Search This Blog

FCO Travel Advice

Bangladesh Travel Advice

AFRICA Travel Widget

Asia Travel Widget

Showing posts with label Rangamati. Show all posts
Showing posts with label Rangamati. Show all posts

Sunday, September 4, 2011

রূপময়ী কাপ্তাই পাহাড়-নদীর হাতছানি

রূপময়ী কাপ্তাই পাহাড়-নদীর হাতছানি

-মো. রেজাউল করিম



প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে ঈদ আনন্দ উপভোগ করার জন্য যে কোনো পর্যটককে আকৃষ্ট করতে পারে কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা অনাবিল আনন্দ বিনোদনের দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কের ‘প্রশান্তি’। আনন্দময় ঈদ আয়োজনকে আরও আনন্দময় করতে পর্যটকদের জন্য এখন উন্মুখ রয়েছে ন্যাশনাল পার্ক। সবুজ বৃক্ষ আর পাহাড় ঘেরা কর্ণফুলী নদী বেষ্টিত ন্যাশনাল পার্ক প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের মন ভরিয়ে দিতে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য সব রকম আয়োজনে সেজে আছে।
কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কের পাশাপাশি কাপ্তাই ৪ ওয়াগ্গা বিজিবি জোন পরিচালিত প্যানারোমা জুম রেস্তোরাঁ এবারের ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের সরব পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে বলে বিজিবি সদস্যরা জানান। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের পাহাড়ের পাদদেশে কর্ণফুলী নদীর তীরে ওয়াগ্গাছড়া, কাপ্তাইয়ে ৯০’র দশকে স্থাপিত হয় এই পর্যটন স্পটটি। এছাড়া ২০০০ সালে স্থাপিত হয় কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক। ন্যাশনাল পার্ক ও জুম রেস্তোরাঁর চতুর্দিকে রয়েছে প্রাকৃতিক নানা জীববৈচিত্র্য। একটু নিরিবিলিতে দাঁড়ালেই দেখা যাবে বানর, হরিণ ও নানা প্রজাতির পশু-পাখির অবাধ বিচরণ। ন্যাশনাল পার্ক ও জুম রেস্তোরাঁয় পিকনিক কর্নার এবং শুটিং স্পটসহ সব ধরনের বিনোদন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে চা বাগান ভ্রমণ, নৌ-বিহার, পিকনিক ও শুটিং স্পট, নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা।
কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কের পাশাপাশি কাপ্তাই ৪ ওয়াগ্গা বিজিবি জোন পরিচালিত প্যানারোমা জুম রেস্তোরাঁ এবারের ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের সরব পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে বলে বিজিবি সদস্যরা জানান। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের পাহাড়ের পাদদেশে কর্ণফুলী নদীর তীরে ওয়াগ্গাছড়া, কাপ্তাইয়ে ৯০’র দশকে স্থাপিত হয় এই পর্যটন স্পটটি। এছাড়া ২০০০ সালে স্থাপিত হয় কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক। ন্যাশনাল পার্ক ও জুম রেস্তোরাঁর চতুর্দিকে রয়েছে প্রাকৃতিক নানা জীববৈচিত্র্য। একটু নিরিবিলিতে দাঁড়ালেই দেখা যাবে বানর, হরিণ ও নানা প্রজাতির পশু-পাখির অবাধ বিচরণ। ন্যাশনাল পার্ক ও জুম রেস্তোরাঁয় পিকনিক কর্নার এবং শুটিং স্পটসহ সব ধরনের বিনোদন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে চা বাগান ভ্রমণ, নৌ-বিহার, পিকনিক ও শুটিং স্পট, নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা।
কাপ্তাইয়ের প্রাকৃতিক শ্যামল সবুজে সৌন্দর্যভরা দুইদিকে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া নিবিড় শান্ত শীতল জলের কর্ণফুলী নদী ভ্রমণের সব আয়োজন। এছাড়া সমুদ্রের বেলাভূমির আমেজে কর্ণফুলী নদীতে নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা আছে। নামাজের জন্য আলাদা ঘরসহ পুরুষ-মহিলাদের জন্য টয়লেট ও প্রসাধনীর ব্যবস্থা রয়েছে। নাট্যানুষ্ঠানসহ যাবতীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য মনোরম পরিবেশে পাহাড়ের ঢালে রয়েছে সাংস্কৃতিক মঞ্চ। উক্ত মঞ্চে যে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান পরিচালনা করা যায়। এছাড়া রয়েছে গাড়ি পার্কিং সুবিধাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধাদি। প্যানোরমা জুম রেস্তোরাঁ সপরিবারে ভ্রমণের একটি চিত্ত আকর্ষণীয় বিনোদনমূলক প্রতিষ্ঠান।


কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক জাহিদুর রহমান মিয়া জানান, ঈদকে সামনে রেখে কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কে নিরাপদে পর্যটকদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। এমনিতেই প্রতি বছর ঈদ মৌসুমে এখানে বিপুলসংখ্যক পর্যটক সমাগম ঘটে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। পর্যটকরা এখানে এসে একই সঙ্গে পাহাড়, নদী, বৃক্ষ আর সবুজের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি স্বচক্ষে দেখতে পাবেন পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যের অন্যরকম সৌন্দর্য। কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কে রয়েছে সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। এখানে উঠে সমগ্র কাপ্তাই উপজেলার সবুজ পাহাড়ের সৌন্দর্য এক নজরে উপভোগ করা যায়। চট্টগ্রাম কাপ্তাই সড়ক ধরে কাপ্তাই উপজেলার শীলছড়ি এলাকা অতিক্রম করলেই ন্যাশনাল পার্কে সুবিশাল দুটি হাতি (কৃত্রিম) পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানায়। এর পর থেকেই শুরু হয় পর্যটকদে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের যাবতীয় অনুষঙ্গ।
কাপ্তাই ৪ ওয়াগ্গা বিজিবি জোন কমান্ডার লে. কর্নেল আকতার শহীদ পিএসসি জানান, ঈদ উপলক্ষে বিজিবি পরিচালিত জুম রেস্তোরাঁকে বর্ণীল আয়োজনে সাজানো হয়েছে। কাপ্তাইয়ে জুম ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় মনোরম পর্যটন স্পট। এখানে এলেই যে কোনো পর্যটকের মনে প্রকৃতি প্রেম জাগ্রত হবেই। জুম রেস্তোরাঁ নাম হলেও এটি কাপ্তাই উপজেলার একটি বৃহত্তম পর্যটন স্পট। এখানে এলেই উপভোগ করা যাবে শান্ত শীতল কর্ণফুলী নদীর অপার সৌন্দর্য, আকাশ, পাহাড়, নদী প্রকৃতির একই সমান্তরালে অপরূপ মিলন।
Source: Daily Amardesh

Thursday, March 10, 2011

কাঁপতে কাঁপতে কাপ্তাই!!!

কাঁপতে কাঁপতে কাপ্তাই!!!

আ হ মে দ কি শো র
পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই যাচ্ছি। কাঁপতে কাঁপতে। কারণ আমাদের হাতে অস্ত্র। মারণাস্ত্র। ভয়ে আছি। রাত ১২টা বাজে। আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১-এর জন্য চারদিকে সতর্ক প্রহরা, নজরদারি চলছে। যে কোনো সময় ধরা পড়ে যেতে পারি। তবু নিরাপত্তার এই ঘেরাটোপ এড়িয়ে আমাদের যেতে হবে কাপ্তাই। কারণ সেখানে সুইডেন বাংলাদেশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ১৮ এবং ২০ ফেব্রুয়ারি আমাদের একটি অস্ত্র প্রদর্শনীর কথা ঠিক হয়ে আছে। আমাদের হাফ প্লাটুনের দলে আছেন আমি কিশোর নামের যুবক, ভুঁড়িগির রক ওরফে রকি, পার্ট টাইম ইয়ো এবং ‘আমরা ভালো আমরা কালোর’ সভাপতি ও আহ্বায়ক মাহবুব মুন্না, এলেমদার ওরফে আলমগীর রাসেল, ঐতিহাসিক শামস্ বিশ্বাস এবং নারায়ণগঞ্জ নিবাসী নব্য ভাবুক কবি ইন্দ্রজিত্ ইমন। সবাই আতঙ্কিত। এই আতঙ্ককে বাস্তবে প্রাথমিকভাবে রূপ দিলেন ভুঁড়িগির রকি। রিকশায় চেপে কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার শুরুতেই রকি, মাহবুব মুন্না এবং শামস্ বিশ্বাসকে বহনকারী রিকশার চাকা পাংচার! রিকশাওয়ালা যাবেন না! রকি তাকে অনুনয় করে বোঝাতে সক্ষম হলো যে ভুঁড়িটাতে যে পরিমাণ গ্যাস ছিল, চাকা পাংচারের সঙ্গে টেনশনে সেটাও পাংচার হয়ে গেছে!
আমাদের সঙ্গের অস্ত্রগুলো সাদা কাপড়ে মোড়া। দেখতে অনেকটা কাফনে মোড়া লাশের মতো আকার ধারণ করেছে। শামস্ বিশ্বাস একাই সেটি কাঁধে করে নিয়ে রিকশায় চেপেছেন। পুলিশ ধরলে তাকে ধরবে। শামস্ মনে মনে উত্তরও ঠিক করে রেখেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলবেন, ভাই এইটা একটা ইভ টিজারের লাশ। কবর দিতে যাচ্ছি কাপ্তাই!
সবকিছু ঠিকঠাক মতো কাপ্তাইগামী বাসের লাগেজ বক্সে দিয়ে আপাতত আমরা বাসে আরোহণ করতেই শুরু হলো আসল কাঁপাকাঁপি! বাসের ড্রাইভার রিখটার স্কেলের ৪ নম্বর শেকিং এম্পটিটিউড গতিতে বাস টানতে শুরু করলেন। এ পরিবহনের ড্রাইভাররা নাকি এমন স্কেলেই গাড়ি টানেন। শামস্ মন্তব্য করলেন-‘এই পরিবহনের গাড়িতে আসহাব কাহাফ কিংবা রিপ ভ্যান উইঙ্কল ঘুমাইলে হয়তো ইতিহাস অন্যরকম হইতো!’ গাড়ির ভেতরে লাইটস অফ হলো যেই মাত্র, অমনি মুন্না নিখোঁজ! অন্ধকারে তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আরেক পোচ কালি চড়াইলে যে তাকে নিগ্রো বলিয়া চালান যায়!
গাড়ি চলছে, বাসের ভেতরে বাজছে গান। বলাবাহুল্য হিন্দি। এলেমদার আলমগীর রাসেল বাসের হেলপারের উদ্দেশে বলে বসলেন, ‘ভাই বাসররাইতের গান ছাড়া আর কিছু নাই! এমনিতেই যে ভূমিকম্পের স্কেলে গাড়ি টানতে আছেন তাতে অটো মিলন হয়ে যাবেরে ভাই! এই গানের দরকার নাই!’ গান বন্ধ হলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শুরু হলো আর কত দিন একা থাকব....
মাঝপথে বিরতি মিলল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। সেখানে ১০ টাকা দামের পরোটা আর ষাট টাকা দামের ভাজি খেয়ে সবার ‘দশেহাল’ অবস্থা। চায়ের পরিবর্তে ‘ছা’ খেয়ে তো শামস্ বিশ্বাস এবং রক রক রকি যথাক্রমে নিতম্ব এবং ভুঁড়ির ওজন কিছুটা হালকা করে এলেন। মাহবুব মুন্নাকে নোকিয়া ১১০০ টর্চ মেরে ফের শনাক্ত করে বাসে ওঠানো হলো। সে কালো এবং ভালো ছেলের মতোই বাসে উঠে আবহাওয়ার সতর্কবাণী দিতে লাগলেন একের পর এক। যা অন্ধকার ছাপিয়ে নাকের কাছে ফকফকে সাদা হয়ে বাতাসে ভেসে রইল!
বাসের ড্রাইভার একের পর এক ওভার টেকিং করে এবং সব যাত্রীকে নির্ঘুম আতঙ্কিত একটি রাত উপহার দিয়ে পৌঁছে গেলেন কাপ্তাই। আমরা বাস থেকে জিনিসপত্র নামাতে নামাতে দেখি সুইডেন বাংলাদেশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বেশ কয়েকজন ছাত্র আমাদের গার্ড অব অনার এবং শেল্টার দিতে লগ গেটে দাঁড়িয়ে। অস্ত্র এবং আনুষঙ্গিক বয়ে নিয়ে তারা পৌঁছে দিলেন কাছেই বিএফআইডিসির রেস্ট হাউসে। সেখানের কেয়ারটেকার পাওয়ারফুল চশমা পরিহিত চার চোখ মিলন বড়ুয়া আমার পূর্বপরিচিত। সরকারি রেস্ট হাউসের ততোধিক সরকারি কাস্টমসে বিশেষজ্ঞ তিনি। তাকে চারবার না ডাকলে তিনি সাড়া দেন না! আমাদের বরাদ্দ রুম দেখিয়ে দিলেন মিলন। একতলার দুটো রুমের বরাদ্দ হয়েছে আমাদের। সবকিছু ভালোই কেবল পুলসিরাত পাড়ি দিয়ে বাথরুমে যেতে হয়। মানে রুমের ভেতরে একটা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে টয়লেট করতে যেতে হবে এই আরকি!
আমরা অস্ত্রের হেফাজত করে বেরুলাম নাস্তা করতে। পেটে ভূমিকম্পে নাড়িভুঁড়ি নড়ে চড়ে হয়ে গেছে। সেটাকে ঠিক করা চাই। কাপ্তাইতে ভালো খাবার হোটেল নেই বললেই চলে। ঠিক তেমনি থাকার জন্যও। ফরেস্টের রেস্ট হাউসগুলোই ভরসা। যদিও অধিকাংশ সময় তা সরকারি লোকেদের বুকিং এ থাকে। তবে আগে থেকে জানালে ব্যবস্থা হতে সময় নেয় না। বাজারে নাস্তা করতে গিয়ে ডুবো তেলে ভাজা পরোটা আর ডিম দেখে সবাই তাই খেতে চাইল। কিন্তু অর্ডার দিলেও যখন আসতে দেরি হচ্ছে, তখন আমাদের হয়ে একজন হোটেল স্টাফকে যেই ওই হা ... পো... বলে ডাক দিলেন অমনি সব হাজির। সার্ভ করতে করতে হা... পো... জানালো তার আসল নাম কুদ্দুস!
আমরা খেয়ে-দেয়েই শুক্রবারকে কাজে লাগাতে ছুটে গেলাম কাপ্তাইর বিখ্যাত বাংলাদেশের একমাত্র পানি বিদ্যুত্ প্রকল্প দেখতে। সেখানে সেনাবাহিনীর জনৈক উচ্চপদস্থ অফিসারের বদৌলতে দুটি জিপে আমরা ছুটলাম মনুষ্য সৃষ্ট কৃত্রিম কাপ্তাই বাঁধ দেখতে। ১৯৫৬ সালে তত্কালীন পূর্ব-পাকিস্তান সরকার আমেরিকার আর্থিক সহায়তায় এই বাঁধ নির্মাণ করে। এটির কাজ শেষ হয় ১৯৬২ সালে। প্রায় ৬৭০ মিটার দীর্ঘ বাঁধটির ১৬টি স্পিলওয়ে গেট আছে, যা প্রায় সাড়ে বাহান্নো লাখ কিউসেক পানি পরিবাহিত করে বিদ্যুত্ উত্পাদনে। বাঁধের আশপাশে ছবি তোলা বিধিবদ্ধভাবে নিষিদ্ধ। যদিও আমাদের কয়েকজন ভাবছিলাম কেন গুগল আর্থ আছে না!
কাপ্তাই লেক দেখতে ইংরেজি এইচ অক্ষরের মতো। কাপ্তাই লেকের এই বৈশিষ্ট্যের দু’টি হাতের একটি কর্ণফুলী নদী, সুভলংয়ের কাছে একটি ক্যানিওন/ফাঁকায় মিলেছে। কর্ণফুলীর একটি পুরনো অংশ, কাসালং, মাইনী, চেঙ্গি এবং রিখ্যয়ং নদীই মূলত কাপ্তাই লেকের পানির ব্যবস্থা করে। বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম লেক তৈরি হলে পানিতে ডুবে যায় হাজারো একর কৃষি জমি। লেকের পানিতে ডুবে যায় সমৃদ্ধ চাকমা রাজার বাড়ি। এই নিয়ে হাহাকার আজও নাকি প্রবহমান।
সবাই জানালো ক্লান্তি নেই। আর তাই কাপ্তাই ড্যাম থেকে ফিরে হালকা রেস্ট নিয়ে ছুটলাম চিত্মরমে। কাপ্তাই মূল শহর থেকে সামান্য দক্ষিণে ওয়াগ্গাছড়া পেরুলেই নয়নাভিরাম এই গ্রামটি। এখানেই পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো বৌদ্ধ বিহার জুমল্যান্ড চিদমুরঙ ক্যায়াঙ অবস্থিত। পার্বত্য আদিবাসীদের প্রিয় বৈসাবি উত্সবে এখানে মেলাসহ নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। অনুষ্ঠানের নিমিত্তে এখানে একটি স্থায়ী বেদী আছে। সেখানে বৈসাবি উত্সবে, বৈশাখে মারমা/চাকমা মেয়েরা দল বেঁধে নাচের সঙ্গে গেয়ে ওঠে—‘মুই তোমারে লই বেরেম, তোমারে মুই সোনেম গান; হাজি হাজি নাজি নাজি, সোনেম পজ্জন নানাগান... (তোমাদের নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াব, গান শোনাবো, হেসে খেলে গান গেয়ে, তোমাদের শোনাবো রূপকথার কাহিনী)’ রেস্ট হাউসে ফিরে আসার আগে বাজার থেকে গরুর দুধের চা আর গরম গরম পিঁয়াজু খেতে ভুললাম না। রাতে সুইডেন পলিটেকনিকের অসাধারণ সুন্দর ক্যাম্পাসের মাঠে আড্ডা জমলো। আমাদের আড্ডায় দারুণ সঙ্গ দিল পূর্ণিমার চাঁদ।
এ সুযোগে অস্ত্র প্রদর্শনের স্থানটি বেছে নিলাম। মাঠের আড্ডায় সুইডেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র শুভ আমাদের শোনালো নূপুর ভাবীর কথা। তাকে নিয়ে প্রচলিত মিথটি সংবেদনশীল হওয়ায় তা অনুল্লেখই রাখলাম। নূপুর ভাবীর অস্বাভাবিক মৃত্য হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর এই ক্যাম্পাস এবং এর আশপাশের অঞ্চলে প্রায়ই রাতে সাদা শাড়ি পরা নারী দেহের চলাচল এবং নূপুরের শব্দ পাওয়া যায়! ঘটনা শুনে আমরা রেস্ট হাউসে ফিরছি এ সময় আমাদের মাঝে প্রথম নূপুরের শব্দ শুনলেন কবি ইন্দ্রজিত্ ইমন। এমনিতেই বেচারা ফেসবুকের নূপুরদের নিয়ে টানা-হেঁচড়ায় আছেন এর মাঝে কাপ্তাইয়ের নূপুর ভাবী তার আত্মায় কাপন লাগিয়ে দিয়ে গেল! নূপুর ভাবীর ভয়েই কিনা জানি না, রাতে ৬ জনে একরুমে জড়ো হয়ে সবাই মিলে কার্ড খেলতে বসেছি ওমনি শুরু হলো নূপুরের আওয়াজ, তাও যেন কাচের তৈরি! ভয়ে ভয়ে সবাই ঘুমুতে গেলাম। সকালে কেয়ারটেকার মিলন বড়ুয়া জানাল রাতে কাচের জানালা ভালো করে বন্ধ করে শুতে না হলে হনুমানেরা দলবেঁধে জানালার ধারে বসে গান ধরে। হায় এই কি তবে নূপুর ভাবী মিস্ট্রি!!
শনিবার আমাদের অস্ত্র প্রদর্শনীর কথা থাকলেও ভারত-বাংলাদেশের ম্যাচের কারণে তা পিছিয়ে পরের দিন রোববার অর্থাত্ ২০ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হয়। সকাল-সকাল তাই মাইক্রোবাস ভাড়া করে কাপ্তাই রাঙামাটির অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য সংবলিত বাইপাস সড়ক হয়ে রাঙামাটি ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লাম।
বাইপাস ঝাগড়াবিল বড়াদম সড়কের প্রতিটি পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অসাধারণ এক পাহাড়ি সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্য গিলে খেতে খেতে চলেছি। মাঝে মাঝে চলা থামিয়ে সেইসব অসাধারণ সুন্দরকে সাধারণ ক্যামেরায় ধরে রাখার অতি আন্তরিক চেষ্টা। রকি’তো পা ছড়িয়ে বসে গেল রাস্তার ওপর। তাকে অনুসরণ করে অন্যরা। আওলাদপাড়ায় ঢোকার মুখে ব্রিজে সেকি উল্লাস সবার। গাড়িতে গান বাজছে-ন চাং যেবার এ জাগান ছাড়ি, ইদু আগং জনমান পুরি, এ জাগাগান রইয়েদে। ম মানান জুড়ি। (এদেশ ছেড়ে আমি যেতে চাই না, এখানে আমি রয়েছি সারা জনম ধরে, এ আবাস ভূমিতেই, আমার মনপ্রাণ মিলেছে এখানে, ঠিক এখানে) মাইক্রোবাস রাঙামাটি শহরতলীর ভেতর দিয়ে আসামবস্তি, ভেদভেদি, কলেজগেট, বনরূপা হয়ে রাজবাড়ি ঘাটে। রাজবাড়ি ঘুরে বেড়াতে যাওয়ার আগে রাজবন বৌদ্ধ বিহার, চতুর্থমহারাজিক স্বর্গ আর কঠিন চিবরদানের স্থানটি দেখে নিলাম। সেখানে যুগ যুগ ধরে বাদাম বিক্রেতা মুসলিম এক লোকের সঙ্গে খাতির হয়ে গেল কবি ও কার্টুনিস্ট ইমনের। তার বাদাম মানুষ না বিহারের বানরগুলো খায়, তা নিয়ে এন্তার গবেষণা করে ফেলল সে।
আমাদের অনেকের ভাগ্যেই রাজার বাড়ির সেই অপরূপ আঙিনা আর জৌলুস দেখার সৌভাগ্য হবে না। গত বছর (১১ নভেম্বর ২০১০) রাজার বাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পুড়ে যাওয়ার আগে একবার ঘুরে গিয়েছিলাম। সেই সময় তোলা কয়েকটি ছবি স্মৃতি হিসেবে আমাদের গাইড ও বন্ধু অশোক চক্রবর্তীকে উপহার হিসেবে দিলাম। পুড়ে ছাই রাজবাড়ীর আঙিনায় দেখলাম জনৈক চাকমা ‘প্রবেশ নিষেধ’ লেখা একটি নোটিশ ঝুলাচ্ছেন। সেই সুযোগে রাজবাড়ির দোড়গোড়ায় সিমেন্টের সিংহের পিঠে চড়ে নিতে ভোলেনি মুন্না ও শামস্। রাজবাড়ির সামনে ফতে খাঁর কামানটি দেখে ইতিহাসের মজার বিষয়টি জানাল শামস্-শাহ সুজাউদ্দৌলা, ভাই আওরঙ্গজেবের ধাওয়া খেয়ে আরাকানের কাছে চাকমা রাজা ধামানার আশ্রিত হন। সে সময় সখ্যের নিদর্শন হিসেবে সুজার কন্যার সঙ্গে ধামানার পুত্র ধরম্যার বিয়ে দেয়া হয়। ১৬৬১-এর ধরম্যা রাজা হওয়ার পর অনেক চাকমা প্রভাবশালীরা মুসলমান নাম ধারণ করেন। যেমন জুবল খাঁ, জল্লাল খাঁ, ফতে খাঁ। আর তাই ফতে খাঁকে মুসলমান ভাবার কোনো কারণ নেই।
অশোকদা আগে থেকেই আমাদের জন্য একটি বোট ঠিক করে রেখেছিলেন। সেই বোটে রওনা হলাম অপরূপা ‘শিলার ডাক’ খ্যাত শুভলং ঝরনা দেখতে। সেই পথে যেতে মনের ভেতর থেকে কে যেন গেয়ে উঠল—‘কর্ণফুলী দুলি দুলি কদু যেবে কনা যেদুং চাং, মুই ত সমারে, মরে নেযানা।।’ (কর্ণফুলী দুলে দুলে কোথায় যাবে বলো না, আমিও যাব তোমার সাথে, আমাকে নাও না তোমার সাথে)। শুভলং ঝরনায় বৃষ্টির মতো ঝিরঝিরে পানি পড়ছে তাতে কি। আমরা ঝরনা ছুঁয়ে দেখতে উঠে গেলাম হাজার ফুট ওপরে। ভিজিয়ে নিলাম তৃপ্তিকে। থেকে বোটে ছুটলাম পর্যটনের ঝুলন্ত ব্রিজ দর্শনে। সেখানে ডারউইনের প্রতি কৃতজ্ঞতা শুভলং প্রদর্শনপূর্বক ঝুল তার ধরে টেনে টুনে ঝুলে বেশ ফটোসেশন হলো।
কাপ্তাই ফিরে রেস্ট হাউসে বিশ্রাম নিয়ে ছুটলাম আগামীকালের অস্ত্র প্রদর্শনীর জন্য প্রিন্সিপ্যাল জনাব বারী স্যারের সঙ্গে আলাপ করতে। তিনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে সাহায্য ও পরামর্শ দিলেন। ২০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার মধ্যে আমরা আমাদের সিআরএনবির (কার্টুনিস্ট রাইটস নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ) অস্ত্র প্রদর্শনী মেলে ধরলাম ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীদের জন্য। হ্যাঁ, আমাদের আঁকা কার্টুন। ইভ টিজিং নামক সামাজিক অভিশাপের বিরুদ্ধে অন্যরকম এক অস্ত্রের প্রদর্শনী দেখল পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ের বিএসপিআই সাধারণ শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা। প্রদর্শনী উদ্বোধন করলেন অধ্যক্ষ। দুশো পাতার ভিজিটরস বুকে মতামতে মুহূর্তেই ভরে গেল সব পাতা। সেখানে বেলী নামের এক শিক্ষার্থী লিখেছেন—‘আপনাদের কার্টুন নামের এই অস্ত্রের আঘাতে পরাজিত হোক নারীর প্রতি সব অবিচার, সে হোক ইভ টিজিং নামের পাশবিকতা!’
কোলাহল মুখরিত যান্ত্রিক নগরীতে ফিরে এলাম আবারও, তখন ঊষার আলো ফুটছে কেবল আর মনের মধ্যে এক বুক আশায় সামাজিক সব অনাচারের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেরা সাহস হয়ে আঁকড়ে ধরে আছে আমাদের অস্ত্রগুলোকে—আমাদের আঁকা ইভ টিজিং বিরোধী কার্টুনগুলোকে।

Source: Daily Amardesh

Sunday, January 30, 2011

টুকটুক ইকো ভিলেজ

টুকটুক ইকো ভিলেজ

রফিকুল আমীন খান
পাহাড় আর লেকে ঘেরা রাঙামাটির প্রতিটি খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে আছে বিস্ময় আর আনন্দ। সৌন্দর্যপিপাসুরা এ বিস্ময় আর আনন্দের টানে বারবার ছুটে চলেন রূপের রানী খ্যাত রাঙামাটি জেলায়। ভ্রমণপ্রিয়দের আনন্দ দিতে কী নেই এখানে। জেলাজুড়ে রয়েছে ভ্রমণের অসংখ্য স্পট। সব রূপলাবণ্যে ভরপুর। রূপের রাণী সেজে বসে আছে ভ্রমণপ্রিয়দের মনে আনন্দ দিতে। কিন্তু দু-এক দিনের ছুটিতে সবার সৌন্দর্য দর্শন দুরূহ ব্যাপার। তাই এক একবারের ছুটিতে রাঙামাটির এক একটি স্পট বা এলাকা দর্শনের চিন্তা করাই শ্রেয়।
রাঙামাটিতে এবার নিয়ে সপ্তমবারের মতো ভ্রমণ। তা সত্ত্বেও আমিসহ সহযাত্রীদের আনন্দ ও উত্সাহের শেষ নেই। নতুনদের মাঝে তা আরও উত্সাহ। সবার চোখে শুধু রাজ্যের বিস্ময়। হাজার হাজার টাকা খরচ করে অনেকেই নিজ দেশ ছেড়ে বিদেশ গেছেন পাহাড়-টিলা-হ্রদের সৌন্দর্যের খোঁজে। কিন্তু নিজ দেশে এত কাছে সেই আকাশসম পাহাড়, সবুজে মোড়া টিলা-উপটিলা, দিগন্ত বিস্মৃত কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ পানিধারা আছে, তা ক’জনের জানা ছিল? ভাবতে অবাক লাগে, মনের অজান্তে কণ্ঠে ভেসে ওঠে ‘ধন-ধন্যে পুষ্পে ভরা ... ... এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।’ এরকম হাজারো মন ভোলানো গান শিল্পীর কণ্ঠে এমনিতে যে ভেসে ওঠেনি, তা সহজেই বোঝা যায় কেবল রাঙামাটিতে গেলে।
রাঙামাটিতে আমাদের এবারের ভ্রমণ আয়োজন ছিল বেসরকারি ভ্রমণ আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান নোঙর ট্যুরিজমের উদ্যোগে। বিচিত্র আর বৈচিত্র্যে ভরা এখানকার নানা উপজাতির সমাজ-সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখা ছাড়াও কাপ্তাই লেকে নৌভ্রমণ ছিল ভ্রমণ পরিকল্পনায়। পরিকল্পনা অনুসারে কোনোটিই বাদ রইল না। সব স্মৃতিই মনের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো। সে সবের মাঝে টুক টুক ইকো ভিলেজ দর্শনের স্মৃতিই মনের জানালায় ভেসে ওঠে বারবার। সম্পূর্ণ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা এ পর্যটন কেন্দ্রটি ভ্রমণপ্রিয়দের কাছে দারুণ উপভোগ্য। রাঙামাটি এলে এটি না দেখে চলে যেতে মন চাইবে না।
জেলা সদরের বালুখালী ইউনিয়নের কিল্ল্যামুড়া এলাকায় অবস্থিত এই পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রটি। চারদিকে কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ পানি রাশির মাঝে হঠাত্ই জেগে ওঠা সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে তোলা এই ভ্রমণ স্পটে খানিক বসতেই নিমিশেই হিমেল হাওয়ার ঝাপটা নিয়ে যাবে কোনো এক স্বর্গীয় অনুভূতির সন্ধানে। কাপ্তাই লেকে দীর্ঘ নৌভ্রমণে যখন ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অবস্থা, তখন টুক টুক ইকো ভিলেজের রেস্তোরাঁর রকমারি খাবারের স্বাদ গ্রহণ জিবে এনে দেয় নতুন তৃপ্তি। কাঠ এবং বাঁশের কারুকাজে তৈরি এ রেস্তোরাঁয় মিলে দেশীয় ও পাহাড়ি আদিবাসীদের মজাদার সব খাবারের আইটেম। লেকের পথে সারা দিনের জন্য যারা নৌভ্রমণে বের হন দুপুরের খাবারটা তারা এখানেই সেরে নিতে বেশি পছন্দ করেন। চারদিকে কাপ্তাই হ্রদের সারি সারি পানিরাশি আর পাহাড়ি বন-বনানীর এমন নির্জন পরিবেশে আয়েশি মেজাজে পেটপুরে খেতে গিয়ে টাকার অংকটা একটু বেশি গুনতে হলেও এর মাঝেও আছে অন্য রকম আনন্দ।
পুরো ইকো ভিলেজটি ৫০ একর পাহাড়ি জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বহু টিলা-উপটিলা বিভক্ত এ পর্যটন কেন্দ্রে থেকে থেকে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি কাঠের কটেজ। অ্যাটাশ বাথ, ব্যালকনি-সমেত এ কটেজগুলোয় থাকার জন্য রয়েছে সুব্যবস্থা। এগুলোয় রাত যাপনের আনন্দস্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে জীবনভর। জানালার ফাঁকগলিয়ে দূরে পাহাড়ের ঢালে কাপ্তাইয়ের পানিতে পূর্ণিমার চাঁদের খেলা করার দৃশ্য অসাধারণ। রাতে পাহাড়ি বন-বনানীর মাঝ থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক সঙ্গে নাম জানা-অজানা নিশাচর পশু-পাখির বিচিত্র শব্দে কেবলই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেতে চায় মন। পর্যটকদের অবস্থান নির্বিঘ্ন করতে আছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রাকৃতিক পরিবেশে আড্ডা দেয়ার জন্য ইকো ভিলেজে তৈরি করা হয়েছে ১৫টি গোলঘর। শিশুদের আনন্দ দিতে প্রশস্ত খেলার মাঠ, কাঠের ব্রিজ সবই আছে এখানে। চারদিকে পাহাড়ি গাছ-গাছালি ছাড়াও ইকো ভিলেজের চড়াই-উত্রাইয়ে থেকে থেকে লাগানো হয়েছে নানান রকমের ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ। লাল গোলাপ, সাদা গোলাপ, আফ্রিকান গাদায় ভরপুর পার্কটিতে পা ফেললেই বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসা কোমল গন্ধে মন জুড়িয়ে যায়। এগুলোর নির্মল ছায়ায় মাঝেমধ্যেই পিকনিক পার্টির লোকদের ভিড় জমাতে দেখা যায়। ভ্রমণ এবং পিকনিক পার্টির আয়োজনের বাইরে অনেককে গবেষণার কাজেও যেতে দেখা যায় এখানে। বিশেষ করে যারা প্রকৃতিপ্রেমী, প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্য পছন্দ করেন, তাদের জন্য নির্ঝঞ্ঝাট ও ঝামেলামুক্ত পরিবেশে কয়েকটি মুহূর্ত কাটানোর এমন সুযোগ আর দু-একটি মেলানো দায়।
পর্যটন এবং বিনোদন কেন্দ্রের বাইরে ইকো ভিলেজ কেন্দ্রটি আজ প্রাকৃতিক জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায়ও দারুণ ভূমিকা রেখে চলেছে। যদিও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠার কাজ এখনও খানিকটা বাকি আছে, তা সত্ত্বেও আশা করা যায় প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন হলে এটি হবে দেশের ইকোপার্কগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। কারণ, একমাত্র এই ইকোপার্কেই রচিত হয়েছে প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত পাহাড়, হ্রদ, ঝরনাধারা আর কোমল পরিবেশের মিলন বন্ধন। প্রকৃতির সৌন্দর্য যে কত বিচিত্র্য হতে পারে, তা এখানের দৃশ্য দেখে বোঝা যায়। প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে একটু নান্দনিকতার ছোঁয়ায় যে ইকো পার্ক গড়ে উঠেছে রাঙামাটির এই স্বচ্ছ পানির মাঝে, তা পর্যটক মনে রাঙামাটির প্রতি ভ্রমণের আকর্ষণ ক্রমেই বাড়াবে—এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
রাঙামাটি শহর থেকে টুক টুক ইকো ভিলেজে যাওয়ার জন্য শহরের রিজার্ভ বাজারের শহীদ মিনার এলাকা থেকে রয়েছে নিজস্ব বোটের ব্যবস্থা। জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা। তবে আমাদের ২০ জনের এই ক্ষুদ্র দলটি বহনের জন্য আলাদা রিজার্ভ ট্রলার ভাড়া করেছিল নোঙর ট্যুরিজম কর্তৃপক্ষ। সারা দিন লেকের পথে টুক টুক ইকো ভিলেজসহ রাঙামাটির অনন্য দর্শনীয় পর্যটন স্পট দেখা শেষে সন্ধ্যায় যখন রিজার্ভ বাজারের ট্রলারঘাটে আমাদের নামিয়ে দিল ততক্ষণে স্মৃতিতে জমা পড়েছে রাঙামাটি ভ্রমণের আরও কিছু নতুন অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। জীবনের সুখ স্মৃতিগুলোর মাঝে যেগুলো চির ভাস্বর হয়ে থাকে জীবনভর।
শীত এলে টুক টুক ইকো ভিলেজসহ রাঙামাটির পর্যটন কেন্দ্রেগুলোয় পর্যটকদের ঢল নামে । এ সময় রাঙামাটি ভ্রমণের মজাই আলাদা। বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করতে পারেন ০১৯২২১১২৬৭৬ নম্বরে।
Source: Daily Amardesh, 31-01-2011

রাঙামাটির ছবি ব্লগ [পর্ব-৫]

আজকের পর্বে থাকছে টুকটুক ইকো ভিলেজ-এ যাওয়ার সময় এবং অবস্থান করা কালীন কয়েকটি ছবি। রাঙামাটিতে গেলে কখনই ১ দিনে পুরোটা ঘুরে শেষ করতে পারবে না কেউ। ১ রাত থাকতেই হবে আপনাকে। রাত কাটানোর কাজটা আপনারা সেরে নিতে পারেন এই টুকটুক ইকো ভিলেজ এই। এখানে কয়েকটি রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। সবগুলো রিসোর্টই পাহাড়ের কিনারায় কাঠের ভিত্তির উপড় তৈরী (ছবিতে দেখবেন)। ধারনা করছি সেগুলো খুবই সাধারন। প্রতি রুম ১ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। এক রুমে ৩ জন পর্যন্ত থাকতে পারবেন। সুতরাং তুলনামুলক অনেক সস্তা। এই সব রিসোর্টে ইলেক্টট্রিসিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে সোলার এনার্জির মাধ্যমে। রাখা আছে জেনারেটর ও। আসুন কয়েকটি ছবি দেখি…


১)

টুকটুক ইকো ভিলেজ-এ যাওয়ার সময়

২)

টুকটুক ইকো ভিলেজ-এর প্রবেশ পথ

৩)

টুকটুক রেষ্টুরেন্ট

৪)

সাদা ভাত এবং চিকেন ইন বেম্বু। স্থানীয় ভাষায় এই খাবারের নাম “কুমোতকুড়া”

৫)

সবুজের মাঝে টুকটুক রিসোর্ট

৬)

একটি নির্মানাধীন রিসোর্টের উপড় আমরা

৭)

টুকটুক ইকো ভিলেজের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোট খাল

৮)

কাশফুল

৯)

পাহাড়ের উপড় থেকে তোলা

১০)

গহীন নীলিমা

১১)

নাম না জানা কোন ফুল

১২)

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, যাবার সময় হলো…

al_berunie লেখক : আদনান আল বিরুনী
Prothom-alo Blog

Wednesday, January 19, 2011

পল্লীভ্রমণ: গন্তব্য হাজাছড়ি মারমাপল্লী

পল্লীভ্রমণ: গন্তব্য হাজাছড়ি মারমাপল্লী
মৃত্যুঞ্জয় রায়
by সাপ্তাহিক ২০০০ 13 জানুয়ারি 2011

রাঙামাটিতে টানা কয়েকদিন বৃষ্টির পর এমন একটা সূর্যস্নাত সকাল দেখে মনটা আনন্দে নেচে উঠল। খুশির আর একটা কারণ, ইউএনডিপির আমন্ত্রণে আমাদের প্রত্যন্ত এলাকার একটা মারমাপাড়ায় যাওয়ার কথা। রাঙামাটি থেকে সে পাড়াটা প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। কাপ্তাই হ্রদের মধ্য দিয়ে বোটে যেতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক লাগে। তবে ইউএনডিপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুপ্রিয় ত্রিপুরা জানালেন, ‘দাদা আপনাদের জন্য ইউএনডিপির স্পিডবোটের ব্যবস্থা হয়েছে। ডাবল ইঞ্জিনের এই স্পিডবোট মিনিটে দেড় কিলোমিটার চলে। তাই হয়তো ৪০-৪৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা সেখানে পৌঁছে যাব।’ ইউএনডিপির কর্মকর্তা সুপ্রিয় ত্রিপুরার কথা শুনে তাই আনন্দ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। কর্ণফুলী নদী, মায়াবী পাহাড়-জলের কাপ্তাই হ্রদ, জলজঙ্গল পেরিয়ে ছুটে চলব আমরা এক অদেখা ভুবনে, অজানা দেশে।

ঠিক সাড়ে ৮টায় চাকমা রাজবাড়ির কাছে ইউএনডিপি ঘাট থেকে স্পিডবোট ছাড়ল। পেছনে ফেনিল ঢেউ তুলে তীব্র বেগে ছুটে চলল বোটটা। লেকের এদিক-ওদিকের দৃশ্যগুলো খুব দ্রুত মুছে যেতে লাগল। এমনকি ভালো লাগা দৃশ্যগুলো স্থির হয়ে একটু ভালো করে ছবি তোলার সুযোগও পেলাম না। তবে এর মধ্যেই ক্যামেরার শাটার টিপে যেতে লাগলাম, যা আসে। প্রথমেই পেরিয়ে গেলাম রাঙামাটির ব্যস্ততম বনরূপার ভাসমান বাজার। ভিয়েতনামের বাজারের মতো চিত্র এই বাজারের। শত শত নৌকা ভিড়েছে বনরূপা বাজারের ঘাটে। আনারস আর কাঁঠালের দাপটটাই যেন বেশি। নৌকায় নৌকায় চলছে বেচাকেনা, পণ্য ওঠানামা। সুপ্রিয় বলল, ‘আজ তো বুধবার। বনরূপার হাট। তাই নৌকা আর পণ্যের আনাগোনা বেশি।’
রাঙামাটিতে প্রচুর কাঁঠাল উৎপন্ন হয়। এমনও হয়, বাজারে খুব বেশি কাঁঠাল ওঠায় কখনো কখনো দাম খুব নেমে যায়। অনেকের বোটে আনার ভাড়াও ঠিকমতো ওঠে না। তবে এখন দিন অনেকটাই বদলে গেছে। ঢাকা ও চিটাগাং থেকে অনেক পার্টি আসে। প্রতি বুধবার বনরূপা থেকে কয়েক ট্রাক কাঁঠাল ও আনারস চলে যায় রাঙামাটির বাইরে। উপজাতিয়রা সাধারণত এ ধরনের কোনো ব্যবসা করেন না। কিছু স্থানীয় উপজাতিয়রা অভিযোগ করেন, একসময় রাঙামাটিতে বাঙালি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট খুব জোরাল ছিল। সব বাঙালি ব্যাপারী একজোট হয়ে শলাপরামর্শ করে একটা দাম ঠিক করে আনারস ও কাঁঠাল কিনত। তারা যা দাম বলত সে দামেই প্রায় সবাই আনারস ও কাঁঠাল বেচতে বাধ্য হতো।
দেখা গেছে, আনারসের দাম চট্টগ্রামে দশ টাকা, সেই আনারসই রাঙামাটিতে বিক্রি হতো টাকায় একজোড়া। এমন দিনও গেছে, পিঠে ঝুড়িভর্তি করে উপজাতি মেয়েরা দশ-বারো কিলোমিটার হেঁটে রাঙামাটিতে আনারস বেচতে নিয়ে এসেছে। এসে দেখে একশ আনারস পঞ্চাশ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে না। তাই কেউ কেউ রাগ করে সেসব আনারস আর ফেরত না নিয়ে কাপ্তাই হ্রদের জলে ফেলে দিয়ে খালি ঝুড়ি নিয়ে আবার দশ-বারো কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরত। তখন তো মোবাইলের যুগ ছিল না। তাই ঢাকা বা চট্টগ্রামে আনারসের দাম কত তা উপজাতিয়রা জানতে পারত না। ফলে বাজারে পণ্য বিক্রি করতে এসে প্রায়ই তাদের ঠকতে হতো। মজার ব্যাপার হলো, তারা যে ঠকছে সেটাও অনেকে বুঝত না। ভাবত ওটাই ন্যায্য দাম। হিসাবও অনেকে ঠিকমতো বুঝত না। অনেক উপজাতি নাগরিকই শত কিংবা হাজার গুনতে পারে না, তারা প্রায়ই কুড়ি হিসাবে টাকা গোনে।
খুব সকালে বনরূপা বাজারের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জনৈক ব্যবসায়ী প্রিয়তোষ চাকমার কাছ থেকে কথাগুলো শুনছিলাম আর প্রায় একশ বছর আগেও তাদের প্রায় একই দশার কথা মনে করে লজ্জিত হচ্ছিলাম। সেকালেও অধিকাংশ উপজাতি মানুষের কাছেই বাঙালি ও মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা ‘শঠ’ হিসাবে পরিচিত ছিল। সে যুগেও এসব ব্যবসায়ী লবণ ও সাবান বিক্রি করত চড়া দামে নতুবা ধান ও অন্য শস্যের বিনিময়ে। সেেেত্রও অধিকাংশ উপজাতিই বিশ্বাস করত, ওটাই বোধহয় ন্যায্য দাম। তবে অতীতে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে তারা পণ্য বেচতে বাজারে আসত না। সকালবেলা শোনা এসব কথা ভাবতে ভাবতেই একে একে পার হয়ে গেলাম ডিসি বাংলো ও পর্যটন। পেছনে পড়ে রইল রাঙামাটি শহর আর আকাশে হেলান দেওয়া পাহাড়গুলো।
আমরা যাচ্ছি কাপ্তাইয়ের পথে। তবে কাপ্তাই যাওয়ার পথ থেকে স্পিডবোটটা টার্ন নিল অন্যপথে। একটু এগ্রিয়ে সুপ্রিয় দেখাল বিলাইছড়ি যাওয়ার পথটাও। যেতে যেতে হ্রদের পানিটা যেন টলটলে হয়ে এলো, রাঙামাটির কাছে কর্ণফুলীর সেই ঘোলাটে রূপ নেই। কেমন শান্ত, নির্জন একটা পরিবেশ। বৃষ্টিতে দিনে দিনে লেকের পানি বাড়ছে। স্বচ্ছ সে জলের বুক যেন এক ঢাউস আয়না। সে আয়নার মধ্যে পড়েছে সবুজ অরণ্য আর নীলাভ পাহাড়ের ছায়া। কোনো কোনো পাহাড়কে ন্যাড়া করে তার বুকে জুমচাষ করা হয়েছে। সেসব জুমে চারা গজিয়ে সবে পাহাড়ের গায়ে একটা সবুজ প্রলেপ পড়েছে। ঢেউ ঢেউ সেসব সবুজ ওড়না পরা পাহাড়ের বুকগুলো হ্রদের জলে ছায়া ফেলেছে। হ্রদের বুকে ফিনফিনে বাতাসের ঢেউ অথবা স্পিডবোট থেকে ধেয়ে যাওয়া ঢেউগুলো সেসব ছবিকে রেখায় রেখায় ভেঙে দিচ্ছে। চমৎকার সে দৃশ্য। স্পিডবোট থেকে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের ঢালে ঢালে মাচাং ঘর, উপজাতিপল্লী, নৌকার আনাগোনা। এসব দেখতে দেখতে হ্রদের নির্জনতা ছেড়ে একটা জনপদের কাছাকাছি এসে পড়লাম বলে মনে হলো। সুপ্রিয় জানাল, ওটা নেভাল ক্যাম্প। আমরা জীবতলি ইউনিয়নে এসে পড়েছি। কিন্তু ওটাকে ডানে রেখে স্পিডবোট ছুটে চলল আরো দূরে। এবার আরো বেশি নির্জনতা, পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় আষাঢ়ী মেঘের মাতামাতি। এসব দৃশ্যে মুগ্ধ হতে হতেই আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। এটাই সেই হাজাছড়ি অংচাজাই কারবারিপাড়া, উপজাতি মারমাদের গ্রাম।
স্পিডবোট থেকে নেমে এবার পাহাড় চূড়ায় ওঠার পালা। লাল মাটির বুক বেয়ে ওপরে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই। তাই যে যেভাবে পারি সুবিধামতো হেঁটে ওপরে উঠে এলাম। উঠতে উঠতে মনে হলো আমরা যেন এক ফলবীথিতে প্রবেশ করছি। কী নেই সে পাহাড়ের ঢালে। কাঁঠাল, লিচু, আম, কুল, বেল, বেতফল, আতা, লেবু, নারকেল, পেয়ারা, তেঁতুল সব গাছই আছে। লিচু, আম, তেঁতুলগাছগুলো বেশ বড়, পুরনো। পাহাড়ের চূড়ায় উঠেই একটা বিশাল তেঁতুলগাছ চোখে পড়ল। আহ্, কী চকচক করছে সবুজ পাতাগুলো। গাছের ডালপালাভর্তি ঘন পত্রপল্লবে শীতল ছায়ার আহ্বান। দলের অঞ্জন বললেন, ‘আপনি যে কোনো মারমাপাড়ায় গেলে তেঁতুলগাছের দেখা পাবেন। তারা নতুন কোনো পাহাড়ে বসতি শুরু করার সময় প্রথম যে গাছটি লাগায় সেটি হলো তেঁতুল। শুধু পাড়ায় না, এমনকি অনেক মারমা বাড়িতেও দেখবেন তেঁতুলগাছ আছে। বলতে পারেন এটা ওদের এক ধরনের সংস্কার। ওরা ভূতপ্রেতে খুব বিশ্বাস করে। অনেক মারমাই মনে করে, দেবতাদের মতো ভূতপ্রেতদেরও পুজো দিতে বা সন্তুষ্ট রাখতে হয়। না হলে ওইসব অপদেবতা যে কোনো সময় তি করতে পারে। মারমাদের বিশ্বাস, দেবতাদের পুজো দিতে হয় তাদের কাছ থেকে বর বা আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য। আর অপদেবতাদের পুজো করতে হয় তাদের রোষ থেকে বাঁচার জন্য। পৃথিবীতে শান্তিময় জীবনের জন্য ভালো ও মন্দ এই দুটি জিনিসকেই বশে রাখার প্রয়োজন আছে।’ হয়তো তেঁতুলের সঙ্গে ভূতপ্রেতদের কোনো সম্পর্ক আছে। তাছাড়া মারমারা খুব তেঁতুল খায়। রান্নায় টক একটি অনিবার্য খাবার। ওদের এ সংস্কার আছে কি না জানি না, তবে পাড়াটায় বেশ কয়েকটা প্রাচীন তেঁতুলগাছের দেখা পেলাম।
লেক থেকে পাড়াটা প্রায় চার-পাঁচশ ফুট ওপরে হবে। তাই অত উঁচুতে জলের স্পর্শ পাওয়া কঠিন। কিন্তু কী আশ্চর্যজনকভাবে অত উঁচু পাহাড়ের মাথায় বিশাল দৈত্যের মতো তেঁতুলগাছগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে। শুধু দাঁড়িয়ে রয়েছে বললে ভুল হবে, ঘনপত্রপল্লবে সে উদ্ভিন্ন যৌবনা, থোকা থোকা হৃষ্টপুষ্ট তেঁতুল ফলে গাছটা সালঙ্কারা। পাহাড়ের ঢালে কাঁঠালগাছগুলোও কম তেজি না, সেগুলোতে কাঁঠালও ধরেছে প্রচুর। উঠতে উঠতে শুধু ফলের গাছই নয়, কিছু বাড়ির আঙিনাতে অনেক বাহারি পাতা ও ফুলের গাছও চোখে পড়ল। তবে পাড়াটার কোথাও কোনো সমতল জমি চোখে পড়ল না। পাহাড়ের চূড়া ও ঢালে ঢালে বাঁশ, কাঠ আর ছন/খড় দিয়ে তৈরি মারমাদের মাচাং ঘর। কয়েকটা মাটির দেয়াল দেওয়া টিনের ঘরও অবশ্য রয়েছে সে গাঁয়ে। আর কারবারির (পাড়াপ্রধান) বাড়িটা নতুন করে তৈরি হচ্ছে ইট-সিমেন্ট দিয়ে। কয়েকজন বাঙালি মিস্ত্রি সে ঘর তৈরির কাজ করছে। এ যেন আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মারমাদেরও আবাসন ব্যবস্থা এবং জীবনধারা ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত।
ছবি : লেখক

Sunday, January 2, 2011

বেড়ানো : অপরূপ পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি

বেড়ানো : অপরূপ পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি

রাজীব পাল রনী
প্রকৃতির রং আর মাধুর্যের পরিপূর্ণ স্বাদ নেয়ার জন্য বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি ঘুরে দেখার। রাত সাড়ে ৮টায় ফকিরাপুল পৌঁছে দেখি, ভ্রমণসঙ্গী সবাই আমার আগে এসে হাজির। আমি পৌঁছামাত্রই নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের বাস রাঙামাটির উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায়। আমাদের বহু প্রতীক্ষিত ট্যুর। তাই বন্ধুদের সবার মাঝেই প্রাণের উচ্ছ্বাস ছিল প্রচুর। বাসে বসে বন্ধুরা গল্প জুড়ে দিল একে অপরের সঙ্গে। আমাদের বাসটি এগিয়ে চলছে ‘গ্রামছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ আমার মন হারায়রে...’ এ গানটি শুনতে শুনতে আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাত্ আমাদের বাস থামল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের জানিয়ে দিল রাঙামাটি যাওয়ার পথে যাত্রাবিরতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের টাইমস্ স্কয়ার হোটেলে। এ হোটেলে কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাই খেতে ভুল করিনি আমরা। যাত্রাবিরতি বিশ মিনিট শেষে আমাদের বাস আবার ছুটল। খুব ভোরে আমাদের বাস চট্টগ্রাম হয়ে রাঙামাটি শহরে পৌঁছলো। শহরে নেমে হোটেলে জিনিসপত্র রেখে নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়ি সৌন্দর্যের টানে। প্রথমে আমরা ঠিক করলাম, প্রথম দিন শহর ও এর আশপাশের দর্শনীয় জায়গা ঘুরে দেখব। যেই কথা সেই কাজ। আমরা প্রথমে বেবিট্যাক্সিতে করে রাঙামাটির উপজাতীয় জাদুঘরে গেলাম। জাদুঘরের দোতলায় দেখতে পেলাম সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতির কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অজস্র নিদর্শন। পার্বত্যাঞ্চলের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের বিরাট স্থান জুড়ে রয়েছে চাকমা, সং এবং বোমাং রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস-ঐতিহ্য। এসব রাজা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত সব রাজকীয় পোশাক, রাজাদের তলোয়ার, কামান, তাদের ব্যবহৃত তৈজসপত্র, রাজকীয় দলিল এবং সে সময়কার স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা সাজিয়ে রাখা হয়েছে জাদুঘরে। দোতলায় দেখতে দেখতে আমরা তিনতলায় যাই। তিনতলায় গিয়ে দেখতে পেলাম জাদুঘর ইনস্টিটিউটের নিজস্ব লাইব্রেরি আর এই লাইব্রেরিতে রয়েছে সহস্রাধিক বই। এ জাদুঘরটি খোলা থাকে সকাল ৯ টা ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। জাদুঘরে প্রবেশ ফি বড়দের পাঁচ টাকা ও ছোটদের দুই টাকা। তারপর আমরা চলে এলাম রাজবাড়ীতে। আছে চাকমা রাজবিহার, সেটিও দেখলাম। তারপর তবলছড়ি, রিজার্ভ বাজারসহ রাঙামাটির ব্যস্ততম জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে লাগলাম। তখন খাড়া দুপুর, ক্ষুধা লেগেছে। কী আর করা। রাঙামাটির মূল শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হলিডে কমপ্লেক্স। তাই আমরা অটোতে করে পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সে এসে আমাদের দুপুরের খাবার খেয়ে নিই। দুপুরের খাবার খেয়ে আবার বেরিয়ে পরলাম ঝুলন্ত সেতু দেখার উদ্দেশে। হলিডে কমপ্লেক্সের পাশেই সেতুটির অবস্থান। আমরা বাড়তি ১০ টাকার টিকিট কেটে ঝুলন্ত সেতুতে প্রবেশ করলাম। প্রথমে ঝুলন্ত সেতুতে দাঁড়াতেই চোখ পড়ল আমাদের লেকের অবারিত জলরাশি আর দূরের উঁচু-নিচু পাহাড়ের আকাশ ছোঁয়া বৃক্ষরাজি। ঝুলন্ত সেতুটি ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ, ৮ ফুট প্রশস্ত এবং উভয় পাশে টানা দ্বারা বেষ্টিত। সেতুটির কারণে পর্যটকদের কাছে রাঙামাটির গুরুত্ব ও আর্কষণ অনেকগুণ বেড়ে গেছে। সকাল আর বিকালে অপরূপ দৃশ্য ধারণ করে এই জায়গা। সন্ধ্যা পর্যন্ত উপভোগ করলাম এই সৌন্দর্য। পরের দিন সকালে আমরা রওনা দেব কাপ্তাই লেকে। তাই আমরা সন্ধ্যা হওয়ার আগেই হলিডে কমপ্লেক্সে চলে আসি। হলিডেতে পছন্দের কাউন চালের পায়েস খেয়ে রাতের খাবার সম্পন্ন করি। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু ঘুমানোর কোনো সুযোগ নেই! কারণ আড্ডা আর গানে গভীর রাত হয়ে গেল। সকালে জানালা দিয়ে দেখি পূর্বাকাশ ফর্সা করে রাঙ্গা সূর্য উঠেছে। আর সকালে ফুরফুরে বাতাসে পাখি গান করছে খুব সুন্দরভাবে। তাই সবাই প্রশান্ত মেজাজে জানালা দিয়ে চোখ রাখি বাইরে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুতি নেয়ার কারণ হচ্ছে, দীর্ঘদিন মনের মধ্যে লালন করা সেই কাপ্তাই লেক ঘুরে দেখব আজ। যে যার মতো ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে ঠিক ৯টার মধ্য আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমরা বন্ধুরা মিলে সারা দিনের জন্য ঝুলন্ত সেতুর পাশ থেকে একটি ট্রলার ভাড়া করে কাপ্তাই লেক দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের ট্রলার আঁকাবাঁকা লেকের পথ ধরে যেতে লাগল। লেকের চারদিকেই স্বচ্ছ জলধারা। কাপ্তাই লেক মিশেছে প্রকৃতির সঙ্গে অপরূপ সাজে। সামনে থেকে না দেখলে বোঝা যায় না। দেখলে মনে হয় যেন কোনো এক শিল্পী তার তুলিতে একেঁছেন চোখজুড়ানো এক ছবি। সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে কিছুক্ষণ আমাদের ট্রলার যাওয়ার পরই চোখে পড়ল একটি বাজার। বাজারের নাম জানা গেল সুভলং বাজার। সুভলং বাজারে একটি মিনি চিড়িয়াখানা আছে। আমরা সেটিও দেখলাম। এটিতে ছয় থেকে সাত রকমের প্রাণী আছে। সামনের পাহাড়েও আমরা উঠলাম, এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় উচ্চতম পুলিশ ক্যাম্প যা ১৭৬০ ফুট। পাহাড় থেকে পুরো রাঙামাটি দেখা যায়। কিছুক্ষণ দেখে আমরা চলে এলাম। আবার ট্রলার যাত্রা। ট্রলার চলছে, সামনে-পেছনে কেবল পাহাড় আর পাহাড়। আর তার অল্প কিছুক্ষণ পরই একটি ঝরনার পাশে এলাম।
এটি সুভলং ঝরনা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সুভলং ঝরনা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক হাজার ফুট উঁচুতে। পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে বিস্তৃত পাহাড় রাশিতে অসংখ্য ঝরনার মধ্যে অন্যতম সুভলং ঝরনা। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ঝরনার আয়ুকাল তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত থাকে। পুরো শীত মৌসুমে পানি থাকে না বললেই চলে। আমরা শীতের শুরুতে যাওয়ায় আমাদের ভাগ্যের ঝরনা দেবী দেখা দিয়েছে। ঝরনার ঝিরঝির শব্দে পাহাড় বেয়ে চলছে অবিরাম জলধারা। চারদিক সুনসান নীরবতা। এরই মাঝে আমরা পাঁচ বন্ধু ঝরনার ধারে বসে রইলাম কিছুটা সময়। হালকা কুয়াশার কারণে ভালো ফটোগ্রাফ পেলাম না। তাতে কোনো দুঃখ নেই। মনের ফিল্মে ভালো করে তুলে রাখলাম এসব ছবি। সুভলং ঝরনা দেখে আমাদের ট্রলার ছেড়ে দিল। ট্রলার যতই সামনে এগোচ্ছে, পাহাড় ও লেকের সৌন্দর্য যেন ততই বেড়ে চলছে। বন্ধুরা সবাই মিলে গান গাইতে আরম্ভ করলাম ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা ... এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’। এমন অনেক গান আমরা গাইতে গাইতে টুকটুক ইকো ভিলেজে কখন পৌঁছে গেছি খেয়াল করিনি। সম্পূর্ণ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা এ পর্যটন কেন্দ্রটি ভ্রমণপ্রিয়দের কাছে দারুণ উপভোগ্য। চারদিকে কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ পানি রাশির মধ্যে হঠাত্ই জেগে ওঠা সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে ওঠা এই ভ্রমণ স্পট। এই ভ্রমণ স্পটে খানিক বসলে নিমিষেই হিমেল হাওয়ার ঝাঁপটা নিয়ে যাবে স্বর্গীয় অনুভূতির সন্ধানে। কাঠ এবং বাঁশের কারুকাজে তৈরি এই রেস্তোরাঁয় মেলে দেশীয় ও পাহাড়ি আদিবাসীদের মজাদার সব খাবারের আইটেম। লেকের পাড়ে যারা সারাদিনের জন্য বের হন তারা ইকো ভিলেজে খাবারটা সারেন এখানেই। তাই আমরাও খাবার সেরে নিলাম এখানেই। তারপর ইকো ভিলেজ আর পেদা টিংটিং ঘুরে পড়ন্ত বিকালে দুই পাশে অবাক করা বিচিত্র লেক আর পাহাড় দেখতে দেখতে আমরা চলে আসি। এক সময় সন্ধ্যা নামল। হোটেলে এসে গুছিয়ে নিই। হালকা ফ্রেশ হয়ে বন্ধুরা মিলে বেরিয়ে পড়লাম কিছু কেনাকাটা করার জন্য। দেশীয় ও উপজাতীয় কিছু পোশাক কেনাকাটা করে আবার হোটেলে ফিরলাম খুব তাড়াতাড়ি। আমাদের বাস রাত ৮টায়। তাই রাতের খাবার খেয়ে আমরা বাসে উঠলাম। নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের বাস ছাড়ল। বাসে বসে ভাবছি, সত্যিই রাঙামাটিকে সৌন্দর্যের লীলাভূমি বললে ভুল হবে না। রাঙামাটির অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। জীবনের সুখস্মৃতিগুলোর মাঝে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে জীবনভর রাঙামাটি। তাই আর দেরি কেন, পাঠক আপনিও ঘুরে আসতে পারেন রাঙামাটিতে।
কীভাবে যাবেন : ঢাকার কমলাপুর, ফকিরাপুল, কলাবাগান, সায়েদাবাদ ও গাবতলী থেকে সরাসরি রাঙামাটির উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ডলফিন পরিবহন, ইউনিক সার্ভিস, এস আলম সার্ভিস, সৌদিয়া ও শ্যামলী পরিবহন ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়। ভাড়া জনপ্রতি নন-এসি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, এসি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। এছাড়া অনান্য বাস, ট্রেন কিংবা বিমানে চট্টগ্রামে এসে এখান থেকেও রাঙামাটি আসতে পারেন। চট্টগ্রাম শহরে সিনেমা প্যালেস এবং বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতি বিশ মিনিট পরপর রাঙামাটির উদ্দেশে ছেড়ে যায় বিরতিহীন বাস।
কোথায় থাকবেন : রাঙামাটিতে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো হোটেল হলো কাঁঠালতলীতে হোটেল সুফিয়া, ফোন : ০৩৫১-৬২১৪৫, ০৩৫১-৬১১৭৪, ০৩৫১-৬১৪৬৯। রিজার্ভ বাজারে হোটেল গ্রীন ০৩৫১-৬২১৪৫। পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স, ডিয়ার পার্ক, রাঙামাটি, ফোন : ০৩৫১-৬১০৪৬, ০১৫৫৬৬৩০৪৯৫, ০১৭২৭৩২৮৮১০। এছাড়াও রাঙামাটিতে আরও কিছু হোটেল রয়েছে। তার মধ্যে হোটেল লেক ভিউ, শাপলা ইত্যাদি হোটেল ও মোটেলে আপনি রাতযাপন করতে পারেন।

সবুজ অরণ্য আর পাহাড়ি হ্রদের হাতছানি কাপ্তাই

সবুজ অরণ্য আর পাহাড়ি হ্রদের হাতছানি কাপ্তাই

রেজাউল করিম, কাপ্তাই (রাঙামাটি)
পাহাড়ি কন্যা কর্ণফুলীর শান্ত-শীতল জলরাশিসমৃদ্ধ হ্রদ আর সবুজ বনানি পাহাড়ের স্বপ্নিল জনপদ কাপ্তাই পার্বত্যাঞ্চল এখন পর্যটকদের স্বপ্নরাজ্য। রাঙামাটি পার্বত্য জেলার মধ্যে কাপ্তাই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে খ্যাত। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, উঁচু-নিচু পাহাড় আর সবুজ অরণ্যানি, কর্ণফুলী নদীর জলতরঙ্গ আর চোখ জুড়ানো নীল জলরাশির কাপ্তাই লেক প্রতিনিয়তই পর্যটকদের দেয় স্বপ্নের হাতছানি। অপরূপা কাপ্তাই এখন শীত মৌসুম শুরু হতে না হতেই শত শত পর্যটকের পদচারণায় মুখর।
কাপ্তাইয়ের আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে কাপ্তাই ৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন পরিচালিত প্যানোরমা জুম রেস্তোরাঁ, কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক। পাহাড়, প্রকৃতি, হ্রদ আর শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ এখানকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কাপ্তাই জুম রেস্তোরাঁর উল্টোদিকে নদীর অপর পাড়ে রয়েছে ওয়াগ্গাছড়া চা বাগান। কর্ণফুলী নদী পার হয়ে ওয়াগ্গা চা বাগান পরিদর্শন করতে পারেন নির্বিঘ্নে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখানে রয়েছে ওয়াগ্গা বিজিবির (সাবেক বিডিআর) সশস্ত্র প্রহরা। এ ছাড়া আছে কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক। এ পার্ক সমৃদ্ধ হয়েছে নানা জীববৈচিত্র্যে। একটু নিরিবিলিতে দাঁড়ালেই দেখতে পাবেন বানর, হরিণ ও নানা প্রজাতির পশুপাখির সমারোহ। ন্যাশনাল পার্ক ও জুম রেস্তোরাঁয় পিকনিক কর্নার এবং শুটিং স্পটসহ সব ধরনের বিনোদন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
আপনাকে মুগ্ধ করার জন্য আরও রয়েছে কাপ্তাই হ্রদ। কাপ্তাই আর রাঙামাটির মাঝখানে এক বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বিশাল স্ফটিক নীল জলের এ কৃত্রিম হ্রদ। পানিবিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে এ হ্রদ সৃষ্টি হলেও এর কৃত্রিমতা স্বাভাবিক সৌন্দর্যকেও যেন ছাড়িয়ে গেছে। বাঁধের উজানে উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে সৃষ্ট মনোহরা স্বচ্ছ নীল জলরাশি কখনো সরু নদীর মতো আবার কখনওবা দিগন্ত বিস্তৃত। উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় আদিবাসী পাহাড়ি বিভিন্ন উপজাতির নিবাস। কাপ্তাই হ্রদে ভ্রমণের বা নৌবিহারের স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে কাপ্তাই বিলাইছড়ি, রাঙামাটি, সুভলং, রাঙামাটি চাকমা রাজবাড়ী ইত্যাদি। কাপ্তাই লেক ছাড়াও বাড়তি আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে কাপ্তাই বাঁধ ও কর্ণফুলী পেপার মিল পরিদর্শনের সুযোগ। অপরদিকে নিরেট প্রকৃতির কোলেই গড়ে উঠেছে কাপ্তাইয়ের চিত্মরমের উপজাতি মারমা পল্লী। প্রাচীন ও আধুনিক বৌদ্ধ মন্দির, প্যাগোডা, আধুনিক রেস্টহাউস আর বিপণি বিতান এখানকার অন্যতম আকর্ষণ।
কাপ্তাই যাওয়ার পথে আরও দেখতে পাবেন এক সময়ের এশিয়ার বিখ্যাত কর্ণফুলী পেপার মিল, বাংলাদেশের একমাত্র কাপ্তাই পানিবিদ্যুত্ কেন্দ্র, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শহীদ মোয়াজ্জেম প্রশিক্ষণ ঘাঁটি, বাংলাদেশ টিম্বার অ্যান্ড প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রিজ, কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্কের বর্ণিল বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ইত্যাদি। এসব পরিদর্শনের জন্য পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয়।
আপনি ঢাকা থেকে সড়ক, রেল বা বিমানে করে চট্টগ্রাম হয়ে সরাসরি কাপ্তাই যেতে পারেন। চট্টগ্রাম শহর থেকে কাপ্তাইয়ের দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার। অপরদিকে ঢাকা থেকে সরাসরি কাপ্তাই পর্যন্ত বাস সার্ভিস রয়েছে। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম হয়ে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি গেটলক সার্ভিসে কাপ্তাই যেতে পারেন। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের অবস্থা খুবই ভালো। কাপ্তাই পৌঁছে হ্রদের জেটি ঘাঁট থেকে ইঞ্জিনচালিত দেশি নৌকা বা স্থানীয় সাম্পানে করে পূর্ব-দক্ষিণে সীমান্তবর্তী থানা সদর বিলাইছড়ি, উত্তরের জেলা শহর রাঙামটি, রাঙামাটির অদূরে শিলাময় পাহাড়ঘেরা শুভংল, চাকমা রাজার বাড়ি প্রভৃতি স্থানে নৌপথে ভ্রমণ করতে পারেন। চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি রাঙামটি গিয়েও কাপ্তাই হ্রদে ভ্রমণ করা যায়। শুভলংয়ের পথে ছোট-বড় অনেক ঝরনা চোখে পড়বে। রাঙামাটি ঝুলন্ত ব্রিজ পর্যটকদের জন্য একটি মনোরম আকর্ষণীয় স্থান। কাপ্তাই থেকে সড়কপথে রাঙামাটির দূরত্ব মাত্র ২৪ কিলোমিটার।
কাপ্তাইয়ে সমস্যা একটি আর সেটি হলো থাকা ও খাওয়া। রাঙামাটি জেলা শহরে পর্যটকদের উন্নত থাকা-খাওয়ার যথেষ্ট ব্যবস্থা থাকলেও কাপ্তাইয়ে সেটি গড়ে ওঠেনি। তবে সরকারি কয়েকটি সংস্থার বেশকিছু রেস্টহাউস রয়েছে। যেখানে অনুমতি সাপেক্ষে ভালো থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থা আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এসব রেস্টহাউসে থাকতে পারেন। পর্যটন শহর উন্মুখ প্রতীক্ষায় আপনারই জন্য।

Saturday, January 1, 2011

শুভলং, রাঙামাটি


শুভলং, রাঙামাটি

শুভলঙের ঝর্নাটি বেশ আকর্ষণীয়। এখানে স্নান করলে মন ভরে যাবে আনন্দে। কাপ্তাই লেকের কোলে বিশাল উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে এ ঝর্নার জল এসে পড়ে নিচে। যদিও এ সময়ে এ ঝর্নার জলে কিছুটা ঘাটতি দেখা যায়। ইচ্ছে হলে বোট থামিয়ে ঝর্নার জলে শরীরটা ভিজিয়ে নিতে পারেন। শুভলং যাওয়ার পথে আরো দু-একটি ছোট ছোট ঝর্নার দেখা মিলবে। সেগুলোও দেখে নিতে পারেন।

কিভাবে যাবেন : রাঙামাটি শহর থেকে ইঞ্জিন বোটে শুভলং যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘন্টা। রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি বাজার এবং পর্যটন কমপ্লেক্স থেকে ইঞ্জিন বোট ভাড়া পাওয়া যায়। যাওয়া আসার ভাড়া ৭০০- ১৫০০ টাকা। যেতে পারবেন ১০ থেকে ২০ জন। সম্প্রতি চালু হয়েছে এই পথে আধুনিক জলযান কেয়ারী কর্ণফুলী। এছাড়া রিজার্ভ বাজার থেকে সকাল থেকে দুপুরের পর পর্যন্ত লোকাল লঞ্চ ছাড়ে বিভিন্ন গন্তব্যে। সকালে উঠলে ফিরতি পথেও পেয়ে যাবেন কোনো লঞ্চ। ঘুরে আসতে পারেন সেসব কোনো লঞ্চেও। শুভলং যতো না সুন্দর, তার চেয়ে আরো সুন্দর এর যাওয়ার পথটি। দুপাশে উঁচু পাহাড় তার মাঝ থেকে নিরবধি বয়ে চলা কাপ্তাই লেক।
Source: http://mynewspapercut.blogspot.com

শুকিয়ে গেছে শুভলং ঝরণা

পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ রাঙামাটির শুভলং ঝরণা। শীত মৌসুমের শুরুতে প্রতিদিন শত শত পর্যটক রাঙামাটিতে ভিড় জমাচ্ছে। প্রকৃতিপ্রেমী এসব মানুষ রাঙামাটির অন্যতম আকর্ষণ শুভলং ঝরণার পাড়ে ছুটে যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক উত্স নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শুকিয়ে গেছে শুভলং ঝরণা। ঝরণার এ দুরবস্থা দেখে প্রতিনিয়ত হতাশ হচ্ছেন পর্যটকরা। এ দৃশ্য গত মঙ্গলবার ক্যামেরাবন্দি করেন আমাদের রাঙামাটি প্রতিনিধি মোহাম্মদ সোলায়মান
Source: Daily Amardesh 9th December,2010

মেঘ বাদলে রাঙামাটি

মেঘ বাদলে রাঙামাটি
মেঘ বাদলে রাঙামাটি

‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান।’ একটা শব্দ বদলে বলা যায়, বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর হ্রদে এল বান। কারণ, রাঙামাটিতে কোনো নদ বা নদী নেই, আছে পাহাড়ঘেরা হ্রদ। ছোট-বড় পাহাড়ের খাদে খাদে জমে থাকা সেই হ্রদের নাম কাপ্তাই হ্রদ। রাঙামাটির সৌন্দর্যের প্রাণ হলো ওই পাহাড়ঘেরা হ্রদ। বাদল দিনে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের বুকজুড়েও টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে। বান হয় না, তবে হ্রদটা জলে জলে টইটুম্বুর হয়। শীতের শীর্ণ ঝরনাগুলো স্রোতবতী হয়, ঝিরিঝিরি থেকে ঝরঝর করে পাহাড় গড়িয়ে লেকের জলে নামতে থাকে শুভলং ঝরনার জল। সে এক চমৎকার দৃশ্য, অবিশ্বাস্য উদ্দামতার এক ফেনিল আহ্বান।
শুভলং ঝরনা থেকে শুভলং বাজারে যাওয়ার পথে আছে আরও ঝরনা, আছে পাহাড়ে পাহাড়ে সবুজের মাখামাখি, দিগন্ত-বিস্তৃত আকাশের ক্যানভাস, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য, কিংবা জলে ডুবে থাকা মরা গাছের ডালে মাছরাঙা আর গঙ্গাফড়িংয়ের ওড়াউড়ি। শীতের সেই টলটলে স্বচ্ছ জল নেই ঠিকই, তবে বাদলের ঘোলাটে জলেও পাহাড়ের ছায়া পড়ে। সে জলের ওপর দিয়ে রাঙামাটির পর্যটন ঘাট বা রিজার্ভ বাজার ঘাট থেকে ইঞ্জিন বোটে করে দ্বীপ রেস্তোরাঁ পেদা টিং টিং ভায়া শুভলং ঝরনা টু শুভলং বাজার ট্রিপটা তাই রাঙামাটির এক অন্য রকমের এক ভালো লাগা ভ্রমণ। একবেলা বা পুরো দিনের জন্য এক চমৎকার ভ্রমণ প্যাকেজ।
কোনো এক ভরা বাদলে মেঘ মাথায় করে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মেখে গিয়েছিলাম এ পথে। সেই সুখস্বপ্নে কেটেছে কয়েক বর্ষা। তাই এবার আর রাঙামাটির ও পথ মাড়ালাম না, গেলাম ভিন্ন পথে। তা ছাড়া বর্ষাটা তখনো জমিয়ে শুরু হয়নি। শুভলং গিয়ে হয়তো এখনই সেই উদ্দাম যুবতী ঝরনাকে পাব না।
কালবোশেখির রুদ্ররূপ মাঝেমধ্যেই হানা দিচ্ছে রাঙামাটিতে। বাংলোয় এক দুর্দান্ত কালবোশেখির রাত পার করেছি। কড়াৎ কড়াৎ মেঘের গর্জন, বাতাস আর ঝড়ের ঝাপটা, দাঁত খিঁচিয়ে বিদ্যুতের ঝলক, দুদ্দাড় করে গাছ ভেঙে পড়া—এ সবই সইতে হয়েছে। ভোরের আলো না ফুটতেই যখন বাংলো থেকে বন্ধু পবন চাকমার মোটরবাইকে করে রওনা হলাম কলেজ বাজারের পথে, তখন দেখি পথ আগলে পড়ে আছে চাপালিশ, আকাশমণি, মিনজিরি গাছ। অগত্যা ভিন্ন পথে ঘুরে সে বাজারে যেতে হলো। উদ্দেশ্য, স্থানীয় চাকমা আদিবাসীদের ভোরবেলার কাঁচাবাজারটা দেখা। সন্ধ্যায়ই পবন জানিয়ে রেখেছিল যে খুব ভোরে না গেলে রোদ উঠতে উঠতেই বাজার ভেঙে যাবে। তাই আদিবাসীদের বাজার দেখতে হলে ভোরেই বেরোতে হবে। চাকমারা জঙ্গলের ও পাহাড়ের অনেক কিছুই খায়। পবন বলল, ‘সেগুলো তোমাদের কাছে হয়তো অখাদ্য মনে হতে পারে। কিন্তু ওসব খাদ্য বিশেষ করে গাছগাছড়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে চাকমাদের সব সঞ্জীবনী ও সৌন্দর্যের শক্তি। তাই ওরা কোনো দিন কোনো চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা সহজে চিন্তা করে না। এ সময় তুমি বাজারে ছোট ছোট একধরনের বুটির মতো হলুদ ফুল দেখবে। আমরা বলি আগয্যা ফুল। পাহাড়ের জঙ্গলে ফোটে। বিকেলভর চাকমা মেয়েরা ওই ফুল তুলে ভোরে বেচতে আসে। ওই ফুল লেকের মাছ দিয়ে রান্না করে খাই। খুব মজা।’ দেখলাম ৬০ টাকা কেজি দরে ওই ফুল বিক্রি হচ্ছে। রাস্তার দুই ধারে চাকমা মেয়েরা বিছিয়ে বসেছে অনেক দোকান। নানা ধরনের লতাপাতা, জুমের সবজি, সুগন্ধি গাছ সাবরাং, বিন্নি চাল, বাঁশের কচি কোড়ক, তারা ডাঁটা, তিতবেগুন, বয়লা শাক, ইয়েরিং শাক, কয়দা, তিদেগুলা, কচি কাঁঠাল, বাংলা কলার মোচা, এমনকি স্ট্রবেরি ফল পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। দলে দলে আদিবাসীরা সেসব কিনছে। ভোরের আলোয় রীতিমতো জমজমাট সেই বাজার।
বাজার থেকে ফিরে নাশতা সেরে এবার পথ ধরলাম কর্ণফুলী দুহিতা কাপ্তাই দেখতে। পবনের কথামতো পুরোনো পথে গেলাম না, গেলাম নতুন পথে—লেক ড্রাইভে। রাঙামাটি থেকে সম্প্রতি নতুন একটা রাস্তা হয়েছে আসামবস্তি হয়ে কাপ্তাই যাওয়ার। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য সে পথের। চড়াই-উতরাই পাহাড় ডিঙিয়ে পিচঢালা পথে গাড়ি ধীরে ধীরে ছুটে চলল কাপ্তাইয়ের পথে। এটাই এখন কাপ্তাই যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা। বাঁ দিকে বিস্তীর্ণ কাপ্তাই লেক, দূরে আবছায়া গিরিশ্রেণী, ডানে একেবারে হাতের কাছেই অনেক উঁচু-নিচু পাহাড়। সেসব পাহাড়ে খুব ফাঁকা ফাঁকা দু-একটা মাচাং ঘর, আগুনে পোড়া পাহাড়ের ঢাল, তার মানে জুম চাষের প্রস্তুতি। আকাশে দলা দলা কালো মেঘ। মেঘ ফুঁড়ে সূর্য উঠতে চাইছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে পড়েছে লেকের জলে। গুঁড়ো গুঁড়ো রুপো ছড়ানো যেন লেকের বুকে। পাড়ে বাঁশ আর বাংলা কলার ঝোপ, নানা রকমের অরণ্যবৃক্ষ। কোথাও বা থুরং কাঁধে আদিবাসী মেয়েরা চলেছে পাহাড়ি পথ বেয়ে, কেউ কেউ ব্যস্ত রয়েছে জুমের পোড়া মাটি পরিষ্কার ও আগর বাগানের পরিচর্যায়। কেউ বা এরই মধ্যে লেকের জলে ছোট্ট ডিঙি বেয়ে চলেছে মাছ ধরতে নয়তো দূর পাহাড় থেকে কাঠ আনতে। এসব দেখতে দেখতে পেরিয়ে যাচ্ছি পথ, সেতু, ছোট ছোট বাজার, নিরিবিলি নবীন অরণ্য আর মেঘমাখা ক্লান্ত আকাশ। বৃষ্টিভেজা লালমাটির সোঁদা গন্ধ এসে নাকে লাগছে। বাতাসটাও ভেজা, ঠান্ডা। কী চমৎকার এক সকাল, কী অপূর্ব এক রাঙামাটি। এসব দেখতে দেখতেই একসময় চলে এলাম কর্ণফুলীর তীরে।
বাঁকে বাঁকে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি কন্যা কর্ণফুলী। শীতের সেই স্বচ্ছতা নেই জলে, নেই সবুজাভ রূপ। তবু ওর পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল নরওয়ের অসলোর সেই জলপাহাড়ি ফিজোর্ডের কথা। ওদেরটা বড়, আমাদেরটা ছোট। ওদের ফিজোর্ডে পর্যটকদের নিয়ে রাজহাঁসের মতো বড় বড় জাহাজ চলে, আমাদের চলে সাম্পান। অথচ একটু পরিকল্পনা নিলে ওই ছোট্ট জায়গাটাই কত না সৌন্দর্যে ভরে উঠতে পারত। কর্ণফুলী এখন বর্ষার জল পেয়ে ঘোলাটে নেশায় ফেঁপে উঠছে। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কর্ণফুলীর দৃশ্য দেখে এসব কথাই বারবার মনে পড়তে লাগল। কাপ্তাই অরণ্যে শুনেছি বুনো হাতি আছে। সত্যি-মিথ্যে জানি না, তবে বেশ কিছু বানর আর একটা সাপ দেখলাম। প্রবেশপথে অবশ্য হাতির দেখা পেলাম, সেটা সিমেন্টের তৈরি। কাছেই স্বর্গের সিঁড়ি। শুনেছি ওখান থেকে কর্ণফুলীকে আরও চমৎকার দেখায়, দেখা যায় ওপারের চা-বাগানগুলো। একদিন স্বর্গের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে সেই স্বর্গসুখ উপভোগের ইচ্ছে তোলা রইল, আপাতত কাপ্তাই পৌঁছেই ইতি টানলাম মেঘ বাদলের রাঙামাটি দর্শনের।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙামাটি যাওয়ার বাস আছে। এ ছাড়া ট্রেনে করে চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে বাসে রাঙামাটি যেতে পারেন।

মৃত্যুঞ্জয় রায়
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ০৮, ২০১০

Wednesday, November 3, 2010

হারিয়ে যাওয়া রাঙামাটি শহর

পাহাড়, হ্রদ আর জঙ্গলের মেলবন্ধন

পাহাড়, হ্রদ আর জঙ্গলের মেলবন্ধন

পাহাড়, হ্রদ আর জঙ্গলের মেলবন্ধন

বাংলাদেশে পাহাড় ও হ্রদ একসঙ্গে দেখ যাবে—এ রকম জায়গা খুব কম, এর মধ্যে রাঙামাটি একটি। আগে রাঙামটি ঘুরে দেখলেও পাহাড়ি গ্রাম বা আদিবাসীদের জীবনযাত্রার পরিচয় পাইনি। আমরা কয়েকজন বন্ধু লোকালয় থেকে একটু দূরে এমন কোনো জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম, কোথায় যাব ভাবছি। এ সময় রাঙামাটির বিলাইছড়ি থেকে এক বন্ধুর দাওয়াত পেয়ে হাতে যেন চাঁদ পেলাম।
আমরা সাত বন্ধু- দুই জোড়া দম্পতি ও তিনজন ব্যাচেলর বিলাইছড়ি রওনা দিলাম। রাতে সরাসরি কাপ্তাইয়ের বাসে রওনা দিয়ে সকাল আটটার মধ্যে সেখানে পৌঁছে গেলাম। খবর নিয়ে জানা গেল, সাড়ে নয়টায় বিলাইছড়ির ট্রলার যাত্রা শুরু করবে, এরপর প্রতি ঘণ্টায় ট্রলার আছে। আমরা প্রথম ট্রলারেই রওনা দিয়ে ১১টার দিকে পৌঁছে গেলাম বিলাইছড়ি।
এখানে রাস্তা তেমন নেই। এক পাড়া থেকে আরেক পাড়া ঘুরতে গেলেও নৌকা লাগে, তবে এখন কয়েকটি সেতু হয়েছে। আমরা নৌকা নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের গাইড হলো স্থানীয় একজন চাকমা। জানা গেল, বিলাইছড়ি উপজেলার নাম হয়েছে একই নামের ঝরনা থেকে। ছড়ি অর্থ ঝরনা আর বিলাই মানে স্থানীয় ভাষায় বাঘ। অনেক আগে প্রথম লোকবসতি শুরুর সময় এখানে ছড়ি থেকে পানি আনতে গিয়ে এক পাহাড়ি বধূ বাঘের সামনে পড়ে যায়, তখন থেকে ওই ঝরনার নাম হয়ে যায় বিলাইছড়ি এবং সংলগ্ন লোকালয় একই নামে পরিচিত হয়ে যায়। ‘তবে এখন সেই রামও নাই এবং অযোধ্যাও নাই’-এর মতো এখানে কোনো বাঘ নেই। তবে এখনো ওই ঝরনা বা ছড়ি দেখা যায়।
কাপ্তাই হ্রদ ঘেঁষে পাহাড়, নদী, জঙ্গল ও হ্রদ নিয়ে সুন্দর একটি উপজেলা বিলাইছড়ি। অপ্রতুল যোগাযোগব্যবস্থা, তেমন প্রচার না হওয়ায় এই এলাকা এখনো লোকজনের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠেনি। গাড়ির হর্ন, কোলাহল ও নাগরিক জীবনের অপ্রিয় কিন্তু এড়ানো সম্ভব নয়,—এ ধরনের সব জিনিস এখানে এসে ভুলে থাকা যায়। অলস ঘুঘুডাকা দুপুর এখনো পাওয়া যায়। এখানে দেখার মতো প্যাগোডা, কমলা বাগান, পাহাড়, নদী, হ্রদ আছে। তবে এখানকার সহজ-সরল আদিবাসীদের সঙ্গে না ঘুরলে বা কথা না বললে ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যাবে।
বিলাইছড়িতে গেলে বাজার অবশ্যই ঘুরবেন, আদিবাসীদের নানা রকম পাহাড়ি বনজ ও অপ্রচলিত খাবার, যেমন—আদা ফুল, হলুদ ফুল, বাঁশের খোড়ল, শামুকসহ নানা রকম পাহাড়ি ঢেঁকিশাক দেখতে পাবেন। তবে সবজি দেখতে সুন্দর হলেই যে খেতে ভালো হবে, এই ধারণা নিয়ে বাজারে গেলে এবং আগে এ ধরনের খাবার না খেলে কিঞ্চিত অসুুবিধায় পড়তে হতে পারে। আমাদের সহযাত্রী মেয়েরা এই সুন্দর ফুল দেখেই কিনে ফেলল এবং খাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দিল। কিন্তু একবার মুখে দেওয়ার পর মনে হলো, ফুল হাতে এবং চুলেই ভালো, রান্নাঘরে বা খাবার প্লেটে নয়।
বিলাইছড়িতে খাবারের খুব ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই নিজেরা বাজার করে হোটেল থেকে রান্না করিয়ে নেওয়াই ভালো। কাপ্তাই লেকের মাছ না খেলে ভ্রমণের মজা অন্তত বারোআনাই মাটি। আমরা মাছ ধরার চেষ্টাও চালিয়েছি ধার করা বড়শি দিয়ে, কিন্তু ভাগ্য বিরূপ। কাঁকড়াও পেলাম না, শেষ পর্যন্ত বাজারই ভরসা।
বিলাইছড়িতে গেলে প্রথমেই ঘোরা উচিত ভিন্ন উপজাতিদের পাড়াগুলো। প্রতিটি উপজাতির আছে আলাদা ঐতিহ্য, আলাদা কাহিনি। এ ছাড়া কমলা বাগান, কাজুবাদামের বাগান ঘুরে দেখা যায়। তবে কাপ্তাই হূদ ও নদী অবশ্যই সময় নিয়ে দেখা উচিত। এ জন্য নৌকা নিয়ে ভ্রমণ করা যায়।
এ ছাড়া আশপাশের বেশ কিছু লোকালয় আছে, যেগুলো দিনেই ঘুরে আসা যায়। কিছুটা দূরে ফারুয়া বাজার আছে, পুরো দিন হাতে থাকলে সকালে বেরিয়ে বিকেলে চলে আসা যায়। এ ছাড়া আরও কিছু নাম না জানা পাহাড় আছে। বিলাইছড়ির পাহাড় কাপ্তাই বাঁধের অংশ হিসেবে কাজ করে। তাই মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় এক পাশে গভীর গিরিখাদ, অপর পাশে পানিভরা হ্রদ চোখে পড়ে। এটাও দেখা উচিত হ্রদের গভীরতা বোঝার জন্য।
এই মৌসুমে যাওয়ার আগে অবশ্যই রোদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য টুপি নিয়ে যেতে হবে। সাঁতার কাটার ইচ্ছা থাকলে কাপড় নিতে হবে। আর টর্চলাইট নিতে ভুলবেন না। কারণ, বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকতে হবে।

কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন
বিলাইছড়ি যাওয়ার আগে সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে যাওয়া উচিত। বিলাইছড়ি বাজারে কাঠের দোতলা হোটেল আছে, যদিও থাকার জন্য খুব একটা ভালো বলা যাবে না। এ ছাড়া উপজেলা অফিসের একটি বাংলো আছে, যেখানে আগে থেকে অনুমতি নিয়ে গেলে ভালো হয়। হোটেলের ভাড়া খুবই কম।
ঢাকা থেকে বিলাইছড়িতে যেতে হলে সরাসরি বাসে কাপ্তাই গিয়ে, সেখান থেকে ট্রলারে বিলাইছড়ি যাওয়া যায়। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগবে। আবার সরাসরি রাঙামাটি বাসে গিয়ে, সেখান থেকে ট্রলারে দুই-আড়াই ঘণ্টা ভ্রমণ করে বিলাইছড়ি পৌঁছা যায়। ট্রলার ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা প্রতিজনের জন্য। আর পুরো ট্রলার ভাড়া নিতে মোটামুটি ৫০০-৬০০ টাকা লাগবে। ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙামাটি যায় এমন বাস আছে—এস আলম, ডলফিন, শান্তিসহ বেশ কিছু পরিবহন সংস্থার।

আসিফ মাহফুজ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ২৫, ২০১০

Sunday, June 27, 2010

বর্ষায় রাঙ্গামাটি

বর্ষায় রাঙ্গামাটি


কাপ্তাই লেকের বুকে ছোট্ট একটি শহর রাঙ্গামাটি। পার্বত্য চট্টগ্রামের এ জেলার সর্বত্রই রয়েছে নানা বৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। বর্ষায় এ জায়গাটি ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে ধরা দেয় একটু ভিন্ন রূপেই। বর্ষার মেঘলা আকাশ, টাপুর-টুপুর বৃষ্টি, জলে টৌটুম্বুর কাপ্তাই লেকে ভ্রমণ, টুক টুক, পেদা টিং টিং, শুভলং ছাড়িয়ে কাপ্তাই লেক ধরে আরো দূরের কোনো গন্তôব্যে যাত্রা, কিংবা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এড়্গুনি বেড়িয়ে পড়ুন রাঙামাটির পথে।

ঢাকা থেকে বাস ছেড়ে সরাসরি এসে থামে রাঙ্গামাটি শহরে। রাত দশটার বাস ছাড়লে খুব ভোরেই পৌঁছায়। রাঙামাটি শহরে রয়েছে বেশ কয়েকটি হোটেল। এখন সেখানে পর্যটকদের ভিড় তেমন একটা নেই। রাঙামাটি ভ্রমণ শুরম্ন করা যেতে পারে শহরের একপ্রান্তô থেকে। প্রথমেই যেতে পারেন উপজাতীয় জাদুঘরে। যে কোন বেবিটেক্সিওয়ালাকে বললেই আপনাকে নিয়ে যাবে জাদুঘরে। এখানে রয়েছে রাঙামাটিসহ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত নানা আদিবাসিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সময়ের নানা সরঞ্জামাদী, পোশাক, জীবনাচরণ এবং বিভিন্ন ধরণের তথ্য। ছোট অথচ অত্যন্তô সমৃদ্ধ এ জাদুঘরটি খোলা থাকে সোম থেকে শুক্রবার সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪ টা ৩০ মিনিট পর্যন্তô। শনি, রবি ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনগুলোতে জাদুঘর বন্ধ থাকে। জাদুঘরে বড়দের প্রবেশ মূল্য পাঁচ টাকা ও ছোটদের দুই টাকা

উপজাতীয় জাদুঘর থেকে কাছেই রাজ বনবিহার। এ অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর তীর্থ স্থান এটি। এখানে আছে একটি প্রার্থনালয়, একটি প্যাগোডা, বনভান্তেôর (বৌদ্ধ ভিড়্গু) আবাসস্থল ও বনভান্তেôর ভোজনালয়। প্রতি শুক্রবার ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলড়্গে এখানে চলে প্রার্থনা। রাজ বনবিহারে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারেন কাপ্তাই লেকের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য।

রাজবনবিহারের পাশেই কাপ্তাই লেকের ছোট্ট একটি দ্বীপজুড়ে রয়েছে চাকমা রাজার রাজবাড়ি। নৌকায় পার হয়ে খুব সহজেই যাওয়া যায় এই রাজবাড়িতে। আঁকা-বাঁকা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গাছের ছায়ায় ইট বাঁধানো পথের মাথায় এ সুন্দর বাড়িটি। এখানে আরো রয়েছে চাকমা সার্কেলের প্রশাসনিক দপ্তর।

রাঙামাটি শহরের একেবারে শেষ প্রান্তেô রিজার্ভ বাজার ছাড়িয়ে আরো প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে রয়েছে পর্যটন কমপেস্নক্স। এই কমপেস্নক্সের ভেতরেই রয়েছে সবার চেনা সুন্দর ঝুলন্তô সেতুটি। সেতু পেরিয়ে সামনের পাহাড়ে উঠলে কাপ্তাই লেকের বড় অংশ দেখা যায়। এখান থেকে কাপ্তাই লেকে নৌ ভ্রমণও করা যায়। তবে এখানে সাম্পানে চড়ে ঝুলন্তô সেতুর আশপাশে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগবে। ঘণ্টা ১০০ টাকায় এখানে পাওয়া যাবে পাঁচজনের চড়ার উপযোগী সাম্পান।

পরদিনটি রাখুন কাপ্তাই লেক ভ্রমণের জন্য। ১৯৬০ সালে জল বিদুøৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে কর্ণফুলী হ্রদ তথা কাপ্তাই লেকের জন্ম। প্রায় ১৭২২ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ লেকের স্বচ্ছ পানি আর বাঁক বাঁকে পাহাড়ের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে। শহরের রিজার্ভ বাজার ঘাটে পাওয়া যায় কাপ্তাই লেকে ভ্রমণের নানা রকম ইঞ্জিন নৌকা। ঝুলন্তô সেতুর কাছেও এরকম অনেক নৌকা আছে, তবে সেখানে ভাড়াটা একটু বেশিই গুনতে হবে। সারাদিনের জন্য একটি বোট ভাড়া করে সকালে চলে যাওয়া যায় শুভলং বাজার। এখানে আর্মি ক্যাম্পের পাশ থেকে সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে কাপ্তাই লেকের অপার সৌন্দর্য উপভোগ কার যায়, তবে এখানে বানর থেকে সাবধান! এদের বিরক্ত করা যাবে না। আর সেটা করলে ওরা কিন্তু চড়াও হতে পারে। শুভলংয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরতি পথের শুরম্নতেই হাতের ডানে শুভলং ঝরনা। এখন বর্ষাকাল। শুভলংয়ের ঝরণায় তাই অঝোর ধারা। ঝরনার শীতল জলে শরীরটা ভিজিয়ে নিতে পারেন। কাপ্তাই লেকের দুপাশের আকাশছোঁয়া পাহাড়গুলোর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চলতে থাকুন। পথে দুপুরের খাবার সেরে নিতে পারেন টুক টুক ইকো ভিলেজ কিংবা পেদা টিংটিং-এ। শুরম্নতেই পড়বে টুকটুক ইকো ভিলেজ। কাপ্তাই লেকের একেবারে মাঝে এই ইকো ভিলেজটির সুন্দর সুন্দর কটেজে রাত কাটানোরও ব্যবস্থা আছে। এর রেস্তেôাঁরাটিতে পাওয়া যায় বিভিন্ন রকম পাহাড়ি মেনুø। এখান থেকে রাঙ্গামাটি শহরের দিকে আসতে সামান্য কিছু পথ এগুলেই পড়বে পেদা টিংটিং। এখানকার রেস্তেôাঁরাটিতেও থাকে নানা রকম খবারের সঙ্গে পাহাড়ি নানা পদের খাবার। সারাদিন কাপ্তাই লেকের এসব জায়গা ভ্রমণের জন্য একটি ইঞ্জিন বোটের ভাড়া পড়বে ১০০০-২৫০০ টাকা। এছাড়া রাঙামাটি শহর থেকে এখন প্রতিদিন শুভলং ছেড়ে যায় আধুনিক ভ্রমণতরী কেয়ারি কর্ণফুলী। প্রতিদিন সকালে ছেড়ে আবার বিকেলে ফিরে আসে। ফিরতি পথে টুক টুক ইকো ভিলেজ কিংবা পেদা টিংটিংয়ে থাকে বিরতি। যাওয়া-আসার ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা।

প্রয়োজনীয় তথ্যঃ

বাংলাদেশের একমাত্র রিকশামুক্ত শহর রাঙ্গামাটি। তাই এই শহরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয় বেবিটেক্সিতে। এক স্টপেজ থেকে আরেক স্টপেজে পৌরসভা নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া হলো ১০ টাকা। এছাড়া রিজার্ভ নিলে শহরের এক প্রান্তô থেকে অন্য প্রান্তেô ভাড়া ৬০-১০০ টাকা। রাঙামাটি শহর থেকে কিনতে পারেন আদিবাসীদের পোশাক,রাঙামাটির তাঁতের কাপড়, আদিবাসীদের তৈরি নানা রকম হস্তôশিল্প সামগ্রী ইত্যাদি। কাপ্তাই লেকে ভ্রমণের জন্য ইঞ্জিন বোটটি দেখে-শুনে নিন। বর্ষাকাল বলে ছাউনি আছে এমন বোট ভাড়া করম্নন। বোটে লাইফ জ্যাকেট আছে কিনা আগেই জেনে নিন।

ভ্রমণ পরিকল্পনাঃ

প্রথম দিনে শহর ও এর আশপাশের দর্শনীয় জায়গাগুলোতে বেড়ানো যেতে পারে। পরের দিনটি পুরোপুরি রাখুন কাপ্তাই লেক ভ্রমণের জন্য।

জররি প্রয়োজনেঃ

সদর হাসপাতাল ০৩৫১-৬৩০৩০, ফায়ার সার্ভিস ০৩৫১-৬২২২০, সদর থানা ০৩৫১-৬২০৬০, ৬২০২২।

Source: http://amaderitaly.com

Tuesday, April 6, 2010

বৈসাবিতে স্বাগতম

বৈসাবিতে স্বাগতম



আপনি কি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী বন্ধুর আমন্ত্রণ পেয়েছেন? আসবেন না আদিবাসীদের বৈসাবিতে? সময় ও সুযোগ হলে চলে চলে আসুন রাঙামাটি, বান্দরবান অথবা খাগড়াছড়িতে। বাংলা বছরের শেষ দিনটি সবার জন্য সব আদিবাসীর বাড়ির দুয়ার থাকে খোলা। সারা দিন চলে আপ্যায়ন ও খানাপিনা। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে, গ্রাম থেকে গ্রামে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের মানুষ, শোনা যাবে ‘হে হে হু হু হু রেং’ (আনন্দ ধ্বনি)।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবি। তবে উৎসবটির নাম সম্প্রদায়ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হলেও সবার উদ্যাপন রীতি ও সময় এক। সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতির সান্নিধ্যে এসে চৈত্র সংক্রান্তির আদলে আদিবাসীরা এ উৎসবকে নিজস্ব আঙ্গিকে ধারণ করেছে।
চৈত্র মাস শুরু হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ের গাছগাছালিতে বসে একটি পাখি মধুর সুরে ডাকে বি-ঝু, বিঝু, বিঝু। এই পাখির ডাক শুনে আদিবাসীরা উৎসবের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। অবশ্য এ উৎসবকে চাকমারা বিঝু নামে ডাকলেও বিভিন্ন সম্প্রদায় বিভিন্ন নামে অভিহিত করে থাকে। তবে সব সম্প্রদায়ের উৎসব উদ্যাপনের রীতি প্রায় একই। বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিনে চলে উৎসব।

বৈচিত্র্যময় তিন দিন
আদিবাসীদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উৎসবের যেমন ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে, তেমনি উৎসবের তিনটি দিনের নামও আলাদা। ত্রিপুরারা উৎসবের প্রথম দিনকে হারি বৈসুক, দ্বিতীয় দিনকে বিসুমা ও তৃতীয় দিনকে বিসিকাতাল, একইভাবে মারমারা সাংগ্রাই আকনিয়াহ্, সাংগ্রাই আক্রাইনিহ্ ও লাছাইংতার এবং চাকমারা ফুলবিঝু, মূলবিঝু ও গোজ্যেপোজ্যে দিন বলে। উৎসব উদ্যাপনের সময় একই হলেও বান্দরবানের মারমা সম্প্রদায় বর্মী পঞ্জিকা অনুসারে দুই দিন পর উৎসব শুরু করে। অবশ্য রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মারমারা চাকমা এবং ত্রিপুরাদের সঙ্গেই উৎসব উদ্যাপন করে।
উৎসবের প্রথম দিন ঘরবাড়ি ও আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা ও ফুল দিয়ে সাজানো হয়। এ দিন পাহাড়ি ছড়া, ঝরনা বা নদীতে ফুল ভাসিয়ে দিয়ে ‘মা গঙ্গা’কে পূজা করে গোসল করা হয়। এ ছাড়াও পাড়ার যুবক-যুবতীরা নদী থেকে পানি তুলে প্রবীণদের গোসল করিয়ে আশীর্বাদ নেন। অনেক এলাকায় দল বেঁধে বৌদ্ধ মূর্তিগুলোকেও গোসল করানো হয়। এর পর সারা দিন প্রস্তুতি চলে পরবর্তী দিন বা উৎসবের মূল দিনের খানাপিনা আয়োজনের।
উৎসবের দ্বিতীয় দিনে প্রত্যেক বাড়িতে নানা মুখরোচক খাবারের আয়োজন করা হয়। তবে ২০ থেকে ২৫ বা তারও বেশি আনাজপাতি দিয়ে তৈরি ‘পাজন’ এবং পানীয় পরিবেশন করা হয়। নানা বয়সী লোকজন সারা দিন দল বেঁধে ‘হে হু হু হু’ রেং (আনন্দ ধ্বনি) দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। চাকমাদের একটা কথা প্রচলন আছে, যে ব্যক্তি কমপক্ষে ১০টি বাড়িতে বিঝু খাবে না সে পরবর্তী জনমে শূকর হয়ে জন্মাবে।
তৃতীয় দিনে দল বেধেঁ মন্দিরে গিয়ে নতুন বছরের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালন করা হয়। এ দিন অনেকে পাড়ার বয়স্ক মুরব্বিদের বাড়িতে ডেকে ভালো কিছু খাবার দেন। আর অনেকে উৎসবের তিন দিন মন্দির, বাড়ির আঙিনা, নদীর ঘাট, সবুজ গাছের নিচে এবং গোয়াল ঘরে বিভিন্ন দেব-দেবীর উদ্দেশে মোমবাতি জ্বালান।
তবে উৎসবে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের কিছু বিশেষ আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান থাকে। এর মধ্যে চাকমাদের ‘বিঝু নৃত্য’, ত্রিপুরাদের ‘গরাইয়া নৃত্য’ ও মারমাদের ‘পানি খেলা’ রয়েছে। তবে একমাত্র মারমাদের পানি খেলা ছাড়া অন্যান্য সম্প্রদায় আর তেমনভাবে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করে না। অনেক সময় কিছু এলাকায় বিশেষভাবে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে
পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার এবং পটুয়াখালীর রাখাইন সম্প্রদায়ও বর্ষবিদায় এবং বরণ উৎসব পালন করে থাকে। তারা এ উৎসবকে ‘মাহা সাংগ্রেং’ বলে অভিহিত করে। এ ছাড়াও ভারতের আসাম, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওসসহ বেশ কয়েকটি দেশে একই সময় অর্থাৎ ইংরেজি মাস এপ্রিলের ১৩-১৪ তারিখে উৎসবটি পালন করা হয় বলে বিভিন্ন গবেষকের লেখায় জানা যায়। এ উৎসব আসামে ‘বিহু’, মিয়ানমারে ‘ছিংগায়ান’ এবং থাইল্যান্ডে ‘সংক্রান’ নামে পরিচিত। কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য বাদ দিলে উৎসবটি সব দেশে পালনের রীতি একই বলে জানা যায়।
বৈসাবিকে উপলক্ষ করে এ সময়টা পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরে আসতে পারেন। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে কটা দিন ভালোই লাগবে।

হরি কিশোর চাকমা
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, এপ্রিল ০৬, ২০১০

Sunday, January 3, 2010

ছবিব্লগ: রাঙামাটি

ছবিব্লগ: রাঙামাটি

২১ শে মে, ২০০৯ দুপুর ১:২২

কিছুদিন আগে রাঙামাটি ঘুরে আসলাম। কিছু ছবি দিলাম এইখানে। পাহাড়ের চেয়ে পানির ছবি দিলাম বেশী। :)


সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০০৯ দুপুর ২:১৪

Tuesday, November 17, 2009

জার্নি টু 'সাজেক' - পাহাড়ের এক রানী ।

জার্নি টু 'সাজেক' - পাহাড়ের এক রানী ।


কিছুদিন পুর্বে সাজেক গিয়েছিলাম কোনো একটা কাজে। অসম্ভম রকমের চোখ ধাঁধানো সুন্দর জায়গা বলে কিছু ছবি তুলে এনেছিলাম। পাঠকদের জন্য দিলাম, আশা করি ভাল লাগবে।
সাজেকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
রাঙামাটির জেলার বাঘাইছরি উপজেলার একটি ইউনিয়ন সাজেক। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন সাজেক আয়তনে বিশাল, বাংলাদেশের অনেক উপজেলার চেয়েও আয়তনে বড়। এটির অবস্হান খাগড়াছড়ি জেলা থেকে উত্তর-পুর্ব দিকে। মুল সাজেক বলতে যে স্হানকে বুঝায় সেটি হলো 'রুইলুই' এবং 'কংলাক' নামের দুটি বসতি, স্হানীয় ভাষায় 'পাড়া'। সমতল ভুমি থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্হিত 'রুইলুই' এবং 'কংলাক' বসতি, (এই উচ্চতা আমার নিজের মাপা জিপিএস দিয়ে)। রুইলুই-এর উচ্চতা কিছুটা কম, প্রায় ১৭৮০ ফুট; সবচেয়ে উচু হলো কংলাক পাড়া, প্রায় ১৮০০ ফুট।
রুইলুই এবং কংলাক থেকে ভারতের মিজোরাম রাজ্য বেশ কাছাকাছি, হাটার দুরত্ব প্রায় দুই ঘন্টার। এজন্য সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রায়, পোষাক-পরিচ্ছদে আধুনিকতার ছাপ পড়েছে। মেয়েরা প্রায় সবাই পশ্চিমা স্টাইলে জিন্স প্যান্ট, গেন্জি বা টি-শার্ট পরিধান করে থাকে। তাদের প্রায় সবারই ছেলেমেয়েকে বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না দিয়ে মিজোরামের উন্নত এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজে পড়ালেখার জন্য পাঠায়। একারনে তাদের অনেকেই ইংরেজিতে কথা বলতে অভ্যস্ত। পাহাড়ী জীবনযাত্রায় তারাই সবচেয়ে উন্নত।


পাঠকদের জন্য কিছু ছবি :
১) সর্বশেষ কংলাকে উঠতে পাথরের সিড়ি


২) কংলাকের পাহাড়ের চুড়াটি পাথরের

৩) নিচে একটি পাড়া এবং দুরে ভারতীয় সীমানায় উচু পাহাড়ের সারি
৪) দিগন্তে পাহাড়ের সারি

৫) বিস্তীর্ন পাহাড়ের উপর মেঘের ছায়া

৬) পাহাড়ি বাঁশের জঙ্গল

৭) মেঘের সাগর

৮) মেঘের সাগরে পাহাড় মাথা উচু করে দাড়িয়ে

৯) পাহাড় ডুবে আছে মেঘের সাগরে

১০) উচুতে একা দাড়িয়ে সে, তাকে আমার ভাল লেগেছে

১১) এই স্হানটুকুই সম্ভবত সাজেকের সর্বোচ্চ স্হান

১২) কংলাকে যাওয়ার পথে এই উচু বটগাছটি দেখা গেল

১৩) সাজেকের অধিবাসীদের ঘরগুলো এমনই সুদৃশ্য

৪) ওখানে অনেক কফি গাছ হয়, কফি গাছের ফল

১৫) এগুলো হলো কফি গাছ

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:২১

By- জেড ইসলাম
skzihad@hotmail.com