Search This Blog

FCO Travel Advice

Bangladesh Travel Advice

AFRICA Travel Widget

Asia Travel Widget

Showing posts with label KhagraChori. Show all posts
Showing posts with label KhagraChori. Show all posts

Monday, January 17, 2011

খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়িতে কয়লার সন্ধান

খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়িতে কয়লার সন্ধান

তারিখ: ১৭-০১-২০১১

খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি এলাকায় গহীন অরণ্যে কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে। একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদের ভিত্তিতে সেনাবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে রোববার পরিদর্শনে গিয়ে এ কয়লার সন্ধান লাভ করে।
জানা গেছে, বর্মাছড়ি এলাকায় কয়লার খনি আছে—এমন খবর সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আসার পর ১২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি লক্ষ্মীছড়ি জোন অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. সালাহউদ্দিন আল মুরাদ এবং লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান, থানা ইনচার্জ মো. শাহজাহান, থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবুল হাসেমসহ একটি দল কয়লার খনি পরিদর্শন করেন।
লে. কর্নেল সালাহউদ্দিন ও ইউএনও মিজানুর জানান, তাঁরা একটি পাহাড়জুড়েই কয়লা দেখতে পেয়েছেন। পাশের পাহাড়ি ছড়া দিয়ে পানিতে কয়লার টুকরো ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। পথচারীরা আগুন দিয়ে কয়লা পুড়ে পরীক্ষা করেছে—এমন চিহ্ন পড়ে আছে।
এলাকাবাসী জানান, কেউ কেউ এ পাহাড় থেকে কয়লা নিয়ে বাসা-বাড়িতে রান্না করছে। পরিদর্শনে যাওয়া কর্মকর্তারা নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য নিয়ে এসেছেন এবং শিগগিরই খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পরীক্ষা করার জন্য পাঠাবেন বলে ইউএনও জানান।
এর আগে ৩০ ফিল্ড রেজিমেন্টের আর্টিলাটির তত্কালীন জোন অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আসিফ আবদুর রউফ প্রথম এ কয়লার সন্ধান পেয়ে তদন্ত করার চেষ্টা চালান। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। বাসস।

আলুটিলা আর নয়নাভিরাম রিসাং

আলুটিলা আর নয়নাভিরাম রিসাং
এপ্রিলের এক রৌদ্রময় সকালে বেরিয়ে পড়লাম পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের লীলাভূমি খাগড়াছড়ির উদ্দেশে। সঙ্গে আমার সবসময়কার ভ্রমণসঙ্গী বন্ধু মুসা আহমেদ, সাকিব হোসেন আর আবদুর রউফ। শিক্ষাজীবন চট্টগ্রামে হওয়ায় তাদের সঙ্গে চষে বেড়িয়েছি চট্টগ্রাম আর পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সব জায়গা। এবার খাগড়াছড়ি ভ্রমণে আমাদের মূল গন্তব্য ছিল আলুটিলা আর রিসাং ঝরনা। ঘুরে এসে লিখেছেন কাউসার মোঃ নূরুন্নবী
বাসস্ট্যান্ডে গিয়েই পড়লাম বিপাকে। সকাল সকাল পেঁৗছলেও বাস মিস করলাম। কাউন্টারের টিকিট বিক্রেতা জানালেন, ২ ঘণ্টার আগে আর কোনো গাড়ি নেই। আমাদের তো মাথায় হাত! কারণ রাতেই আবার চট্টগ্রাম ফিরে আসতে হবে। উপায়ান্তর না দেখে চড়ে বসলাম লোকাল বাসে। আর এখানেই ভুলটা করে বসলাম। রীতিমতো যুদ্ধ করে বাসে সিট দখল করতে হলো। একে তো মানুষের উপচেপড়া ভিড়, তার ওপর বাসের পেছনের সিটে বসায় ঝাঁকি খেতে খেতে প্রাণ যায় অবস্থা। তবে মাটিরাঙা পেঁৗছার পর অবস্থা পাল্টে গেল। পথের দুই ধারের মনকাড়া রূপ আস্তে আস্তে আমাদের ক্লান্তির অনেকখানিই প্রশমিত করে দিল। সারি সারি উঁচু পাহাড় আর জুমক্ষেত পেছনে ফেলে আমাদের বাস ছুটে চলেছে। আমরা একেকজন হারিয়ে গেলাম মায়াবী এক জগতে। কিছুক্ষণ পর আমাদের বাসটি উঁচু-নিচুু রাস্তায় গিয়ে পেঁৗছল। হঠাৎ বাসটি একবার খাড়া ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে তো এই আবার বিপজ্জনকভাবে নেমে আসছে। কিছু কিছু জায়গায় দেখলাম, সেতুর আগে ঝুঁকিপূর্ণ সতর্ক নির্দেশ দেওয়া। খাগড়াছড়ির পথে পথে এরকম অনেক ছোট ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু চোখে পড়ে।
বাসের হেলপারকে আগেই বলে রেখেছিলাম আলুটিলা নামিয়ে দিতে। ৩ ঘণ্টার বাস জার্নিটাকে ৪ ঘণ্টা বানিয়ে খাগড়াছড়ি শহরের প্রায় ছয় কিলোমিটার আগে বাস নামিয়ে দিল আমাদের গন্তব্যস্থল আলুটিলায়। অনেকেই হয়তো জানেন, আলুটিলা বিখ্যাত তার রহস্যময় সুড়ঙ্গের কারণে। আমাদেরও ব্যাপারটা আগে থেকেই জানা ছিল। তাই আলুটিলায় নেমেই আমাদের মধ্যে একটা অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার ভাব চলে এলো। পাঁচ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম। প্রবেশমুখেই দেখতে পেলাম পর্যটকদের আকর্ষণ করতে আলুটিলা কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ড। অনেকখানি হেঁটে আর প্রায় শ'খানেক ধাপ সিঁড়ি ভাঙার পর গিয়ে মিলল সুড়ঙ্গমুখের দেখা। বন্ধু রউফ মোবাইলটর্চের আলোতে সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে পড়ল। তবে কিছুদূর গিয়েই বোঝা গেল, এরকম ঘুটঘুটে অন্ধকারে সুড়ঙ্গ জয় সম্ভব নয়। তাছাড়া কোনো কারণ ছাড়াই গা ছমছম করছিল। তাই আবার ফিরে গিয়ে মশাল কিনে আনলাম। সুড়ঙ্গের পথ কিছুটা কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল। তলদেশে প্রবহমান ঝরনা। মাথার ওপর ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাদুড়ের কর্কশ চিৎকার। পাহাড়ের নিচে খুব সাবধানে মশাল নিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতর যেতে হয়। এভাবে মিনিট দশেক যাওয়ার পর পাওয়া গেল সুড়ঙ্গের অপর প্রান্ত। বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে গেল ভাব নিয়ে আমরা মনোযোগ দিলাম মশাল হাতে ফটোসেশনে।
আলুটিলা সুড়ঙ্গ জয় (!) শেষে আমরা বেরিয়ে এলাম। আলুটিলার উল্টোপাশেই রয়েছে আবাসিক হোটেল 'ইমাং'। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এ হোটেল থেকে খাগড়াছড়ি শহরটিকে ছবির মতো সুন্দর দেখায়। ইমাংয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা রওনা হলাম রিসাংয়ের উদ্দেশে। আলুটিলা থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার আগে রিসাং। সেখান থেকে ঝাড়া সোয়া দুই কিলো হাঁটাপথ। সমতল পথ নয়, জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি পথ। যাওয়ার সময় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি সঙ্গী হওয়ায় হেঁটে যেতে তেমন কষ্ট হলো না। কিন্তু ফেরার সময় প্রচণ্ড রোদ থাকায় পাহাড়ি রাস্তায় চলতে চলতে আমাদের দম বের হওয়ার জোগাড়। স্থানীয়দের কাছে রিসাং ঝরনা 'তেরাংতৈ কালাই ঝরনা' নামে বেশি পরিচিত। আর মারমা ভাষায়, 'রিসাং' মানে পাহাড় থেকে পানি পড়া।
রিসাং যাওয়ার পথে আদিবাসীদের ঘরবাড়িগুলো চোখে পড়ার মতো। বেশিরভাগ বাড়িই পাহাড়ি মাটির তৈরি। দেখতে চমৎকার। স্থানীয় একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মাটির তৈরি হলেও বাড়িগুলো যথেষ্ট মজবুত। জানা গেল, ওখানে টিপরা বা ত্রিপুরার অধিবাসীদের বাস।
হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে গেলাম সিঁড়ির দেখা। কয়েকশ' ধাপ। কিছু ধাপ পেরোতেই শুনতে পেলাম পাহাড় থেকে অনবরত জলপতনের ধ্বনি। বুঝে গেলাম রিসাংয়ের খুব কাছে চলে এসেছি। আরও কিছুটা নামার পর দেখা গেল যৌবনবতী রিসাংয়ের। সিঁড়ির শেষ ধাপটি পেরিয়ে কাদাময় পিচ্ছিল পথ আর ছড়াটা অনেকটা দৌড়ে রিসাংয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চোখ জুড়িয়ে গেল, মন ছেয়ে গেল প্রশস্তিতে। আর দেরি করলাম না। কাপড়-চোপড় নিয়েই আমরা নেমে পড়লাম ঝরনার পানিতে শরীর জুড়াতে। দুঃসাহসী কয়েকজনকে দেখলাম, ঝরনার ঢালু অংশ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নিচের ছড়ায় পড়ছে। ব্যাপারটা আনন্দদায়ক সন্দেহ নেই; কিন্তু বিপজ্জনকও বটে। রিসাংয়ে গিয়ে আমাদের কারোরই ফিরতে মন চাইছিল না।
রিসাং থেকে বাসে করে খাগড়াছড়ি শহরে গিয়ে পেঁৗছলাম। রিসাংয়ের মায়াবী রূপ আমাদের আবার বাস মিস করিয়ে দিল। শহরে পেঁৗছে জানলাম, বিরতিহীন শেষ বাসটি মাত্র ছেড়ে গেছে। শেষ লোকাল বাসটি আর মিনিট বিশেক পর ছাড়বে। টিকিট কেটে তড়িঘড়ি করে কিছু খেয়ে নিলাম। ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে বাসে উঠে দেখি, আমাদের সিটে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একজন বসে আছে। মাটিরাঙা পর্যন্ত তার স্ত্রী আর সন্তানকে বসতে দিতে লোকটি আমাদের অনুরোধ করলেন। কী আর করা! ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে প্রায় অর্ধেকটা পথ বাসে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
খাগড়াছড়িতে গেলে ফেরার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। পাহাড়ি রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা যেন না ঘটে সে জন্য সন্ধ্যার পর বাস চলাচল করতে দেওয়া হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জায়গাতেই সন্ধ্যার আগেই শেষ বাসটি ছেড়ে যায়।
যেভাবে যাবেন
একদিনের ভ্রমণ হওয়ায় খাগড়াছড়ি শহরটি খুব ভালো করে দেখার সুযোগ হয়নি। তবে বাস থেকে শহরটিকে মনে হয়েছে, ছিমছাম সাজানো-গোছানো। খাগড়াছড়ি যেতে চাইলে ঢাকা থেকে যে কোনো এসি বা নন-এসি পরিবহনে যাওয়া যাবে। এসি পরিবহন স্টারলাইনের ভাড়া ৪০০ টাকা। আর শ্যামলী, এস আলমসহ বিভিন্ন নন-এসি পরিবহনের ভাড়া ৩০০ টাকা। ট্রেনে গেলে প্রথমে চট্টগ্রাম নামতে হবে। তারপর যেতে হবে বাসে। চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে পাওয়া যাবে বিরতিহীন বাস 'শান্তি'। ভাড়া ১৪০ টাকা। যেতে লাগবে ৩ ঘণ্টা। রিসাংয়ের কাছাকাছি থাকার জায়গা হচ্ছে পর্যটন মোটেল । তবে প্রকৃতির দুর্গমতাকে জয় করে সৌন্দর্য উপভোগ করার মজাটা কিন্তু একেবারেই আলাদা।

ছবি : লেখক
Source: Daily Samakal


এবার কাণ্ড খাগড়াছড়িতে

এবার কাণ্ড খাগড়াছড়িতে

লিখেছেন অদ্রোহ, তারিখ: শুক্র, ২৯ অক্টো ২০১০

39103_1532905009916_1453524600_1413453_4058355_n

রাঙ্গামাটির মাটি লাল রঙের কিনা জানিনা,বান্দরবানে বাঁদরদের বান ডাকে সেটাও হলফ করে বলা যাবেনা,কিন্তু খাগড়াছড়িতে যে নল-খাগড়া এন্তার দেখা যায়,সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। মেলা আগে নাকি খাগড়াছড়ির বুক চিরে বয়ে যাওয়া চেঙ্গি নদির দুপাশে ঘন নল-খাগড়ার বন ছিল, আর সেই থেকেই নাকি খাগড়াছড়ি নামটা কল্কে পেয়েছে। পাহাড়ি ঝর্নার জল জমা হলে পরে তাকে বলা যায় ছড়ি,এমন ছড়ি খাগড়াছড়িতে মিললেও মিলতে পারে বৈকি। যাকগে, ওসব জ্ঞানগর্ভ আলাপ থাক, বলছিলাম খাগড়াছড়ি ভ্রমণের কথা। সফরটা আদপেই একেবারে ঝটিকাগোছের ছিল, বলা যায় অনেকটা দুম করেই আমরা এক ঘনঘোর বর্ষার দিনে বেরিয়ে পড়েছিলাম খাগড়াছড়ির পানে।

তখন বেমক্কা মিলে যাওয়া একটি ছুটিতে বন্ধুরা সব চাঁটগায়। হাতে অফুরন্ত অবসর,বেলা করে ঘুম থেকে উঠে, বিকেলে ফুটবলে কষে লাথি হাঁকিয়ে আর রাত্তিরে রাজা-উজির মেরেই দিন গুজরান করছিলাম। হঠাৎ মাথায় ভূত চাপল কোথাও ঢুঁ মেরে আসার। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত হল খাগড়াছড়িই যাওয়াই সই, ওদিকটায় একদমই ঢুঁ মারা হয়নি। পরদিন ভোরবেলা রওনা দেওয়ার কথা , কিন্তু আমরা একেকজন কুঁড়ের বাদশা, বেশ অনেকটা সময় বিছানায় ওপাশ এপাশ করে, বিকট স্বরে বাজতে থাকা অ্যালার্মঘড়িকে কড়কে দিয়ে যখন আমরা চোখ ডলতে ডলতে বাস-স্টেশনে এসে পড়লাম , তখন ঘড়ির কাঁটা নটা ছুঁই ছুঁই। তবে আকাশের গোমড়ামুখো সুরত দেখে মনটা দমে গেল, তার ওপর বাঁধল নতুন বিপত্তি। শুনলাম খাগড়াছড়িগামী একমাত্র বিরতিহীন বাসটাকে আমরা অল্পের জন্য মিস করেছি। ওদিকে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে, আর লোকাল বাসের হেলপাররা অক্লান্তভাবে কর্ণপ্রদেশে "আঁইয়ুন, আঁইউন, বাস ছাড়ি যারগই" বলে হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছে। কী আর করা, কা তব কান্তা বলে শেষমেশ ওই লোকাল বাসই ভরসা। আর সিটটাও পড়েছে একেবারে বেকায়দা জায়গায়, সামনের রাস্তায় ঝাঁকুনির কথা ভেবে তখন থেকেই আমাদের মধ্যে দুর্বলচিত্তদের মুখ পাংশুটে হয়ে গেল। ওদিকে তখন বৃষ্টি বেশ ভালভাবে জেঁকে বসেছে, তবে ফটিকছড়ি পেরুনোর পর চারপাশের প্রকৃতি বদলে যেতে লাগল। বর্ষার সবুজে ছাওয়া সদ্যস্নাত বন দেখে মনে হল এক্ষুনি বাস থামিয়ে নেমে পড়ি। এভাবে একে একে বিভিন্ন এলাকা ছাড়িয়ে মানিকছড়ি এসে পৌঁছুলাম। এরপর পথ রীতিমত শ্বাসরোধকরা, বারবার পাক খেয়ে উপরে উঠে গেছে, কখনোবা এঁকেবেঁকে নিচে নেমে গেছে ।এরমক খাড়া নিচের দিকে নেমে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝেই কানের দুপাশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আগেই বিভিন্ন "শুভানুধ্যায়ীরা" বাঁকা হাসি হেসে বলেছিল, রাস্তা তো খুব একটা সুবিধের নয় হে, ওসব রাস্তায় হামেশাই দুর্ঘটনা ঘটে। আমরাও তখন তুড়ি মেরে বলেছিলাম, আরে ছোহ! এসবের থোড়াই কেয়ার করি, এ আর এমন কি ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে পরে মনে হয়েছিল, আমরা না হয় পেছনের সিটে উটপাখির মত মাথা গুঁজে চোখটোখ বন্ধ করে দিব্যি থাকতে পারি, তবে এসব হতচ্ছাড়া পথে গাড়ি হাঁকানোর জন্য ড্রাইভার ব্যাটাদের এলেমদার হতে হয় বৈকি, একটু অসাবধান হলেই একেবারে খাদে পড়ে পঞ্চত্বপ্রাপ্তি নিশ্চিত। এসব করতে করতে হঠাত চোখ কচলে দেখলাম ,আরে ওই তো বড় বড় করে লেখা "আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র"। তবে লটবহর নিয়ে আমরা সে যাত্রায় আর নামলামনা, সামনের পর্যটন মোটেলেই আস্তানা গাড়বো বলে মনস্থ করা হল। সেখানে গিয়ে দেখি পুরো মোটেল খা খা করছে, আর একজন লোক কাউন্টারে বসে জাদু হ্যায় নাশা হ্যায় না কি জানি একটা হিন্দি গানে মশগুল। বারকয়েক গলা খাঁকারি দেওয়ার পর তার মর্জি হল, আমরা যথাসম্ভব বিনীত স্বরে বললাম, আমাদের থাকার বন্দোবস্ত দরকার, তবে তার আগে পেটপূজো না করলেই নয়। ওদিকে রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখি সেখানেও গুটিকয়েক মাছি ভনভন করছে, ইনফ্যাক্ট মাছি মারার মত লোকও নেই। অনেক হাঁকডাকের পর কে জানি এসে জানাল, খাবারের কিঞ্চিত দিরং আছে। এহেন পৈশাচিক ভ্রমণের পর এই নির্মম স্তোকে আমাদের কেউ কেউ হল অগ্নি, আর বাকিরা শর্মা। সাথে সাথে প্ল্যান চেঞ্জড, এখন শহরে যাওয়াই সই। বাইরে এসে অবশ্য খিঁচড়ে থাকা মেজাজটা কিছুটা শান্ত হল, পাশ দিয়ে দেখলাম বেশ সুন্দর একটা নদী, নামটা অবশ্য বিতিকিচ্ছিরি কিসিমের-চেঙ্গি। ওখান থেকে ব্যাটারিচালিত শম্বুকগতির টমটমে করে শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা।

পর্যটন রিসর্টের দোরগোড়ায়-
38842_1367348300891_1147195504_30874811_4282116_n

উঁকিঝুঁকি মারতে থাকা নদী

40678_1367357861130_1147195504_30874831_2690639_n

মনে হচ্ছিল তখুনি ঝাঁপ দেই-
38842_1367348260890_1147195504_30874810_3310664_n

খাগড়াছড়ি শহরটা একেবারেই ছোট, আর তাই খুঁজেপেতে একটা চলনসই গোছের হোটেলে উঠে আমরা একটা জবরদস্ত উদরপূর্তি করলাম। তারপর খানিক গড়িয়ে যখন শহরটা ঢুঁ মারতে বের হলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে গেল বলে। বর্ষার দিন,মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সূর্য মাঝেমাঝেই ঘাই মেরে যাচ্ছে। তবে ভাগ্যদেবী এযাত্রায় সহায় হলেন , উটকো বৃষ্টি বাগড়া দিলে সেদিনকার প্লেন কেঁচে গন্ডুষ হয়ে যেত। ততক্ষণে বেলা বয়ে গেছে, তাই আলুটিলা প্রজেক্টে সেদিনকার মত ইস্তফা দিয়ে সাব্যস্ত হল এরপরের গন্তব্য শহরের ঠিক বাইরের কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। জায়গাটা ছিমছাম, পরিপাটি করে সাজানো। বেশ কজায়গায় দেখলাম লোভনীয় পেয়ারা-কামরাঙ্গা-আমড়ার গাছ। বড় বড় করে লেখা, "ফল পাড়তে বারণ করা হল- আদেশক্রমে কর্তৃপক্ষ"। কিন্তু আমাদের মত বিটকেলেদের কাছে ব্যাপারটা হয়ে গেল পাগলকে সাঁকো নাড়াতে নিষেধ করার মত।

40678_1367357821129_1147195504_30874830_3332248_n

ঐ কেন্দ্রের ভেতরেই আবার ছবির মত সুন্দর কিছু জলাধার। সকালের বৃষ্টিতে পুরো পথ ভিজে কাদাটে হয়ে আছে- এর মাঝে রয়েসয়ে পথ চলতে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ থেকেই কী একটা বোঁটকা গন্ধ নাকে আসছিল- ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতে গিয়ে বুঝলাম পুকুরপাড়ের কাঁঠাল গাছের নিচে কাঁঠাল পচে অমন বিদঘুটে গন্ধ ছড়িয়েছে। ভাত ছড়ালে যে কখনো সখনো কাকের অভাব হয় সেটাও বুঝলাম।ওদিকে টলটলে পানি দেখে আমাদের কারো কারো গা কুটকুট করতে লাগল, ওদিকে পড়ন্ত বেলার রোদও বেখাপ্পাভাবে চড়ে বসেছে, জলকেলি করার জন্য নিঃসন্দেহে প্রশস্ত সময়। তবে আমাদের সবাই পরিপাটি বস্ত্রাচ্ছাদিত হওয়ায় সেদিনকার মত এ প্রস্তাব মুলতবি রাখতে হল।

Source: www.sachalayatan.com

Friday, January 14, 2011

পাহাড়চূড়ার ছড়ায়...

পাহাড়চূড়ার ছড়ায়...

পলাশ বড়ুয়া | তারিখ: ১১-০১-২০১১


প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের ওপর পাথরের ছড়া। স্বচ্ছ পানিতে চোখে পড়ে মাছের আনাগোনা। তবে সেখানে যাওয়ার আগে পেরিয়ে যেতে হবে সবুজ পাহাড়, পাথরের গুহা, জলপ্রপাত আর ঝরনা। যাত্রাপথ দারুণ রোমাঞ্চকর। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার তৈদুছড়ার কথা বলছি।
ত্রিপুরা ভাষায় ‘তৈদু’ শব্দের অর্থ হচ্ছে পানির দরজা। আদিবাসীদের কাছে জানা গেল এখানকার কথা। প্রাকৃতিক শোভা আর রোমাঞ্চ—দুয়ের স্বাদ নিতে যাওয়াটাই ঠিক হলো। সফরসঙ্গী আরও কয়েকজন।
সকাল সকাল যাত্রা শুরু। গাড়িতে করে দীঘিনালা উপজেলার চাপ্পাপাড়া পর্যন্ত গিয়ে এবার পা দুটো কাজে লাগানোর পালা। কারণ, কাঁচা রাস্তায় গাড়ি আর যাবে না। প্রথমে গিয়ে পৌঁছালাম বোয়ালখালী ছড়ার পাশের গ্রাম বুদ্ধমা পাড়ায়। সেখানে একটু বিশ্রাম। এরপর বোয়ালখালী ছড়া পেরিয়ে তৈদুছড়ার মুখ দিয়ে প্রবেশ করলাম। অল্প পানির ছড়া দিয়েই হাঁটতে হবে। দূর থেকে দেখে চমকে গেলাম। মনে হলো বুনো হাতির পাল পানিতে গা ভাসিয়ে রয়েছে। আর এগোনো ঠিক হবে? ভুল ভাঙল ভালো করে দেখে। এগুলো হাতি নয়, সারিবদ্ধ বড় বড় পাথর। পুরো ছড়াটিতেই এ রকম বড় বড় পাথর, মাঝেমধ্যে সুড়ঙ্গের মতো। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর কান যেন বন্ধ হয়ে আসতে চাইল তীব্রবেগে পানি গড়িয়ে পড়ার শব্দে। ১০ মিনিট হাঁটাপথ এগিয়ে পেয়ে গেলাম তৈদুছড়ার জলাধার। সঙ্গী অজিত ত্রিপুরা জানালেন, ‘ওপরে গেলে পানির উৎসও দেখা যাবে। আমরা সবাই একবাক্যে রাজি। একটু বিশ্রাম নিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু হলো হাঁটা।’
প্রায় এক ঘণ্টা এগোনোর পর আবার সেই কানফাটানো পানির আওয়াজ। আরও একটু এগিয়ে চোখে পড়ল ঝরনা। ঠিক সিঁড়ির মতো প্রাকৃতিক ধাপ আছে। তাতে বসে বা শুয়ে পানিতে গা ভাসানো যায়। মাঝেমধ্যে আবার পানির স্রোত বেড়ে হঠাৎ ধাক্কা মারে। সেজন্য সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এই ঝরনাটির ওপরে আছে আরও একটি ঝরনা। আর ঝর্নাটির নিচে পানি পড়ে তৈরি হয়েছে ছোট হ্রদ।
সেই ঝরনা থেকে আরও চড়াই পেরিয়ে আমরা পৌঁছলাম সবচেয়ে উঁচু ছড়াটিতে। এখানকার পানিতে আদিবাসীরা ছোট ছোট মাছ ধরছে। ছড়া ধরে একটু হাঁটতেই সামনে পড়ল আর একটি জলপ্রপাত। এরপর সামনে একটি গুহা। প্রবেশমুখের দুই পাশের দেয়ালে ধাপ কাটা। প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে, যেন বিশ্রাম নেওয়ার বেঞ্চ। চাইলে এখানে বসে আড্ডা দেওয়া যাবে। গুহা পেরিয়ে এবার বড় ঝরনা। এখানেও রয়েছে কয়েক ধাপে পাথরের সিঁড়ি। একদম পিচ্ছিল নয়। শুধু পানির ধাক্কা থেকে একটু সাবধান। আদিবাসীরা জানালেন, সারা বছরই এখানে পানি থাকে। ঝরনার আশপাশের পাহাড়ে তাঁরা জুমচাষ করেন।
এবার ফেরার পালা। ওঠার সময় গল্পে গল্পে আর ঝরনা দেখার উত্তেজনায় সময়টা পার হয়ে যায়। নামার সময় মনটা বেশ খারাপই হলো। আবার আসার সাধ নিয়ে পানিপথে হাঁটা শুরু করলাম।
Source: Daily Prothom-Alo

Sunday, October 17, 2010

খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের উপচে পড়াভিড়

খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের উপচে পড়াভিড়

আব্দুল্লাহ আল- মামুন, খাগড়াছড়ি থেকে :

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খাগড়াছড়ি। এখানে পাহাড়, ঝরনা, নদী, আকাশ মিলেমিশে একাকার। এখানকার প্রকৃতির নির্মল পটে দেশী বিদেশি পর্যটক ছুটে আসছে। সবুজে ঘেরা পাহাড়ি এ জনপদ এখন পর্যটকদের পদভারে মুখরিত। পর্যটন স্পটগুলোতে দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড়। ঈদের ছুটিতে শহরের হোটেল-মোটেল, রেস্ট হাউস এবং গেস্টহাউসগুলো অনেক আগেই বুকিং হয়েছে। কোথাও সীট না পেয়ে পর্যটকদের শেষ ঠিকানা উপজাতিদের বসত-বাড়ি। অজানা অচেনা অতিথির আশ্রয় মিলছে তাদের ঐতিহ্যবাহী মাচাং ঘরে। পাহাড়িদের অতিথি আপ্যায়নে আগন্তুকরাও মুগ্ধ। পর্যটন শহর খাগড়াছড়ির ছায়া ঢাকা মায়া ভরা গ্রামগুলোতে এখন প্রতিদিন পাহাড়ি-বাঙালির মিলন মেলা বসছে। কেউ আবার বেড়াতে এসেও হোটেল-মোটেলে সীট না পেয়ে জেলা শহর থেকে উপজেলা শহরগুলোর পর্যটন স্পটের কাছাকাছি হোটেল অথবা পরিচিত জনদের ঠিকানায় অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছে।
কোথায় যাবেন?
খাগড়াছড়ির পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্পটগুলো হচ্ছে- খাগড়াছড়ি জেলা শহরের অদূরেই অবস্থিত আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র অবস্থিত। এ পাহাড় চূড়ায় বসে এক পলকে পুরো খাগড়াছড়ি শহরের অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করা যাবে। তখন আপনার কা্ছে মনে হবে আপনি নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে অবস্থান করছেন। কারণ খাগড়াছড়ির মতই নেপাল শহরটি পাহাড় ঘেরা নির্মল পরিবেশে অবস্থিত। খাগড়াছড়ির এ দৃশ্য অনেকের কাছে কল্পনার দার্জিলিং হিসেবে খ্যাত। আলুটিলা পাহাড়ের নিচেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে দেখতে পাবেন রহস্যময় কৃষ্ণ কালো গুহা। যেখানে মশাল জ্বালিয়ে যেতে হয়। এর এক প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে অন্য প্রান্ত দিয়ে বেড়িয়ে আসার পথে আপনাকে নিজে যাওয়া হবে রহস্যের অন্য কোন ভুবনে। এ গুহার নিচে স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা, মাথার কাছে বাদুরের ঝাক আরও কত কিছু...। আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রিসাং ঝরনা, এই ঝরনাধারায় অনবরত ঝরনা ধারা ঝরঝর শিরশির বইছে; আর হাতছানিতে আপনাকেই ডাকছে। এখানে গোসলটাও সেরে নিতে পারেন। অনুমতি সাপেক্ষে শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত সেনাবাহিনীর রিজিয়ন কর্তৃক সৃষ্ট গিরী সোভা হ্রদকে ঘিরে গড়ে ওঠা নান্দনিক সাজে সজ্জিত নতুন পর্যটন কেন্দ্র সত্যি আপনাকে অন্য ভুবনে নিয়ে যাবে। খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দেবতা পুকুর, পথে দেখা মিলবে পাহাড়ে পাহাড়ে উপজাতিদের সৃজিত জুম ধানের ক্ষেত, এখানে আসার পথে মারমা, ত্রিপুরা ও চাকমা উপজাতির ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্রময় জীবনধারা দেখা যাবে, শহরের প্রবেশমুখে রয়েছে নবনির্মিত আনসার ও ভিডিপির নান্দনিকতার ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত হেরিটেজ পার্ক, এখানে বসে এঁকে বেঁকে বয়ে যাওয়া চেঙ্গি নদী, উঁচু ঢেউ তোলা পাহাড়, দূরের নিল আকাশে সাদা মেঘের খেলা দেখার অপূর্ব সুযোগ রয়েছে। যা পর্যটকদের জন্য নতুন সংযোজন। খাগড়াছড়ি শহরের মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে কৃষি গবেষণা কেন্দ্রকে ঘিরে হরেক রঙের ফুল,ফলজ, বনজ ও ভেষজ বাগান, পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে ছোট্ট একটি হ্রদ ও লোহার ব্রিজ। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলা থেকে একটু ভিতরে রয়েছে এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তর বৌদ্ধমূর্তি। এই মূর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা বিশাল আয়তনের অরণ্য কুটির আপনাকে নিয়ে যাবে চীন, জাপান, কোরিয়ার মত মঙ্গোলীয়ন কোন একদেশের বুড্ডিস জগতে। পানছড়ি উপজেলা শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে তবলছড়ি ঝরনাটিলা। এখানে একটি পাহাড় ছড়ায় ছোট বড় পাথরের উপর দিয়ে প্রবাহমান স্বচ্ছ পানি, কয়েকটি ঝরনা ও বিরাশি টিলার গায়ে আদা-হলুদ, কচু, বিভিন্ন সবজিসহ জুম চাষ দেখার সুযোগটি বেশ ব্যতিক্রম। এখানে গামারি, সেগুনসহ বিভিন্ন ফলজ, বনজ পাহাড়ে হরেক রকম পাখ-পাখালি ছাড়াও বন্য শুকুর, বন্য বানর, বন্য হরিণের হাক-ডাক আনাগোনার দৃশ্যটিও কি কম ব্যতিক্রম?
এছাড়াও খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে একটি বিশাল ঝরনা আবিষ্কৃত হয়েছে। যা দেশের সবচেয়ে বড় ঝরনা বলা হচ্ছে। তবে এখনই এ ঝরনায় যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়নি। ওদিকে মাটিরাঙ্গার ১০ মাইল এলাকায় শতবর্শী বটবৃক্ষ, রামগড়ের বিডিআরের জন্মস্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা নতুন ঝুলন্ত ব্রিজ ও লেক দেখার মত একটি স্থান। এখানে সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ব বিষয় রামগড় উপজেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট পাহাড়ি ফেনী নদীর ওপারেই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য অবস্থিত। যা কাঁটা তাঁরের বেড়া দারা পরিবেষ্টিত। দেশের মানচিত্রে গ্রথিত ও প্রায় চিকন একটি দাগের মত সংযুক্ত স্থানটিই হচ্ছে রামগড়। এই রামগড় সীমান্ত ঘেঁষে রয়েছে বিশাল আকারের একটি চা বাগান সেখানেও আপনারা হারিয়ে যেতে পারেন। যে কোন সময়ে, যে কোন মূহুর্তে...
কিভাবে যাবেন?
রাজধানী ঢাকার কমলাপুর, সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান থেকে সরাসরি বাস খাগড়াছড়ি আসে। এস আলম, সৌদিয়া, স্টার লাইন(এসিসহ), শান্তি পরিবহন, শ্যামলী বাসযোগে খাগড়াছড়ি আসতে ভাড়া লাগবে ৩০০-৩৫০ টাকা। অভ্যন্তরীণভাবে পাহাড়ি পথে ঘোরাঘুরির জন্য চাঁদের গাড়ি (জীপ) সবচেয়ে ভালো। খোলা গাড়িতে বসে প্রকৃতিও দেখা হবে, ছবি তোলা যাবে। তাছাড়া এক জিপে ২০জন উঠলেও সমস্যা নেই। তাই ভাড়াও অনেক কম। এছাড়া মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার সবই পাওয়া যাবে। এখন খাগড়াছড়ি শহরে ঘোরারোর জন্য অসংখ্য বেটারি চালিত দূষণমুক্ত টমটম গাড়িতো রয়েছেই। টমটম গাড়িতে চেপে কম সময়ে শহরের নিউজিল্যান্ড পর্যটন কেন্দ্র, ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের স্থান খাগড়াছড়ি স্টেডিয়াম, বিভিন্ন দোকানে কেনাকাটার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কোথায় থাকবেন?
আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের খুব কাছে পাহাড় চূড়ায় নবনির্মিত ইমাং রির্সোস এন্ড নেচারাল রেস্টুরেন্ট ডবল কক্ষ নন এসি ১০০০ টাকা, সিঙ্গেল নন এসি ৮০০ টাকা, ডবল এসি রুম ১৮০০ টাকা। শহরের প্রবেশমুখে চেঙ্গী নদীর পারে অবস্থিত পর্যটন মোটেলের ডবল রুম নন এসি ১০৫০ টাকা, ডবল এসি রুম ১৫০০ টাকা, ভিআইপি সুইট রুম ২৫০০ টাকা ও সিঙ্গেল রুম ৩০০ টাকা, এসি রুম ৬০০ নন এসি ডবল নন এসি ৫০০ টাকা, সিঙ্গেল রুম ২০০ টাকা। এছাড়া আরও কম মূল্যে খাগড়াছড়ি বাজার এলাকায় রয়েছে হোটেল আল-মাসুদ, হোটেল লবিয়ত, হোটেল ফোর স্টারসহ অনেকগুলো হোটেল।

Source: www.dailysangram.com

রহস্যময় আলুটিলা আর নয়নাভিরাম রিসাং

রহস্যময় আলুটিলা আর নয়নাভিরাম রিসাং


এপ্রিলের এক রৌদ্রময় সকালে বেড়িয়ে পড়লাম পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের লীলাভূমি খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। সঙ্গে আমার সবসময়কার ভ্রমণ সঙ্গী বন্ধু মুসা আহমেদ, সাকিব হোসেন আর আবদুর রউফ। শিক্ষাজীবন চট্টগ্রামে হওয়ায় এদের সঙ্গে চষে বেড়িয়েছি চট্টগ্রাম আর পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সব জায়গায়। এবার খাগড়াছড়ি ভ্রমনে আমাদের মূল গন্তব্য ছিলো আলুটিলা আর রিসাং ঝর্না।
বাস স্ট্যান্ডে গিয়েই পড়লাম বিপাকে। সকাল সকাল পৌঁছুলেও বাস মিস করলাম। কাউন্টারের টিকিট বিক্রেতা জানালো দু’ঘন্টার আগে আর কোন গাড়ি নেই। আমাদের তো মাথায় হাত! কারণ রাতেই আবার চট্টগ্রাম ফিরে আসতে হবে । উপায়ন্তর না দেখে চড়ে বসলাম লোকাল বাসে। আর এখানেই ভুলটা করে বসলাম। রীতিমত যুদ্ধ করে বাসে সিট দখল করতে হলো। একে তো মানুষের উপচে পড়া ভীড়। তার উপর বাসের পেছনের সিটে বসায় ঝাকি খেতে খেতে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তবে মাটিরাঙ্গা পৌঁছানোর পর অবস্থা পাল্টে গেলো। পথের দু’ ধারের মনকাড়া রূপ আস্তে আস্তে আমাদের ক্লান্তির অনেকখানিই প্রশমিত করে দিলো। সারি সারি উঁচু পাহাড় আর জুম ক্ষেত পেছনে ফেলে আমাদের বাস ছুটে চলেছে। আর আমরা একেকজন হারিয়ে গেলাম মায়াবী এক জগতে। কিছুক্ষণ পর আমাদের বাসটি উঁচু-নীচু রাস্তায় গিয়ে পৌঁছুলো। হঠাৎ বাসটি একবার খাড়া উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে তো এই আবার বিপদজনকভাবে নেমে আসছে। কিছু কিছু জায়গায় দেখলাম সেতুর আগে ঝুঁকিপূর্ণ সতর্ক নির্দেশ দেওয়া। খাগড়াছড়ির পথে পথে এরকম প্রচুর ছোট ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু চোখে পড়ে।
বাসের হেল্পারকে আগেই বলে রেখেছিলাম আলুটিলা নামিয়ে দিতে। তিন ঘন্টার বাস জার্নিটাকে চার ঘন্টা বানিয়ে খাগড়াছড়ি শহরের প্রায় ছয় কি.মি. আগে বাস নামিয়ে দিলো আমাদের গন্তব্যস্থল আলুটিলায়। অনেকেই হয়তো জানেন আলুটিলা বিখ্যাত তার রহস্যময় সুড়ঙ্গের কারনে। আমাদেরও ব্যাপারটা আগে থেকেই জানা ছিলো। তাই আলুটিলায় নেমেই আমাদের মধ্যে একটা অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার ভাব চলে এলো। পাঁচ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম। প্রবেশ মুখেই দেখতে পেলাম পর্যটকদের আকর্ষণ করতে আলুটিলা কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ড। অনেক খানি হেঁটে আর প্রায় শ’খানেক ধাপ সিড়ি ভাঙ্গার পর গিয়ে মিললো সুড়ঙ্গ মুখের দেখা। বন্ধু রউফ মোবাইল টর্চের আলোতে সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে পড়লো। তবে কিছুদূর গিয়েই বোঝা গেলো এরকম ঘুটঘুটে অন্ধকারে সুড়ঙ্গ জয় সম্ভব নয়। তাছাড়া কোন কারন ছাড়াই গা ছম ছম করছিলো। তাই আবার ফিরে গিয়ে মশাল কিনে আনলাম। সুড়ঙ্গের পথ কিছুটা কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল। তলদেশে প্রবাহমান ঝর্না। মাথার উপর ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাদুড়ের কর্কশ চিৎকার। পাহাড়ের নীচে খুব সাবধানে মশাল নিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতর যেতে হয়। এভাবে মিনিট দশেক যাওয়ার পর পাওয়া গেলো সুড়ঙ্গের অপর প্রান্ত। বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে গেলো ভাব নিয়ে আমরা মনোযোগ দিলাম মশাল হাতে ফটোসেশনে।


এ সিড়ি বেয়ে নিচে নামলেই আলুটিলা সুড়ুঙ্গ







মশাল হাতে ফটোশেসন

আলুটিলা সুড়ঙ্গ জয় (!) শেষে আমরা বেরিয়ে এলাম। আলুটিলার উল্টোপাশেই রয়েছে আবাসিক হোটেল ‘ইমাং’। পাহাড়ের উপর অবস্থিত এ হোটেল থেকে খাগড়াছড়ি শহরটিকে ছবির মতো সুন্দর দেখায়। ইমাংয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা রওয়ানা হলাম রিসাংয়ের উদ্দেশ্যে। আলুটিলা থেকে প্রায় দেড় কি.মি. আগে রিসাং। সেখান থেকে ঝাড়া সোয়া দুই কিলো হাঁটা পথ । সমতল পথ নয়, জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ী পথ। যাওয়ার সময় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি সঙ্গী হওয়ায় হেঁটে যেতে তেমন কষ্ট হলোনা। কিন্তু ফেরার সময় প্রচন্ড রোদ থাকায় পাহাড়ী রাস্তায় চলতে চলতে আমাদের দম বের হওয়ার জোগাড়। স্থানীয়দের কাছে রিসাং ঝর্না ‘তেরাংতৈ কালাই ঝর্না’ নামে বেশি পরিচিত। আর মারমা ভাষায় ‘রিসাং’ মানে পাহাড় থেকে পানি পড়া।
রিসাং যাওয়ার পথে আদিবাসীদের ঘর-বাড়িগুলো চোখে পড়ার মত। বেশিরভাগ বাড়িই পাহাড়ি মাটির তৈরী। দেখতে চমৎকার। স্থানীয় একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো মাটির তৈরী হলেও বাড়িগুলো যথেষ্ট মজবুত। জানা গেলো, ওখানে টিপরা বা ত্রিপুরার অধিবাসীদের বাস।
হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে গেলাম সিড়ির দেখা। কয়েকশো ধাপ। কিছু ধাপ পেরোতেই শুনতে পেলাম পাহাড় থেকে অনবরত জল পতনের ধ্বনি। বুঝে গেলাম রিসায়েংর খুব কাছে চলে এসছি। আরো কিছুটা নামার পর দেখা পাওয়া গেলো যৌবনবতী রিসাংয়ের। সিড়ির শেষ ধাপটি পেরিয়ে আর কাদাময় পিচ্ছিল পথ আর ছড়াটা অনেকটা দৌড়ে রিসাংয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চোখ জুড়িয়ে গেলো, মন ছেয়ে গেলো প্রশাস্তিতে। আর দেরি করলাম না। কাপড়চোপড় নিয়েই আমরা নেমে পড়লাম ঝর্নার পানিতে শরীর জুড়াতে। দুঃসাহসী কয়েকজনকে দেখলাম ঝর্নার ঢালু অংশ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নীচের ছড়ায় পড়ছে। ব্যাপারটা আনন্দদায়ক সন্দেহ নেই কিন্তু বিপদজনকও বটে। রিসাংয়ে গিয়ে আমাদের কারোরই ফিরতে মন চাইছিলো না।


এ সিড়ি বেয়ে নিচে নামলেই রিসাং ঝর্না

রিসাং ঝর্না

রিসাং থেকে বাসে করে খাগড়াছড়ি শহরে গিয়ে পৌঁছালাম। রিসাংয়ের মায়াবী রূপ আমাদের আবার বাস মিস করিয়ে দিলো। শহরে পৌঁছে জানলাম বিরতহীন শেষ বাসটি মাত্রই ছেড়ে গিয়েছে। শেষ লোকাল বাসটি আর মিনিট বিশেক পর ছাড়বে। টিকিট কেটে তড়িঘড়ি করে কিছু খেয়ে নিলাম। ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে বাসে উঠে দেখি আমাদের সিটে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একজন লোক বসে আছে। মাটিরাঙা পর্যন্ত তার স্ত্রী আর সন্তানকে বসতে দিতে লোকটি আমাদের অনুরোধ করলো। কী আর করা! ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে প্রায় অর্ধেকটা পথ বাসে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
খাগড়াছড়িতে গেলে ফেরার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন জরুরী। পাহাড়ি রাস্তায় কোন দুর্ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য সন্ধ্যার পর বাস চলাচল করতে দেওয়া হয়না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জায়গাতেই সন্ধ্যার আগেই শেষ বাসটি ছেড়ে যায়।
যেভাবে যাবেন
একদিনের ভ্রমণ হওয়ায় খাগড়াছড়ি শহরটি খুব ভালো করে দেখার সুযোগ হয়নি। তবে বাস থেকে শহরটিকে মনে হয়েছে ছিমছাম সাজানো গোছানো। খাগড়াছড়ি যেতে চাইলে ঢাকা থেকে যেকোন এসি বা নন-এসি পরিবহনে যাওয়া যাবে। এসি পরিবহন স্টারলাইনের ভাড়া ৪০০ টাকা। আর শ্যামলী, এস আলম সহ বিভিন্ন নন-এসি পরিবহনের ভাড়া ৩০০ টাকা। ট্রেনে গেলে প্রথমে চট্টগ্রাম নামতে হবে। তারপর যেতে হবে বাসে। চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে পাওয়া যাবে বিরতিহীন বাস ‘শান্তি’। ভাড়া ১৪০ টাকা। যেতে লাগবে তিন ঘন্টা। রিসাংয়ের কাছাকাছি থাকার জায়গা হচ্ছে পর্যটন মোটেল । আর আলুটিলার কাছে হচ্ছে হোটেল ইমাং। এছাড়া শহরে বিভিন্ন দরের হোটেল পাবেন। হেঁটে না গিয়ে জিপ বা চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করেও রিসাং যেতে পারেন। তবে প্রকৃতির দুর্গমতাকে জয় করে সৌন্দর্য উপভোগ করার মজাটা কিন্তু একবারেই আলাদা। #

০৪ ঠা মে, ২০১০

By কাঊসার রুশো

Friday, October 8, 2010

খাগড়াছড়ি ভ্রমণের এখনই সময়


খাগড়াছড়ি ভ্রমণের এখনই সময়

০০ তরুণ ভট্টাচার্য, খাগড়াছড়ি থেকে

বাংলাদেশের প্রধান বনজ সম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চল হচ্ছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি। দেশের সমতল এলাকার তুলনায় এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি যেন সম্পূর্ণ আলাদা। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু, ছোট আর বড় পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে এখানে রয়েছে পাহাড়ী ঝিরি বা ঝরণা, ছড়া আর ছড়ি। ঘন সবুজ অরণ্যভূমির বুক চিরে কল কল শব্দে আপন অরণ্য ভূমির খরস্রোতা নদী চেঙ্গী, ফেনী, মাইনী ও কর্ণফুলী বহমান। অনেকটা সুন্দরবনের মতো পরিব্যাপ্ত গহীন পার্বত্য অরণ্যানী ছড়িয়ে আছে চেঙ্গী, কাসালং ও মাইনী উপত্যকা জুড়ে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ ক্রমশ বাড়ছে। বর্ষার রেশ কেটে যাওয়ায় শরতের শান্ত প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আকর্ষণে পর্যটকদের যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে খাগড়াছড়ি। শরৎ, হেমন্ত আর শীতের মৌসুমে পর্যটকদের আকর্ষণ খুব বেড়ে যায়। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য যেখানেই বিলিয়ে আছে সেখানেই ছুটে যায় প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণ পিপাসুরা। প্রকৃতির কিছু অপূর্ব সৃষ্ঠি অপার এ সৌন্দর্য্যকে করেছে মহিমান্বিত ও আকর্ষণীয়। এসব সৃষ্টিসমূহ হচ্ছে যথাক্রমে-

দেবতার পুকুর ঃ জেলার মাইসছড়ির নুনছড়ির সুউচ্চ পাহাড় এলাকায় রয়েছে ভিন্ন প্রকৃতির এক হ্রদ। তার নাম 'মাতাই পুখিরী'। এই হ্রদটি দেড়হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হলেও চারদিকে মালভূমি দ্বারা বেষ্টিত বলে হ্রদটি সমতল ভূমিতেই অবস্থিত মনে হয়। স্থানীয় আদিবাসী ত্রিপুরাদের মতে, পাহাড়ের উপরের এই হ্রদে কখনো পানি কমে না এবং পানি অপরিষ্কারও হয় না বলে তারা এর নাম দিয়েছে 'মাতাই পুখিরী' অর্থাৎ দেবতার পুকুর।

আলুটিলা ঃ চট্টগ্রামের বা ফেনীর কোন গাড়িতে চড়ে খাগড়াছড়ির সুউচ্চ আলুটিলা পর্যটন স্পটে গিয়ে বটমূলে দাঁড়িয়ে পূর্ব দিগন্তে দূর-বহুদূর দৃষ্টি ফেরালেই দেখা যাবে পার্বত্য শহর খাগড়াছড়ি। বন্ধুর এই পাহাড়ী উপত্যকায় গড়ে উঠেছে কত না সুদৃশ্য ভবন, সারি সারি ঘর-বাড়ি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে রৌদ্র ঝলমলে টিনের চালাঘর যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। সূর্যাস্তের পর আলুটিলা থেকে খাগড়াছড়ি দেখা অর্থাৎ রাতের খাগড়াছড়ি যেন আর এক মনোলোভা দৃশ্য। দূর থেকে দেখা যায় ঘন কালো অন্ধকারে লাখো বাতির মিটিমিটি আলো।

রহস্যময় সুরঙ্গ ঃ রহস্যময় সুরঙ্গ আলুটিলা পর্যটন কেন্দ পরিদর্শনকালে পর্যটকদের জন্য আরেকটি আকর্ষণ। 'পাহাড়ের চোরা এই সুরঙ্গ একাকী ভ্রমণ করতে অনেকেই ভয় পান। এই ভয়ের কারণ সুরঙ্গ ঘন কালো অন্ধকার বলে। এছাড়া সুরঙ্গে শত শত কলাবাদুরও থাকে। রাতে বা দিনে অবশ্যই টর্চ, মশাল কিংবা হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে ঢুকতে হয় এই সুরঙ্গে। স্থানীয়ভাবে মশাল কিনতে পাওয়া যায়। সুরঙ্গ দেখতে হলে দলে ভিড়ে দেখা ভাল।

বটবৃক্ষ, রিছাং ঝর্না ও রাজার দীঘি ঃ স্মৃতিতে ধরে রাখার মতো দুইশ বছরের প্রায় ২০০ ফুট ব্যাসার্ধের বিশালাকৃতির এক বটবৃক্ষ দেখতে যাওয়া যায় আলুটিলার ১০ নম্বরে। খাগড়াছড়ি বা মাটিরাংগা থেকে চাদেঁর গাড়ি বা জীপ নিয়ে যাওয়া যায় ১০ নম্বরে। খাগড়াছড়ি ও মাটিরাংগার মাঝপথে আলুটিলা সল্ট প্রজেক্টের পাশ দিয়ে পায়ে হেঁেট যাওয়া যায় রিছাং ঝনর্া দেখতে।


মং রাজ বাড়ি ঃ খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলা সদরে গিয়ে ঘুরে দেখা যায় শতাধিক বছরের পুরানো মারমা জাতিগোষ্ঠীর রাজা বা মং রাজার বাড়ি। প্রয়াত মং রাজার নিকটাত্মীয়ের অনুমতি নিয়ে ঐতিহ্যমন্ডিত অনেক কিছুই দেখা যায় এখানে। আলাপ করে জানা যায় অনেক ইতিহাস। তবে নতুন মং রাজার বাড়ী নির্মিত হয়েছে এখন খাগড়াছড়ি সদরের জিরো মাইল মহালছড়া এলাকায়। সে ভবনটিও স্মৃতিতে ধরে রাখার মতো।

রামগড় লেক ও চা বাগান ঃ সীমান্ত শহর রামগড় উপজেলা সদরে নান্দনিক সৌন্দর্যমন্ডিত কৃত্রিম লেক নানাদিক থেকে আনন্দ যোগায় পর্যটকদের। রামগড় সদরের খুব কাছেই বাগান বাজার এলাকায় পাহাড়ী পরিবেশে চা-বাগান ও পিকনিক স্পট। এখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন আদিবাসী সাওঁতালরা। আগ্রহ করে জানা যাবে তাদের জীবন ও জীবিকা সম্পর্কে। চা-বাগানের অভ্যন্তরে রয়েছে শাপলা ফোটা বিশাল প্রাকৃতিক লেক। কিছুদিন পর এ লেকে আসবে শীতের নানান জাতের অতিথি পাখি।

বৌদ্ধ ও হিন্দুদের তীর্থস্থান ঃ বৌদ্ধ ও হিন্দু তীর্থ যাত্রীদের ঘুরে দেখার মত তীর্থস্থান রয়েছে অনেকগুলো। বৌদ্ধ তীর্থ যাত্রীরা খাগড়াছড়ি এসে প্রাচীন য়ংড বৌদ্ধ বিহার, আলুটিলা পর্যটন কেন্দে র আলুটিলা নবগ্রহ ধাতু চৈতু্য, ধর্মপুর আর্য বন বিহার, পানছড়ি অরণ্য কুঠির ও দীঘিনালা বন বিহারে ঘুরে দেখার মত রয়েছে অনেক কিছুই। পানছড়ি অরণ্য কুঠিরে রয়েছে ৪৭ ফুট উঁচু দেশের সর্বোচ্চ বুদ্ধ মূর্তি। হিন্দু তীর্থ যাত্রীদের জন্য রামগড়ের প্রাচীন দক্ষিণেশ্বরী কালী বাড়ি, খাগড়াছড়িতে নারায়ণবাড়ি ও সিঙ্গিনালায় লোকনাথ সেবাশ্রম, দীঘিনালায় প্রাচীন শিব মন্দির ঘুরে দেখার মত।

যাতায়াত ও থাকা খাওয়া ঃ প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত রূপনন্দিনী খাগড়াছড়িকে দেখতে আর জানতে পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই। রাজধানী ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সমিতির আরামদায়ক বাস ছাড়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০-১৫টি। সাইদাবাদ, কমলাপুর, গাবতলী, ফকিরাপুল, কলাবাগান ও টিটি পাড়া থেকে টিকেট সংগ্রহ করে এস আলম,স্টার লাইন, শ্যামলী, সৌদিয়া, শান্তি স্পেশাল ও খাগড়াছড়ি এক্সপ্রেসযোগে খাগড়াছড়ি আসা যায়। ঢাকা থেকে ট্রেনে ফেনী এসেও হিলকিং অথবা হিল বার্ড বাসে চড়ে খাগড়াছড়ি আসা যায়। চট্টগ্রামের অক্সিজেন থেকেও শান্তি স্পেশাল ও লোকাল বাসে উঠে আসা যায় খাগড়াছড়িতে। খাগড়াছড়িতে আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও মোটামুটি ভাল আছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন নির্মাণ করেছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এক সুবিশাল "মোটেল"।

Wednesday, September 15, 2010

খাগড়াছড়ির অরণ্যে

খাগড়াছড়ির অরণ্যে

হেমন্তের সকালে ঘুম ভাঙা চোখে বাইরে তাকাতেই পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা সাদা কুয়াশায় চোখ আটকে গেল। আফসোস! আরেকটু আগে কেন ঘুম ভাঙল না। গাড়িতে থাকা সবাই তখন বড় বড় চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে। পাহাড়ি রাস্তায় প্রতি বাঁকে পাহাড়ের গায়ে সাদা কুয়াশা মেঘের মতো লেগে আছে। যেন প্রতিটি পাহাড় কুয়াশার সাদা চাদর দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে। দিনের আলো তখনো ফোটেনি। আধো আলো আধো অন্ধকারের মধ্য দিয়ে গাড়ি ছুটে চলছে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে দুই চোখে যা দেখছি, তা-ই ভালো লাগছে।
এই ভালো লাগার জন্যই খাগড়াছড়িতে আসা। কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলাম আমাদের গন্তব্য খাগড়াছড়ির আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে।
ভ্রমণের টিভি অনুষ্ঠান ‘বাংলালিংক বাংলার পথে’, ইনসাইটা ট্যুরিজম ও নর্থ আলপাইন ক্লাব, বাংলাদেশ এই ভ্রমণের আয়োজন করেছিল। আগের রাতে যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকা থেকে। বাংলার পথের উপস্থাপক টিংকু বলেন, অনুষ্ঠান করার জন্য বাংলাদেশের অনেক স্থানে যেতে হয়। বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে ইচ্ছা থাকলেও কাউকে সফরসঙ্গী করা যায় না। তাই পার্বত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ি আমাদের এই ভ্রমণের আয়োজন।
২৩ অক্টোবর সকাল হওয়ার আগেই পৌঁছে যাই পার্বত্য অঞ্চলে।

আলুটিলা
খাগড়াছড়ি জেলার পুরোটাই পাহাড়ি এলাকা।এর মধ্যে মাটিরাঙ্গার আলুটিলা পাহাড়ের সৌন্দর্য হূদয় ছুঁয়ে যায়। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে ঢোকার প্রধান ফটকের দুই পাশে শতবর্ষী দুটি বটবৃক্ষ স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের বুকে বটগাছ দুটির সৌন্দর্য ভালো লাগে। ফটক দিয়ে ঢোকার পর ডান পাশের রাস্তা দিয়ে মিনিট খানেক হাঁটলেই চোখে পড়বে একটি পাহাড়ি সরু পথ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেছে সেই পথটি। সরু পথটি দিয়ে নেমে পড়ি নিচের দিকে। নেমেই চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা। ছোট একটি পাহাড়ি ঝরনা। ঝরনা দিয়ে পানি নামছে। পানি আটকে রাখার জন্য ছোট একটি বাঁধ দেওয়া হয়েছে। একজন আদিবাসী পাহাড়ি নারী ঝরনা থেকে পানি নিতে ও পূজা দিতে এসেছেন। এই ঝরনার পানি দিয়ে তাঁরা খাওয়াসহ সব কাজ করেন। পাহাড়ি আদিবাসী এই নারী বলেন, ‘এই ঝরনার পানি দিয়েই আমরা আমাদের সব চাহিদা পূরণ করে থাকি। তাই একে পূজা করি।’ ঝরনার পানি দিয়েই ঘুমকাতুরে শরীরটা সতেজ করি আমরা। কিছু দূর এগোলেই পাহাড়ের বুক থেকে কুয়াশা দিয়ে সাদা তুলার মতো ঢেকে থাকা খাগড়াছড়ি শহরটি দেখা যায়। খাগড়াছড়ি জেলাটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত হলেও শহরটি সমতল ভূমির ওপর। সকালের পাহাড়গুলো আলাদা রূপে সেজেছে। যত দূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়।
পাহাড়ের নাম আলুটিলা হলেও কোনো আলু পাওয়া যায় না পাহাড়ে। আদিবাসীদের কাছে জানা যায় পাহাড়ের নাম আলুটিলা হওয়ার কারণ। প্রচলিত আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন কোথাও খাবার পাওয়া যায়নি। ওই সময় এই পাহাড়ে অনেক আলু হয়েছিল। দুর্ভিক্ষের সময় আদিবাসীরা আলু খেয়ে বেঁচে ছিল। সেই থেকে এই পাহাড়ের নাম আলুটিলা পাহাড়। কুয়াশা কেটে যাওয়ার পর আলুটিলা পাহাড়ের আসল সৌন্দর্য দেখা যায়।

রিছাং ঝরনা
খাগড়াছড়ির অন্যতম সুন্দর স্থান হলো রিছাং ঝরনা। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র থেকে গাড়িতে করে যাত্রা শুরু করলাম। একটু বেশি সাহসীরা উঠে গেলাম গাড়ির ছাদে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখার জন্য। একটু ভয় থাকলেও কষ্ট করে ছাদে ওঠায় লাভই হলো। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় ছাদ থেকে পাহাড় দেখার আনন্দ অন্য রকম। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে ভুলে গেলাম সারা রাতের ভ্রমণের ক্লান্তি। গাড়ি কিছুক্ষণ চলার পর থামতে হলো আমাদের। বড় গাড়ি পাহাড়ি সরু রাস্তায় ঢুকতে পারবে না। নামতে হলো আমাদের সবাইকে। সবাই খুশিমনে হাঁটতে শুরু করলাম পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে। যা দেখছি সবকিছুই ভালো লাগছে। ভালো লাগার মতোই সবকিছু। দল বেঁধে হাঁটতে থাকি পাহাড়ি ইট বিছানো মেঠো পথ ধরে। দুই পাশে উঁচু উঁচু পাহাড়ের মধ্য দিয়ে উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা। কিছুক্ষণ পর পর কাঁধে করে কলার ঝাঁকা নিয়ে ছুটে যাচ্ছে পাহাড়িরা। আমাদের যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, সেই রাস্তা দিয়ে তারা অনায়াসেই কলার ঝাঁকা নিয়ে যাচ্ছে। যাত্রা শুরুর আগেই আমাদের সবার হাতে একটি করে বাঁশের লাঠি দেওয়া হয়েছে। এই লাঠি যে কতটা দরকারি উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথে তা দ্রুতই বোঝা গেল।কিছু দূর হাঁটার পর আমাদের নামতে হয় আরও সরু পথে। এবার আর দল বেঁধে হাঁটার উপায় নেই। একজন একজন করে হাঁটতে হবে পাহাড়ি লাল মাটির পথ দিয়ে। হাঁটতে গিয়ে বোঝা গেল, পথগুলো অনেক পিচ্ছিল ও ঢালু। আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছে, পাহাড়ি রাস্তায় জোঁকের ভয় আছে। সবকিছু মিলে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। বাঁশের লাঠির ওপর ভর করে আস্তে আস্তে নামতে থাকি পাহাড়ের নিচের দিকে। হঠাত্ আমাদের কানে একটি শব্দ এসে বাজতে থাকে। ঝরনার পানি পড়ার শব্দ।আমরা ঝরনার ওপরের অংশের কাছে গেলাম। পাহাড় থেকে নেমে আসছে পানি। অনেকেই আনন্দের বাঁধ ভেঙে নেমে পড়ল ঝরনার ওপরের অংশের পানিতে। আরও কিছুটা পাহাড়ি পথ নেমে রিছাং ঝরনায় নামলাম আমরা।
নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আধার রিছাং ঝরনা যেন সৃষ্টির সেরা। প্রায় ১০০ ফুট উপর ঝরনার পানি নিচে পড়ছে। নিচে পড়ার পর আরও প্রায় ১০০ ফুট পাথরের ওপর গড়িয়ে নেমে আসে সমতলে। রিছাং ঝরনার ভালো লাগার বিষয়ের মধ্যে অন্যতম হলো, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে খেলা করতে পারবেন আপনি। আপনি ফিরে যেতে পারবেন সেই গ্রামের ফেলে আসা শৈশবে। পানি নিচে পড়ার ফলে একটি পিচ্ছিল পথের সৃষ্টি হয়েছে ঝরনার পানি যাওয়ার পথে। আপনি একটু সাহসী হলেই সেই পানির স্রোতের সঙ্গে নিচে নেমে আসতে পারেন। সবাই মেতে উঠি ঝরনার পানির সঙ্গে নেমে আসার খেলায়। আমাদের সঙ্গে ছিল পর্বত আরোহী দল নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশ। তারা নেমে পড়ে রিছাং ঝরনা অবতরণে। ঝরনার ওপরের অংশ থেকে প্রায় ৪০ মিটার নেমে আসেন তাদের ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মুসা ইব্রাহীম।
আবার যাত্রা শুরু করলাম আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে। যাওয়ার পথে পাড়ি দিলাম অন্য একটি পথ। পর্যটকদের জন্য বানানো হয়েছে সিঁড়ি দিয়ে তৈরি করা একটি পথ। সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাওয়া যাবে অনেকটা পথ। সিঁড়ির পথ শেষ হওয়ার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে একটু বিশ্রাম নিই। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে কতগুলো বেঞ্চ। আদিবাসীরা পাহাড়ি পথে কিছুক্ষণ পর পর নিয়ে যায় পাহাড়ি কলা। গাছপাকা কলার স্বাদ নিয়ে শরীরটাকে একটু সতেজ করে নিই আমরা। পাহাড়িরা এই কলাকে বলে বাংলা কলা। দামও খুব একটা বেশি নয়।

রহস্যময় সুড়ঙ্গ
নাম শুনলেই কেমন যেন রহস্যের গন্ধ পাওয়া যায়। রহস্যময় সুড়ঙ্গ আসলেই রহস্যময়। নাম শুনেই কেমন যেন ভয় ভয় লাগে। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে ঢোকার পর বাঁ দিকে রহস্যময় সুড়ঙ্গ। বাঁ দিকের পথ দিয়ে কিছু দূর এগোলেই পাওয়া যাবে রহস্যময় সুড়ঙ্গ। এই সুড়ঙ্গে কখনো একা যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। আমরা সবাই দল বেঁধে নামতে শুরু করলাম রহস্যময় সুড়ঙ্গে। হাতের ডান পাশের পথ দিয়ে ঢুকতে হবে সুড়ঙ্গে। আমাদের মধ্যে ভয়ানক ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করছে। সিঁড়ি ভেঙে আসতে আসতে নামতে থাকি সুড়ঙ্গে। অন্ধকার থাকার কারণে মশাল নিয়ে প্রবেশ করলাম সুড়ঙ্গে। নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে শীতল পানি পায়ে এসে লাগল। পানি পায়ে লাগার সঙ্গে সঙ্গে শীতল পরশ অনুভূত হলো সারা শরীরে। মশালের আধো আলো আধো অন্ধকার নিয়ে প্রবেশ করলাম রহস্যময় সুড়ঙ্গের মধ্যে। সুড়ঙ্গ দিয়ে ছপ ছপ করে পানি নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে; অনেক সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে। একটু এদিক-সেদিক হলেই বড় কোনো দুর্ঘটনায় পড়ার আশঙ্কা আছে। সুড়ঙ্গের মধ্যে অনেক ছোট-বড় গর্ত ও পাথরের খণ্ড আছে। পানি যেতে যেতে এর পথ পিচ্ছিল হয়ে গেছে। মশালের আলোয় সুড়ঙ্গের ভেতর পাথরগুলোকে দেখে আলাদা রকম ভালো লাগার অনুভূতি হয় আমাদের মধ্যে। প্রায় ৩০ মিনিটের পথ পাড়ি দেওয়ার পর বের হয়ে আসতে পারি সুড়ঙ্গ থেকে। বের হওয়ার মুখের অংশটুকু দেখে মনে হয় বৃক্ষ আর সুড়ঙ্গের মিতালি। এক স্বপ্নপুুরীর গল্পের সেই রসস্যময় সুড়ঙ্গ।

খাগড়াছড়ির নিউজিল্যান্ড
অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের একটুকরো নিউজিল্যান্ডকে পাওয়া গেল খাগড়াছড়িতে। সবুজ ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে খাগড়াছড়ির নিউজিল্যান্ড। আলুটিলা পাহাড়ের ওপর থেকে দেখে মনে হয়, সবুজের সঙ্গে মিতালি করে আছে ছোট ছোট ঘর। খাগড়াছড়ি শহরের এক পাশে নিউজিল্যান্ড অবস্থিত। আলুটিলা পাহাড় থেকে খাগড়াছড়ি শহরকে বিছিন্ন করে রেখেছে চিঙ্গা নদী। চিঙ্গা নদীর পাড়েই নিউজিল্যান্ড। সময় থাকলে দেখে আসতে পারেন খাগড়াছড়ির নিউজিল্যান্ড।

যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে ব্যক্তিগতভাবে খাগড়াছড়ি যেতে হলে আপনাকে বাসে যেতে হবে। ঢাকার যেকোনো আন্তজেলা বাস কাউন্টার থেকে খাগড়ছড়ির বাস পাবেন আপনি। এস আলম ও সৌদিয়া বাসে যেতে পারেন। এ জন্য আপনাকে ভাড়া গুনতে হবে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। খগড়াছড়ি শহরে সরকারি পর্যটন মোটেলে থাকতে পারবেন ৮০০ থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে থাকতে পারবেন আপনি। বেসরকারিভাবে থাকার ব্যবস্থাও আছে; এখানে কিছুটা কম ভাড়ায়। হোটেল শৈল সুবর্ণায় ৬০০ থেকে এক হাজার এবং জিরান হোটেলে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকার থাকতে পারবেন। খাগড়াছড়ি শহর থেকে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে আবস্থিত। যেকোনো উপায়ে আপনি আসতে পারবেন আলুটিলায়। আলুটিলা থেকে রিছাং ঝরনা চার কিলোমিটার।

বাদল খান
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, অক্টোবর ২৭, ২০০৯

Wednesday, August 11, 2010

খাগড়াছড়ির বাঁকে

খাগড়াছড়ির বাঁকে

খাগড়াছড়ির বাঁকে

আগেও অনেকবার পাহাড়ে, এমনকি খাগড়াছড়িতেও গিয়েছি, কিন্তু বর্ষায় পাহাড়ের সজীবতা দেখার ইচ্ছা ছিল অনেক দিন থেকেই। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে বৃষ্টিভেজা বন, সবুজ পাহাড় আর নদী দেখার জন্য আষাঢ়ের প্রথম দিনে রওনা হয়ে গেলাম খাগড়াছড়িতে।
যে রাস্তা দিয়ে খাগড়াছড়ি যেতে হয়, সেটাও দেখার মতো। রাঙামাটি অথবা বান্দরবানের মূল শহরে যাওয়ার চেয়ে খাগড়াছড়িতে যেতে অনেক বেশি পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। এখানে যাওয়ার সময় শুধু পাহাড় নয়; ঝরনা, প্যাগোডা, জুমঘরসহ অনেক কিছুই চোখে পড়বে।
তাই রাস্তায় চোখ খোলা রেখে যেখানে ইচ্ছা থেমে ছবি তুলতে শুরু করে দিলাম। বৃষ্টির সময় পাহাড়গুলোকে সবুজরূপে দেখা গেল। নদী ও ঝরনাগুলোও পরিপূর্ণ প্রমত্ত রূপ নিয়ে হাজির। পথে বেশ কিছু প্যাগোডাও চোখে পড়ল। তবে দিনের আলো থাকতে থাকতে পৌঁছানোর তাড়া থাকায় বেশিক্ষণ থামা গেল না।
পাহাড়ের কোলে দূরে একটি জুমঘর অথবা দূরে পাহাড়ের চূড়ায় কর্মরত পাহাড়িদের দেখতে দেখতে চলে এলাম খাগড়াছড়িতে ঢোকার প্রবেশপথে। আলুটিলাতে স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসা করেও নামকরণের শানে নজুল জানা গেল না। তবে এটুকু জানা গেল, আলুটিলা পার্ক ও এর মধ্যে অবস্থিত গুহা প্রধান পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আলুটিলার গুহাটি পানির স্রোতের কারণে সৃষ্টি। এই গুহার মধ্য দিয়ে পাহাড়ের এক পাশ থেকে আরেক পাশে হেঁটে যাওয়া যায়। এখানে গাইড আছে, মশালও কিনতে পাওয়া যায়। সুতরাং মশাল জ্বালিয়ে গাইডের সঙ্গে আমরা চলে গেলাম হাঁটু পানি ভেঙে গুহার ভেতরে। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিট গুহার ভেতর দিয়ে হাঁটার পর বেরিয়ে এলাম অন্যদিকে, গা ছমছম করা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ঝড়বৃষ্টির সময় গুহাতে পানির স্রোত অনেক বেশি থাকে এবং মাঝেমধ্যে পুরো গুহা পানিতে ভরে যায়। সে জন্য আকাশ দেখে ঢোকা উচিত। এখানে একটি পিকনিক স্পটও আছে, ভাড়া নিয়ে এটা ব্যবহার করা যায়।
আলুটিলা ঘুরে আমরা হোটেল থেকে হাত-মুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহরে ঘুরতে। সৌভাগ্য যে আমাদের, চাকমা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসেছিলাম। তারা আমাদের প্রথমেই নিয়ে গেল মারমাদের একটি রেস্তোরাঁ ‘সিস্টেম ফ্যামিলি হোটেল’-এ খাওয়ার জন্য।
কখনো ভাবিনি এ রকম একটি ঘরোয়া রেস্তোরাঁ পাব খাগড়াছড়িতে এসে। অনেক বাঙালিও এখানে প্রতিদিন খাওয়ার জন্য আসেন। এখানে বাঙালি খাবারের পাশাপাশি পাহাড়ি খাবারও পাওয়া যায়। আমরা যে যার মতো খেয়ে নিলাম। যেমন, কেউ কপি বাঁশের তরকারি ও মুরগির ঝোল, আবার অনেকে আগ্রহ নিয়ে পাহাড়ি রান্না খেল। যারা ঝাল সহ্য করতে পারে, তাদের জন্য সুবিধা হবে খেতে। কারণ, পাহাড়ি রান্না ঝাল ছাড়া কল্পনাই করা যায় না।
এরপর চলে গেলাম চেঙ্গি নদীর তীরে সময় কাটাতে। বৃষ্টির সময় না এলে চেঙ্গির আসল রূপ দেখা যায় না। সমতলের নদী থেকে এটা পুরো আলাদা—অনেক বেশি বাঁক আর স্রোত। বৃষ্টির পরে প্রমত্তা নদীতে গাছের গুঁড়ি, বাঁশ চোখে পড়ল। তবে বৃষ্টি শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই চেঙ্গি নদী আবার তার শান্ত রূপে ফিরে এল।
রাতে আমরা জামতলার একটি চাকমা হোটেলে গেলাম। এখানে আমাদের চাকমা বন্ধুদের পরামর্শে ভুনা শামুক খেলাম, চিংড়ি মাছের মতো খেতে। তবে বেশি মিল পাবেন কাঁকড়ার স্বাদের সঙ্গে।
পরদিন সকালে উঠে রওনা দিলাম ছোট মেরুং বাজারের দিকে। এখান থেকে আরও ভেতরে গিয়ে জুম চাষ দেখলাম এবং জুমঘরে বসে পাহাড়ি চাষি ও বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করলাম। এখানকার বেশির ভাগ আদিবাসী সরাসরি জুম চাষের সঙ্গে জড়িত। জুমে প্রথমে পাহাড় পুড়িয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে তার গর্ত করে, প্রতিটি গর্তে তিন থেকে চার-পাঁচ ধরনের বীজ বপন করা হয়। প্রধানত ধান, ভুট্টা, শসা ও বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ পাহাড়িদের মধ্যে জনপ্রিয়। জুমের মিষ্টি ভুট্টা পাহাড়িরা সেদ্ধ করে খায়, আমরাও খাওয়া শুরু করে দিলাম। পাহাড়িরা বিশেষ এক ধরনের সবজি রান্না করে ৩২ ধরনের তরকারি দিয়ে, সেই পাচন খেলাম আমরা সবাই। বিকেলে চেঙ্গি নদীতে নৌকা ভ্রমণ করে পুরো শহরের এক পাশ দিয়ে ঘুরে এলাম। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে নদীভ্রমণ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। যাঁরা খাগড়াছড়িতে ঘুরতে যাবেন, তাদের প্রতি অনুরোধ রইল, একবার অবশ্যই এটি চেষ্টা করে দেখবেন।
শহরের ভেতরে অসাধারণ সুন্দর পাহাড় আর ধানখেত থাকার কথা শুনে সেদিকে গেলাম। জায়গাটার নাম নিউজিল্যান্ড পাড়া। জানা গেল, অনেক আগে এক পাহাড়ি ভদ্রলোক এই এলাকা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘নিউজিল্যান্ডের মতো বাতাস;’ সেই থেকে এলাকার নাম হয়ে গেছে নিউজিল্যান্ড পাড়া। আমাদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে গেল, যিনি নামটা রেখেছেন, তিনি আদৌ নিউজিল্যান্ডে গিয়েছেন কি না। স্থানীয় বন্ধুদের কাছ থেকে জানা গেল, না, তিনি কখনো নিউজিল্যান্ডে যাননি। তিনি ক্রিকেট খেলা দেখতেন, তা থেকে ধারণা করেছেন, নিউজিল্যান্ডে প্রচুর বাতাস।
এখানে নিউজিল্যান্ড ক্যাফে নামের একটি রেস্তোরাঁ আছে। তাজা ফলের শরবত এবং নানা ধরনের স্ন্যাক্স পাবেন এখানে, ফ্রেঞ্চফ্রাই থেকে শুরু করে হালিম পর্যন্ত। তবে যাওয়ার আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য। চার বন্ধুর উদ্যোগে শুরু এই রেস্তোরাঁয় সামনের বার এলে ইন্টারনেটও পাওয়া যাবে বলে জানানো হলো আমাদের।
এই মৌসুমে আসার আরেকটা সুবিধা হলো তাজা, সস্তা ফল। শহরে ঢোকার ঠিক আগে প্রাকৃতিক পরিবেশে আনসারদের একটি অসাধারণ সুন্দর রেস্তোরাঁ আছে। এখানে সব সময় খাওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও বসে চেঙ্গি নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করলাম প্রতিদিন।
কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি খাগড়াছড়িতে যাওয়ার বাস আছে। এই বাসগুলো প্রথমে চট্টগ্রামে না গিয়ে সরাসরি ফেনী থেকে রামগড় হয়ে খাগড়াছড়িতে চলে যায়। শান্তি পরিবহন, সৌদিয়া ও এস আলমের সরাসরি বাস আছে। টিকিটের দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। বাসে সরাসরি যেতে আট ঘণ্টার মতো সময় লাগে। ট্রেন বা প্লেনে চট্টগ্রামে গিয়ে, সেখান থেকেও বাসে যাওয়া যায়, তবে ট্রেনে সময় বেশি লাগবে। থাকার জন্য পর্যটনের হোটেল আছে। খুবই সুন্দর, নদীর ঠিক পাশে। ভাড়া পড়বে দেড় হাজার টাকা, ডাবল বেড এসি রুম। এ ছাড়া শৈল সুবর্ণা আছে, ভাড়া একটু বেশি। শহরের মধ্যে আছে হোটেল জিরান। চাকমা আতিথেয়তা পেতে হলে এখানে থাকতে পারেন। এখানে এসি রুম নেই, ভাড়াও অনেক কম, ৩০০-৫০০ টাকার মধ্যে ডাবল রুম আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের আরও কিছু হোটেল আছে বিভিন্ন ভাড়ার মধ্যে।

আসিফ মাহফুজ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুলাই ২০, ২০১০

Thursday, March 4, 2010

 চারদিক: রামগড়ে রাত, ভোরটাও

চারদিক: রামগড়ে রাত, ভোরটাও

মৃত্যুঞ্জয় রায় | তারিখ: ০৩-০৩-২০১০
হেয়াকো বাজার পেরোতেই বেলাটা হেলে পড়ল। সন্ধ্যা নাগাদ কিছুতেই খাগড়াছড়ি পৌঁছাতে পারব না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, রাতে পাহাড়ি পথে আর পা না বাড়িয়ে রামগড়েই থেকে যাব। সাঁই সাঁই করে গাড়ি পাহাড়ি পথে ছুটে চলেছে। পাহাড় বললে বোধ হয় ভুল হবে। ফটিকছড়ির হেয়াকো বাজারের পর থেকে উঁচু-নিচু টিলা আর টিলার ওপর কিছু রুক্ষ্ম-শুষ্ক চা-বাগান চোখে পড়ছে। ডানে-বাঁয়ে দাঁতমারার বিশাল বিশাল রাবার বাগান। টিলার ঢালে পাতাটাতা ঝরিয়ে দিগম্বর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বসন্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। রাবারগাছগুলোর পেছনের আকাশজমিনটা ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে। গাছগুলোকে কয়লাপোড়া কালো ছায়ার মতো মনে হচ্ছে। এও তো প্রকৃতি ও ক্ষণের একটা সৌন্দর্য। তবে আমাদের আর বুঝতে বাকি রইল না যে কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ে সন্ধ্যা নামবে, সন্ধ্যার পর রাত। রাত মানেই পাহাড়ের আতঙ্ক। তখন এতটা পথ অচেনা জায়গায় ড্রাইভ করা বোকামি, পায়ে পায়ে ঝুঁকি। তাই রামগড়েই থাকার জায়গা খোঁজার জন্য ফোন লাগালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই মোবাইল ফোনে নিশ্চিত হয়ে গেল রামগড় উপজেলা পরিষদ চত্বরে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় থাকার ব্যবস্থা।
লেকের পাড়ে নাতিউচ্চ একটা টিলার ঠিক মাথায় চমত্কার ডাকবাংলো। টিনের ছাউনি। রুমে ঢুকতেই হাড়কাঁপানো শীত এসে জেঁকে বসল। সেই সঙ্গে বিদ্যুত্ না থাকা। বাইরে পূর্ণিমার আলোয় সব ফকফক করছে। ইচ্ছে করছে রাতের জোছনায় রামগড়ের অদেখা রূপটা দেখে নিই। কিন্তু শীতে কে বেরোবে কম্বলের নিচ থেকে? দরজা-জানালা খুললেই শীতের ঝাপটা। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে দরজা-জানালা আটকে জাহিদ ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। তিনিই আমাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করেছেন, রাতে খাওয়ার জন্য নিতে আসবেন।
বাংলোটায় বেশ কটা রুম। কিন্তু আমরা দুজন একটা রুমে ছাড়া আর কেউ নেই। সুনসান অপার্থিব এক নীরবতা। ঝিঁঝি ডাকছে, ডাকছে নিশাচর পাখিরা। ওরাই জানিয়ে দিচ্ছে আমরা এখনো পৃথিবীর মাটিতে আছি। বাংলোর আশপাশের গাছ থেকে শীতের শুকনো পাতা খসে পড়ার খসখস শব্দ হচ্ছে। আটটা বাজতেই জাহিদ ভাই এসে হাজির হলেন। রামগড়ে ট্রানজিট ব্রেক। তবু এসেই যখন পড়েছি, তখন এ জায়গাটা একটু দেখে যেতে দোষ নেই। খাগড়াছড়ির এ উপজেলাটা খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে অনেক দূরে। ঠিক পাহাড়িও নয়, সমতলও নয়। একটাি ঝিরি বয়ে গেছে পাশ দিয়ে। তার দুই পাশে সমতল ভূমি। সেখানে নানা রকম সবজি ফলছে। টিলায় টিলায় বনজ বৃক্ষরাজি। শীতে মরা চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টিলার ঢালে ঢালে বাংলা কলার ঝোপ, ফুরিয়ে আসা নলখাগড়ার ফুলে ম্রিয়মাণ সৌন্দর্য। আসার সময় এসব দেখেছি। সকালে রওনা হওয়ার আগে কিছুটা সময় হাতে আছে। অতএব আর একটু ঘুরে দেখা যায়। জাহিদ ভাইকেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী কী দেখার আছে রামগড়ে?’
‘কেউ তো সহসা এখানে বেড়াতে আসে না। দেখার মতো কোনো জায়গাও নেই। যেখানে এখন আছেন, ওটাই বলতে পারেন রামগড়ের একমাত্র দর্শনীয় স্থান। একটা লেক, লেকের ওপর ঝুলন্ত সেতু, লেককে ঘিরে উদ্যান, বেঞ্চ, অবজারভেটরি রুম। অনেকেই এখানে পিকনিকে আসে। বর্ষায় লেকে বোটিংয়ের ব্যবস্থাও আছে।’
‘রাত পোহালে না হয় লেকের পাড়ে প্রাতর্ভ্রমণে বেরোনো যাবে।’ বলে শুয়ে পড়লাম।
চেনা-অচেনা অনেক পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল। ভোর হতেই বাংলোর বারান্দায় পায়চারি করতে লাগলাম। টিলার চূড়ায় বাংলোর বারান্দায় কুয়াশামাখা ভোরের রোদ আছড়ে পড়েছে। এল প্যাটার্নের ডাকবাংলোটার পেছনে একফালি ঘাসের গালিচাঢাকা আয়তাকার উঠোন। উঠোনের কিনারা ঢাল বেয়ে সোজা নিচে নেমে গেছে। ঢালে পাহাড়ি গাছপালা। সামনের উঠোনটা পাকা, স্টিলের রেলিংঘেরা। তার নিচ দিয়েই পথ, পথের ওপাশে লেক। বাংলোর গেটে একটা কাঠগোলাপের গাছ পাতাটাতা ঝরিয়ে ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদিক দিয়ে বেরিয়েই লেকের ধারে সরু পথটা ধরলাম প্রাতর্ভ্রমণের জন্য। লেকের শান্ত নিথর জলের ওপর কুয়াশার দাপাদাপি, যেন জলের চাতাল থেকে ধানসেদ্ধ গরম ভাপ উঠছে, পাতলা ধোঁয়া উঠছে। লেকের ওপর একটা চমত্কার ঝুলন্ত ব্রিজ। পাশে গোলাকার একটা অবজারভেটরি সেন্টার। রাঙামাটির বিস্তীর্ণ সৌন্দর্য নেই রামগড়ে, তবু যেন এই লেকটাই রামগড়ে এক টুকরো রাঙামাটি। লেকের ওপারে পরিষদের দালানকোঠা। ধীরে ধীরে রোদ উঠছে, পেটও চোঁ চোঁ করছে। অতএব নাশতার জন্য ফিরতে হলো। নাশতা সেরে উঠতেই জাহিদ ভাই বললেন, ‘খুব কাছেই বর্ডার। যাবেন নাকি? ওপারে ত্রিপুরা।’ যেতে মন চাইল। কিন্তু সময় কম। তাই ওখানে না গিয়ে রামগড়ে শতবর্ষী দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি মন্দিরটাই দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। সেটা দেখার পর জাহিদ ভাই বললেন, ‘বরং এখানে সময় নষ্ট না করে আপনারা খাগড়াছড়ি যওয়ার পথে ডাইভারশন থেকে চিটাগাংয়ের দিকে ছয়-সাত কিলোমিটার এগিয়ে মানিকছড়িটা ঘুরে যেতে পারেন। সেখানে মং রাজার বাড়িটা দেখে আসতে পারেন।’ জানি যে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের তিনটি সার্কেলে তিনজন রাজা আছেন, রাজবাড়িও তিনটি। খাগড়াছড়ি সার্কেলের মং রাজার রাজত্ব। রাঙামাটিতে চাকমা রাজা আর বান্দরবানে বম রাজা। খাগড়াছড়ি চলে গেলে আর এ রাজবাড়ি দেখা হবে না। তাই চলতি পথে ওটাই দেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে রামগড়কে বিদায় জানিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম।
Source: Daily Ptothom-alo