটের বমিতে জান বের হয়ে আসে। একেকটা ধাক্কায় নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে আসতে চায় কিন্তু এক দু চামচ শ্লেষ্মা ছাড়া পড়ে না কিছুই...

...তখনও আমি বুঝে উঠতে পারিনি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভাষা। প্রকৃতি তার নিজের ভাষায় আমাকে দুবার নিষেধ করলেও আমি অনুবাদ করতে পারেনি বনের শব্দমালা। আমি আবারও ভরপেট সেই মাছ খেয়ে বাংলোর ব্যালকনিতে বসে বিড়ি ধরিয়েছি। যতদূর চোখ যায় সামনে নিজের নিয়মে সাজানো সুন্দরবন। জোয়ারের পানি তখন সন্ধ্যার আগে পা ধুইয়ে দিচ্ছে বৃক্ষরাজির...

তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। পাশে বসা কাউকে দেখতে পাই না আমি। আমার চোখ আটকে আছে নদীর অন্যপাড়ে দূরের একটা বিশাল কেওড়া গাছে। প্রথমে কেওড়া গাছটা তার নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে একটু নড়ে উঠে। তারপর এক ঝটকায় মাটি থেকে নিজের শেকড়গুলো খুলে নিয়ে নদীর উপর দিয়ে হাঁসের মতো ভাসতে ভাসতে আসতে থাকে আমার দিকে। আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। একটুও নড়তে পারছি না আমি। হাতের বিড়িতেও পারছি না টান দিতে। একজন ঋষি মানুষের মতো ঝাঁকড়া কেওড়াগাছটা নদী পার হয়ে এসে বাংলোর ব্যালকনির নিচে সিঁড়ির কাছে দাঁড়ায়। আমি তাকিয়ে আছি। সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে গাছটা একটা দীর্ঘ ডাল বাড়িয়ে ব্যালকনিতে বসা আমাকে পেঁচিয়ে ধরে গলায়। আমি কিছুই করতে পারছিলাম না তখন। গাছটা আমাকে টানতে টানতে নিচে নামিয়ে নিয়ে যায় তার গোড়ায়। তারপর আমাকে ধরে রেখেই হরিণে সবগুলো পাতা খাওয়া কাঠির মতো আরেকটা ডাল সোজা এনে নলের মতো ঢুকিয়ে দেয় আমার মুখের ভেতর। মুখ থেকে গলা বেয়ে পাকস্থলীতে গিয়ে থামে ডালটা। তারপর পেটের ভেতরে ডালের মাথাটা একটু বাঁকিয়ে হঠাৎ এক হ্যাঁচকা টানে প্যান্টের পকেট ঝাড়ার মতো করে আমার পুরো পাকস্থলীটাকে বের করে নিয়ে আসে মুখের বাইরে। হুড়মুড় করে গাছের গোড়ায় ছিটকে পড়ে পেটের ভেতর যা কিছু ছিল সব। ...চাবানো মাছ। পানি। গলে যাওয়া ভাত...

তারপর অনেকগুলো ছোট ছোট পাতাওয়ালা ডাল এগিয়ে এসে পুরো পাকস্থলীটা মুছে দিতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেখানে একটা টুকরো মাছের গন্ধও থাকে। তারপর আবার এক ধাক্কায় পাকস্থলীটা ভেতর ঢুকিয়ে আমাকে ছেড়ে দিয়ে গাছটা নদী পার হয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে এক ঝটকায় আবার সাধারণ গাছ হয়ে যায়। আর ঘোর ভেঙে আমি নিজেকে আবিষ্কার করি বাংলোর সিঁড়ির নিচে বমিতে মাখামাখি। ... আর ঠিক তখনই আবিষ্কার করি- সুন্দরবনের এই প্রকৃতি চায় না মাঝিদের মাংস মাখা মাছের কোনো গন্ধ আমার ভেতরে যাক... মাছ নয়। মাছ নয়; মাঝিদের রক্তের দলা এই সব;

বলেন তো দ্বিতীয় বমিটাকে এভাবে বর্ণনা করলে জিনিসটা কোথায় দাঁড়াতো? পুরো একটা আদর্শবাদী সাহিত্য হয়ে যেত কাহিনীটা। কিন্তু আফসোস। আপনারা সবাই ওখানে বসা ছিলেন দিনের আলোয়। আপনারা সবাই দেখলেন আমি বাপ্পী ভাইর কাছ থেকে গ্যাসের টেবলেট আর খাবার স্যালাইন নিলাম

এই বমিটার সাথে কিন্তু প্রথম বমির পরে একজনের একটা কমেন্ট যোগ দিয়ে রীতিমতো শ্রেণিসংগ্রাম আর শ্রেণিশোষণ বিষয়ক ওয়াজ মাহফিলের লেকচার বানিয়ে ফেলা যায়;

সুপ্রিয় কমরেডগণ আপনারা জানেন। নিপীড়িত নির্যাতিত আমার কমরেড জেলে ভাইদের রক্ত জল করা মাছ যখন সামন্তবাদী চক্রান্তে আমার পেটে গিয়ে শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিশ্রুতির কারণে উগলে বেরিয়ে আসছিল বমি হয়ে। তখন একজন আমাকে বলে- কুত্তার পেটে ঘি ভাত হজম হয় না

মানে কী বুঝছেন কমরেডগণ? না বোঝেন নাই। আপনারা ভাবছেন সেই লোক মাছ খাওয়ার খোঁটা দিয়েছে আমাকে? না ভুল। জেলেদের কাছ থেকে মাছ কেড়ে নিয়ে খাওয়াকে ওরা জায়েজ করে ফেলেছে বহু শতাব্দী ধরে। ওইটা এখন আর মাথায়ও নাই তাদের। সে ইঙ্গিত করেছে গতকালের খাওয়া বিদেশি মদের

কমরেডগণ। আপনারা জানেন এইসব সাম্রাজ্যবাদীরা মানুষকে লোভ দেখিয়ে; সুবিধা দিয়ে নিজের দলে ভিড়াতে চায়। আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে চায়। কারণ মানুষ যত বিভক্ত হবে ততই তাদের লাভ। ততই মুনাফা তাদের। ঐতিহাসিক সেই পুঁজিবাদী চক্রান্তের নীল নকশায় তারা আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে মদের আসরে নিয়ে যায়। গ্লাসের মধ্যে ঢেলে দেয় আমাদের আদিবাসী কমরেডদের ঘরে তৈরি করা চুয়ানির মতো স্বচ্ছ সাদা পানি। আমি সরল মনে তা মুখে দেই। গন্ধটা চুয়ানি থেকে একটু কম ছিল বলে আমি ধরে নেই সুন্দরবনের খোলা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে গেছে চুয়ানির সুবাস

কিন্তু কমরেডগণ। পরিকল্পিতভাবে তারা আমাকে মদের বোতল দেখায় না। যখন আমি পুরাপুরি টাল তখন তারা আমাকে বোতল দেখায়। বোতল দেখেই চমকে উঠে নেশা কেটে যায় আমার। মুহূর্তের মধ্যে আমি ধরে ফেলি মুনাফাখোর সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের নীল নকশার ছক। আমি চিনে ফেলি এরা কারা। কেন তারা গেলাস বাড়িয়ে দিচ্ছে আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গেই আমি ধরে বসি এমএম মানে মদ-ম্যানেজারকে। কাউকে বাদ দেই না আমি। তিন তিনটা সেমিঅটোমেটিক রাইফেলের সুরক্ষিত পাহারা তুচ্ছ করে একে একে সবার মুখোশ উন্মোচিত করি আমি। রাইফেলকে কেন ভয় পাব আমি? কাকে ভয় পাব আমি? আমার একার জীবনের কী দাম যদি না একটা শ্রমিকের এক এক ফোঁটা রক্তকে শোষণের হাত থেকে বাঁচাতে পারি?

যখন তারা দেখল তাদের মুখোশ খুলে গেছে। তখন লেজ গুটিয়ে মদের সবগুলো বোতল লুকিয়ে ফেলল নৌকার গলুইয়ের ভেতর। আর পরের দিন যখন তাদেরই চক্রান্তে জলমজুরের প্রাণের মাছ খেয়ে বমি করছি আমি; তখন আমাকে দুর্বল আর একা পেয়ে তারা প্রমাণ করতে চাইল যে বাংলামদ খাওয়া আমার পেটে বিদেশি মদ হজম হয়নি তাই বমি করছি আমি...

কমরেডগণ। এরা সেই শ্রেণীর মানুষ। যারা শ্রমিকের রক্ত খেয়ে রক্তশূন্যতার দায় শ্রমিকের ঘাড়ে চাপায়। তারা জেলের কাছ থেকে মাছ ছিনতাই আড়াল করতে বমির দায় আমার হজমশক্তির উপর চাপায়। কিন্তু আপনারাই বলেন মদ খেয়ে কি সতেরো-আঠারো ঘণ্টা পরে বমি করে কেউ? আমি বমি করেছি কারণ আমি চিনতে না পারলেও আমার প্রতিটা রক্ত কণিকা ঠিকই চিনতে পেরেছ এই মাছ আমার কমরেডের রক্তের ফোঁটায় তৈরি মাছ। তাই আমার শরীর উগরে দিয়েছে এই মাছ...

কিন্তু আমি সেই যুক্তির ধারে কাছেও যাই না কমরেডগণ। আমি বলি- সত্যিই তো। বিদেশি মদ তো আমার পেটে হজম হবার কথাই নয়। কারণ আমার প্রতিটা রক্ত কণিকা জানে এই এক বোতল মদের দাম আমার একটা শ্রমিকের এক মাসের মজুরির সমান। আমার চাষির; আমার শ্রমিকের রক্ত পানি করা টাকা কেড়ে নিয়ে কারা রাতের অন্ধকারে মাতাল হবার জন্য এইসব মদ আমদানি করে আমি জানি। তাই এই মদ হজম হয় না আমার। আমার পেটে এইসব মদ হজম হয় না কারণ আমি জানি এইসব লাল-সাদা পানির জন্য প্রতিবছর যত টাকা বিদেশে পাচার করা হয় রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে... সেই টাকায় অত হাজার শ্রমিকের জন্য বাড়ি হয় প্রতি বছর। মাত্র অত বছর বিদেশ থেকে এইসব মদ আমদানি বন্ধ করলে আমার দেশের প্রতিটা কৃষক নিজের গাড়ি নিজে চালিয়ে ধান ক্ষেতে গিয়ে লাঙ্গল চালাতে পারে... আমি জানি এইসব। তাই এই মদ আমি চিনতে না পারলেও আমার প্রতিটা রক্ত কণিকা জানে এইটা মদ নয়। আমার ভাইয়ের রক্ত আর ঘাম...

আহারে...
আবারও মিস করলাম দুর্দান্ত একটা লেকচারের টপিক। এ জীবনেও আর শ্রেণিসংগ্রাম বিষয়ক একটা লেখা তৈরি করা হলো না আমার...

শ্রেণিসংগ্রাম আসোলেই একটা অসাধারণ স্কুল। যেখানে গিয়ে খুব সহজেই শিখে আসা যায় মানুষের ঠিক কোন জায়গায় শিঙা লাগালে একটানে সবগুলো রক্ত শুষে নেয়া যায়। দেখেন না এ যাবতকালে দেশে যতগুলো সরকার হয়েছে তারা নিজেরা শ্রেণিসংগ্রামি না হলেও প্রতিবারই মন্ত্রীপরিষদ ভর্তি থাকে শ্রেণিসংগ্রামের ইস্কুল পাশ করা লোকে? এরা শ্রেণিসংগ্রামের নামে মানুষের ভেতর গিয়ে জেনে এসেছে ঠিক কোন জায়গায় কামড় দিলে মানুষ মরার আগে আর টুশব্দও করতে পারে না জীবনের মতো। এইজন্যই একা ইলেকশনে দাঁড়ালে পাঁচশো ভোট না পেলেও সব সরকারেই এদের অত বেশি দাম...

এই লেকচারটাও কিন্তু যেকোনো সময়ের যেকোনো বিরোধী দলের সড়কবক্তৃতার খসড়া হিসেবে বিক্রি করে দেয়া যায়। বাংলাদেশে সব সময়ই এই বক্তৃতাটা ফিট করে দেয়া যাবে একটু এদিক সেদিক ঘুরিয়ে। কিন্তু সেই সুযোগটাও নাই আমার। কারণ নিজেকে শ্রেণিদরদি হিসাবে প্রমাণ করতে পারিনি আমি। না পত্রিকায় লিখেছি কিছু। না কোনো পোস্ট দিয়েছি ব্লগে শ্রেণিসংগ্রামের পক্ষে। তাই কেউ খাবে না আমার এই ড্রাফট। আফসোস...

এজন্যই কি আপনি আমাকে সুন্দরবন যেতে বলেছিলেন? এসব কি আপনারও চোখে পড়েছিল? চোখে পড়েছিল কি মাঝিদের কাছ থেকে কেজি দুই টোপ নিলেও আব্দুল ওহাব আর এমদাদ বঁড়শি বাইছিল মুরগির নাড়িভুঁড়ি দিয়ে? চোখে পড়েছিল কি এই চার আর মাছ খাইয়ে বাপ্পী ভাই চারটা মুরগি সেভ করে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল ফেরত? ওসবের কি কোনো ছবি তুলেছিলেন আপনি?

ধুত্তুরি...

২০০৯.০৮.২৫-২৬ মঙ্গল-বুধবার