Search This Blog

FCO Travel Advice

Bangladesh Travel Advice

AFRICA Travel Widget

Asia Travel Widget

Showing posts with label SYLHET. Show all posts
Showing posts with label SYLHET. Show all posts

Sunday, January 30, 2011

পার্কের আদলে মসজিদ

পার্কের আদলে মসজিদ

সাইনবোর্ড না পড়লে যে কেউ মনে করবেন এটি একটি পার্ক। আসলে এটি কোনো পার্ক নয়, পার্কের আদলে তৈরি মসজিদ। যার অবস্থান পূণ্যভূমি সিলেটের ওসমানীনগর থানার তাজপুরের দিঘিরপাড়ে। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ নির্মাণ করেছেন এলাকার বিশিষ্ট ধনাঢ্য ব্যক্তি ধন মিয়া।
শৈল্পিক কারুকাজখচিত মসজিদের পাশেই রয়েছে সুবিন্যস্ত পাঠাগার। নামাজ আদায় ছাড়াও বিকালে লোকজন এখানে বই পড়তে আসেন। ভিড় করেন বিভিন্ন স্থান থেকে আগত সৌন্দর্যপিপাসুরাও। পাঠাগারের পেছনে রয়েছে সুবিশাল দিঘি। সুসজ্জিত ফুলের বাগান, নারিকেল গাছ, বসার ছাউনি, দোলনা, ছোট-বড় গেট। সব মিলিয়ে মনে হবে এটি কোনো পার্কের দৃশ্য। লোকমুখে শোনা যায়, ধন মিয়া স্বপ্নযোগে মসজিদ নির্মাণের আদেশ পেয়ে এটি নির্মাণ করেন। মসজিদের নির্মাণকাজ কয়েক বছর আগে শুরু হলেও শেষ হয়েছে দুই বছর আগে। পড়ন্ত বিকালে দিঘিরপাড়ের মনোরম দৃশ্য ঘুরতে আসা মানুষকে বিমোহিত করে। যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে অবসরে ঘুরে আসতে পারেন ওসমানীনগরের দিঘিরপাড় মসজিদ।
-রামিল মাসুদ
Daily Bangladesh pratidin

Monday, January 17, 2011

সিলেটের পর্যটন এলাকাসমূহ

সিলেটের পর্যটন এলাকাসমূহ

১. হজরত শাহ জালাল রহমত উল্লাহের মাযার
সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রে হযরত শাহজালাল (র.) এর সমাধি। মূল সড়ক থেকে বিশাল তোরণ পেরিয়ে একটু ভেতরে হেঁটে গেলেই মূল মাজার কমপেস্নক্স। এখানে প্রবেশের শুরুতেই দেখা মিলবে দরগাহ মসজিদের। মসজিদটি বর্তমানে আধুনিক রূপ নিলেও এটি তৈরি হয়েছিল ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে। মসজিদের পাশেই রয়েছে মাজারে ওঠার সিঁড়ি। উপরে উঠে মাজারে প্রবেশ করতে হয় গম্বুজ বিশিষ্ট একটি হলঘরের মধ্য দিয়ে। এই হলঘরের ঠিক পশ্চিমের ভবনটি ঘড়িঘর। ঘড়িঘরের আঙিনার পূর্ব দিকে যে তিনটি কবর রয়েছে, তা হযরত শাহজালালের ঘনিষ্ঠ তিনজন সঙ্গীর। এর দক্ষিণ পাশে গ্রিলঘেরা ছোট্ট ঘরটি হযরত শাহজালালের চিলস্নাখানা। দুই ফুট চওড়া এ চিলস্নাখানায় তিনি জীবনের তেইশটি বছর ধ্যানমগ্ন কাটিয়েছেন বলে কথিত আছে। চিলস্নাখানার উত্তরের প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়বে উঁচু ইটে বাঁধানো হযরত শাহজালাল (র.) এর সমাধি। এটি নির্মাণ করা হয় ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে। এর পাশেই রয়েছে ইয়েমেনের রাজা শাহজাদ আলীর কবর এবং ১৪১০ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের শাসনকর্তা মুক্তালিব খান উজিরের কবর। এ মাজারে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজশাহের শাসনকালে ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালালের হাতে এ অঞ্চল বিজিত হয়। তিনি হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দকে পরাজিত করে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। সে সময়ে তুরস্কের কুনিয়া শহর থেকে তিনি ৩১৩ জন শিষ্যসহ এ দেশে আসেন। বহু যুদ্ধে বিজয়ের পর সিলেটেই তিনি থেকে যান। ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃতু্যবরণ করেন। হযরত শাহজালালের পুরো মাজার কমপেস্নক্সটি ঘুরে দেখার মতো। মাজার কমপেস্নক্সে পূর্ব পাশের পুকুরে দেখা মিলবে বহুকালের ঐতিহ্য গজার মাছের। শত শত জালালি কবুতরও রয়েছে এখানে। মাজার কমপেস্নক্সের পশ্চিম পাশের একটি ঘরে এখনও রক্ষিত আছে হযরত শাহজালালের ব্যবহূত তলোয়ার, পেস্নট, বাটি ইত্যাদি।

2. লাকাতুরা চা বাগান :সিলেট শহর থেকে বিমানবন্দর রোড ধরে কিছু দূর এগোলেই চোখে পড়বে এ চা বাগান। এখানকার চা বাগান ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগবে।


৩. মালনিছড়া চা বাগান :লাকাতুরা চা বাগান ছেড়ে বিমানবন্দরের দিকে একটু এগোলেই হাতের বামপাশে সুন্দর এ চা বাগানটির অবস্থান। এটিকে বলা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো চা বাগান। ইংরেজ সাহেব হার্ডসনের হাত ধরে ১৮৫৪ সালে এ চা বাগানের প্রতিষ্ঠা। মালনিছড়া চা বাগানের ভেতরে ঘুরে বেড়ানোর মজাটাই আলাদা। অনুমতি নিয়ে চা বাগানের কোনো কর্মচারীর সহায়তায় ঘুরে দেখা যেতে পারে বাগানটি। মালনিছড়া চা বাগানের মধ্যে একটি কমলালেবুর বাগানও আছে।

৪.সিলেট পর্যটন :মালনিছড়া থেকে কিছুদূর সামনে ক্যাডেট কলেজ ছাড়িয়ে রয়েছে হাতের ডানপাশে পাহাড়ি টিলার উপরে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ভ্রমণ কেন্দ্র। বেড়ানোর জন্য এ জায়গাটিও চমৎকার। এ জায়গাটিতে বসে দূর পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সিলেটের মোটেলটিও এখানেই।

৫. শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : সিলেট শহরের পাশে কুমারগাঁও এলাকায় ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলামেলা ক্যাম্পাসটি ভালো লাগবে সবার।
৬.কি্বন ব্রিজ :হযরত শাহজালালের সমাধি থেকে ২৫-৩০ টাকা রিকশা ভাড়ার দূরত্বে কি্বন ব্রিজ। সুরমা ব্রিজ নামেও এটি বেশ পরিচিত। ১৯৩৬ সালে নির্মাণ করা হয় এটি। তৎকালীন ইংরেজ গভর্নর মাইকেল কি্বনের নামেই এর নামকরণ করা হয়। ১১৫০ ফিট লম্বা এবং ১৮ ফিট প্রস্থ এ ব্রিজটি দেখতে ধনুকের মতো বাঁকানো। ১৯৭১ সালে পাক হানাদাররা ব্রিজটির একাংশ উড়িয়ে দেয়। পরে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের অর্থায়নে বিধ্বস্ত অংশটির পুনঃনির্মাণ করা হয়।

৭. আলী আমজাদের ঘড়িঘর :কি্বন ব্রিজ থেকে নিচে তাকালেই চোখে পড়ে একটি ঘড়িঘর। ব্রিজের পাশে চাঁদনীঘাটে অবস্থিত এ ঘড়িঘরটি আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। জানা যায়, পৃথি্ব পাশার বিখ্যাত জমিদার আলী আমজাদ খাঁ দিলস্নীর চাঁদনীচকে শাহজাদী জাহানারা কতর্ৃক নির্মিত ঘড়িঘর দেখে মুগ্ধ হন। তাই তিনি সুরমা নদীর তীরে চাঁদনীঘাটের কাছে অনুরূপ একটি ঘড়িঘর নির্মাণ করেন। এ জন্যই সবাই একে জানেন আলী আমজাদের ঘড়িঘর নামে।

৮.মনিপুরী জাদুঘর :শহরের সুবিদবাজার এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এ জাদুঘরটি। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী সমপ্রদায় মনিপুরীদের শত বছরের কৃষ্টি আর ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে এ জাদুঘরের মাধ্যমে। এ জাদুঘরে দেখা মিলবে কয়েকশ বছরের পুরোনো ঘণ্টা, ধমর্ীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহূত নানান দ্রব্যসামগ্রী, যুদ্ধে ব্যবহূত সরঞ্জাম, মনিপুরীদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প সামগ্রীসহ আরো অনেক কিছু।

৯. এমসি কলেজ :সিলেট শহরে অবস্থিত প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুরারীচাঁদ কলেজ বা সিলেট এমসি কলেজ। ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজটি এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে ব্যাপক ভূমিকা রেখে আসছে।
১০. ওসমানী স্মৃতি জাদুঘর :সিলেট শহরের কোর্ট পয়েন্টের কাছে নাইওরপুলে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গণি ওসমানীর বাসভবন 'নূর মঞ্জিল'। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের পরিচালনায় এখানে রয়েছে ওসমানী স্মৃতি জাদুঘর। এ জাদুঘর খোলা থাকে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সকাল ১০.৩০ মিনিট থেকে বিকাল ০৫.৩০ মিনিট পর্যন্ত এবং অক্টোবর থেকে মার্চ সকাল ৯.৩০ মিনিটি থেকে বিকাল ৪.৩০ মিনিট পর্যন্ত। শুক্রবার খোলা থাকে বিকেল ৩.৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিট পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার এবং অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে জাতীয় জাদুঘর বন্ধ থাকে। এ জাদুঘরের কোনো প্রবেশমূল্য নেই।

.হযরত শাহপরান (র.) এর সমাধি :হযরত শাহ পরান ছিলেন হযরত শাহজালালের ভাগ্নে। তিনিও ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক। শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার পূর্ব দিকে দক্ষিণগাছের খাদিমপাড়ায় রয়েছে এই মহান সাধকের মাজার। বিশাল বটগাছের ছায়াতলে এ মাজারে উঠতে হয় সিঁড়ি বেয়ে। প্রতিদিন হাজার হজার ভক্তের পদচারণায় মুখরিত থাকে পুরো মাজার এলাকা। মাজারের পাশেই রয়েছে মুঘল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ।
2. মাধবকুন্ড জলপ্রপাত

clip_image0015মাধবকুন্ড দক্ষিণবাগ রেল ষ্টেশন হতে ৩ কিলোমিটার দুরে মাধবকুন্ড জলপ্রপাত যেখানে প্রতি বছর অনেক দর্শনার্থী আসেন। মাধবকুন্ডের ঝর্ণা হচ্ছে পর্যটকদের জন্য সিলেট বিভাগের মধ্যে একমাত্র আকর্ষণীয় স্হান। অসংখ্য পর্যটক ও বনভোজনকারীরা এখানকার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে প্রতি দিন আসেন।

যেভাবে আসবেন:
বাস যোগে কুলাউড়া রেলষ্টেশন হতে মাধবকুন্ডে আসতে হলে ১ ঘন্টায় আসা যায়। ভ্রমণের সময় আশপাশে সবুজ চা বাগানের দৃশ্য চোখে পড়বে। পাহাড়ের ঝিকঝাক রোড আপনার ভ্রমণকে আরও আনন্দদায়ক করবে। মাধবকুন্ডে একটি বড় পাহাড়ী প্রাকৃতিক ঝর্ণা আছে। ২০০ ফুট হতে লক্ষ লক্ষ টন পানি নীচের দিকে পড়তে থাকে। পাথরের বড় বড় স্তুপ ও কালো পাথরগুলো মাধবকুন্ডকে সুন্দর আকৃতি দিয়েছে। এখানে পর্যটন মোটেলের সাথে থাকা ও খাওয়ার সুবিধা দেয়ার জন্য একটি রেস্টুরেন্ট আছে। রাতকাটানোর জন্য একটি জেলা বাংলোও আছে । জঙ্গলের মধ্যে অবস্হান আপনাকে অতিরিক্ত আনন্দ দিতে পারে। জেলা বাংলো বুকিং দেয়ার জন্য আপনাকে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ অফিসে যোগযোগ করতে হবে।

. শ্রীমঙ্গল
শ্রীমঙ্গল বাংলাদেশের "চা রাজধানী" নামে খ্যাত।
clip_image0016
যা যা দেখবেন:
শ্রীমঙ্গলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ চা বাগান আছে যা সবুজ কার্পেট নামে খ্যাত। এখানে চা গবেষণা কেন্দ্র ও একটি চা উৎপাদনের কারখানা আছে। প্রতি বছর বাংলাদেশের উৎপাদিত মানসম্মত চায়ের একটি বিরাট অংশ বিদেশে রপ্তানী হয়ে থাকে। শ্রীমঙ্গলে অধিকাংশ জায়গা জুড়েই চা বাগান চোখে পড়বে। যদি আপনি চা বাগানে থাকার ব্যবস্হা করতে পারেন তাহলে সে ভ্রমণটি আপনার স্মৃতিময় হয়ে থাকবে। শ্রীমঙ্গলের রেস্ট হাউজ অথবা অন্যান্য অনেক জায়গা আছে থাকার জন্য। তবে এখানে থাকার জন্য আগে থেকে বাগানের মালিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়।
. চৈতন্য দেবের মন্দির
শ্রী চৈতন্য দেবের মন্দির সিলেট শহর হতে ৪৫ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে অবস্হিত। প্রায় ৫০০ বছরের পুরাতন এ শ্রী চৈতন্যের মন্দিরটি। প্রতি বছর বাংলা ফাল্গুন মাসে পূর্ণিমা রাতে এখানে একটি মেলার আয়োজন হয়ে থাকে যেখানে হাজার হাজার দেশী বিদেশী ভক্ত মেলাটি উপভোগ করেন।
. শাহী ঈদগাঁহ
১৭ শতাব্দীতে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব একটি পাহাড়ের উপরে সার্কিট হাউজের দক্ষিণ পূর্বে তিন কিলোমিটার দূরে শাহী ঈদগাঁহ নির্মাণ করেছিলেন। এটি দেখতে দূর্গের মত মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে মুসলিম সম্প্রদায়ের দুটি বড় ঈদের জামাত এখানে আয়োজন করা হয়ে থাকে।
. গৌর গোবিন্দের দূর্গ
একটি সৌন্দর্যময় পাহাড়ের চূড়ায় মুরারিরচাঁদ সরকারী কলেজটি অবস্হিত যার দক্ষিণ পশ্চিম দিকে রাজা গৌর গোবিন্দ দূগর্টি রয়েছে। এটিও একটি দর্শণীয় স্হান।
. জৈন্তাপুর রাজবাড়ি
জন্তাপুর সিলেট শহর হতে ৪৩ কিলোমিটার দূরে সিলেট শিলং রোডের পাশে অবস্হিত। প্রাচীন রাজার রাজধানী নামে খ্যাত এ জৈন্তাপুর। এখানে খাশিয়া ও জৈন্তা পাহাড় ও জৈন্তা ভূমি আছে। জৈন্তাপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এ রাজার রাজত্বের নিদর্শনগুলো। জৈন্তাপুর বন এবং জাফলং এলাকার আশেপাশে, শ্রীপুর এবং তামাবিল এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে প্রচুর লোকজন এখানে আসে।
যদি আপনি জাফলং-এ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন তাহলে জাফলং-এ সারাদিন বেড়িয়ে সন্ধ্যায় সিলেট শহরে ফিরে যেতে হবে। সাধারণত: শীতকালে জাফলং ভ্রমণের উপযুক্ত সময় তবে পাহাড়ী ঝর্ণা উপভোগ করতে চাঁদনী রাতে আসা উচিত। জৈন্তাপুর রাজবাড়ি জাফলং হতে ৫ কিলোমিটার দূরে, এখানে একটি সুন্দর চা বাগান আছে। সিলেট শহরের দক্ষিণ পশ্চিমে ৩৫ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্হিত। শ্রীপুর ভ্রমণের পর জৈন্তাপুরের জৈন্তা রাজপ্রাসাদ পরিদর্শন করতে ভুলবেন না। ১৮ শতকে জৈন্তা রাজার রাজধানী ছিল এ জৈন্তাপুর। জৈন্তা রাজাবাড়ি হচ্ছে জৈন্তা রাজার রাজপ্রাসাদ। এটি জৈন্তাপুর বাজারের কাছে। এ রাজপ্রাসাদটি বর্তমানে ধ্বংসের পথে তবুও অনেক পর্যটক জৈন্তা রাজার অস্তিত্বতের নিদর্শন দেখতে আসে।
. শ্রীপুর

clip_image0017শ্রীপুর হচ্ছে অন্য একটি পর্যটন স্হান যেখানে আপনি পাহাড়ী ঝর্ণা থেকে পানি পড়ার শব্দ শুনতে পাবেন। এ এলাকার বর্ধিত অংশে ভারতীয় সীমানার ঝর্ণাটি আপনার দৃষ্টিতে আসবে। মাঝেমাঝে বড় বড় পাথর এ ঝর্ণার সাথে শ্রীপুরে আসে। জাফলং এবং তামাবিল ভ্রমণের পর সিলেটে ফেরার পথে শ্রীপুর ভ্রমণ করতে পারেন। জাফলং থেকে শ্রীপুরের দূরত্ব ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার।
. লাউয়াছড়া বন

clip_image0018“লাউয়াছড়া রেইন ফরেস্ট” বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন। পর্যটকরা এখানে বানরের গাছে চড়ার দৃশ্য, পাখি যেমন- পেঁচা, টিয়া ইত্যাদি দেখতে পাবেন। এখানে হরিণের ঘোরাফেরা, চিতাবাঘ, বন্যমোরগ, কাঠবিড়ালী এবং অজগর সাপ দেখতে পাবেন। যারা পাখি দেখতে ভালোবাসে তারা কোনভাবে এটা দেখতে ভুলবেননা।
এশিয়ার মধ্যে বিরল ক্লোরোফোর্মের গাছ রয়েছে এখানে যা সত্যিই আকর্ষণীয়। এখানে খাসিয়া ও মুণিপুরী দু’জাতির উপজাতিদের বসবাস । মুণিপুরীদের আকর্ষণীয় নাচ ও গান এখানকার আকর্ষণ অনেকটা বৃদ্ধি করেছে। তাদের একটি ঐতিহ্য হচ্ছে কাপড় বোনা। আপনি এখান থেকে হস্তশিল্প, উলের তৈরি শাল, শাড়ী, নেপকিন, বিছানার চাদর এবং কিছু ব্যাগও কিনতে পারেন। খাসিয়া উপজাতিদের গ্রামগুলো পাহাড়ের উঁচুতে ও গভীর বনের মধ্যে যা শহর থেকে অনেক দূরে। লাউয়াছড়া বনকে বলা হয়ে থাকে স্বর্গের রাজ্য যা আপনাকে এক ধরণের প্রশান্তি এনে দিবে।
2. জাফলং

clip_image0019জাফলং সিলেট বিভাগের অন্যতম আকর্ষণীয় স্হান। সিলেট শহর হতে এটি ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্হিত ও সিলেট শহর হতে দেড়ঘন্টা সময় নিবে এখানে পৌঁছাতে। জাফলং-এর দর্শনীয় দিক হচ্ছে চা বাগান ও পাহাড় থেকে পাথর আহরণ। মারি নদী ও কাশিয়া পাহাড়ের পাদদেশে জাফলং অবস্হিত। মারি নদীর উৎপত্তি হিমালয় থেকে। এর স্রোতে লক্ষ লক্ষ টন পাথর চলে আসে। মারি নদীতে ভ্রমণের মাধ্যমে পাথর সংগ্রহের দৃশ্য আপনাকে সত্যিই আনন্দ দিবে। জাফলং হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য সমৃদ্ধ সম্পূর্ণ পাহাড়ী এলাকা যা সবুজ পাহাড়ের অরণ্যে ঘেরা। এখানে প্রচুর বন্য প্রাণীর বসবাস। বনের কাছাকাছি আসলে আপনাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আপনি জাফলং- এ আসলে খাসিয়া উপজাতিদের জীবন ও জীবিকা চোখে পড়বে। জাফলং- এ আসতে হলে সিলেট থেকে আপনাকে সকাল সকাল যাত্রা করতে হবে যাতে ভ্রমণ শেষে সন্ধ্যার আগে সিলেট ফিরতে পারেন।
. তামাবিল স্হলবন্দর
জাফলং হতে অর্ধেক কিলোমিটার দূরে হচ্ছে তামাবিল যা ভারত সীমান্তের নিকটে অবস্হিত। যদি আপনি ভারতের শিলং ভ্রমণ করতে চান তাহলে কাষ্টমস-এর নিয়মকানুন সেরে সীমানা পাড় হয়ে সেখানে যেতে পারেন। ভারতে যেতে হলে আপনাকে সেখানকার ভিসার মেয়াদ থাকতে হবে। সিলেট শহর হতে তামাবিল সীমানা ৫৫ কিলোমিটার দূরে অবস্হিত। এ এলাকার দর্শনীয় স্হান ও ঝর্ণার উৎস দেখতে হলে তামাবিল দিয়ে বর্ডার পার হতে হবে।
. সুরমা ভেলী

clip_image0020সুরমা ভেলীর দুই দিকে পাহাড় পর্বতের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকার মাঝখানে চা রোপণের দৃশ্য ও সবুজ বন সত্যিই মনকে মুগ্ধ করবে। বাংলাদেশের পর্যটন স্হানগুলোর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ খাসিয়া, জৈন্তা ও ত্রিপুরা পাহাড় এখানেই অবস্হিত। ঘন বন, মুণিপুরী উপজাতিদের বন্যজীবনের অনেক নিদর্শন এখানে দেখতে পাওয়া যায়। নীচু পাহাড়ে মাইলের পর মাইলের চা বাগানের বিস্তার একটি সবুজ কার্পেটের মত দেখা যায়। এটি পর্যটকদের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে। সিলেট হচ্ছে চা বাগানের একটি শস্যভান্ডার, এখানে ১৫০ টির উপরে চা বাগান আছে যার মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তিনটি চা বাগান এখানে অবস্হিত। সিলেটের আরেকটি দর্শনীয় স্হান হচ্ছে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী যা উত্তর দক্ষিণে অবস্হিত। এখানে অনেক হাওড় আছে যা শীতের সময় সবুজ ভূমিকে আর প্রসারিত করে কিন্তু বর্ষার সময় অশান্ত সাগরে রূপ নেয়। শীতের সময় সাইবেরিয়া হতে এইসব হাওড়ে লক্ষ লক্ষ অতিথি পাখি আসে। যা সত্যিই দেখার মত।

কিভাবে যাবেন :ঢাকা থেকে রেল, সড়ক ও আকাশ পথে সরাসরি সিলেটের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে। ঢাকার কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬.৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, দুপুর ২.০০ মিনিটে প্রতিদিন ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ১০.০০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ভাড়া এসি বার্থ ৬৯৮ টাকা, এসি সিট ৪৬০ টাকা, প্রথম শ্রেণী বার্থ ৪২৫ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ২৭০ টাকা, সি্নগ্ধা শ্রেণী ৪৬০ টাকা, শোভন চেয়ার ১৮০ টাকা, শোভন ১৫০ টাকা, সুলভ ৯৫ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮.১৫ মিনিটে যায় পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এবং শনিবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯.০০ মিনিটে উদয়ন এক্সপ্রেস। প্রথম শ্রেণী বার্থ ৪৬৫ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ৩২০ টাকা, সি্নগ্ধা শ্রেণী ৫৩৫ টাকা, শোভন চেয়ার ২১০ টাকা, শোভন ১৯০ টাকা।

ঢাকা থেকে গ্রিন লাইন পরিবহন (০২-৮৩৩১৩০২-৪, ০২-৮৩৫৩০০২-৪), সোহাগ পরিবহন (০২-৯৩৪৪৪৭৭, ০১৭১১৬১২৪৩৩), সৌদিয়া এস আলম (০১১৯৭০১৫৬৩২-৩৪) পরিবহনের এসি বাস যায় সিলেটে। ভাড়া ৫৫০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকার ফকিরাপুল, কমলাপুর, সায়েদাবাদ প্রভৃতি জায়গা থেকে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সিলকম পরিবহন, এনপি ইত্যাদি পরিবহনের নন এসি বাসও সিলেটে যায়। ভাড়া ২৫০-৩০০ টাকা। ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমান (০২-৭১৬৮৮৪২), জিএমজি এয়ারলাইন্স (০২-৮৯২২২৪৮, ০২-৮৯২৪২৭৪), ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের (০২-৮৯৩২৩৩৮, ০২-৮৯৩১৭১২) বিমান নিয়মিত উড়াল দেয় সিলেটের আকাশে।

কোথায় থাকবেন :সিলেট শহরে থাকার জন্য বেশকিছু ভালো মানের হোটেল আছে। শাহজালাল উপশহরে আছে পাঁচতারকা মানের হোটেল রোজ ভিউ (০৮২১-৭২১৮৩৫), নাইওরপুল এলাকায় হোটেল ফরচুন গার্ডেন (০৮২১-৭১৫৫৯০), জেল সড়কে হোটেল ডালাস (০৮২১-৭২০৯৪৫), ভিআইপি সড়কে হোটেল হিলটাউন (০৮২১-৭১৮২৬৩), লিঙ্ক রোডে হোটেল গার্ডেন ইন (০৮২১-৮১৪৫০৭), শহরের বাইরে বিমানবন্দর সড়কে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পর্যটন মোটেল (০৮২১-৭১২৪২৬), খাদিম নগরে জেসটেট হলিডে রিসোর্ট (০৮২১-২৮৭০০৪০), খাদিম নগরে আরেকটি আধুনিক রিসোর্ট নাজিমগড় (০৮২১-২৮৭০৩৩৮)। এ ছাড়া শহরে সাধারণ মানের অন্যান্য হোটেল হলো আম্বরখানায় হোটেল পলাশ, (০৮২১-৭১৮৩০৯)। দরগা গেইটে হোটেল দরগাগেইট (০৮২১-৭১৭০৬৬)। দরগা গেইটে হোটেল ঊর্মি (০৮২১-৭১৪৫৬৩)। জিন্দাবাজারে হোটেল মুন লাইট (০৮২১-৭১৪৮৫০)। তালতলায় গুলশান সেন্টার (০৮২১-৭১০০১৮)। এসব হোটেলে ৪০০-১২,০০০ টাকায় বিভিন্ন মানের কক্ষ আছে।
Source: www.ruralinfobd.com & Daily Ittefaq

Sunday, January 9, 2011

ফাহিম-ফারহা: হাকালুকি হাওরে


হাকালুকি হাওরে
হাকালুকি হাওরে এখন অনেক পাখি। শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে ও খাবারের খোঁজে হাজার হাজার মাইল আর পথে ৩১০০০ ফুট উঁচু হিমালয় পেরিয়ে আমাদের দেশের হাওরগুলোতে আসে এসব পাখি। হালালুকি হাওরে যাবে নাকি পাখি দেখতে? এম আহসানুল হক খোকন ঢাকা থেকে উপবন ট্রেনে রওনা হয়ে ভোর ৫টায় সপরিবারে কুলাউড়া রেলস্টেশনে পেঁৗছালাম রাতদুপুরে। ফাহিম ও ফারহা তখন গভীর ঘুমে। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকিতে পরিযায়ী পাখি (যারা আবহাওয়া বা খাবারের জন্য স্থান পরিবর্তন করে), বুনো ফুল ও প্রকৃতি দেখার জন্য আমাদের এই সফর। আঁধার তখনো কাটেনি। ভোর ৬টার মধ্যেই শ্যামলের জিপ গাড়িযোগে হাকালুকি হাওরে রওনা হলাম। পথে মানুষজন নেই বললেই চলে। সুয্যিমামা উঠি উঠি করছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলে হাওরের এক মাথায় পেঁৗছালাম। হাজার হাজার পাখির কলকাকলিতে মুখরিত বিস্তীর্ণ প্রান্তর। ফাহিমের ঘোর লেগে গেল। ফারহানা জানতে চাইল, যাবো কোনদিকে? বললাম, পা ফেলি চলো। কিছু দূর যাওয়ার পর দুজন মাছ ব্যবসায়ীর দেখা মিলল। জানলাম, ওরা হেঁটে নাগোয়া বিল যাবে। আমরা সারা দিন জিপে নাগোয়া, হিঙ্গাজুর, পানাবিল প্রভৃতি স্থান ঘুরে সন্ধ্যায় পুটবিলে তাঁবু ফেলব। তাঁবু, খাবার, স্ন্যাকস পানীয় প্রয়োজন মতো সঙ্গে এনেছি।
হাকালুকি হাওরের ২০,৪০০ হেক্টর এলাকায় প্রায় ২৩৮টি বিল রয়েছে। নাগোয়া বিল হাকালুকি হাওরের দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত। যেতে যেতে শকুনের একটা ঝাঁক ডানা মেলে আকাশে ভেসে থাকতে দেখা গেল। পাশের জল-কাদায় কানিবক, ছোট বক, হট্টিটি, শামুক খোলের দেখা পেলাম। সবুজ মাঠে গরু-মহিষের পালের ধারেকাছেই গোশালিক, গাং শালিকের ঝাঁক। গরু-মহিষের গায়ে থাকা পোকামাকড় খেতে বুনো শালিক হামলে পড়েছে। ঘণ্টাখানেক চলে এক জায়গায় বসে সঙ্গে আনা কেক, পাউরুটি দিয়ে সকালের নাশতা সারলাম। নাশতা পর্ব শেষ করেই কুরা যাত্রা শুরু হলো। আবার চলার শুরুতেই ভরত, ধানী তুলিকা ও ধলাখঞ্জন দেখা গেল। প্রায় আধঘণ্টা চলার পর ঘরকুরি বিলের পাহারা কুটিরে পেঁৗছাই। বিস্তৃর্ণ হাওর এলাকায় এ ধরনের কুটিরে বিলের মাছ ও বাথানের পশু পাহারা চলে। কুটিরের লোকজন বসতে অুনরোধ করল। গ্লাস ভরে গরুর দুধ দিল খেতে। তাঁদেরকে বিস্কুট দিল ফাহিম-ফারহা। ঘরকুরির কুটির থেকে রওনা হয়ে কিছু দূর যেতেই প্রায় ৫০টি চকাচকি হাঁসের দলকে চরতে দেখা গেল। বুনো হাঁস দেখে ফাহিম ও ফারহা আনন্দে আত্মহারা। এরা মানুষ দেখে অভ্যস্ত মনে হলো। খুব কাছ থেকেই ছবি তুললাম। শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে ও খাবারের খোঁজে হাজার হাজার মাইল আর পথে ৩১০০০ ফুট উঁচু হিমালয় পেরিয়ে আমাদের দেশের হাওরগুলোতে আসে এসব পাখি। ফাহিম জানতে চাইল, বুনো হাঁসের খাবার কী? বললাম বুনো হাঁসদের কেউ বিলের উপরিভাগের জমি থেকে ধান-দানা জাতীয় শস্য, কেউ পানির উপরিভাগের শ্যাওলা, লতাগুল্ম এবং কেউ কেউ পানিতে ডুব দিয়ে শামুক-ঝিনুক খায়। নাগোয়া বিলের পাহারা কুটির বিন্দুর মতো চোখে পড়ছে। আকাশে হাজার হাজার হাঁসের কাকলী। প্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে নাগোয়া বিলে পেঁৗছলাম। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার হাঁটায় আমরা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। এখানে বসে বিশ্রাম নিতে নিতে হঠাৎ বৃষ্টি এলো। একটু ঘুমিয়ে নিলাম। দুপুরে বড় আইড়, পাবদা, চাপিলা মাছের ঝোলে দারুণ ভোজ হলো। ততক্ষণে বৃষ্টিকে হারিয়ে দিয়ে রোদ এসে পড়েছে। আমরা আবার রওনা করলাম। এবারের গন্তব্য পুট ও হিঙ্গাজুরি বিল। কারণ গত দুই বছর এই দুটি বিলে মাছ ধরা হয়নি। ফলে এখানে প্রচুর দেশি এবং শীতের পরিযায়ী পাখির বিচরণ। বেলা দুটোয় রওনা করে কখনো সবুজ ঘাস, কখনো ধানক্ষেত, কখনো কর্দমাক্ত পথে আমরা চলেছি। পথে চকিয়া বিলে মাছ নিলামের হৈ চৈ দেখলাম। চকিয়া থেকে আরো ঘণ্টাখানেক চলার পর সামনে বড় একটা খালের পাড়ে ধানি জমির আলপথ ধরে পথ চললাম। কাছের এক কুটিরে গিয়ে আমার পূর্ব পরিচিত কয়েকজনকে পেলাম। আগেরবার পাখি শুমারির দেখা হয়েছিল। কুটিরের ধারে আমরা তাঁবু বাঁধলাম। তারপর ছৈওয়ালা নৌকায় পাখি দেখতে বের হলাম। ঝাঁকে ঝঁকে বড়সরালী, ছোট সরালী, ল্যাঞ্জাহাঁস, পাতি তিলিহাঁস, গিরিয়া, গাডওয়াল, খুন্তে হাঁস, টিকিহাঁস, বালিহাঁস, সিথীহাঁস, ভূঁতিহাস দেখলাম। দেশি প্রজাতির মধ্যে কালেম, ময়ূর, লেজা জলপিপি, জলপিপি, পানমুরগি, পানডুবি, পানকৌড়ি, ছোট নথ জিরিয়া, ছোট ডুবুরি, কুড়া ঈগল, শঙ্খচিল দেখলাম। সন্ধ্যায় পূর্ণিমার বড় চাঁদ রুপালি আলোয় বিশ্ব চরাচর উদ্ভাসিত করলে জেলেদের গানের আসরে যোগ দিলাম। রাতে টাটকা মাছের ঝোলে মজার ভোজ হলো। মধ্যরাতে আবার বৃষ্টি এল। এমন বৃষ্টিতে তাঁবুতে থাকতে ভয় পাচ্ছিলাম ফাহিম ও ফারহার জন্য। কিন্তু ওরাই বলল, মজা লাগছে। ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। চমৎকার স্বপ্নে ভোরে ঘুম ভেঙে দেখি বিলের পানি বেড়ে গেছে। সোনাব্যাঙ ডাকছে চারদিকে। বৃষ্টির মাঝে ডিঙ্গি নৌকায় করে ভোরের পাখি দেখতে লাগলাম। ঝাঁকের খুব কাছে যাওয়া গেল। এই সময় বিশ্বে বিপন্ন দুটি মরচেরং ভূতিহাঁস দেখার সৌভাগ্য হলো। পুরো দিন নৌকায় শুয়ে-বসে এবং বৃষ্টির চঞ্চলতা দেখে কেটে গেল। তৃতীয় দিন রোদ উঠল। বেগুনি রঙের একদল কালেম ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে বিলের ধারে খাবার খুঁজতে দেখলাম। ছোট সরালী, রাজসরালী, কূট, ছোটডুবুরি, ডাহুক, পাতিপানমুরগি, উত্তুরে খুন্তে হাঁস, বালিহাঁস দেখলাম। ৯টা পর্যন্ত পাখি দেখা শেষে চা-নাশতা সারলাম। তারপর হেঁটে পুটবিলে যেতে আধঘণ্টা সময় লাগল। এই বিলে বিপন্ন প্রজাতির মাকনা ফুলের সমাহার দেখে সবাই আমরা উচ্ছ্বসিত। একসময় মাকনা সারা দেশের বিলে দেখা গেলেও এখন শুধু হাকালুকি হাওরের কয়েকটি বিলে দেখা যায়। মন ভরে আমরা মাকনা ফুল ও গাছের ফটো তুললাম। মালাম বিলে যেতে আটটি মৃত পিয়ং দেখে মনটা খুব খারাপ হলো। বিলে বিষটোপ দিয়ে এদের হত্যা করা হয়েছে। পুট ও পানাবিলের মাঝে হিজল-করচের বনে বুনোতুলশী, নলখাগড়া দেখলাম। নলখাগড়া বনের দাগিঘাস পাখির সুরেলা ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত। এখানে রংবেরঙের গঙ্গাফড়িং, ঘাসফড়িং দেখে ছবি তুললাম। বিকেলে আরো পাখি ও বুনো গাছ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। এখানে বৃষ্টি, বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে পাখির রাজ্যে দুটি দিন যেন স্বপ্নের মতো গেল। ফিরতি পথেও ফাহিম-ফারহা পাখির রাজ্যেই ডুবে থাকল।

ছবি : লেখক
Source: Daily Kalerkantho

সাগরের ইলিশ হাকালুকি হাওরে

মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকী
হাকালুকি হাওর থেকে আহরিত সাগরের ইলিশের একাংশ

হাকালুকি হাওর থেকে আহরিত সাগরের ইলিশের একাংশ

বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সুস্বাদু একটি মাছ, যার নাম ইলিশ। শুনলেই ভোজন রসিক বাঙ্গালীর জিভে জল এসে যায়। এ মাছে রয়েছে ৫৩.৭ ভাগ পানি, ১৯.৪ ভাগ চর্বি, ২১.৮ ভাগ আমিষ এবং অবশিষ্টাংশ বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ। ইলিশে পাওয়া যায় শতকরা ৬০ ভাগ খাওয়ার উপযোগী flash বা মাছ। ইলিশে বিদ্যমান ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড মানুয়ের রক্তের কোলস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করে, ফলে হৃদরোগের ঝুকি কমাতে সাহায্য করে। এ মাছের আমিষে ৯ ধরনের এমাইনো এসিড পাওয়া যায় যা মানুষের পাকস্থলীতে তৈরী হতে পারে না। এছাড়া ইলিশে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ইত্যাদির পাশাপাশি ভিটামিন এ, ডি এবং কিছু পরিমাণ ভিটামিন বি পাওয়া যায়। ইলিশের স্বাদ এবং গন্ধ নির্ভর করে তার তেলের উপর এবং এর দেহস্থ সুঘ্রাণ ও ভাজার সময়ের ঘ্রাণ আশেপাশের মানুষের নাগের ডগায় কেন যে ছড়িয়ে পড়ে তার কোন সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া না গেলেও ইলিশ নিঃসৃত সুগন্ধি পার্থিব অনেক সুগন্ধিকেই হার মানায় নিঃসন্দেহে। আর সমুদ্র পাড়ের সে ইলিশ যদি এসে ধরা দেয় আমাদের স্বাদু পানি বেষ্টিত বিশাল গোলাকার চৌবাচ্চা সদৃশ বৃহত্তম হাকালুকি হাওরে তাহলে কেমন হয়!

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন স্বাদু পানির মৎস্য ভাণ্ডার বলে খ্যাত সিলেটের হাকালুকি হাওরে এ বছর (জুন) প্রচুর পরিমাণে ইলিশের সমাগম দেখা যাচ্ছে। অতীতে হাকালুকি হাওরে মাঝে মধ্যে দু’ একটা ইলিশ মাছ নজরে পড়লেও এ বছর এর পরিমান বেশ চোখে পড়ার মত। জানা যায়, আগাম বন্যা ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে এ বছর বেশ আগে ভাগেই হাকালুকি হাওর পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ফলে বিভিন্ন জাতের ছোট-বড় স্বাদু পানির মাছ ইতোমধ্যেই ডিম ছেড়েছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিদিনই জেলেদের জালে হাওরের অন্যান্য মাছের সাথে বেশ কিছু ঝাটকা ইলিশও ধরা পড়ছে। এ বারের আগাম বন্যায় হাওর প্লাবিত হওয়ার সাথে ইলিশের প্রজনন মৌসুম মিলে যাওয়াতে বেশী পরিমাণে ঝাটকা ইলিশ হাওরে ঢুকে পড়ছে বলে মনে করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের উপকূলীয় ও জলাভূমি জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (সিডবিস্নউবিএমপি) কুলাউড়া অফিসের মৎস্য জীববৈচিত্র্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকী।

প্রজনন মৌসুমে ইলিশ মাছ পূর্নিমার ৫ দিন আগে এবং ৫ দিন পরে ডিম ছেড়ে থাকে। এসময় দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদী এবং নদীর সাথে সংযোগ আছে এমন কিছু বিল ও হাওড় অঞ্চলে এদের দেখা মেলে। এছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জের কুশিয়ারা নদীতে এ সময়ে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম পরিমাণে বর্জ্য পানিতে নিষ্কাশনের কারনে অধিক পরিমাণে ইলিশ মাইগ্রেট করার সুযোগ পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া সরকারের ঝাটকা নিধন বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলেও ইলিশের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হয়। ইলিশ মাছ নদীর প্রায় ১২০০-১৩০০ কিঃমিঃ উর্দ্ধে পাওয়া যায় এবং এরা দিনে প্রায় ৭১ কিঃমিঃ পর্যন্ত পরিভ্রমণ করতে পারে। হাওরে প্রাপ্ত এ সকল ইলিশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে। ফ্রেশ ইলিশের স্বাদ একটু ভাল হলেও তা নদীতে প্রাপ্ত অন্যান্য ইলিশের মত অতটা সুস্বাদু নয় বলে জানা যায়। স্রোতের বিপরীতে চলে আসা এসব ঝাটকা অকালে জেলেদের জালে ধরা না পড়লে হাকালুকিতে এ বছর বেশ ভালই ইলিশ পাওয়া যেত বলে ধারণা করা হয়। পরিপক্ক এক একটা ইলিশ মাছ ওজন ভেদে প্রায় ১.০ -২০.০ লক্ষ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে।

প্রশাসনের সহায়তায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও মৎস্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যেই হাওরের ছোট মাছ নিধন রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু বিশাল আয়তনের হাওরের তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনসহ কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, ফেঞ্চুগঞ্জ এবং গোলাপগঞ্জের উপজেলা প্রশাসন একযোগে কাজ করলে হাওরের মৎস্য সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব বলে স্থানীয়দের ধারণা। এ ক্ষেত্রে জন প্রতিনিধিদের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ অতীব জরুরী। হাকালুকির ছোট মাছ রক্ষায় আশু পদক্ষেপ নেয়া না হলে হাওর পাড়ের মুনাফালোভী মহাজন চক্রের কারণে মৎস্য ভাণ্ডার বলে খ্যাত ‘হাকালুকি’ অচিরেই মৎস্য শূন্য হয়ে পড়বে বলে সকলের ধারণা করা হচ্ছে। আর ইলিশ, সেতো অতিথি পাখির মতই এসেছে আবার সুযোগ পেলে চলেও যাবে হয়ত। তবে তাদের বিচরন ও ফিডিং ক্ষেত্র রক্ষা করা গেলে আমরা বারবারই এদের ফিরে পেতে পারি বলে বিশেষজ্ঞগণ ধারণা পোষণ করেন।

Source: www.bdfish.org

এই তো মাধবপুর হ্রদ


এই তো মাধবপুর হ্রদ

স্বরূপ সোহান | তারিখ: ০৪-০১-২০১১

আরেকটু হলেই মিস হয়ে যেত। হাতে সময় ছিল মাত্র তিন ঘণ্টা। আগের তিন দিন পুরো শ্রীমঙ্গল চষে বেড়িয়ে আমরা যখন ঢাকা ফেরার ট্রেনের অপেক্ষায় ঠিক তখনই মাইক্রোবাসের ড্রাইভার মজিদ অনেকটা হাই তুলতে তুলতে বললেন, ‘সব জায়গায় তো গেলেন, মাধবপুর লেকটাই তো দেখলেন না।’ আমাদের নিয়ে মাইক্রোবাস সবে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান পেরিয়েছে। আমরা সবাই গাড়ির মধ্যেই হইচই করে উঠলাম। ‘দেখব না মানে, আলবৎ দেখব।’ গাড়িতে ছোট-বড় মিলে ১৫ জনের চিৎকারে ড্রাইভারের ভিরমি খাওয়ার দশা। ভাবটা এমন, বলেও দেখি বিপদ! ঘড়িতে তখন ১২টা ১০ মিনিট। আমাদের ট্রেন তিনটায়। ট্রেন মিস করার ভয়টা যে একেবারেই নেই তা নয়। তার পরও আমাদের সাজ্জাদ ভাই (সাজ্জাদ শরিফ, উপসম্পাদক, প্রথম আলো) একেবারে দলনেতার মতো সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললেন। গাড়ি ছুটে চলল দুই দিকের সবুজ চা-বাগানের মাঝের রাস্তা দিয়ে মাধবপুরের দিকে। গন্তব্য মাধবপুর হ্রদ।
একদম মসৃণ পিচঢালা রাস্তা নয়। বরং মাঝেমধ্যে একটু হোঁচট খেতে হয়। প্রায় আধ ঘণ্টা চলার পর আমরা গেটে পৌঁছালাম। গেট বলতে মাধবপুর টি-এস্টেটের প্রবেশদ্বার। মাধবপুরের এই টি-এস্টেটটি ন্যাশনাল টি-কোম্পানির অধীনে। সিলেটের ভৌগোলিক মানচিত্রে এর অবস্থান কমলগঞ্জ উপজেলায়। গেটম্যান সদা প্রস্তুত। দ্বার উন্মোচন হতেই আমাদের গাড়ি ঢুকে পড়ল চা-বাগানে। কিন্তু কোথায় হ্রদ? শাওন আপা, টিনা আর দীপা আপা সবাই অস্থির হ্রদ দর্শনে। সবার উৎকণ্ঠা উপেক্ষা করে নির্বিকার মজিদ ড্রাইভার গাড়ি পার্ক করল অনেকটা আচমকাই। পার্কিং দেখেই বুঝলাম, গাড়ির রাস্তা শেষ। এবার হন্টন। শুধু আমাদেরটাই নয়, পার্কিংয়ে আছে আরও বেশ কয়েকটি গাড়ি। আর এই গাড়ির পর্যটকদের ঘিরেই পার্কিংয়ে জমে উঠেছে কয়েকটি টিস্টল। ওখান থেকে জানা গেল, আর মাত্র দুই মিনিট হাঁটলেই মাধবপুর লেক। কোনোভাবেই চায়ের তৃষ্ণাটা যাচ্ছিল না। তাই ওই বাগানের গরম চা খেলাম আমরা সবাই। শীতের আমেজে অপূর্ব স্বাদ সেই ধোঁয়া ওঠা চায়ের।
লক্ষ্মীকান্ত চৌহান। আদিনিবাস ভারতবর্ষে। চাকরি সূত্রে বহু বছর এই মাধবপুর টি-এস্টেটে। কীভাবে যেন জুটে গেলেন আমাদের সঙ্গে। আমরা হাঁটছি আর লেকের গল্প শুনছি তাঁর কাছ থেকে। জানা গেল, প্রায় পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই হ্রদ। চা-বাগানের মেঠোপথে হাঁটার সময় চোখে পড়ল নানা বনৌষধি গাছ। আমলকী, হরীতকী, বহেরা কী নেই? দেখলাম চাগাছের নার্সারিও। চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, বীজগাছের পাতা থেকে নাকি চা ভালো হয় না। শুধু চা-পাতার জন্য কলম গাছাই উৎকৃষ্ট।
বড়সড় একটা ধাক্কা অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। মেঠোপথ দিয়ে একটু উঁচুতে উঠতেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল আমাদের। কোথায় এলাম? এত সুন্দর! চারদিকে অজস্র ছোট-বড় টিলার মধ্য দিয়ে নয়নাভিরাম হ্রদ। মনে হচ্ছিল ক্যানভাসে আঁকা ছবি দেখছি। পাশ থেকে চৌহান বললেন, ‘ওই টিলাগুলোর ওপর থেকে লেক আরও সুন্দর লাগবে, চলেন টিলার ওপর যাই।’ কিন্তু আমরা নির্বাক, দুই চোখ দিয়ে শুধু দেখছি সামনের অপার সৌন্দর্য। শুভ ভাই ভাঙলেন নীরবতা। ক্যামেরার ক্লিক শব্দে ফিরে এলাম বাস্তবতায়। হ্রদের টলমল পানিতে ফুটে আছে বেগুনি শাপলা। বাচ্চাদের সে কী চিৎকার! ওরা কখনো বেগুনি শাপলা দেখেনি। জানা গেল, এই শাপলা বহু বছর ধরে হ্রদের আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য।
এবার টিলায় ওঠার পালা। হ্রদ দর্শন হবে উঁচু থেকে। প্রায় ২০ মিনিট চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পৌঁছালাম সবচেয়ে উঁচু টিলার ওপর। টিলার ওপর আছে বসার জায়গা। ওখানে বসার আগ্রহ দেখা গেল না কারও। উঁচু থেকে হ্রদ দর্শনের লোভ সবার। সবুজ ঘন টিলাগুলোর মাঝ দিয়ে টলমলে পানি এঁকেবেঁকে গেছে। পাহাড়ি ফুল আর শাপলা যেন তার গয়না। শীতের দুপুরের নরম রোদের আলো আছড়ে পড়ছে চারদিকের টিলায়। আর তার ছায়া পড়েছে হ্রদের ফটিকসদৃশ হ্রদের পানিতে। সে এক মায়াময় দৃশ্য। পাশে দাঁড়ানো চৌহান ফিসফিস করে বললেন, ‘আপনারা একটু বাঁয়ে তাকান। ওই যে মেঘের মাঝে পাহাড়গুলো দেখছেন, ওটা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য।’ সত্যিই তো তাই। টিলার পূর্বদিকে মেঘের রাজ্যে ত্রিপুরাকে দেখে আমরা সবাই বিস্মিত। এত কাছে ত্রিপুরা। জানা গেল এখান থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে ভারত সীমানা। আর সেখানেই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ।
এবার নামার পালা। হ্রদ পেরিয়ে আমরা যেদিক দিয়ে টিলায় উঠেছি, এবার নামলাম তার উল্টো দিক দিয়ে। হ্রদের পাশ দিয়ে মসৃণ রাস্তা বানিয়েছে বাগান কর্তৃপক্ষ। পর্যটকদের সুবিধার জন্য এই রাস্তা তৈরি। শুনলাম অচিরেই পর্যটকদের জন্য আরও কিছু আয়োজন করতে চলেছে বাগান কর্তৃপক্ষ। এই হ্রদ ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনাও আছে তাদের। এই বদ্ধ হ্রদটি খরার দিনে শুধু চা-বাগানেরই তৃষ্ণা মেটাবে না, প্রকৃতিপ্রেমীরাও তাঁদের আকণ্ঠ ভরে পান করবেন প্রকৃতিসুধা।

হ্রদ দর্শনের খুঁটিনাটি

 ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল যেতে পারেন ট্রেনে। পারাবত, জয়ন্তিকা অথবা উপবনে। শ্রীমঙ্গলে নেমে বাসে এক ঘণ্টার পথ মাধবপুর টি-এস্টেট। অথবা শ্রীমঙ্গল থেকে মাইক্রোবাসও নিতে পারেন। ট্রেন অথবা বাসে সাকল্যে খরচ হবে জনপ্রতি ৪০০ টাকা।
 থাকতে পারেন শ্রীমঙ্গল অথবা কমলগঞ্জে। শ্রীমঙ্গলে ভালো হোটেল পাবেন। আর কমলগঞ্জে এনজিওর গেস্ট হাউস আছে। থাকা খরচ বাবদ প্রতি রাত এক হাজারের মধ্যে।
 মাধবপুর টি-এস্টেটের আশপাশে রেস্টুরেন্ট নেই। তাই আপনাকে কষ্ট করে তিন কিলোমিটার দূরে ভানুগাছে যেতে হবে খাওয়ার জন্য। অথবা প্যাকেট খাবার কিনে নিতে পারেন।
 স্যান্ডেল অথবা জুতা না পরে কেডস পরবেন। টিলায় উঠতে সুবিধা হবে।
 হ্রদ দর্শনে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না।
 বাগানে বসে বাগানের চা খেতে ভুলবেন না। এটি অন্য রকম এক মজা।
 যদি পিকনিক করতে চান, বাগান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিতে পারেন। পিকনিক করতে কোনো বাধা নেই। সারা দিন কেটে যাবে নয়নাভিরাম লেকে।

Source:

Prothom Alo

Thursday, January 6, 2011

অতিথি পাখির কলতানে মুখর বাইক্কা বিল

অতিথি পাখির কলতানে মুখর বাইক্কা বিল

আতাউর রহমান কাজল, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
একটু উষ্ণতার খোঁজে প্রতিবছরই ঝাঁকে ঝাঁকে আসে অতিথি পাখি। শীতের কুয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে হাজার হাজার অতিথি পাখির কলতানে আর ডানা ঝাপটানোর শব্দে এখন মুখর বাইক্কা বিল। সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে ছুটে আসা এই পাখিরা মুখর করে তুলেছে পুরো এলাকা। এবার আগের চেয়ে বেশি বিচিত্র রং আর হরেক প্রজাতির অতিথি পাখির সমাগম হয়েছে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের এই বিলে।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়োজিত ‘ইন্টিগ্রেটেড প্রটেকটেড এরিয়া কো-ম্যানেজমেন্টে’র (আইপ্যাক) সিলেট অঞ্চলের ক্লাস্টার ডিরেক্টর মাজহারুল ইসলাম জাহাঙ্গীর জানান, সুদূর সাইবেরিয়া, উত্তর আমেরিকা, হিমালয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শীতের শুরুতে প্রতি বছর ঝাঁকে ঝাঁকে আসে নানা প্রজাতির পাখি। ওইসব অঞ্চলে যখন শীত তীব্র হয়ে ওঠে ঠিক সেসময় এসব পাখি একটু উষ্ণতা ও খাদ্যের অন্বেষণে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে দলবেঁধে। এসব পাখির কিছু অংশ আমাদের দেশের বিভিন্ন হাওর, বিল ও জলাশয়ে ছুটে আসে নিরিবিলি একটু আশ্রয়ের সন্ধানে। এবার বাইক্কা বিলে আসা অতিথি পাখির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—রাজসরালী, পিনটেল, লেঞ্জাহাঁস, সাদাবক, জলপিপি, পানমুরগি, কাস্তেচড়া, বেগুনি কালেম, বালিহাঁস, ভুতিহাঁস, পাতিসরালী, পানকৌড়ি, ঈগলসহ আরও অনেক জাতের পাখি।
আইপ্যাক সূত্র জানায়, শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে পাখি শিকারিদের উপদ্রব কমে যাওয়ায় এবং জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়ায় এখানে অতিথি পাখির আগমন বেড়েই চলেছে। ইউএস এইডের তত্ত্বাবধান ও অর্থায়নে বাইক্কা বিল মত্স্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলার পর নিরুপদ্রব বাইক্কা বিল এখন অতিথি পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে আগের চেয়ে আরও বিচিত্র পাখির ঝাঁক ছুটে আসছে। বাড়ছে পাখির সংখ্যাও।
হাওরপাড়ের বাসিন্দা মো. মিন্নত আলী জানান, নভেম্বরের শুরু থেকেই হাওরে অতিথি পাখি আসতে শুরু করেছে। জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের আগমন অব্যাহত থাকবে। শীত শেষে মার্চে গ্রীষ্মের আভাস পেলে এসব পাখি আবার ফিরে যাবে আপন নীড়ে। এরই মধ্যে এ বিলের সৌন্দর্য বেড়ে গেছে অতিথি পাখিদের সমারোহে। নিরাপদ আশ্রয়ে মেতে উঠেছে জলকেলি আর ডুবসাঁতারে। কখনও তারা ঝাঁকে ঝাঁকে চক্রাকারে উড়ে বেড়াচ্ছে বিলের আকাশজুড়ে। কেউবা জলের মধ্যে খাবার জোগাড়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। আগত এসব পাখির কলকাকলি আর কিচিরমিচির শব্দে হাওরে এক মধুময় আবহ সৃষ্টি করে, যা সহজেই মন কাড়ে দেশি-বিদেশি পাখিপ্রেমিক আর পর্যটকদের।
মাজহারুল ইসলাম জাহাঙ্গীর আরও জানান, অতিথি পাখিরা আমাদের পরিবেশের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাখির বিষ্ঠা জলাভূমির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া পাখিরা কীটপতঙ্গ খেয়ে ফসলের ক্ষতি রোধ করতে সহায়তা করে। পাখির বিষ্ঠার কারণে দ্রুত বেড়ে ওঠে জলজ উদ্ভিদ, যা খেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পায় তৃণভোজী মাছ। এছাড়াও পাখিদের একটি বৃহত্ অংশ জলজ আগাছার অতিবৃদ্ধি রোধ করে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতিথি পাখিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শীতের এই অতিথিদের দেখতে বাইক্কা বিলে প্রতিদিন আসছেন দেশি-বিদেশি পর্যটক। পাখিদের জলকেলি আর নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে এখানে নির্মিত হয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। টাওয়ারে বসে বাইনোকুলার ও টেলিস্কোপ দিয়ে হাওরের প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করা যায়। নৌকায় চড়ে বাইক্কা বিলের অপরূপ সৌন্দর্য দেখা আর পাখিদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগও রয়েছে। অনেক বিদেশি পর্যটক এই বিলে এসে ডকুমেন্টারি ফিল্মও তৈরি করেন।
Source: Daily Amardesh, 6th January,2011

অতিথি পাখির কলকাকলীতে মুখরিত শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা : শীত নামার প্রারম্ভেই মাছ ও পাখির নিরাপদ অভয়াশ্রম শাপলা সালুক পূর্ণ চোখ ধাঁধাঁনো শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলে আসতে শুরু করেছে হাজার হাজার অতিথি পাখি। হাজার হাজার দেশী বিদেশী পাখির উড়াউড়ি, কিচির মিচির আর কলধ্বনিতে মুখরিত। বরফের দেশ সুদুর সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, জিনজিয়াং, নেপাল, ভুটান, ভারত ও পাকিস্তান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এসব পাখি আসছে। যে সব দেশে শীত মওসুমে ভয়াবহ ঠান্ডা আর তাপমাত্রা নেমে যায় হিমাঙ্কের অনেক নিচে। এসব দেশ থেকে কনকনে ঠান্ডা থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য পাড়ি জমায় অতিথি পাখিরা। শীত মওসুমে বরফের দেশে পাখিদের প্রকট খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তাপমাত্রা ও আবহাওয়া প্রতিকূল হয়ে পড়ে জীবনধারণের জন্য। আর সে কারণেই প্রতি বছর বিশেষ করে শীত মওসুমে পাখিরা মাইগ্রেট করে থাকে। উড়ে যায় দেশ-দেশান্তরে। যেখানে নেই খাদ্যাভাব।
শীত মওসুম পর্যন্ত এসব অতিথি পাখি বাইক্কা বিলে বিচরণ করে। শীত কমতে শুরু করলে আবার এসব অতিথি পাখি নিজ দেশে চলে যায়। তবে বাইক্কা বিলে আমাদের দেশীয় পাখির সাথে প্রেমে আবদ্ধ হয়ে অনেক পাখি নিজ দেশের মায়া ছেড়ে এখানেই স্থায়ী আবাস গড়ে। দেশের একমাত্র সরকার অনুমোদিত ও বৃহৎ পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে বাইক্কা বিল দেশ বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। এ বিলে পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ৩১ ফুট উচ্চতার টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে পর্যটকদের সুবিধার্থে। এটি বাংলাদেশে প্রথম জলাভূমি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। তাছাড়া দিগন্ত বিস্তৃত শাপলা শালুক আর হিজল করচের সমারোহ, হাজার হাজার পাখির উড়াউড়িকে খুব কাছে থেকে দেখার জন্য রয়েছে দুরবীণ ও বাইনোকুলার। পর্যটক ও দর্শনার্থীর জন্য নির্মিত পর্যবেক্ষণ দ্বিতল বিশিষ্ট এ টাওয়ার থেকে দুরবীণ ও বাইনোকুলার দিয়ে পাখি এবং বিশাল বিস্তৃত হাইল হাওরের সৌন্দর্য্যপুর্ণ ফুটন্ত শাপলায় ভরপুর জলাভূমি পর্যবেক্ষণ করা যায়। টাওয়ারের বিভিন্ন তলায় রয়েছে পাখি ও মাছের ছবিসহ পরিচিতি। এখানে এলেই পর্যটকদের আলাদা এক আনন্দ আর অনুভূতিতে পাখির জগতে নিয়ে যায়। শীতের মওসুম ছাড়াও এই সুবিশাল হাইল-হাওরের বাইক্কা বিলে হাজার হাজার পাখিদের জলকেলি, উড়াউড়ি আর কিচির-মিচির শব্দে মুখরিত থাকে। এ বছরের শীতের শুরু থেকে শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলের মৎস্য অভয়াশ্রম এলাকায় অতিথি পাখির আগমন উল্লেখযোগ্য এবং সংখ্যাও অন্যান্যবারের তুলনায় অনেক বেশি বলে জানালেন আইপ্যাক সংশ্লিষ্টরা।
প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা ও দুর্যোগের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে বিরল প্রজাতির পাখি। হারিয়ে যাওয়া পাখির নিরাপদ আশ্রয় গড়ে উঠেছে শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে। এখানে পাখিরা স্বাধীন ও প্রচুর খাবারসহ পেয়েছে বেঁচে থাকার আশ্রয়। তাইতো প্রতি বছর হাজার হাজার অতিথি পাখি ছুটে আসছে নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের সন্ধানে। ভাব জমিয়ে নিচ্ছে আমাদের দেশী পাখিদের সাথে। ক্রমশ সখ্যতা ও প্রেমের বন্ধনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে প্রচুর পাখি। যে দৃশ্য পর্যটকদের এনে দেয় অনাবিল আনন্দ ও সুখ। বিভিন্ন প্রজাতির দেশী-বিদেশী পাখির অভয়াশ্রম বাইক্কা বিলে পর্যটকদের আহবান করে প্রতিনিয়ত। নিজ চোখে না দেখলে দৃশ্য অনুধাবনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও দেশের সর্বপ্রথম ও বৃহৎ পাখির মেলা এখন বাইক্কা বিলে।
আদিকাল থেকে বিশাল এ জলাভূমিতে প্রতিবছর শীত মওসুমে লাখ লাখ অতিথি পাখির আগমন ঘটে। বিশেষ করে মেরু অঞ্চলের বরফময় দেশ সাইবেরিয়ার অতিথি পাখি নিয়ে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। চলতি মওসুমে হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে পাখির সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। হারিয়ে যাওয়া প্রজাতির মধ্যে পানছি কোড়া, ঈগল, কালা মাথা, মেঠে মাথা ঠিটি ইত্যাদি। বিপন্ন পাখিদের অভয়াশ্রম হিসাবে শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরকে আন্তর্জাতিক পাখি এলাকা হিসাবে নির্বাচন করার সামগ্রিক যোগ্যতা রয়েছে।
পাখি আর মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিতির পাশাপাশি হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে হিজল-করচসহ বিভিন্ন গাছের সবুজ বনায়নে হাইল হাওরের দৃশ্যপট আরও বদলে দিয়েছে। বাইক্কা বিলের চারদিকে এখন দিগন্তজুড়ে শুধু কেবল চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য আর সবুজের সমারোহ। হিজল করচের হাইল হাওরে যেমনি সবুজের প্রশান্তি এনে দিয়েছে তেমনি সবুজ রূপে সেজেছে। ২-৩ বছর ধরে হাওরের বাইক্কা বিলে আবারও লাল আর সাদা পদ্ম ফুলে ভরে উঠছে। মাঝে মাঝে দেখা যায় বিরল নীল পদ্ম। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে চারিদিক। এরই মাঝে ফুটে রয়েছে পদ্মটুনা। হাওরের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়া এখনো যে সম্ভব তার একটি উদাহরণ এই হাইল হাওরের বাইক্কা বিল। ইউএসআইডি'র সহায়তাপুষ্ট বেসরকারি সংস্থা মাচ প্রকল্প ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ হিসেবে হাইল-হাওরের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করে ২৫০ একর জলাভূমিকে মাছ ও পাখির জন্য অভয়াশ্রম গড়ে হাইল হাওরের অতীতের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করে। বর্তমানে আইপ্যাক তার দেখভাল করছে। হাইল-হাওরের পাড়, ছড়ারপাড় ও রাস্তার পাশে প্রাকৃতিক বাদাবন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য হিজল আর করচ বনায়ন শুরু করে। একই সঙ্গে লাগানো হয় অর্জুন, ক্ষুদিজাম, বট, জারুল, কাইনজাম, ডুমুর, পিটালী ও মেরুল গাছের চারা। এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮৫ হাজার চারা হাইল হাওরে লাগানো হয়েছে। পশু-পাখির নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ এ প্রকল্পের কাজ। এছাড়া হাইল হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি মাটির ক্ষয়রোধ এবং পরিবেশের উন্নয়নের উদ্দেশ্যেই এ বনায়ন করা হয়েছে। হাইল হাওরে জীববৈচিত্র্য রক্ষার কাজে নিয়োজিত আইপ্যাকের শ্রীমঙ্গল অফিসের সাইড কো-অর্ডিনেটর আমিনুল ইসলাম জানান, হাইল-হাওর থেকে হারিয়ে যাওয়া মাছ, গাছ ও পাখি মাত্র ৫-৬ বছরের ব্যবধানে হাওরে পুনর্বাসিত হতে শুরু করেছে তাছাড়া স্থানীয় মৎস্যজীবীসহ জলাভূমির অন্যান্য উপকারভোগীদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। তিনি আরও জানান, হাওরের কাগাউড়াকান্দি অর্থাৎ বাইক্কাবিলের পূর্বপাড়, বড় গাঙ্গিনার খালের পাড়, সানন্দাবিলের পাড়, জেঠুয়া বিলের পাড়, খইয়া বিলের পাড়, মেদী বিলের পাড় ও রামাইবিলের পাড়সহ প্রায় ১২ কিলোমিটার স্থান এখন হিজল করচসহ গাছের সবুজ আচ্ছাদন তৈরি করেছে। এসব গাছে এখন বাসা বেঁধেছে দেশীয় পাখি। এখানে ৯৮ প্রজাতির মাছের আবাসস্থল এবং ১৬০ প্রজাতির পাখির বিচরণ ক্ষেত্র। সম্প্রতি বার্ড লাইফ ইন্টারন্যাশনাল এ হাওরকে গুরুত্বপূর্ণ পাখি এলাকা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে তালিকাভুক্ত করেছে।

Source: Daily Sangram, 6th January

বাইক্কা বিলে ১২ হাজার পাখি

বিশ্বজ্যোতি চৌধুরী, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) | তারিখ: ১৫-০১-২০১০

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে হাইল হাওরের ‘বাইক্কা বিল অভয়াশ্রমে’ এ বছর ১২ হাজারেরও বেশি পাখি এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে শ্রীমঙ্গলে আইপ্যাক কার্যালয়ে পাখিশুমারি শেষে পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ সমন্বয়কারী ইনাম আল হক এ তথ্য প্রকাশ করেন।
‘এশিয়ান ওয়াটার বার্ড সেনসাসের’ উদ্যোগে ইনাম আল হক ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনালের দুজন স্বেচ্ছাসেবক ড. পল এম থম্পসন ও নিক ডায়মন্ডকে নিয়ে হাইল হাওরের বাইক্কা বিল অভয়াশ্রমে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই দিন অবস্থান করে পাখি গণনা করেন।
পাখি-বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক জানান, হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে প্রতিবছর পাখির সংখ্যা এবং প্রজাতি দুটোই বেড়ে চলেছে। এ বছর ৪০ প্রজাতির ১২ হাজার ২৫০টি জলচর পাখি বাইক্কা বিলে পাওয়া গেছে। বিলে একটি ডাহুক ও দুটি ফুলুরি হাঁস পাওয়া গেছে। জলচর পাখি ছাড়া আটটি পালাসী কুড়া ঈগল পাওয়া গেছে।
ইনাম আল হক বলেন, দেশি পাখি ডাহুক এখন সচরাচর দেখা যায় না। ফুলুরি হাঁস সাইবেরিয়া, উত্তর-পূর্ব চীন ও জাপানে বেশি দেখা যেত, কিন্তু এখন এরা প্রায় বিপন্ন। পালাসী কুড়া ঈগলও পৃথিবীব্যাপী বিপন্নপ্রায়।
ড. পল এম থম্পসন বলেন, ২০০৯ সালে বাইক্কা বিলে পাখি পাওয়া গিয়েছিল ৩৪ প্রজাতির নয় হাজার ৪০৫টি। এর আগের বছর পাওয়া যায় ৩৭ প্রজাতির সাত হাজার। এ বছর সবচেয়ে বেশি সাড়ে চার হাজারটি রাজ সরালি পাওয়া গেছে। সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে পাতি সরালি, যার সংখ্যা আড়াই হাজার। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পাখির মধ্যে রয়েছে বেগুনি কালেম, পাতি তেলি হাঁস, কটনটি, দলপিপি, নেউপিপি, ধুপনি বক, সাদা বক, কালাপাখ ঠেঙ্গি, সাইবেরিয়ার গিরিয়া হাঁস ও ল্যাঞ্জা হাঁস এবং মধ্য এশিয়ার মরচেরং ভূতি হাঁস।
বাইক্কা বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষার কাজে নিয়োজিত আইপ্যাক প্রকল্পের কর্মকর্তা (মনিটর) তাপস কুমার রায় জানান, ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনালের উদ্যোগে ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে জলচর পাখিশুমারি হয়ে থাকে। পাখিশুমারির মাধ্যমে পাওয়া তথ্যগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়।
Source: Daily Prothom-Alo, 15-01-2010

বাইক্কা বিল শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার হাইল হাওরে অবস্থিত বাইক্কা বিল এখন সাদা পদ্মে ভরা। এর আয়তন প্রায় ১০০ হেক্টর। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলগুলোর অন্যতম এ হাওরটি ৯৮ প্রজাতির মাছের আবাসভূমি এবং ১৬৫ প্রজাতির পাখির বিচরণক্ষেত্র। এখানে রয়েছে দ্বিতল একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। টাওয়ারে বসে পাখি কিংবা জলজ সম্পদ দেখার জন্য রয়েছে বাইনোকুলার ও টেলিস্কোপ। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে বাইক্কা বিলের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মোটর বাইকে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যেই পেঁৗছানো যায়।
লেখা ও ছবি : বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন

Source: Daily Kalerkantho, 22th July -2010

বাইক্কা বিলের মাখনা ফল ইসমাইল মাহমুদ, শ্রীমঙ্গলসুস্বাদু ফল হিসেবে সমাদৃত মাখনা ফল এখন শ্রীমঙ্গলস্থ হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে পাওয়া যাচ্ছে। সুপরিচিত মাখনা ফল হাওরপাড় এবং আশপাশ এলাকার মানুষের কাছে 'ফু-কল' নামে পরিচিত। শহুরে বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই ফলটি সম্পূর্ণ অপরিচিত। মাখনা ফলটি হাওরে জন্মানো কাঁটাযুক্ত ও লতানো ভাসমান এক ধরনের উদ্ভিদের ফল। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও সদর উপজেলার হাইল হাওরে কিছু কিছু বিলে মাখনা ফলের দেখা মেলে। ইদানীং শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলে বিলুপ্তপ্রায় মাখনা উদ্ভিদ ব্যাপকভাবে জন্মাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বাইক্কা বিল মৎস্য অভয়াশ্রম ও পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণার পর পাখিদের নিরাপদে বসার জন্য মাখনা উদ্ভিদের প্রসার বেড়েছে। হাওরপাড়ের বাসিন্দারা হাওর থেকে মাখনা ফল সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য প্রতিদিনই পাঠাচ্ছে ঢাকায়। বাইক্কা বিলের প্রায় ১০০ হেক্টর ফল আয়তনের অভয়াশ্রম এলাকায় বর্তমানে হাজার হাজার মাখনা পাওয়া যাচ্ছে। মাখনা ফলটির আকার অনেকটা লাটিমের মত। ফলটির রঙ গাঢ় সবুজ। গাছের পাতা হালকা সবুজ। লতানো গাছ ও ফলের মধ্যে অজস্র তীক্ষ্ন সুচালো কাঁটা রয়েছে। মাখনা ফলের পাতা বিশাল আকৃতির গোলাকার হওয়ার ফলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পাতার আড়ালে অনায়াসে লুকিয়ে থাকতে পারে। পাতায় পাতায় হেঁটে বেড়ায় পাখির দল। বাইক্কা বিলের মাখনা ফল সংগ্রাহকরা জানান, মাখনা কাঁটাযুক্ত ফল হলেও পানি থেকে তোলার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফলটির সুচালো কাঁটা সম্পূর্ণ নেতিয়ে পড়ে। প্রতিটি মাখনার ওজন সাধারণত ১৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত হলেও বাইক্কা বিলে অনেক সময় ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের মাখনাও পাওয়া যায়। প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই শতাধিক হাওরপাড়ের মানুষ মাখনা সংগ্রহ করে। উপজেলার সদর ইউনিয়নের সবুজবাগ, লালবাগ, ভাড়াউড়া, কালাপুর ইউনিয়নের হাজীপুর, বরুনা, সাতগাঁও ইউনিয়নের রুস্তমপুর, ভূনবীর ইউনিয়নের ভিমশী, ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকার হাওরপাড়ের অধিকাংশ অদিবাসী মৌসুমী ফল মাখনা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। প্রতিদিন গড়ে হাইল হাওর থেকে ৮ থেকে ১২ হাজার কেজি মাখনাফল সংগ্রহ করা সম্ভব। পাইকারি মাখনা ব্যবসায়ীরা ৭/৮ টাকা কেজি হিসেবে আহরণকারীদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পাঠায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পুরান ঢাকাবাসীর কাছে যথেষ্ট কদর রয়েছে মাখনা ফলের। তাছাড়া মাখনা ফল প্রসাধন শিল্পের কাঁচামাল ও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বাইক্কা বিল মৎস্য অভয়াশ্রমের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত 'মাঠ' প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা জানান, দেশের জলাশয় ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার কারণে মাখনা ফল প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। তাছাড়া হাওর অঞ্চলের উন্মুক্ত জলাভূমি থেকে ধ্বংসাত্মক পদ্ধতিতে মাছ ও মাখনা আহরণের ফলে ফলটি বিলুপ্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি। বিল সেচ করে মাছ ধরার সময় মাখনা উদ্ভিদকে কেটে ফেলা হয়। তাছাড়া অপরিপক্ব মাখনা ফল আহরণ করার ফলেও এসব হ্রাস পায়। মাখনা গাছে কাঁটা থাকার কারণে পদ্ধতিগত নিয়ম ছাড়া মাখনা আহরণের ফলে উদ্ভিদটি অনেক সময় পচে যায়। বাইক্কা বিল ও দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে জন্ম নেওয়া মাখনা সঠিক সময়ে পরিপক্ব উপায়ে সংগ্রহ করা হলে বিপুল পরিমাণ মাখনা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা যাবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন ।
Source: Daily Bangladesh Pratidin, 15th May, 2010

Related Links:

বেড়া নো : ঘুরে আসুন শ্রীমঙ্গল

Thursday, December 30, 2010

মাধবপুর থেকে মাধবকুণ্ড

মাধবপুর থেকে মাধবকুণ্ড

মাধবপুর থেকে মাধবকুণ্ড

মাধবপুর হ্রদে পৌঁছে বিস্ময়ে চোখ স্থির হয়ে যায়। এ যে নীল পদ্ম! একজন কবিতা আওড়ানো শুরু করলেন, ‘বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টি নীল পদ্ম…।’ গাইড শুধরে দিলেন এটা ঠিক ‘নীল পদ্ম’ নয়, ‘নীল শাপলা’। দলের সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ক্যামেরার ফ্রেমে স্মৃতি ধরে রাখতে। আমাদের গাইড জানালেন, ‘দেশে নীল শাপলা মাধবপুর ছাড়া অন্য কোথাও খুব একটা দেখা যায় না। এই নীল শাপলা দেখতে প্রতিদিন অনেক পর্যটক ভিড় জমায়।’ চারপাশে চা-বাগানের মধ্যে মাধবপুর যেন একটুকরো স্বর্গ। টলটলে লেকের পানি, চারপাশে চা-গাছ, বুনোফুল, নাম না জানা পাখির ডাক—সব মিলিয়ে উদাস করা সব মুহূর্ত।
ঈদের ছুটিতে আমাদের গন্তব্য ছিল শ্রীমঙ্গল—বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে জোগাড় করা হলো দর্শনীয় স্থানগুলোর ঠিকানা। কিন্তু এর অনেকগুলোরই অবস্থান শ্রীমঙ্গলের বাইরে। মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত পড়েছে বড়লেখা উপজেলায়। মাধবপুর হ্রদ কমলগঞ্জে। লাউয়াছড়া বন শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ মিলিয়ে। আর পাখিদের অভয়ারণ্য ‘বাইক্কা বিল’ পড়েছে শ্রীমঙ্গলে। সবাই নিশ্চিত করলেন, শ্রীমঙ্গলে আস্তানা গাঁড়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
শ্রীমঙ্গলজুড়ে বাগানের পর বাগান চা-গাছের সারি। শ্রীমঙ্গল পৌঁছে সহজেই আবহাওয়ার বদলটা টের পাওয়া গেল। কিছুটা বিশ্রামের পর ঠিক করা হলো তিন দিনের ‘মহাপরিকল্পনা’। ঠিক হলো, প্রথম দিনই যাব মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে। দ্বিতীয় দিন লাউয়াছড়া বন, মাগুরছড়া পুঞ্জি ও মাধবপুর লেক। আর তৃতীয় দিন বাইক্কা বিল ও সিতেশ বাবুর মিনি চিড়িয়াখানায়। তিন দিনের জন্য একটা গাড়ি রিজার্ভ করা হলো।
শ্রীমঙ্গলে আমরা ছিলাম চা-গবেষণাকেন্দ্রের রেস্ট হাউসে। প্রথম দিন আমাদের চোখ মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের দিকে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাধবকুণ্ডের দূরত্ব ৯৩ কিলোমিটার। সময় লাগল ঘণ্টা দুয়েক। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমরা পৌঁছালাম মাধবকুণ্ডে। স্রোতস্বিনী জলের কলকল ধ্বনি শোনা যাচ্ছে কিছুটা দূর থেকেই। প্রায় ২০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে তীব্রবেগে সশব্দে নেমে আসছে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের ধারা। জলতরঙ্গের আরও কাছে এগিয়ে যাই। নিরাপত্তারক্ষীর ‘না’। কাছে যেতে মানা—দুর্ঘটনা ঠেকাতে বেষ্টনী দিয়ে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সময় গড়িয়ে যায়। জলপ্রপাতের সঙ্গে মেশে বিকেলের আলোর খেলা। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই রওনা দিই শ্রীমঙ্গলের পথে।
পরদিনের জন্যও গাড়ি ঠিকঠাক। গন্তব্য লাউয়াছড়া। শ্রীমঙ্গল থেকে লাউয়াছড়ার দূরত্ব মাত্র আট কিলোমিটার। সময় লাগল মিনিট বিশেক। এবার লাউয়াছড়ায় সবুজের অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার সুখ। এত প্রাণবৈচিত্র্যে ভরা বন বাংলাদেশের আর কোথাও চোখে পড়ে না। এ বনের আয়তন এক হাজার ২৫০ হেক্টর। সারা দিন ঘুরেও শেষ করা যায় না। তবে এক ঘণ্টায় সংক্ষেপে কীভাবে ঘুরে আসা যাবে, তারও একটা রুট আছে। লাউয়াছড়া বনে চোখে পড়বে বানর, উল্লুক, চশমা পরা হনুমান, বনবিড়াল, কাঠবিড়ালিসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। কখনো কখনো দেখা মেলে মায়াহরিণ আর শজারুর।
লাউয়াছাড়া উদ্যান থেকে এবার আমরা আদিবাসী খাসি (খাসিয়া) অধ্যুষিত মাগুরছড়া পুঞ্জিতে গেলাম। মাতৃতান্ত্রিক খাসি পরিবারের মেয়েরাই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। খাসিপল্লিতে দেখা গেল, খাসি মেয়েরা অসম্ভব দ্রুততায় পান সাজিয়ে সাজিয়ে পালা করছে। পাইকার ব্যবসায়ীরা ঘরে ঘরে এসে পান কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এখান থেকে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধের দূরত্ব ১২ কিলোমিটারের মতো। মুক্তিযুদ্ধের এই বীর যোদ্ধাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফিরে আসতে আসতেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
তৃতীয় দিন আমাদের গন্তব্য ‘বাইক্কা বিল’। শ্রীমঙ্গল থেকে বাইক্কা বিলের দূরত্ব ১৩ কিলোমিটার। হাইল হাওরের অন্তর্ভুক্ত বাইক্কা বিল পাখির অভয়ারণ্য। নানা প্রজাতির হাজারও পাখি রয়েছে এখানে। ছোট্ট নৌকায় বিল পরিদর্শনের সময় কোলে এসে বসবে কত যে পাখি! ওরাও জেনে গেছে, এরা শিকারি নন, পর্যটক। সারা দিনই এখানে কাটাতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, তাই ফিরতে হয়।
আমাদের রেস্ট হাউসের চারপাশে চা-বাগান। বিকেলে সিতেশ বাবুর মিনি চিড়িয়াখানায় একটু ঢুঁ দিয়ে আমরা চলে যাই ‘নীলকণ্ঠ চায়ের দোকানে’। এখানে নানা রঙের চা পাওয়া যায়। দুই, তিন, চার থেকে সাত লেয়ার।
শ্রীমঙ্গলে এলাম আর মণিপুরি শাড়ি কেনা হবে না, তা কী হয়। নীলকণ্ঠ চায়ের দোকানের কাছেই মণিপুরি আদিবাসীদের বেশ কয়েকটি শোরুম রয়েছে। মণিপুরি শাড়ি, কামিজ, ওড়না, ফতুয়া কেনার ধুম পড়ে গেল পুরো দলে।
রাতে ফিরে ‘সমাপনী আড্ডা’। ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল। মধ্যরাত এগিয়ে আসে। রাতের ট্রেনের স্লিপিং বার্থে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পরদিন সকালে পৌঁছালাম ঢাকায়। ঢাকা তখনো ফাঁকা। এবং সুন্দর।

কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন
ঢাকার সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে শ্রীমঙ্গলে (মৌলভীবাজার) আধাঘণ্টা পর পর বাস রয়েছে। নন-এসির মধ্যে শ্যামলী পরিবহন ও হানিফ পরিবহন। এ ছাড়া টিআর ট্রাভেলসের এসি বাস রয়েছে। বাসে ঢাকা থেকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌঁছাতে সময় লাগবে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টার মতো।
ট্রেনে যাওয়ারও পথ রয়েছে। উপবন এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস। তবে সময় একটু বেশি লাগবে। ছয় থেকে সাড়ে ছয় ঘণ্টা। ঈদের মৌসুমে ট্রেনের টিকিট অবশ্যই আগাম কেটে রাখা উচিত।
শ্রীমঙ্গলে থাকার অনেক ধরনের ভালো বন্দোবস্ত রয়েছে। চা-গবেষণা ইনস্টিটিউটের রেস্ট হাউস, টি-রিসোর্ট। টি-রিসোর্টে একটি বাংলো পুরোটাই ভাড়া নিতে হয়। শ্রীমঙ্গল শহরে মানসম্পন্ন অনেক হোটেল রয়েছে। টি-টাউন রেস্ট হাউস, সন্ধ্যা হোটেল, এলাহী প্লাজা, হোটেল তাজমহল, হোটেল বিরতি, হোটেল রহমানিয়া উল্লেখযোগ্য। ভাড়াও নাগালের মধ্যেই। এ ছাড়া দলের সদস্যসংখ্যা বেশি হলে তিন-চার দিনের জন্য বাড়িও ভাড়া নিতে পারেন। এ ছাড়া কমলগঞ্জেও রয়েছে হিড বাংলাদেশ নামের একটা উন্নয়ন সংস্থার রেস্ট হাউস। ঈদের ছুটিতে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার আগে হোটেল বা বাংলোর বুকিং নিশ্চিত করে যাওয়া উচিত।

ফিরোজ জামান চৌধুরী
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ২৪, ২০১০

পর্যটকের পদভারে মুখরিত মাধবকুণ্ড

০০০ বিয়ানীবাজার সংবাদদাতা

বড়লেখার মাধবকুণ্ডে ইংরেজি নববর্ষের দ্বিতীয় দিনেও হাজার হাজার পর্যটকের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে। ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সৌন্দর্য পিপাসুরা মাধবকুণ্ডে জড়ো হতে থাকেন। বেলা যত বাড়তে থাকে পর্যটকদের ভিড় ও জনসমুদ্রে রূপ নেয়। পিকনিক স্পট ও ইকোপার্ক মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের নিচে পর্যটকদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না।

বড়লেখা-কুলাউড়ার সহকারী পুলিশ সুপার আহাদুজ্জামান ইত্তেফাককে জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পুলিশ বিশেষ নজরদারি করায় পর্যটকরা কম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পর্যটকরা জানান, দেশের একমাত্র জলপ্রপাত মাধবকুণ্ডকে যে রকম সাজিয়ে তোলা দরকার সে রকম হচ্ছে না। নতুন সাজে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তুললে শুধু নতুন বছরের এক দিন নয়, প্রতিদিনই দেশ-বিদেশ থেকে হাজারও পর্যটকের পদভারে মুখরিত হবে।
Source: Daily Ittefaq, 6th january, 2011

Sunday, December 5, 2010

সাতছড়ির বনে

সাতছড়ির বনে

০০ আলোকচিত্র ও লেখা মুস্তাফিজ মামুন ০০

সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। রঘুনন্দন পার্বত্য বনভূমিতে সংরক্ষিত এ বনাঞ্চলের বিস্তৃতি প্রায় ২৪৩ হেক্টর। উদ্যানটির গোড়ার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জুমচাষ করতে করতে এক সময় রঘুনন্দন পাহাড়ের বনভূমি শেষ হয়ে যায়। পরে ১৯০০ সালের দিকে কাঠ উৎপাদনের জন্য প্রচুর গাছ লাগানো হয় পাহাড়ি এ অঞ্চলে। এরপরে ১৯১৪ সালে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে সরকারের খাতায় নাম লেখায় জায়গাটি। এর দীর্ঘকাল পরে ২০০৫ সালে এ এলাকার নির্দিষ্ট কিছু জায়গা নিয়ে জাতীয় এ উদ্যানটির প্রতিষ্ঠা। সাতছড়ি অর্থ সাতটি ছড়া, অর্থাৎ পাহাড়ি ঝরণা। এসব ছড়ার কোনো কোনটির দেখা মেলে আজও।



রাজধানী থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জাতীয় এ উদ্যানটিতে জীববৈচিত্র্যের কমতি নেই। উদ্যানের বাসিন্দা প্রায় ১৯৭ প্রজাতির জীবের মধ্যে ১৪৯ প্রজাতিই পাখি। সাতছড়িকে তাই পাখির রাজ্য বললেও কমবেশি বলা হবে না। এছাড়া ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬ প্রজাতির উভচর প্রাণীর সন্ধান মিলেছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। মুখপোড়া হনুমান, চশমা হনুমান, উলস্নুক, লজ্জ্বাবতী বানর, কুলু বানরের মতো বিরল প্রাণীর দেখা মেলে এ উদ্যানে। এছাড়া মায়া হরিণ, খিদির শুকর, বন্য শুকর, বেজি, গন্ধ গোকুল, বনবিড়াল, মেছো বাঘ, কটকটি ব্যাঙ, গেছো ব্যাঙ, গিরগিটি, বিভিন্ন রকমের সাপ, গুঁইশাপ প্রভৃতি রয়েছে এ বনে। ফিঙ্গে, কাঠঠোকরা, মথুরা, বনমোরগ, ধনেশ, লাল ট্রগন, পেঁচা, সুই চোরা এ বনের উলেস্নখযোগ্য পাখি।

পর্যটকদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে তিনটি ট্রেইল পথ আছে। একটি আধা ঘণ্টার, অন্যটি এক ঘণ্টার এবং আরেকটি তিন ঘন্টার হাঁটাপথ।

আধা ঘণ্টার হাঁটা পথটির শুরু সাতছড়ি রেঞ্জ কার্যালয়ের প্রবেশপথের কাছাকছি প্রধান সড়কের পাশে 'ওয়াইল্ডারনেস এরিয়া' লেখা বোর্ডের কাছ থেকে। সড়কের দক্ষিণ দিকে পথের শুরু হয়ে চক্রাকারে ঘুরে আবার একই জায়গায় এসে পথটি ইতি টেনেছে। সাতছড়ি উদ্যানের ভেতরে একমাত্র ত্রিপুরা বা টিপরা আদিবাসী পাড়াটিতে এ পথেই যেতে হবে।

এক ঘণ্টার হাঁটাপথটির শুরু আগের ট্রেইলটি অর্থাৎ আধাঘণ্টার পথ ধরে। এ পথের শুরুতে ডানদিকে প্রথম যে বাঁকটি টিপরা পাড়ার দিকে গেছে, সেদিকে না গিয়ে আরো কিছুটা পথ চলে দ্বিতীয় বাঁকটি ধরে চলতে হবে। একটু সকালের দিকে এবং নিরবতা বজায় রাখলে এ পথে দেখা মিলতে পারে উলস্নুকের মতো বিপন্ন প্রাণী।

তিন ঘণ্টার হাঁটাপথটির দৈর্ঘ্য প্রায় ছয় কিলোমিটার। অন্য দুটি পথের পাশ থেকেই এটিরও শুরু। তবে শেষ হয়েছে পূর্ব দিকের চাকলাপুঞ্জি চাবাগানের কাছাকাছি প্রধান সড়কে এসে। এ পথটির বেশিরভাগই শুকনা ছড়াপথ। উলস্নুক, চশমা হনুমান, মুখপোড়া হনুমানসহ নানান পাখির দেখা মিলতে পারে এ পথে।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানটির মধ্যে যে টিপরা পাড়াটি আছে, সেখানে আদিবাসী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ২৪টি পরিবারের বসবাস। বন দেখার সঙ্গে সঙ্গে এখানে দেখে আসতে পারেন এ আদিবাসীদের জীবনধারা।

এছাড়া সাতছড়ির আশপাশে বেশ কটি চাবাগানও আছে। এখানকার উলেস্নখযোগ্য বাগানগুলো হলো সাতছড়ি, লালচান্দ, দেউন্দি, লস্করপুর, চণ্ডিছড়া, চাকলাপুঞ্জি, চান্দপুর, নালুয়া, শ্রীবাড়ি, দারাগাঁও, রেমা, পারকুল প্রভৃতি। এই চাবাগানগুলোর সৌন্দর্যও অবর্ণনীয়। এ সময়ে গেলে দেখতে পাবেন চা-শ্রমিকদের পাতা তোলার কৌশল।

সাতছড়ি উদ্যানে খরচপাতি

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে প্রবেশের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক জনপ্রতি ২০ টাকা, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও ছাত্র জনপ্রতি ১০ টাকা, বিদেশিদের জন্য ৫ ইউএস ডলারের সমমূল্যের টাকা। উদ্যানের বনভোজনকেন্দ্র ব্যবহার করতে চাইলে জনপ্রতি ১০ টাকা হিসেবে দিতে হবে। এছাড়া কার, জিপ ও মাইক্রোবাস পার্কিং ২৫ টাকা। উদ্যানের নির্ধারিত গাইড সেবা পাওয়া যাবে ১৫০-৩০০ টাকা ঘণ্টায়।

কিভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে সাতছড়ি যাবার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো সিলেটগামী যে কোনো বাসে মাধবপুর মুক্তিযোদ্ধাচত্ত্বরে নেমে সেখান থেকে বাস কিংবা ম্যাক্সিতে চড়ে একেবারে উদ্যানের দুয়ারে যাওয়া যায়। এছাড়া ঢাকা থেকে রেল ও সড়কপথে হবিগঞ্জ গিয়ে, সেখান থেকেও সাতছড়ি আসা যায়। ট্রেনে হবিগঞ্জ যেতে হলে নামতে হবে সায়েস্তাগঞ্জ স্টেশনে। স্টেশন থেকে শহরের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। ঢাকার কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬.৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, দুপুর ২.০০ মিনিটে প্রতিদিন ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাাহের প্রতিদিন রাত ১০.০০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ভাড়া এসি সিট ২৯৯ টাকা, প্রথম শ্রেণী বার্থ ২৬০ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ১৭৫ টাকা, সি্নগ্ধা শ্রেণী ৩০৫ টাকা, শোভন চেয়ার ১২০ টাকা, শোভন ৯৫ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮.১৫ মিনিটে যায় পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এবং শনিবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯.০০ মিনিটে উদয়ন এক্সপ্রেস। ভাড়া প্রথমশ্রেণী বার্থ ৩৩৫ টাকা, প্রথমশ্রেণী সিট ২২৫ টাকা, সি্নগ্ধা শ্রেণী ৩৯৭ টাকা, শোভন চেয়ার ১৫৫ টাকা, শোভন ১৪০ টাকা। ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে অগ্রদূত পরিবহন (০১৭১৬০৩৮৬৯), দিগন্ত পরিবহন (০১৭১১৩২৯৯৪৪) এবং বিছমিলস্নাহ পরিবহন (০১৭১১৯০৮৬৮৪) হবিগঞ্জ যায় । ভাড়া এসি ২৫০ টাকা এবং নন-এসি ২০০ টাকা। হবিগঞ্জ সদর থেকে বাসে চড়ে আসা যায় সাতছড়ি।

কোথায় থাকবেন :ঢাকা থেকে দিনে দিনেই সাতছড়ি বেড়িয়ে আসা সম্ভব। তবে থাকতে চাইলে সারাদিন ঘুরে হবিগঞ্জ শহরে গিয়ে থাকা যাবে। সেজন্য খুব সকালে সিলেটের যে কোনো বাসে এসে মাধবপুরের মুক্তিযোদ্ধাচত্ত্বরে নেমে সাতছড়ি আসতে হবে। তবে ফিরতি পথে হবিগঞ্জ হয়ে ফেরাই উত্তম। কারণ মুক্তিযোদ্ধা চত্ত্বরে ঢাকাগামী ভালো বাস স্টপেজ দেয় না। আর হবিগঞ্জ শহরে থাকার জন্য কয়েকটি সাধারণ মানের হোটেল আছে। হোটেল সোনার তরী (০১৭১১২৩৩৩৩২, এসি দ্বৈত কক্ষ ৭০০ টাকা, নন-এসি একক কক্ষ ৩০০ টাকা, নন-এসি দ্বৈত কক্ষ ৩৫০ টাকা), হোটেল জামিল (০১৭১৮৭৯২১৭৪, এসি দ্বৈত কক্ষ ৭০০ টাকা, নন-এসি একক কক্ষ ৩০০ টাকা, নন-এসি দ্বৈত কক্ষ ৪০০ টাকা)।

জরুরি প্রয়োজনে : আধুনিক সদর হাসপাতাল ০১৭৩০৩২৪৮১৭, চুনারুাঘাট উপজেলা স্বাস্থ্যকমপেস্নক্স ০১৭৩০৩২৪৭৩১, পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ০৮৩১-৫২২৫৭, সদর থানা ০৮৩১-৫২২২৩, চুনারুঘাট থানা (০৮৩২৫-৫৬০০২, ০১৭১৩-৩৭৪৪০০)।

Wednesday, October 27, 2010

বেড়া নো : ঘুরে আসুন শ্রীমঙ্গল

বেড়া নো : ঘুরে আসুন শ্রীমঙ্গল

আতাউর রহমান কাজল
চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গল। পাহাড়, অরণ্য, হাওর আর সবুজ চা-বাগান ঘেরা শ্রীমঙ্গল। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য আর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে যাওয়ার এখনি সময়। প্রকৃতির সুরম্য নিকেতন শ্রীমঙ্গলে দেখার আছে চা-বাগানের পর চা-বাগান, চা প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র, লাউয়াছড়া রেইনফরেস্ট, মাগুরছড়া গ্যাসকূপ, চা গবেষণা কেন্দ্র, লাউয়াছড়া ইন্সপেকশন বাংলো, খাসিয়া পুঞ্জি, মণিপুরীপাড়া, হাইল-হাওর, ডিনস্টন সিমেট্রি, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান নির্মাই শিববাড়ি, টি-রিসোর্ট, ভাড়াউড়া লেক, হাজার প্রজাতির গাছ-গাছালি, দিগন্তজোড়া হাওর প্রভৃতি।
চা শিল্পের জন্য শ্রীমঙ্গলের সুনাম ও পরিচিতি বিশ্বব্যাপী। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শ্রীমঙ্গলের অবস্থান। ৪২৫ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জনপদের সঙ্গে রেল ও সড়কপথে যোগাযোগ রয়েছে সারা দেশের। ভ্রমণবিলাসীদের কাছে এ এলাকাটি যেন তীর্থস্থান।
কী কী দেখবেন
চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) : চারদিকে সবুজের সমারোহ। যেদিকে চোখ যায়, চা-বাগান আর চা-বাগান। এরই মাঝে দাঁড়িয়ে আছে দেশের একমাত্র চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। এ ক্যাম্পাসে আছে সারিবদ্ধ পাম, ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি বৃক্ষের শোভা। লেকের জলে ফুটন্ত লাল জলপদ্ম। এছাড়াও এখানে রয়েছে একটি চা প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র। পরিচালকের অনুমতি সাপেক্ষে চা কারখানাসহ পুরো এলাকাটি আপনি দেখে নিতে পারেন। টি রিসোর্ট : শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশে ভাড়াউড়া চা-বাগান সংলগ্ন ২৫.৮৩ একর জায়গার ওপর টি রিসোর্টের অবস্থান। অন্যান্য সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য সুইমিংপুলসহ একটি অত্যাধুনিক টেনিস কোর্ট ও একটি ব্যাডমিন্টন কোর্টও রয়েছে এখানে। ২ রুম বিশিস্ট কটেজের ভাড়া ৩ হাজার টাকা এবং ৩ রুমবিশিষ্ট কটেজের ভাড়া ৪ হাজার টাকা। ভিআইপি রুম ২ হাজার টাকা এবং আইপি রুম দেড় হাজার টাকা।
সিতেশবাবুর চিড়িয়াখানা : দুর্দান্ত সাহসী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদ সিতেশরঞ্জন দেব। এ মানুষটির সখ্য বনের পশু-পাখিদের সঙ্গে। সেই সখ্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ শহরের মিশন রোড এলাকায় তার নিজ বাসভবনে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা মিনি-চিড়িয়াখানাটি।
লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক : শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ন্যাশনাল পার্ক লাউয়াছড়ার অবস্থান। শ্রীমঙ্গল থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে অথবা বাসে চড়ে আপনি আসতে পারেন এই বনে। এখানে একটি পিকনিক স্পট আছে। এর নাম শ্যামলী। শ্যামলী থেকে আর কিছুদূর পথ গেলে লাউয়াছড়া বন বিট অফিস ও ইন্সপেকশন বাংলো চোখে পড়বে। বন বিট কার্যালয়ের সামনে দেখতে পাবেন দক্ষিণ এশিয়ার বিরল প্রজাতির ‘আফ্রিকান টিক ওক’ বৃক্ষ যা দীর্ঘকাল থেকে ক্লোরোফর্ম বৃক্ষ নামে পরিচিত। এখানে পৌঁছার পর আপনি ইচ্ছে করলে হারিয়ে যেতে পারেন ঘন সবুজ অরণ্যে। দেখতে পাবেন উল্লুক, বনমোরগ, খরগোশ, বানর, হনুমান, হরিণ, ভল্লুক, চিতাবাঘসহ নানা প্রজাতির পশুপাখি। এসব প্রাণী দেখতে বনের একটু গভীরে যেতে হবে। ভেতরে যেতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ইকো-ট্যুর গাইডের সাহায্য নিতে পারেন।
ভাড়াউড়া লেক : শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ২ কিলোমিটার দূরে জেমস ফিনলে কোম্পানির চা-বাগান ভাড়াউড়ায় রয়েছে একটি লেক। লেকে রয়েছে জলপদ্মের মেলা। চা -বাগানের বুকে এই লেকটির আকর্ষণ কম নয়। এখানে আছে বানর আর হনুমানের বিচরণ। শীতে দলবেঁধে আসে অতিথি পাখি। পাহাড়ের কাছাকাছি গেলেই দেখতে পাবেন একসঙ্গে অনেক বানর। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। দেখবেন বানরগুলো আপনাকে ভেংচি কাটছে।
নির্মাই শিববাড়ি : আজ থেকে প্রায় ৫৫২ বছর আগে ১৪৫৪ খ্রিস্টাব্দে শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা পরগণার শঙ্করসেনা গ্রামে নির্মাই শিববাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে বালিশিরা অঞ্চলে ত্রিপুরার মহারাজা রাজত্ব করতেন। প্রবল শক্তিশালী এ রাজার বিরুদ্ধে ‘কুকি’ সামন্তরাজা প্রায়ই বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। এরকম কোনো একদিন কুকিরাজার বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে মহারাজা একদল সৈন্য পাঠান বিদ্রোহ দমন করতে। তুমুল এ যুদ্ধে কুকিরা পরাজিত হলেও মহারাজার প্রধান সেনাপতি রণক্ষেত্রে নিহত হন। বিয়ের অল্প ক’বছরের মধ্যেই স্বামীহারা হন মহারাজা কন্যা নির্মাই। তখনকার দিনে ভারতবর্ষে সহমরণ প্রথা চালু ছিল। কিন্তু রাজকন্যা সহমরণে রাজি না হয়ে স্বামী নিহত হওয়ার স্থানে এসে শিবের আরাধনা শুরু করেন এবং সিদ্ধিও লাভ করেন। তার নামেই শিববাড়ির নামকরণ করা হয় নির্মাই শিববাড়ি। ঐতিহাসিক এই স্থানটি ধর্মীয় পৌরাণিক কাহিনী, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আচার-আচরণে একটি অন্যতম তীর্থস্থানের মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে লাইটেস, কার ও টেম্পোযোগে ৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই এখানে পৌঁছা যায়।
হাইল-হাওর : শ্রীমঙ্গল শহরের পশ্চিম প্রান্তে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আছে এককালে বৃহত্তর সিলেটের মত্স্যভাণ্ডার বলে খ্যাত বিখ্যাত হাইল-হাওর। এই হাওরে শীত মৌসুমে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে আসে অতিথি পাখিরা। তারা দল বেঁধে হাওরে সাঁতার কেটে বেড়ায়। নৌকায় চড়ে অতিথি পাখিদের সাঁতার কাটা, জলকেলি ও জেলেদের মা ছধরার দৃশ্য দেখতে পারেন। হাওরের বাইক্কা বিলে নির্মিত পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে অতিথি পাখিদের দেখতে পারবেন। শীত মৌসুমে বাইক্কা বিলে হাজার হাজার পাখির অবাধ বিচরণের দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।
মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জি : বনবাদাড় আর গাছপালার সবুজ সমুদ্রের বুক চিরে চলে যাওয়া সড়ক আর রেলপথ পেরুলেই রয়েছে খাসিয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের একটি পুঞ্জি। এ পুঞ্জির নাম মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জি। মাটির সিঁড়ি বেয়ে আপনি উঠে যেতে পারেন টিলা-পাহাড়ের মাথায়। ছোট ছোট অনেক টিলার উপর তারা গড়ে তুলেছেন নিজ নিজ বসতবাড়ি। তাদের ভাষায় একে বলে পুঞ্জি। খাসিয়া সম্প্রদায় গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বাস করে এখানে। প্রতিটি পুঞ্জিতে একজন করে মন্ত্রী (খাসিয়াদের প্রধান) থাকেন। পুঞ্জির মানুষের জীবনযাত্রাকে জানতে হলে মন্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন। খাসিয়ারা থাকে শহরের যান্ত্রিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মেজাজে, ভিন্ন পরিবেশে। একটু চোখ ফেরালেই দেখতে পাবেন পানের বরজ। খাসিয়া পুঞ্জি ঘুরে আপনি সহজেই খাসিয়াদের স্বতন্ত্র এবং বিচিত্র জীবনধারা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। মাগুরছড়া পরিত্যক্ত গ্যাসকূপ : ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন গভীর রাতে এ গ্যাসকূপে ড্রিলিংয়ের সময় অগ্নিবিস্ফোরণে আশপাশের খাসিয়া পুঞ্জি, চা-বাগান, রেললাইন, সবুজ বনাঞ্চল সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই গ্যাসকূপটি এখন পরিত্যক্ত এবং সংরক্ষিত এলাকা। চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া। গত ৮ বছর ধরে এ এলাকাটিতে আবার সজীবতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে বন বিভাগ। আগুনে পোড়া গাছগুলো এখনও কালের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মাগুরছড়ায়। দর্শনার্থীরা এ এলাকায় বেড়াতে এসে অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করে মাগুরছড়ার দৃশ্যাবলি। অগ্নিকাণ্ডের কারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিলুপ্ত জীববৈচিত্র্য অচিরেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কিনা এ নিয়েও রয়েছে সংশয়। মাগুরছড়ার এ এলাকাকে এখন অনুপম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা যায়। শ্রীমঙ্গল থেকে সড়কপথে এখানে আসতে নয়ন ভোলানো প্রাকৃতিক দৃশ্য এই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন প্রয়োজন কেবল উদ্যোগ আর আন্তরিকতার।
ডিনস্টন সিমেট্রি : শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ডিনস্টন চা-বাগানে এর অবস্থান। শতাধিক বছর আগে শ্রীমঙ্গলের ডিনস্টন চা-বাগানে ডিনস্টন সিমেট্রি’র গোড়াপত্তন হয়। ১৮৮০ সালে শ্রীমঙ্গল অঞ্চলে ব্রিটিশদের দ্বারা বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হওয়ার পর সুদূর ব্রিটেন থেকে এখানে টি প্ল্যান্টারদের আগমন ঘটতে থাকে। সেই যুগে যেসব বিদেশি এই অঞ্চলে মারা যান, সেসব বিদেশিকে সমাহিত করা হয় শ্রীমঙ্গলের ডিনস্টন সিমেট্রিতে। উঁচু-নিচু পাহাড় টিলায় ঘেরা চিরসবুজ চা-বাগানের মাঝে অবস্থিত এই সিমেট্রিতে বিদেশিদের কবর রয়েছে ৪৬টি।
কীভাবে আসবেন : প্রতিদিন ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলের পথে তিনটি আন্তঃনগর ট্রেন যাত্রা করে। ৫ ঘণ্টায় আপনি পৌঁছে যাবেন শ্রীমঙ্গল। পারাবত এক্সপ্রেস সকাল সাড়ে ৬টায়, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস দুপুর ২টায় এবং উপবন রাত সাড়ে ১০টায়। ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলের চেয়ারকোচের ভাড়া ১৩৫ টাকা, ১ম চেয়ার ২০০ টাকা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচে ৩০০ টাকা এবং স্লিপিং কোচে ৩৬০ টাকা। টিকিট সংগ্রহ করা যাবে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে। বাসে যেতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। বাস ভাড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এসি বাসে খরচ পড়বে ২৫০ টাকা।
কোথায় থাকবেন : শ্রীমঙ্গল শহরে ২০টিরও বেশি আবাসিক হোটেল রয়েছে। ভালো দেখে যে কোনো একটিতে উঠতে পারেন। ভাড়া মোটামুটি কম। শ্রীমঙ্গল শহরের উল্লেখযোগ্য হোটেলগুলো হলো—টি টাউন রেস্ট হাউস, হোটেল সন্ধ্যা, এলাহী প্লাজা, হোটেল বিরতি, আল-রহমান, হোটেল মুক্তা ও হোটেল নীলিমা। এছাড়াও সরকারি ও আধা-সরকারি সংস্থাগুলোর বেশকিছু বাংলো রয়েছে এখানে। কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে এখানে উঠতে পারেন। শ্রীমঙ্গলের সব দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে হলে অন্তত ৩-৪ দিন সময় নিয়ে এলেই ভালো হয়। সপরিবারে যেতে পারেন আবার বন্ধু-বান্ধব মিলে একত্রেও যেতে পারেন। শহরে খাওয়া-দাওয়ার জন্য অনেক হোটেল রয়েছে। নূর ফুডস, শাহ হোটেল, নোয়াখালী হোটেলের যে কোনো একটিতে আপনি স্বল্প খরচে খাওয়ার কাজ সেরে
নিতে পারেন।

Monday, October 4, 2010

লাউয়াছড়া : ঘুমন্ত পাহাড়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য

লাউয়াছড়া : ঘুমন্ত পাহাড়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য

ফখরুল আলম
লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক প্রকৃতিপ্রেমীদের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অনন্য স্থান। বন-পাহাড় আর জীবজন্তুর অভয়ারণ্য। পাহাড়ি এই জনপদে রয়েছে খাসিয়াসহ বিভিন্ন উপজাতীয়দের বসবাস। কাছ থেকে দেখলে মনে হবে ঘুমন্ত সবুজ পাহাড়ের অতন্দ্র প্রহরী হলো এসব আদিবাসী। পাহাড়ের পাদদেশে এই জনগোষ্ঠীর যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির পরিচর্যা করে লাখো বৃক্ষ লালন-পালন করছে। এর ফলে এসব পাহাড়ে দিন দিন নতুন বৃক্ষ সতেজভাবে বেড়ে উঠছে। পাহাড়ি গাছে লতিয়ে বেড়ে ওঠা পানচাষ করে খাসিয়াদের জীবন চলে। ঐতিহ্যগতভাবে বন, পাহাড়, সবুজ গাছগাছালি ও প্রকৃতির সঙ্গে খাসিয়াদের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতির আপনজন হিসেবে অতি কাছে বসবাসকারী খাসিয়ারা তাদের মতোই সভ্যতার অনাদরে প্রকৃতির আপন খেয়ালে বেড়ে ওঠা বৃক্ষরাজিকে সন্তানতুল্য মনে করেন। পাহাড়ি শীতল ছায়ায় বেড়ে ওঠা এসব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মননশীলতাও অত্যন্ত কোমল।
লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে এশিয়া মহাদেশের বিরল প্রজাতির একটি গাছ আছে, যার নাম ক্লোরোফর্ম বৃক্ষ। এটি ভূমণ্ডলের একমাত্র আফ্রিকার বন ছাড়া আর কোথাও দেখা যায়নি। এককথায় বলা যায়, দুর্লভ নেশার গাছ। যার পাতার গন্ধে মানুষ নিজের অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ে গাছতলায়। অনেকেই এই গাছকে ঘুমপাড়ানি গাছ বলে ডেকে থাকেন। এই গাছটি লাউয়াছড়া ফরেস্ট রেস্ট হাউসের পার্শ্বে রয়েছে। বর্তমানে গাছটির বয়স দেড়শ’ বছর। বয়সের ভারে পাতাগুলোতেও তেমন সতেজতা নেই। তাই তেজও অনেক কমে গেছে। লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কের অন্যতম আকর্ষণ ক্লোরোফর্ম এই বৃক্ষটি। মূলত যদিও তার তেজষক্ষমতা কমে আসছে; কিন্তু এখনও এই বৃক্ষটির নিচে দাঁড়ালে গরমের সময় অনেক ঠাণ্ডা অনুভব করা যায়।
লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে নিসর্গ নামের একটি প্রকল্প আছে। তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ গাইড রয়েছে। এই প্রকল্পে একটি তথ্যকেন্দ্রও রয়েছে। এখানে লাউয়াছড়া বনের সব তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া উপহারসামগ্রী স্যুভেনির ইত্যাদি পাওয়া যায়।
‘ইকো রেস্তোরাঁ’ আছে। ইচ্ছে করলে রেস্তোরাঁয় খাবারও খাওয়া যাবে।
একসময় শীত মৌসুমে পর্যটকদের আসা-যাওয়া থাকত সিলেটে বেশি। বর্তমানে বছরের সবসময়ই দেশি- বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। বিশেষ করে চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। এসব ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের আগমন ঘটে শ্রীমঙ্গলের পাখি ও মত্স্য অভয়ারণ্য বাইবকা বিল, রেইন ফরেস্ট, লাউয়াছড়া ছাড়াও দিগন্তরেখা বিস্তৃত চা বাগানের অপূর্ব সৌন্দর্য পর্যটকদের অসম্ভব কাছে টানে। তবে পাশাপাশি দেখতে পারবেন ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠা সীতেজ বাবুর মিনি চিড়িয়াখানা। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। রমেশ বাবুর জাদুকরী ৭ কালারের চা। নীলকণ্ঠ কেবিনের ৭ রংয়ের চা আপনাকে তৃপ্তি দেবে।
লাউয়াছড়া বনাঞ্চলে রয়েছে ১৬৭ প্রজাতির বৃক্ষ ও আকর্ষণীয় বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড। বিশ্বের ৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে যে বিরল প্রজাতির উল্লুক রয়েছে তার দেখাও পাওয়া যায় এই বনে। ২৪৬ প্রজাতির বাহারি রং-বেরংয়ের পাখি। ৪ জাতের উভচর প্রাণী। ৬ প্রজাতির সরীসৃপ। ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ ১৭ প্রজাতির কীটপতঙ্গ রয়েছে লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে। ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জায়গা নিয়ে এ উদ্যান রয়েছে জীববৈচিত্র্য। তবে উল্লুক, চশমাবানর, মুখপোড়া হনুমান, লজ্জাবতী এসব হলো বনের আকর্ষণীয় প্রাণী। লাউয়াছড়া বনে হেঁটে হেঁটে আপনি ও আপনার প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। বিশাল এই বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর বিভিন্ন ব্যবস্থাও রয়েছে। আধঘণ্টা এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার তিনটি ওয়াকিং ট্রেইল। এছাড়াও রয়েছে হাতির পিঠে চড়ে সবুজ বনাঞ্চল ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা। তাছাড়াও সুসজ্জিত বেশকিছু ‘ইকো রিকশা’ রয়েছে। তবে এগুলোয় চড়লে অবশ্যই টাকা দিতে হয়।
আরও কয়েক কিলোমিটার দূরে গেলে দেখা যায়, চা বাগানের ভেতরে বিশাল একটি লেক। লেকটির নাম মাধবপুর লেক। মাধবপুর লেকের সন্নিকটে উপজাতীয় কালচার একাডেমি রয়েছে। বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্র্রদায়ের আচার-অনুষ্ঠান আর সাংস্কৃতিক জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কমলগঞ্জ উপজাতীয় সাংস্কৃতিক একাডেমির চার দেয়াল। এখানকার উপজাতীয় সম্প্রদায়কে নিয়ে তাদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে সময় কাটান এবং সুখ আহরণ করতে পারবেন আপন মনে। সবুজ প্রকৃতি আর পাহাড়ের মাঝে বয়ে চলা আঁকাবাঁকা রেলপথও আপনাকে মুগ্ধ করে দেবে।
প্রকৃতির লীলায়িত নন্দন কানন, নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বর্ণময়, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী এবং তাদের সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতি নিয়ে গঠিত শ্রীমঙ্গল।
পাহাড়ে দাঁড়িয়ে দূরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠতে হবে আপনাকে। ‘যতদূর চোখ যায় ওই দূর নীলিমায় চোখ দুটি ভরে যায় সবুজের বন্যায়’। শিল্পীর গাওয়া এ গানের বাস্তবতা খুঁজে পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে।

যাতায়াত : লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে যেতে হলে শ্রীমঙ্গল শহরে প্রথম যেতে হবে। শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশেই পড়বে পার্কটি। ঢাকা থেকে ট্রেন বা সড়কপথে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। ভাড়া পড়বে ২০০-২৫০ টাকা। শ্রীমঙ্গল শহরে ভালো হোটেল রয়েছে। থাকা-খাওয়াসহ সবকিছু সহজলভ্য। শ্রীমঙ্গলের অপরূপ সৌন্দর্য আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

লাউয়াছড়ার বনে বনে
লেখা : মুস্তাফিজ মামুন

শ্রীমঙ্গল শহরের কাছেই জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশের অন্যতম একটি জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়া। দুই-একদিনের সময় হাতে নিয়ে সহজেই বেড়িয়ে আসা যায় জাতীয় এ উদ্যান থেকে। কড়চার এবারের বেড়ানো শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে।

লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল

শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশেই রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। প্রায় ১,২৫০ হেক্টর জায়গা নিয়ে এ উদ্যানে রয়েছে_১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, চার প্রজাতির উভচর, ছয় প্রজাতির সরীসৃপ, বিশ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ২৪৬ প্রজাতির পাখি। প্রধান সড়ক ফেলে কিছুদূর চলার পরে ঢাকা-সিলেট রেল লাইন। এর পরেই মূলত জঙ্গলের শুরু। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অন্যতম আকর্ষণ হলো উলস্নুক, চশমা বানর, মুখপোড়া হনুমান, লজ্জাবতী বানর ইত্যাদি। উদ্যানে বেড়ানোর তিনটি ট্রেকিং পথ আছে। একটি তিন ঘণ্টার, একটি এক ঘণ্টার এবং অন্যটি আধ ঘণ্টার পথ। উদ্যানের ভেতরে একটি খাসিয়া পলস্নীও আছে।

আধ ঘণ্টার ট্রেকিং

এ পথটির শুরু রেললাইন পেরিয়ে হাতের বাঁ দিক থেকে। এ পথের শুরুতে উঁচু উঁচু গাছগুলোতে দেখা মিলতে পারে কুলু বানরের। নানা রকম গাছ-গাছালির ভেতর দিয়ে তৈরি করা এ হাঁটা পথটিতে চলতে চলতে জঙ্গলের নির্জনতায় শিহরিত হবেন যে কেউ। এ ছাড়া এ পথের বড় বড় গাছের ডালে দেখা মিলবে বুনো অর্কিড। যদিও এ সময়টা অর্কিডে ফুল ফোটার সময় নয়। নির্দেশিত পথে হাতের বাঁয়ে বাঁয়ে চলতে চলতে এই ট্রেইলটির শেষ হবে ঠিক শুরুর স্থানেই।

এক ঘণ্টার ট্রেকিং

এক ঘণ্টার ট্রেকিংয়ের শুরুতেই দেখবেন বিশাল গন্ধরুই গাছ। এ গাছের আরেক নাম কস্তুরী। এগাছ থেকে নাকি সুগন্ধি তৈরি হয়। এ ছাড়া এ পথে দেখবেন ঝাওয়া, জগডুমুর, মুলী বাঁশ, কাঠালি চাঁপা, লেহা প্রভৃতি গাছ। আরো আছে প্রায় শতবষর্ী চাপলিশ আর গামারি গাছ। এ ছাড়া এ পথে নানারকম ডুমুর গাছের ফল খেতে আসে উলস্নুক, বানর, হনুমান ছাড়াও এ বনের বাসিন্দা আরো অনেক বন্যপ্রাণী। ভাগ্য সহায় হলে সামনেও পড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া এ পথে দেখা মিলতে পারে মায়া হরিণ আর বন মোরগের।

রোমাঞ্চকর ট্রেকিং

তিন ঘণ্টার হাঁটা পথটিও বেশ রোমাঞ্চকর। এ পথের বাঁয়ে খাসিয়াদের বসত মাগুরছড়া পুঞ্জি। এ পুঞ্জির বাসিন্দারা মূলত পান চাষ করে থাকেন। ১৯৫০ সালের দিকে বনবিভাগ এ পুঞ্জি তৈরি করে। এ পথে দেখা মিলবে বিশাল বাঁশবাগান। এ বাগানে আছে কুলু বানর আর বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর। লজ্জাবতী বানর নিশাচর প্রাণী। এরা দিনের বেলায় বাঁশের ঝারে ঘুমিয়ে কাটায়। এ ছাড়া এ পথে দেখা মিলবে নানান প্রজাতির পাখির, আর পথের শেষের দিকে দেখা মিলতে পারে এ বনের অন্যতম আকর্ষণ উলস্নুক পরিবারের। এরা বনের সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোতে দলবদ্ধভাবে বাস করে।

কিছু তথ্য

জঙ্গল ভ্রমণে কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত। বেশি উজ্জ্বল রঙের পোশাক না পরে অনুজ্জল পোশাক পরতে হবে। ইনসেক্ট রিপল্যান্ট ব্যবহার করা উচিত। বনে হৈচৈ করলে বন্যপ্রাণীদের দেখা যাবে না। তাই সর্বোচ্চ নিরবতা পালন করতে হবে। বনের মধ্যে কোনোরকম ময়লা-অবর্জনা ফেলা যাবে না। ট্রেকিংয়ের সময় সঙ্গে পর্যাপ্ত খাবার পানি নিন। আইপ্যাকের প্রশিক্ষিত গাইড সঙ্গে নিয়ে ট্রেকিংয়ে যাওয়া উচিত। নয়তো পথ হারানোর ভয় আছে।

খরচপাতি

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ মূল্য প্রাপ্তবয়স্ক ২০ টাকা, ছাত্র ও অপ্রাপ্তবয়স্ক ১০ টাকা, বিদেশি নাগরিকদের জন্য ৫ মার্কিন ডলার কিংবা সমমূল্যের টাকা। এ ছাড়া কার, জিপ ও মাইক্রোবাস পার্কিং ২৫ টাকা, সিনেমা ও নাটকের শুটিং প্রতিদিন ৬,০০০ টাকা, পিকনিক স্পট ব্যবহার জনপ্রতি ১০ টাকা।

শ্রীমঙ্গল কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়ক ও বেলপথে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ (০১৭১১৯২২৪১৭), শ্যামলী পরিবহন (০১৭১১৯৯৬৯৬৫), সিলেট এক্সপ্রেস (০১৭১৩৮০৭০৬৯), টি আর ট্রাভেলস (০১৭১২৫১৬৩৭৮) ইত্যাদি বাস শ্রীমঙ্গল যায়। ভাড়া ২৫০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকার কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬.৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, দুপুর ২.০০ মিনিটে প্রতিদিন ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ১০.০০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ভাড়া এসি বার্থ ৫২৬ টাকা, এসি সিট ৩৪৫ টাকা, প্রথম শ্রেণী বার্থ ৩০০ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ২০০ টাকা, সি্নগ্ধা শ্রেণী ৩৪৫ টাকা, শোভন চেয়ার ১৩৫ টাকা, শোভন ১১০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮.১৫ মিনিটে যায় পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এবং শনিবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯.০০ মিনিটে উদয়ন এক্সপ্রেস। ভাড়া প্রথম শ্রেণী বার্থ ৩৭০ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ২৫০ টাকা, সি্নগ্ধা শ্রেণী ৪২০ টাকা, শোভন চেয়ার ১৬৫ টাকা, শোভন ১৫০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

শ্রীমঙ্গলে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো মানের জায়গা ভানুগাছ রোডে টি রিজর্ট (০৮৬২৬-৭১২০৭, ০১৭১২৯১৬০০১)। শ্রীমঙ্গলের হবিগঞ্জ সড়কে আরেকটি ভালো আবাসন ব্যবস্থা হলো রেইন ফরেস্ট রিসোর্ট (০২-৯৫৫৩৫৭০, ০১৯৩৮৩০৫৭০৭)। এ ছাড়া শ্রীমঙ্গলের অন্যান্য হোটেল হলো হবিগঞ্জ সড়কে টি টাউন রেস্ট হাউস (০৮৬২৬-৭১০৬৫), কলেজ রোডে হোটেল পস্নাজা (০৮৬২৬-৭১৫২৫) ইত্যাদি। এসব হোটেল- রিসোর্টে ৫০০-৩ হাজার টাকায় কক্ষ পাওয়া যাবে।

Source: Daily Ittefaq, 22th Feb-2011

লাউয়াছড়ায় গত বছর (২০১০) পর্যটক এসেছেন লাখের বেশি : রাজস্ব আয় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি, ৮ জানুয়ারি ২০১১
দেশে ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্টখ্যাত মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে গত বছর (২০১০) রেকর্ডসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক এসেছেন। ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ বছরে এ পার্কে পর্যটক এসেছেন ১ লাখ ৭৮৬ জন। এ থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৮০ টাকা। এ সময়কালে এ পার্কে আগত প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার ১৪৯ এবং ছাত্র ও অপ্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার ৯০২ জন। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৯২, বনভোজনে এসেছেন ৩ হাজার ৫৪৩ জন। আগত যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৭৮টি এবং লাউয়াছড়ায় শুটিং হয়েছে ৪টি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত মৌলভীবাজার বণ্যপ্রাণী রেঞ্জ কার্যালয়ের রেঞ্জ কর্মকর্তা গাজী মোস্তফা কামাল জানান, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তিনি জানান, ২০০৮ সালে লাউয়াছড়ায় আগত পর্যটক-দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৫ হাজার জন। ২০০৯ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪ হাজার জনে দাঁড়ায়।
আইপ্যাক সূত্র জানায়, গত ৫/৬ বছর ধরে এখানে পর্যটকের সংখ্যা প্রতিবছর ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। পারিবারিক পর্যায় থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সফরের উদ্দেশ্যে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাউয়াছড়ায় ছুটে আসছে দর্শনার্থীরা। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চিরসবুজ এ পাহাড়ি বনাঞ্চল যেমনি জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর তেমনি বনজসম্পদের অমূল্য ভাণ্ডার। সেই সঙ্গে কনকনে শীত আর অঝোর ধারায় বৃষ্টি এখানকার প্রকৃতিকে করেছে স্বতন্ত্র ও মধুময় যা মানুষ আস্বাদন করতে চায়। তাই এ পার্কে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ১২৫০ হেক্টর আয়তনের এ পার্কটি এখন পৃথিবীর মানচিত্রে এক গৌরবময় স্থান দখল করে নিয়েছে।
Source: Daily Amardesh, 8th January-2011