Search This Blog

FCO Travel Advice

Bangladesh Travel Advice

AFRICA Travel Widget

Asia Travel Widget

Monday, October 4, 2010

শ র ত্ তা রু ণ্য

শ র ত্ তা রু ণ্য

সোহরাব শান্ত
শুভ্রতার প্রতীক শরত্। বর্ষার বিদায়ের পর চারদিকে শুভ্রতার আবেশ ছড়িয়ে আসে। বর্ষার পানি যেই কমতে শুরু করে অমনি শুরু হয় সবুজের সমারোহ। নদীর পাড়, বিস্তীর্ণ বিল-ঝিল এবং চরের মাটিতে জন্ম নেয়া কাশের মাথায় লাগে সাদার দোলা। অপরূপ কাশফুলের সৌন্দর্য মুগ্ধ করে চলে পালতোলা নৌকার মাঝিকে যাত্রী কিংবা পথচারীরাও কম যান না। শরতের এমন শুভ্র সৌন্দর্য এড়াতে পারে কে আছে এমন বাঙালি। ঝিরি ঝিরি বাতাসে যখন কাশবন দুলতে থাকে, তখন দুলতে থাকে মানুষের মনও। অপার মুগ্ধতা নিয়ে কাশফুলের সৌন্দর্য অবলোকন করা দর্শকের মনে খেলে যায় অসম্ভব এক ভালোলাগা। শিশু থেকে তরুণ, তরুণ থেকে বৃদ্ধ, মুগ্ধ হয় সবাই। বয়সভেদে মুগ্ধতার মাত্রাটাও হয় ভিন্ন। শিশু-কিশোরদের মাঝে কাশফুলের সৌন্দর্যকে নিজের করে নেয়ার এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাই তো তারা দল বেঁধে কাশফুল ছেঁড়ায় মেতে ওঠে। বিশেষ করে গ্রামীণ শিশুদের আনন্দ যেন আর ধরেই না।
তরুণদের কাছে শরত্ আসে অন্যভাবে। শরতের স্বাভাবিক প্রকৃতি তরুণ মনকে ভাবুক করে তোলে। সঙ্গে যদি থাকে ভালোবাসার মানুষটি তাহলে তো কথাই নেই। শরতের প্রকৃতি তরুণ মনে ভালোবাসার রং পাল্টাতে বিরাট ভূমিকা রাখে। শহুরে জীবনাচারে শরতের প্রকাশটা একটু ভিন্নই বলতে হবে। প্রগতিশীল তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সাদা-শুভ্র পোশাক-আশাক পরার প্রবণতা বিগত কয়েক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে। শরেক কেন্দ্র করে তারা বিভিন্ন নকশার পোশাক তৈরি করছে। এ সময় দেশি সুতি কাপড় বেশ আরামদায়কও বটে। তরুণদের সাদার ওপর কাজ করা পাঞ্জাবিতে মানায় ভালো। তরুণীদের বেলায় শাড়ির কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। শারদীয় পোশাক যাকে বলে আর কি! প্রকৃতির মাঝেই যেন হারিয়ে যাওয়া। শুধু পোশাকই নয়, ফ্যাশন হাউসগুলো বর্তমানে দেশীয় অলঙ্কারকেই বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। পোশাকের সঙ্গে মানানসই অলঙ্কারগুলোও শরতের সাজে আনে ভিন্নমাত্রা। শরতের আরেক আকর্ষণ শিউলি ফুল। শিউলির আকর্ষণ এড়ানো সত্যিই কঠিন! শিল্পীর কণ্ঠে যেভাবে ধ্বনিত হয়—‘ওগো বিদেশিনী তোমার চেরি ফুল দাও/আমার শিউলি নাও।’ শিউলি কুড়ানোর অভিজ্ঞতা যাদের হয়নি, তারা সেই মজাটি বোঝার কথা নয়। তারপরও এক কথায় বলা যায়, শরতের প্রকৃতিতে কাশফুল আর শিউলি স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
উজ্জ্বল সাদা কাশফুলের মতোই শুভ্রতায় আচ্ছাদিত দেখা যায় শরতের আকাশ। স্থানে স্থানে দেখা মেলে সাদা মেঘের। ঝিরিঝিরি বাতাস বইতে শুরু করে কখনও কখনও। রোদে-বৃষ্টিতে লুকোচুরির পর্বটা শরতেই বেশি লক্ষ্য করা যায়। শরতের দিনে এই দেখা যায় কাঠফাটা রোদ হঠাত্ই কোত্থেকে যেন ঝমঝমিয়ে নেমে যাবে বৃষ্টি। পৃথিবীকে নিমিষেই ঠাণ্ডা করে দিয়ে অল্পক্ষণেই হারিয়ে যায় বৃষ্টি। এখানেই শরতের সৌন্দর্য। অপ্রস্তুত মুহূর্তে হয়তো এক ঝলক রোদের দেখা দিয়ে মুহূর্তেই বৃষ্টি বিষয়টা খুবই মজার। উদার মনের তরুণ-তরুণীদের জন্য তো ব্যাপারটা আরও বেশি উপভোগ্য। বৃষ্টিতে ভেজার মজাটাই আলাদা, তাই না! আর তা যদি হয় হঠাত্ বৃষ্টি জয়তু শরত্।
এই শরতে : শরতের প্রকৃতির পরিচয় তো পাওয়া গেল। শরত্ কীভাবে উপভোগ্য করা যায় আমাদের জীবনে? খুব সহজ! কারণ এই শরতেই যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় উত্সব দুর্গাপূজা। যাকে সুন্দর করে বলা হয়—শারদীয় দুর্গাপূজা!
বেড়াতে চাইলে : বেড়ানোর জন্য মোটামুটি ভালো সময় শরত্। কারণ না গরম, না ঠাণ্ডা এমন একটা পরিস্থিতি বিরাজ করছে এখন। কিছুদিন পরই শুরু হয়ে যাবে শীত। যারা শীতের আগেই বেড়াতে চান, ব্যাগ-ল্যাগেজ গুছিয়ে ফেলতে পারেন। দিনের শুভ্রতা আর রাতের জ্যোত্স্না দেখার এই তো সুযোগ। যারা নৌকা কিংবা নদী ভ্রমণ করতে চান তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না। তবে নদী ভ্রমণে একটু সাবধানী হতে হবে। বর্ষার পানি অনেক ময়লা-আবর্জনা নিয়ে নেমে যাচ্ছে। তাই ভ্রমণের সময় পানি খাওয়া ও ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। ভ্রমণ বা সাধারণ ঘোরাফেরা যাই হোক না কেন, এ সময়ের সাজগোজ হালকা হলেই ভালো হবে। যেহেতু রোদ-বৃষ্টির খেলা চলে এই সময়, তাই সঙ্গে একটা ছাতা রাখতে ভুলবেন না যেন।
শরতের বিকেল, শরতের মেঘ, শরতের জ্যোত্স্না, কাশফুল— সবই ভালো করে দেবে আপনার মন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কি আর এমনি এমনিই লিখেছিলেন—

‘শরত্, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি
ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙুলি\
শরত্, তোমার শিশির-ধোয়া কুণ্ডলে
বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে
আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি\’

এই শরতের সকাল, শরতের দুপুর, শরতের বিকেল রাত, শরতের রাত, ভালো লাগবে সবই। শরতের ভালোলাগা, মুগ্ধতা ছড়াক সবার চোখে।

লাউয়াছড়া : ঘুমন্ত পাহাড়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য

লাউয়াছড়া : ঘুমন্ত পাহাড়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য

ফখরুল আলম
লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক প্রকৃতিপ্রেমীদের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অনন্য স্থান। বন-পাহাড় আর জীবজন্তুর অভয়ারণ্য। পাহাড়ি এই জনপদে রয়েছে খাসিয়াসহ বিভিন্ন উপজাতীয়দের বসবাস। কাছ থেকে দেখলে মনে হবে ঘুমন্ত সবুজ পাহাড়ের অতন্দ্র প্রহরী হলো এসব আদিবাসী। পাহাড়ের পাদদেশে এই জনগোষ্ঠীর যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির পরিচর্যা করে লাখো বৃক্ষ লালন-পালন করছে। এর ফলে এসব পাহাড়ে দিন দিন নতুন বৃক্ষ সতেজভাবে বেড়ে উঠছে। পাহাড়ি গাছে লতিয়ে বেড়ে ওঠা পানচাষ করে খাসিয়াদের জীবন চলে। ঐতিহ্যগতভাবে বন, পাহাড়, সবুজ গাছগাছালি ও প্রকৃতির সঙ্গে খাসিয়াদের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতির আপনজন হিসেবে অতি কাছে বসবাসকারী খাসিয়ারা তাদের মতোই সভ্যতার অনাদরে প্রকৃতির আপন খেয়ালে বেড়ে ওঠা বৃক্ষরাজিকে সন্তানতুল্য মনে করেন। পাহাড়ি শীতল ছায়ায় বেড়ে ওঠা এসব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মননশীলতাও অত্যন্ত কোমল।
লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে এশিয়া মহাদেশের বিরল প্রজাতির একটি গাছ আছে, যার নাম ক্লোরোফর্ম বৃক্ষ। এটি ভূমণ্ডলের একমাত্র আফ্রিকার বন ছাড়া আর কোথাও দেখা যায়নি। এককথায় বলা যায়, দুর্লভ নেশার গাছ। যার পাতার গন্ধে মানুষ নিজের অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ে গাছতলায়। অনেকেই এই গাছকে ঘুমপাড়ানি গাছ বলে ডেকে থাকেন। এই গাছটি লাউয়াছড়া ফরেস্ট রেস্ট হাউসের পার্শ্বে রয়েছে। বর্তমানে গাছটির বয়স দেড়শ’ বছর। বয়সের ভারে পাতাগুলোতেও তেমন সতেজতা নেই। তাই তেজও অনেক কমে গেছে। লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কের অন্যতম আকর্ষণ ক্লোরোফর্ম এই বৃক্ষটি। মূলত যদিও তার তেজষক্ষমতা কমে আসছে; কিন্তু এখনও এই বৃক্ষটির নিচে দাঁড়ালে গরমের সময় অনেক ঠাণ্ডা অনুভব করা যায়।
লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে নিসর্গ নামের একটি প্রকল্প আছে। তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ গাইড রয়েছে। এই প্রকল্পে একটি তথ্যকেন্দ্রও রয়েছে। এখানে লাউয়াছড়া বনের সব তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া উপহারসামগ্রী স্যুভেনির ইত্যাদি পাওয়া যায়।
‘ইকো রেস্তোরাঁ’ আছে। ইচ্ছে করলে রেস্তোরাঁয় খাবারও খাওয়া যাবে।
একসময় শীত মৌসুমে পর্যটকদের আসা-যাওয়া থাকত সিলেটে বেশি। বর্তমানে বছরের সবসময়ই দেশি- বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। বিশেষ করে চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। এসব ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের আগমন ঘটে শ্রীমঙ্গলের পাখি ও মত্স্য অভয়ারণ্য বাইবকা বিল, রেইন ফরেস্ট, লাউয়াছড়া ছাড়াও দিগন্তরেখা বিস্তৃত চা বাগানের অপূর্ব সৌন্দর্য পর্যটকদের অসম্ভব কাছে টানে। তবে পাশাপাশি দেখতে পারবেন ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠা সীতেজ বাবুর মিনি চিড়িয়াখানা। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। রমেশ বাবুর জাদুকরী ৭ কালারের চা। নীলকণ্ঠ কেবিনের ৭ রংয়ের চা আপনাকে তৃপ্তি দেবে।
লাউয়াছড়া বনাঞ্চলে রয়েছে ১৬৭ প্রজাতির বৃক্ষ ও আকর্ষণীয় বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড। বিশ্বের ৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে যে বিরল প্রজাতির উল্লুক রয়েছে তার দেখাও পাওয়া যায় এই বনে। ২৪৬ প্রজাতির বাহারি রং-বেরংয়ের পাখি। ৪ জাতের উভচর প্রাণী। ৬ প্রজাতির সরীসৃপ। ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ ১৭ প্রজাতির কীটপতঙ্গ রয়েছে লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে। ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জায়গা নিয়ে এ উদ্যান রয়েছে জীববৈচিত্র্য। তবে উল্লুক, চশমাবানর, মুখপোড়া হনুমান, লজ্জাবতী এসব হলো বনের আকর্ষণীয় প্রাণী। লাউয়াছড়া বনে হেঁটে হেঁটে আপনি ও আপনার প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। বিশাল এই বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর বিভিন্ন ব্যবস্থাও রয়েছে। আধঘণ্টা এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার তিনটি ওয়াকিং ট্রেইল। এছাড়াও রয়েছে হাতির পিঠে চড়ে সবুজ বনাঞ্চল ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা। তাছাড়াও সুসজ্জিত বেশকিছু ‘ইকো রিকশা’ রয়েছে। তবে এগুলোয় চড়লে অবশ্যই টাকা দিতে হয়।
আরও কয়েক কিলোমিটার দূরে গেলে দেখা যায়, চা বাগানের ভেতরে বিশাল একটি লেক। লেকটির নাম মাধবপুর লেক। মাধবপুর লেকের সন্নিকটে উপজাতীয় কালচার একাডেমি রয়েছে। বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্র্রদায়ের আচার-অনুষ্ঠান আর সাংস্কৃতিক জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কমলগঞ্জ উপজাতীয় সাংস্কৃতিক একাডেমির চার দেয়াল। এখানকার উপজাতীয় সম্প্রদায়কে নিয়ে তাদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে সময় কাটান এবং সুখ আহরণ করতে পারবেন আপন মনে। সবুজ প্রকৃতি আর পাহাড়ের মাঝে বয়ে চলা আঁকাবাঁকা রেলপথও আপনাকে মুগ্ধ করে দেবে।
প্রকৃতির লীলায়িত নন্দন কানন, নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বর্ণময়, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী এবং তাদের সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতি নিয়ে গঠিত শ্রীমঙ্গল।
পাহাড়ে দাঁড়িয়ে দূরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠতে হবে আপনাকে। ‘যতদূর চোখ যায় ওই দূর নীলিমায় চোখ দুটি ভরে যায় সবুজের বন্যায়’। শিল্পীর গাওয়া এ গানের বাস্তবতা খুঁজে পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে।

যাতায়াত : লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে যেতে হলে শ্রীমঙ্গল শহরে প্রথম যেতে হবে। শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশেই পড়বে পার্কটি। ঢাকা থেকে ট্রেন বা সড়কপথে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। ভাড়া পড়বে ২০০-২৫০ টাকা। শ্রীমঙ্গল শহরে ভালো হোটেল রয়েছে। থাকা-খাওয়াসহ সবকিছু সহজলভ্য। শ্রীমঙ্গলের অপরূপ সৌন্দর্য আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

লাউয়াছড়ার বনে বনে
লেখা : মুস্তাফিজ মামুন

শ্রীমঙ্গল শহরের কাছেই জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশের অন্যতম একটি জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়া। দুই-একদিনের সময় হাতে নিয়ে সহজেই বেড়িয়ে আসা যায় জাতীয় এ উদ্যান থেকে। কড়চার এবারের বেড়ানো শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে।

লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল

শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশেই রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। প্রায় ১,২৫০ হেক্টর জায়গা নিয়ে এ উদ্যানে রয়েছে_১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, চার প্রজাতির উভচর, ছয় প্রজাতির সরীসৃপ, বিশ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ২৪৬ প্রজাতির পাখি। প্রধান সড়ক ফেলে কিছুদূর চলার পরে ঢাকা-সিলেট রেল লাইন। এর পরেই মূলত জঙ্গলের শুরু। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অন্যতম আকর্ষণ হলো উলস্নুক, চশমা বানর, মুখপোড়া হনুমান, লজ্জাবতী বানর ইত্যাদি। উদ্যানে বেড়ানোর তিনটি ট্রেকিং পথ আছে। একটি তিন ঘণ্টার, একটি এক ঘণ্টার এবং অন্যটি আধ ঘণ্টার পথ। উদ্যানের ভেতরে একটি খাসিয়া পলস্নীও আছে।

আধ ঘণ্টার ট্রেকিং

এ পথটির শুরু রেললাইন পেরিয়ে হাতের বাঁ দিক থেকে। এ পথের শুরুতে উঁচু উঁচু গাছগুলোতে দেখা মিলতে পারে কুলু বানরের। নানা রকম গাছ-গাছালির ভেতর দিয়ে তৈরি করা এ হাঁটা পথটিতে চলতে চলতে জঙ্গলের নির্জনতায় শিহরিত হবেন যে কেউ। এ ছাড়া এ পথের বড় বড় গাছের ডালে দেখা মিলবে বুনো অর্কিড। যদিও এ সময়টা অর্কিডে ফুল ফোটার সময় নয়। নির্দেশিত পথে হাতের বাঁয়ে বাঁয়ে চলতে চলতে এই ট্রেইলটির শেষ হবে ঠিক শুরুর স্থানেই।

এক ঘণ্টার ট্রেকিং

এক ঘণ্টার ট্রেকিংয়ের শুরুতেই দেখবেন বিশাল গন্ধরুই গাছ। এ গাছের আরেক নাম কস্তুরী। এগাছ থেকে নাকি সুগন্ধি তৈরি হয়। এ ছাড়া এ পথে দেখবেন ঝাওয়া, জগডুমুর, মুলী বাঁশ, কাঠালি চাঁপা, লেহা প্রভৃতি গাছ। আরো আছে প্রায় শতবষর্ী চাপলিশ আর গামারি গাছ। এ ছাড়া এ পথে নানারকম ডুমুর গাছের ফল খেতে আসে উলস্নুক, বানর, হনুমান ছাড়াও এ বনের বাসিন্দা আরো অনেক বন্যপ্রাণী। ভাগ্য সহায় হলে সামনেও পড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া এ পথে দেখা মিলতে পারে মায়া হরিণ আর বন মোরগের।

রোমাঞ্চকর ট্রেকিং

তিন ঘণ্টার হাঁটা পথটিও বেশ রোমাঞ্চকর। এ পথের বাঁয়ে খাসিয়াদের বসত মাগুরছড়া পুঞ্জি। এ পুঞ্জির বাসিন্দারা মূলত পান চাষ করে থাকেন। ১৯৫০ সালের দিকে বনবিভাগ এ পুঞ্জি তৈরি করে। এ পথে দেখা মিলবে বিশাল বাঁশবাগান। এ বাগানে আছে কুলু বানর আর বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর। লজ্জাবতী বানর নিশাচর প্রাণী। এরা দিনের বেলায় বাঁশের ঝারে ঘুমিয়ে কাটায়। এ ছাড়া এ পথে দেখা মিলবে নানান প্রজাতির পাখির, আর পথের শেষের দিকে দেখা মিলতে পারে এ বনের অন্যতম আকর্ষণ উলস্নুক পরিবারের। এরা বনের সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোতে দলবদ্ধভাবে বাস করে।

কিছু তথ্য

জঙ্গল ভ্রমণে কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত। বেশি উজ্জ্বল রঙের পোশাক না পরে অনুজ্জল পোশাক পরতে হবে। ইনসেক্ট রিপল্যান্ট ব্যবহার করা উচিত। বনে হৈচৈ করলে বন্যপ্রাণীদের দেখা যাবে না। তাই সর্বোচ্চ নিরবতা পালন করতে হবে। বনের মধ্যে কোনোরকম ময়লা-অবর্জনা ফেলা যাবে না। ট্রেকিংয়ের সময় সঙ্গে পর্যাপ্ত খাবার পানি নিন। আইপ্যাকের প্রশিক্ষিত গাইড সঙ্গে নিয়ে ট্রেকিংয়ে যাওয়া উচিত। নয়তো পথ হারানোর ভয় আছে।

খরচপাতি

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ মূল্য প্রাপ্তবয়স্ক ২০ টাকা, ছাত্র ও অপ্রাপ্তবয়স্ক ১০ টাকা, বিদেশি নাগরিকদের জন্য ৫ মার্কিন ডলার কিংবা সমমূল্যের টাকা। এ ছাড়া কার, জিপ ও মাইক্রোবাস পার্কিং ২৫ টাকা, সিনেমা ও নাটকের শুটিং প্রতিদিন ৬,০০০ টাকা, পিকনিক স্পট ব্যবহার জনপ্রতি ১০ টাকা।

শ্রীমঙ্গল কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়ক ও বেলপথে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ (০১৭১১৯২২৪১৭), শ্যামলী পরিবহন (০১৭১১৯৯৬৯৬৫), সিলেট এক্সপ্রেস (০১৭১৩৮০৭০৬৯), টি আর ট্রাভেলস (০১৭১২৫১৬৩৭৮) ইত্যাদি বাস শ্রীমঙ্গল যায়। ভাড়া ২৫০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকার কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬.৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, দুপুর ২.০০ মিনিটে প্রতিদিন ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ১০.০০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ভাড়া এসি বার্থ ৫২৬ টাকা, এসি সিট ৩৪৫ টাকা, প্রথম শ্রেণী বার্থ ৩০০ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ২০০ টাকা, সি্নগ্ধা শ্রেণী ৩৪৫ টাকা, শোভন চেয়ার ১৩৫ টাকা, শোভন ১১০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮.১৫ মিনিটে যায় পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এবং শনিবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯.০০ মিনিটে উদয়ন এক্সপ্রেস। ভাড়া প্রথম শ্রেণী বার্থ ৩৭০ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ২৫০ টাকা, সি্নগ্ধা শ্রেণী ৪২০ টাকা, শোভন চেয়ার ১৬৫ টাকা, শোভন ১৫০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

শ্রীমঙ্গলে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো মানের জায়গা ভানুগাছ রোডে টি রিজর্ট (০৮৬২৬-৭১২০৭, ০১৭১২৯১৬০০১)। শ্রীমঙ্গলের হবিগঞ্জ সড়কে আরেকটি ভালো আবাসন ব্যবস্থা হলো রেইন ফরেস্ট রিসোর্ট (০২-৯৫৫৩৫৭০, ০১৯৩৮৩০৫৭০৭)। এ ছাড়া শ্রীমঙ্গলের অন্যান্য হোটেল হলো হবিগঞ্জ সড়কে টি টাউন রেস্ট হাউস (০৮৬২৬-৭১০৬৫), কলেজ রোডে হোটেল পস্নাজা (০৮৬২৬-৭১৫২৫) ইত্যাদি। এসব হোটেল- রিসোর্টে ৫০০-৩ হাজার টাকায় কক্ষ পাওয়া যাবে।

Source: Daily Ittefaq, 22th Feb-2011

লাউয়াছড়ায় গত বছর (২০১০) পর্যটক এসেছেন লাখের বেশি : রাজস্ব আয় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি, ৮ জানুয়ারি ২০১১
দেশে ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্টখ্যাত মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে গত বছর (২০১০) রেকর্ডসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক এসেছেন। ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ বছরে এ পার্কে পর্যটক এসেছেন ১ লাখ ৭৮৬ জন। এ থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৮০ টাকা। এ সময়কালে এ পার্কে আগত প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার ১৪৯ এবং ছাত্র ও অপ্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার ৯০২ জন। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৯২, বনভোজনে এসেছেন ৩ হাজার ৫৪৩ জন। আগত যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৭৮টি এবং লাউয়াছড়ায় শুটিং হয়েছে ৪টি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত মৌলভীবাজার বণ্যপ্রাণী রেঞ্জ কার্যালয়ের রেঞ্জ কর্মকর্তা গাজী মোস্তফা কামাল জানান, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তিনি জানান, ২০০৮ সালে লাউয়াছড়ায় আগত পর্যটক-দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৫ হাজার জন। ২০০৯ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪ হাজার জনে দাঁড়ায়।
আইপ্যাক সূত্র জানায়, গত ৫/৬ বছর ধরে এখানে পর্যটকের সংখ্যা প্রতিবছর ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। পারিবারিক পর্যায় থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সফরের উদ্দেশ্যে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাউয়াছড়ায় ছুটে আসছে দর্শনার্থীরা। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চিরসবুজ এ পাহাড়ি বনাঞ্চল যেমনি জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর তেমনি বনজসম্পদের অমূল্য ভাণ্ডার। সেই সঙ্গে কনকনে শীত আর অঝোর ধারায় বৃষ্টি এখানকার প্রকৃতিকে করেছে স্বতন্ত্র ও মধুময় যা মানুষ আস্বাদন করতে চায়। তাই এ পার্কে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ১২৫০ হেক্টর আয়তনের এ পার্কটি এখন পৃথিবীর মানচিত্রে এক গৌরবময় স্থান দখল করে নিয়েছে।
Source: Daily Amardesh, 8th January-2011

Wednesday, September 15, 2010

খাগড়াছড়ির অরণ্যে

খাগড়াছড়ির অরণ্যে

হেমন্তের সকালে ঘুম ভাঙা চোখে বাইরে তাকাতেই পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা সাদা কুয়াশায় চোখ আটকে গেল। আফসোস! আরেকটু আগে কেন ঘুম ভাঙল না। গাড়িতে থাকা সবাই তখন বড় বড় চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে। পাহাড়ি রাস্তায় প্রতি বাঁকে পাহাড়ের গায়ে সাদা কুয়াশা মেঘের মতো লেগে আছে। যেন প্রতিটি পাহাড় কুয়াশার সাদা চাদর দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে। দিনের আলো তখনো ফোটেনি। আধো আলো আধো অন্ধকারের মধ্য দিয়ে গাড়ি ছুটে চলছে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে দুই চোখে যা দেখছি, তা-ই ভালো লাগছে।
এই ভালো লাগার জন্যই খাগড়াছড়িতে আসা। কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলাম আমাদের গন্তব্য খাগড়াছড়ির আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে।
ভ্রমণের টিভি অনুষ্ঠান ‘বাংলালিংক বাংলার পথে’, ইনসাইটা ট্যুরিজম ও নর্থ আলপাইন ক্লাব, বাংলাদেশ এই ভ্রমণের আয়োজন করেছিল। আগের রাতে যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকা থেকে। বাংলার পথের উপস্থাপক টিংকু বলেন, অনুষ্ঠান করার জন্য বাংলাদেশের অনেক স্থানে যেতে হয়। বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে ইচ্ছা থাকলেও কাউকে সফরসঙ্গী করা যায় না। তাই পার্বত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ি আমাদের এই ভ্রমণের আয়োজন।
২৩ অক্টোবর সকাল হওয়ার আগেই পৌঁছে যাই পার্বত্য অঞ্চলে।

আলুটিলা
খাগড়াছড়ি জেলার পুরোটাই পাহাড়ি এলাকা।এর মধ্যে মাটিরাঙ্গার আলুটিলা পাহাড়ের সৌন্দর্য হূদয় ছুঁয়ে যায়। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে ঢোকার প্রধান ফটকের দুই পাশে শতবর্ষী দুটি বটবৃক্ষ স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের বুকে বটগাছ দুটির সৌন্দর্য ভালো লাগে। ফটক দিয়ে ঢোকার পর ডান পাশের রাস্তা দিয়ে মিনিট খানেক হাঁটলেই চোখে পড়বে একটি পাহাড়ি সরু পথ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেছে সেই পথটি। সরু পথটি দিয়ে নেমে পড়ি নিচের দিকে। নেমেই চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা। ছোট একটি পাহাড়ি ঝরনা। ঝরনা দিয়ে পানি নামছে। পানি আটকে রাখার জন্য ছোট একটি বাঁধ দেওয়া হয়েছে। একজন আদিবাসী পাহাড়ি নারী ঝরনা থেকে পানি নিতে ও পূজা দিতে এসেছেন। এই ঝরনার পানি দিয়ে তাঁরা খাওয়াসহ সব কাজ করেন। পাহাড়ি আদিবাসী এই নারী বলেন, ‘এই ঝরনার পানি দিয়েই আমরা আমাদের সব চাহিদা পূরণ করে থাকি। তাই একে পূজা করি।’ ঝরনার পানি দিয়েই ঘুমকাতুরে শরীরটা সতেজ করি আমরা। কিছু দূর এগোলেই পাহাড়ের বুক থেকে কুয়াশা দিয়ে সাদা তুলার মতো ঢেকে থাকা খাগড়াছড়ি শহরটি দেখা যায়। খাগড়াছড়ি জেলাটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত হলেও শহরটি সমতল ভূমির ওপর। সকালের পাহাড়গুলো আলাদা রূপে সেজেছে। যত দূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়।
পাহাড়ের নাম আলুটিলা হলেও কোনো আলু পাওয়া যায় না পাহাড়ে। আদিবাসীদের কাছে জানা যায় পাহাড়ের নাম আলুটিলা হওয়ার কারণ। প্রচলিত আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন কোথাও খাবার পাওয়া যায়নি। ওই সময় এই পাহাড়ে অনেক আলু হয়েছিল। দুর্ভিক্ষের সময় আদিবাসীরা আলু খেয়ে বেঁচে ছিল। সেই থেকে এই পাহাড়ের নাম আলুটিলা পাহাড়। কুয়াশা কেটে যাওয়ার পর আলুটিলা পাহাড়ের আসল সৌন্দর্য দেখা যায়।

রিছাং ঝরনা
খাগড়াছড়ির অন্যতম সুন্দর স্থান হলো রিছাং ঝরনা। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র থেকে গাড়িতে করে যাত্রা শুরু করলাম। একটু বেশি সাহসীরা উঠে গেলাম গাড়ির ছাদে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখার জন্য। একটু ভয় থাকলেও কষ্ট করে ছাদে ওঠায় লাভই হলো। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় ছাদ থেকে পাহাড় দেখার আনন্দ অন্য রকম। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে ভুলে গেলাম সারা রাতের ভ্রমণের ক্লান্তি। গাড়ি কিছুক্ষণ চলার পর থামতে হলো আমাদের। বড় গাড়ি পাহাড়ি সরু রাস্তায় ঢুকতে পারবে না। নামতে হলো আমাদের সবাইকে। সবাই খুশিমনে হাঁটতে শুরু করলাম পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে। যা দেখছি সবকিছুই ভালো লাগছে। ভালো লাগার মতোই সবকিছু। দল বেঁধে হাঁটতে থাকি পাহাড়ি ইট বিছানো মেঠো পথ ধরে। দুই পাশে উঁচু উঁচু পাহাড়ের মধ্য দিয়ে উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা। কিছুক্ষণ পর পর কাঁধে করে কলার ঝাঁকা নিয়ে ছুটে যাচ্ছে পাহাড়িরা। আমাদের যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, সেই রাস্তা দিয়ে তারা অনায়াসেই কলার ঝাঁকা নিয়ে যাচ্ছে। যাত্রা শুরুর আগেই আমাদের সবার হাতে একটি করে বাঁশের লাঠি দেওয়া হয়েছে। এই লাঠি যে কতটা দরকারি উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথে তা দ্রুতই বোঝা গেল।কিছু দূর হাঁটার পর আমাদের নামতে হয় আরও সরু পথে। এবার আর দল বেঁধে হাঁটার উপায় নেই। একজন একজন করে হাঁটতে হবে পাহাড়ি লাল মাটির পথ দিয়ে। হাঁটতে গিয়ে বোঝা গেল, পথগুলো অনেক পিচ্ছিল ও ঢালু। আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছে, পাহাড়ি রাস্তায় জোঁকের ভয় আছে। সবকিছু মিলে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। বাঁশের লাঠির ওপর ভর করে আস্তে আস্তে নামতে থাকি পাহাড়ের নিচের দিকে। হঠাত্ আমাদের কানে একটি শব্দ এসে বাজতে থাকে। ঝরনার পানি পড়ার শব্দ।আমরা ঝরনার ওপরের অংশের কাছে গেলাম। পাহাড় থেকে নেমে আসছে পানি। অনেকেই আনন্দের বাঁধ ভেঙে নেমে পড়ল ঝরনার ওপরের অংশের পানিতে। আরও কিছুটা পাহাড়ি পথ নেমে রিছাং ঝরনায় নামলাম আমরা।
নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আধার রিছাং ঝরনা যেন সৃষ্টির সেরা। প্রায় ১০০ ফুট উপর ঝরনার পানি নিচে পড়ছে। নিচে পড়ার পর আরও প্রায় ১০০ ফুট পাথরের ওপর গড়িয়ে নেমে আসে সমতলে। রিছাং ঝরনার ভালো লাগার বিষয়ের মধ্যে অন্যতম হলো, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে খেলা করতে পারবেন আপনি। আপনি ফিরে যেতে পারবেন সেই গ্রামের ফেলে আসা শৈশবে। পানি নিচে পড়ার ফলে একটি পিচ্ছিল পথের সৃষ্টি হয়েছে ঝরনার পানি যাওয়ার পথে। আপনি একটু সাহসী হলেই সেই পানির স্রোতের সঙ্গে নিচে নেমে আসতে পারেন। সবাই মেতে উঠি ঝরনার পানির সঙ্গে নেমে আসার খেলায়। আমাদের সঙ্গে ছিল পর্বত আরোহী দল নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশ। তারা নেমে পড়ে রিছাং ঝরনা অবতরণে। ঝরনার ওপরের অংশ থেকে প্রায় ৪০ মিটার নেমে আসেন তাদের ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মুসা ইব্রাহীম।
আবার যাত্রা শুরু করলাম আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে। যাওয়ার পথে পাড়ি দিলাম অন্য একটি পথ। পর্যটকদের জন্য বানানো হয়েছে সিঁড়ি দিয়ে তৈরি করা একটি পথ। সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাওয়া যাবে অনেকটা পথ। সিঁড়ির পথ শেষ হওয়ার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে একটু বিশ্রাম নিই। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে কতগুলো বেঞ্চ। আদিবাসীরা পাহাড়ি পথে কিছুক্ষণ পর পর নিয়ে যায় পাহাড়ি কলা। গাছপাকা কলার স্বাদ নিয়ে শরীরটাকে একটু সতেজ করে নিই আমরা। পাহাড়িরা এই কলাকে বলে বাংলা কলা। দামও খুব একটা বেশি নয়।

রহস্যময় সুড়ঙ্গ
নাম শুনলেই কেমন যেন রহস্যের গন্ধ পাওয়া যায়। রহস্যময় সুড়ঙ্গ আসলেই রহস্যময়। নাম শুনেই কেমন যেন ভয় ভয় লাগে। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে ঢোকার পর বাঁ দিকে রহস্যময় সুড়ঙ্গ। বাঁ দিকের পথ দিয়ে কিছু দূর এগোলেই পাওয়া যাবে রহস্যময় সুড়ঙ্গ। এই সুড়ঙ্গে কখনো একা যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। আমরা সবাই দল বেঁধে নামতে শুরু করলাম রহস্যময় সুড়ঙ্গে। হাতের ডান পাশের পথ দিয়ে ঢুকতে হবে সুড়ঙ্গে। আমাদের মধ্যে ভয়ানক ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করছে। সিঁড়ি ভেঙে আসতে আসতে নামতে থাকি সুড়ঙ্গে। অন্ধকার থাকার কারণে মশাল নিয়ে প্রবেশ করলাম সুড়ঙ্গে। নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে শীতল পানি পায়ে এসে লাগল। পানি পায়ে লাগার সঙ্গে সঙ্গে শীতল পরশ অনুভূত হলো সারা শরীরে। মশালের আধো আলো আধো অন্ধকার নিয়ে প্রবেশ করলাম রহস্যময় সুড়ঙ্গের মধ্যে। সুড়ঙ্গ দিয়ে ছপ ছপ করে পানি নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে; অনেক সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে। একটু এদিক-সেদিক হলেই বড় কোনো দুর্ঘটনায় পড়ার আশঙ্কা আছে। সুড়ঙ্গের মধ্যে অনেক ছোট-বড় গর্ত ও পাথরের খণ্ড আছে। পানি যেতে যেতে এর পথ পিচ্ছিল হয়ে গেছে। মশালের আলোয় সুড়ঙ্গের ভেতর পাথরগুলোকে দেখে আলাদা রকম ভালো লাগার অনুভূতি হয় আমাদের মধ্যে। প্রায় ৩০ মিনিটের পথ পাড়ি দেওয়ার পর বের হয়ে আসতে পারি সুড়ঙ্গ থেকে। বের হওয়ার মুখের অংশটুকু দেখে মনে হয় বৃক্ষ আর সুড়ঙ্গের মিতালি। এক স্বপ্নপুুরীর গল্পের সেই রসস্যময় সুড়ঙ্গ।

খাগড়াছড়ির নিউজিল্যান্ড
অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের একটুকরো নিউজিল্যান্ডকে পাওয়া গেল খাগড়াছড়িতে। সবুজ ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে খাগড়াছড়ির নিউজিল্যান্ড। আলুটিলা পাহাড়ের ওপর থেকে দেখে মনে হয়, সবুজের সঙ্গে মিতালি করে আছে ছোট ছোট ঘর। খাগড়াছড়ি শহরের এক পাশে নিউজিল্যান্ড অবস্থিত। আলুটিলা পাহাড় থেকে খাগড়াছড়ি শহরকে বিছিন্ন করে রেখেছে চিঙ্গা নদী। চিঙ্গা নদীর পাড়েই নিউজিল্যান্ড। সময় থাকলে দেখে আসতে পারেন খাগড়াছড়ির নিউজিল্যান্ড।

যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে ব্যক্তিগতভাবে খাগড়াছড়ি যেতে হলে আপনাকে বাসে যেতে হবে। ঢাকার যেকোনো আন্তজেলা বাস কাউন্টার থেকে খাগড়ছড়ির বাস পাবেন আপনি। এস আলম ও সৌদিয়া বাসে যেতে পারেন। এ জন্য আপনাকে ভাড়া গুনতে হবে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। খগড়াছড়ি শহরে সরকারি পর্যটন মোটেলে থাকতে পারবেন ৮০০ থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে থাকতে পারবেন আপনি। বেসরকারিভাবে থাকার ব্যবস্থাও আছে; এখানে কিছুটা কম ভাড়ায়। হোটেল শৈল সুবর্ণায় ৬০০ থেকে এক হাজার এবং জিরান হোটেলে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকার থাকতে পারবেন। খাগড়াছড়ি শহর থেকে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে আবস্থিত। যেকোনো উপায়ে আপনি আসতে পারবেন আলুটিলায়। আলুটিলা থেকে রিছাং ঝরনা চার কিলোমিটার।

বাদল খান
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, অক্টোবর ২৭, ২০০৯

Sunday, September 5, 2010

বমগ্রাম সাইকতপাড়া রুমা, বান্দরবান



বমগ্রাম সাইকতপাড়া রুমা, বান্দরবান দেশের সবচেয়ে উঁচু গ্রামের নাম সাইকতপাড়া। বান্দরবান জেলার রুমা থানায় এর অবস্থান। পাহাড়ে আমার এবারের গন্তব্য বমগ্রাম সাইকতপাড়া। দিনক্ষণ ঠিক করে এস আলম পরিবহনের রাতের বাসে রওনা দিলাম বান্দরবানের উদ্দেশে। ভাড়া ৩৫০ টাকা। সকাল সাড়ে ৭টায় বাস বান্দরবান এসে পেঁৗছাল। রিকশা নিয়ে চলে গেলাম রুমা জিপস্ট্যান্ডে। ২০ টাকা ভাড়া নিল। সকাল ৯টায় চাঁদের গাড়ির ছাদে বসে সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা দিলাম। চাঁদের গাড়িতে জনপ্রতি ভাড়া ৭০ টাকা। সকাল ১১টায় সদরঘাট পেঁৗছে রুমা বাজারের ট্রলারে চেপে বসলাম। ট্রলারচালকের সহকারী সবার কাছ থেকে ৩০ টাকা করে ভাড়া তুলল। দুপুর ২টায় রুমা বাজারে পেঁৗছে দুপুরের খাবার সেরে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে ফেলি। বিকেল সাড়ে ৩টায় গাইড রুয়াত বমকে সঙ্গে করে রুমা বাজার থেকে যাত্রা শুরু করি। বগামুখপাড়ায় রাত কাটিয়ে পরের দিন দুপুর নাগাদ সাইকতপাড়ায় গিয়ে উঠি।
সাইকতপাড়া সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় দুই হাজার ৬০০ ফুট উঁচুতে। আমরা পাড়ার কার্বারি (গ্রামপ্রধান) সাংচুয়ান বমের ঘরে উঠি। পাড়াটি বেশ ছিমছাম ও গোছানো। এত উচ্চতায়ও বেশ বড় একটি খেলার মাঠ আছে। এখান থেকে কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়া দেখা যায়। পাড়ার কার্বারির কাছ থেকে জানতে পারলাম, ১৯৬১ সালে এখানে পাড়াটি স্থাপিত হয়। ত্লাংচাতপাড়া থেকে প্রথমে ছয়টি পরিবার এখানে এসে বসবাস শুরু করে। বর্তমানে গ্রামটিতে ৩৫টি পরিবারের প্রায় দুই শ লোক বাস করে। পাড়ার এক পাশে পাহাড়ের ফাটল দিয়ে পানি বেরিয়ে একটি প্রবাহ বয়ে চলেছে। পাড়ায় বেশ কিছু কমলা ও কফিগাছ আছে।
লেখা ও ছবি : এম এ মুহিত
Source: dailykalerkantho

Friday, August 27, 2010

নীলগিরি, বান্দরবান

নীলগিরি, বান্দরবান

By তাসনীম

চির সুন্দর এই দেশ আমার বাংলাদেশ।

নীলগিরি, বান্দরবানগুলবাহার, চাঁদপুরনীলগিরি, বান্দরবাননীলগিরি, বান্দরবাননীলগিরি, বান্দরবাননীলগিরি, বান্দরবাননীলগিরি, বান্দরবানস্বর্ণমন্দির, বান্দরবান
Source: http://www.nature.com.bd

Tuesday, August 17, 2010

বান্দরবানে সবুজ নিসর্গে

বান্দরবানে সবুজ নিসর্গে

বান্দরবানে সবুজ নিসর্গে

বাস ছেড়েছিল মাঝরাতেরও একটু পর।
‘বান্দরবান খুব সুন্দর, না?’
দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের এই প্রশ্নের উত্তরে বান্দরবান নিয়ে নানা ইতিবাচক কথা বলা হয়। তার পর থেকেই ওর চোখে স্বপ্ন। সে স্বপ্ন বাকি কজন শিশুর মধ্যেও ছড়িয়ে যায়। শিশুরা উত্তেজনায় ঘুমাতে পারছিল না। কিন্তু আমরা জানি, বাসের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের চোখে ভর করা স্বপ্ন আরও বড় হবে…।
গন্তব্য বান্দরবান। উপলক্ষ ঈদের ছুটিতে বেড়ানো। ঈদের ছুটিতে বান্দরবানে যেতে চাইলে আগে থেকেই হোটেল, রেস্টহাউস বা রিসোর্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিতে হবে, নইলে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশ যেখানে সবচেয়ে বেশি আকাশের কাছাকাছি, সে জেলাই বান্দরবান। ঈদ কবে হচ্ছে, সে দ্বিধা কেটে গেছে সন্ধ্যার পরপরই। সুতরাং ভোর হতে শুরু করলেই ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’ গানটি সার্থকতা পেয়ে যাবে।
যাঁরা কাজের চাপে বছরের অন্য সময় বের হতে পারেন না, ঈদের বড় ছুটিটাকেই তাঁরা বেছে নেন বেড়ানোর জন্য। ঢাকার কলাবাগান বাসপাড়ায় অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী-সন্তানসমেত অনেকগুলো পরিবার দেখে সে কথাই মনে হয়েছিল। বাক্সপেটরা বেঁধে নিয়ে তিন দিনের জন্য ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ সব পরিবার।
দ্রুতগতিতে চলা বাসের জানালার বাইরে মেঘের সঙ্গে চাঁদের লুকোচুরি। সরু একফালি চাঁদ কী আনন্দটাই না দিচ্ছে মানুষকে! মহাসড়কের এখানে-ওখানে মাঝেমধ্যেই সৃষ্টি হওয়া যানজটও মাটি করতে পারছে না সে আনন্দকে। বাসটি সবাইকে শুধু বান্দরবানে পৌঁছে দেবে না, পৌঁছে দেবে ঈদ-উৎসবের কাছেও।
২.
ভোরের আকাশ এসে যখন রাঙিয়ে দিচ্ছিল দিগন্ত, তখন অনেকের চোখই জানালার বাইরে। অন্ধকার ছিন্ন করে সূর্য ওঠার আগেই আকাশে লাগছিল লালের পরত। চট্টগ্রাম কালুরঘাট সেতু পেরিয়ে বাস ছুটে চলেছে কক্সবাজার সড়ক দিয়ে। এ পথে কিছুদূর যাওয়ার পর সাতকানিয়া থেকে বাঁ-দিকের আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু পথটিতে পৌঁছে জুড়িয়ে গেল মন। এ পথই আমাদের পৌঁছে দেবে বান্দরবানে।
সূর্য উঠছে। সমতল থেকে পাহাড়ি পথে পড়তেই দৃশ্যবদল। সবুজ পাহাড়ের মধ্য দিয়ে পথ। কালো রাস্তাটি ছাড়া আশপাশের সবই সবুজ। নীল আকাশে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘ। ঘন কালো মেঘও স্থায়ী হচ্ছে কিছুক্ষণের জন্য—বৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে। ভ্রমণে থাকা মানুষ দেখতে পেল, পথে-ঘাটে নেমে এসেছে মানুষ। এই মানুষের ভিড়েই কিছু মানুষকে কোলাকুলি করতে দেখে বোঝা গেল, ঈদের নামাজ শেষ হয়েছে।
৩.
থাকব মিলনছড়িতে গাইড ট্যুরের রিসোর্টে। বান্দরবান শহরে পৌঁছে অটোরিকশায় করে তিন মাইল দূরের রিসোর্টটিতে পৌঁছানো গেল দ্রুতই। ধাপের পর ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে ওদের রেস্তোরাঁয় বসার সঙ্গে সঙ্গেই বাটিতে করে এল সেমাই। ঠান্ডা জল। ঈদ উপলক্ষে খাবারটি রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের উপহার।
‘কখন বেড়াতে যাব?’—আশপাশে ঘুরঘুর করতে থাকা শিশুদের প্রশ্ন।
দলের কনিষ্ঠ সদস্যরা এরই মধ্যে দল পাকিয়ে ফেলেছে। ভ্রমণজনিত ক্লান্তির পর বড়রা যখন বিশ্রামের কথা ভাবছেন, তখনই শিশুরা জানিয়ে দিল, মাত্র তিন দিনের ছুটির একটি মুহূর্তও নষ্ট করা চলবে না। অতঃপর ঠিক করা চাঁদের গাড়িতে উঠে পড়া। গন্তব্য চিম্বুক পাহাড়। পথটি আকর্ষণীয়। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে গভীর খাদ। চিম্বুক পাহাড়ের নিচে এসে আমরা গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। হেঁটে হেঁটে উঠি। একটু একটু করে উঠি, আর মনে হয় আকাশের সিঁড়ি ধরেই বুঝি উঠছি।
চিম্বুক থেকে ফেরার পথে ঢুকে পড়ি শৈলপ্রপাতে। এটি একটি পার্কের মতো জায়গা, ঝরনা নেমে এসেছে ওপর থেকে। বড় বড় পাথরের চাঁই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ক্ষীণ জলের ধারা ছুটে চলেছে। জল দেখেই আমাদের মনে হয় বান্দরবানের নদটি দেখব। তাই চলে যাই শঙ্খ নদে। নদটিকে সাঙ্গু নদও বলা হয়। এত স্বচ্ছ জলের নদ দেখা ভাগ্যের ব্যাপার। নৌকায় বসে জলের দিকে তাকালে দেখা যায় মাছের সাঁতার।
এরই মধ্যে আমরা জেনে ফেলেছি, বান্দরবানে আছে মুরং, ত্রিপুরা, বম, তঞ্চ্যঙ্গা, চাকমা, চাক, খ্যাং, খুমি, লুসাই ও পাঙ্খো আদিবাসীরা। বমপাড়ায় গিয়ে আমরা দেখে আসি ভাটিয়াপাড়া স্কুল। সেখানে বমদের বাড়িতে হূষ্টপুষ্ট মোরগ-মুরগি, শূকর দেখা গেল।
দুপুরে খাবার পর আবার যাত্রা। সঙ্গে হালকা খাবার। কক্ষ্যাংঝিরি থেকে নৌকায় করে রুমাবাজার। শঙ্খ নদ বেয়ে যেতে যেতে দুই তীরের জীবনযাত্রা দেখা যায়। রুমা বাজারে কিছুক্ষণ ঘোরার পরই সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে। আমরা নৌকায় উঠে বসি। ফিরতে হবে। ঈদের দিনটি এত অসাধারণ আনন্দের সঙ্গে কাটবে, তা কে জানত আগে! আফসোস থেকে যায়, নীলগিরি যাওয়া হলো না!
রাতে খাবার পর আমরা একটু হাঁটতে বের হই। একজন বলে ওঠে, আকাশের দিকে তাকাও!
যাঁরা হাঁটছিলেন, তাঁরা কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ান। আকাশে নক্ষত্রের মেলা! একসঙ্গে এত তারা কখনো কি কেউ দেখেছে! পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে থাকা মানুষেরা মাঝেমধ্যেই আকাশের দিকে তাকায় আর হয়তো ভাবে, ‘সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটির কথা হয়’ (জীবনানন্দ দাশ)।
এই বান্দরবানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুটি শৃঙ্গ: তাজিনডং আর কেওক্রাডাং; কিন্তু তা অনেক দূরে। তিন দিনের ছোট ছুটিতে সেখানে পৌঁছানো যায় না। বেশি সময় নিয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে যাওয়ার জন্যও প্রস্তুতি শুরু হয় সেদিন থেকেই।

ঈদের ছুটিতে রাঙামাটি ও বান্দরবানে
অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের হাতছানি দেয় রাঙামাটি ও বান্দরবান। এই ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন, বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন এসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে। তার আগে জেনে নিন কয়েকটি ভ্রমণ সংস্থার ঠিকানা ও বিভিন্ন প্যাকেজ।

রিভার অ্যান্ড গ্রিন
বান্দরবান: এখানে প্রতিজন ঘুরে আসতে পারেন দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজে। এতে খরচ পড়বে চার হাজার ৫০০ টাকা।
এর মধ্যে নন-এসি বাস, এসি বাস, সকালের নাশতা ও বেড়ানোর সময় গাইড-সুবিধা পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া বান্দরবান ও নিলাগিরি দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজে নন এসি বাসে করে যাওয়া, গাড়িতে ঘোরা ও থাকার ব্যবস্থাসহ প্রতিজন প্যাকেজের খরচ পড়বে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা।
রাঙামাটি: দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজে ঢাকা থেকে নন-এসি বাস, নন-এসি রুম ও রাঙামাটির আশপাশে ঘুরতে প্রতিজন খরচ পড়বে তিন হাজার ৫০০ টাকা। ফোন: ৮৮২৬৭৫৯।

পেট্রো অ্যান্ড এভিয়েশন
বান্দরবান: ঢাকা-রাঙামাটি-ঢাকা দুই রাত তিন দিন প্রতিজন থাকা-খাওয়া চাহিদাভেদে তিন থেকে ছয় হাজার টাকা খরচ পড়বে।
রাঙামাটি: ঢাকা থেকে রাঙামাটি দুই রাত তিন দিন প্রতিজন থাকা-খাওয়া ও ঘুরে বেড়ানো চাহিদাভেদে দুই হাজার ৪৫০ থেকে সাত হাজার ৮০০ টাকা খরচ পড়বে। ফোন: ০১৭৩০০৪৩৬১৯।
বেঙ্গল ট্যুর: এই প্রতিষ্ঠানের আলাদাভাবে রাঙামাটি ও বান্দরবানের কোনো প্যাকেজ নেই। তবে দলবেঁধে বা পরিবার-পরিজন নিয়ে যেতে চাইলে তারা ব্যবস্থা করে দেয়। খরচটাও পড়বে চাহিদা অনুযায়ী। ফোন: ৮৮৫৭৪২৪।
জার্নি প্লাস: এই প্রতিষ্ঠানটিও রাঙামাটি ও বান্দরবান ঘুরে বেড়ানোর আয়োজন করে। তবে আলাদা কোনো প্যাকেজ নেই। যেতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন। ফোন: ৯৬৬০২৩৪।

জাহীদ রেজা নূর
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ১৭, ২০১০

Wednesday, August 11, 2010

খাগড়াছড়ির বাঁকে

খাগড়াছড়ির বাঁকে

খাগড়াছড়ির বাঁকে

আগেও অনেকবার পাহাড়ে, এমনকি খাগড়াছড়িতেও গিয়েছি, কিন্তু বর্ষায় পাহাড়ের সজীবতা দেখার ইচ্ছা ছিল অনেক দিন থেকেই। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে বৃষ্টিভেজা বন, সবুজ পাহাড় আর নদী দেখার জন্য আষাঢ়ের প্রথম দিনে রওনা হয়ে গেলাম খাগড়াছড়িতে।
যে রাস্তা দিয়ে খাগড়াছড়ি যেতে হয়, সেটাও দেখার মতো। রাঙামাটি অথবা বান্দরবানের মূল শহরে যাওয়ার চেয়ে খাগড়াছড়িতে যেতে অনেক বেশি পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। এখানে যাওয়ার সময় শুধু পাহাড় নয়; ঝরনা, প্যাগোডা, জুমঘরসহ অনেক কিছুই চোখে পড়বে।
তাই রাস্তায় চোখ খোলা রেখে যেখানে ইচ্ছা থেমে ছবি তুলতে শুরু করে দিলাম। বৃষ্টির সময় পাহাড়গুলোকে সবুজরূপে দেখা গেল। নদী ও ঝরনাগুলোও পরিপূর্ণ প্রমত্ত রূপ নিয়ে হাজির। পথে বেশ কিছু প্যাগোডাও চোখে পড়ল। তবে দিনের আলো থাকতে থাকতে পৌঁছানোর তাড়া থাকায় বেশিক্ষণ থামা গেল না।
পাহাড়ের কোলে দূরে একটি জুমঘর অথবা দূরে পাহাড়ের চূড়ায় কর্মরত পাহাড়িদের দেখতে দেখতে চলে এলাম খাগড়াছড়িতে ঢোকার প্রবেশপথে। আলুটিলাতে স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসা করেও নামকরণের শানে নজুল জানা গেল না। তবে এটুকু জানা গেল, আলুটিলা পার্ক ও এর মধ্যে অবস্থিত গুহা প্রধান পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আলুটিলার গুহাটি পানির স্রোতের কারণে সৃষ্টি। এই গুহার মধ্য দিয়ে পাহাড়ের এক পাশ থেকে আরেক পাশে হেঁটে যাওয়া যায়। এখানে গাইড আছে, মশালও কিনতে পাওয়া যায়। সুতরাং মশাল জ্বালিয়ে গাইডের সঙ্গে আমরা চলে গেলাম হাঁটু পানি ভেঙে গুহার ভেতরে। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিট গুহার ভেতর দিয়ে হাঁটার পর বেরিয়ে এলাম অন্যদিকে, গা ছমছম করা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ঝড়বৃষ্টির সময় গুহাতে পানির স্রোত অনেক বেশি থাকে এবং মাঝেমধ্যে পুরো গুহা পানিতে ভরে যায়। সে জন্য আকাশ দেখে ঢোকা উচিত। এখানে একটি পিকনিক স্পটও আছে, ভাড়া নিয়ে এটা ব্যবহার করা যায়।
আলুটিলা ঘুরে আমরা হোটেল থেকে হাত-মুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহরে ঘুরতে। সৌভাগ্য যে আমাদের, চাকমা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসেছিলাম। তারা আমাদের প্রথমেই নিয়ে গেল মারমাদের একটি রেস্তোরাঁ ‘সিস্টেম ফ্যামিলি হোটেল’-এ খাওয়ার জন্য।
কখনো ভাবিনি এ রকম একটি ঘরোয়া রেস্তোরাঁ পাব খাগড়াছড়িতে এসে। অনেক বাঙালিও এখানে প্রতিদিন খাওয়ার জন্য আসেন। এখানে বাঙালি খাবারের পাশাপাশি পাহাড়ি খাবারও পাওয়া যায়। আমরা যে যার মতো খেয়ে নিলাম। যেমন, কেউ কপি বাঁশের তরকারি ও মুরগির ঝোল, আবার অনেকে আগ্রহ নিয়ে পাহাড়ি রান্না খেল। যারা ঝাল সহ্য করতে পারে, তাদের জন্য সুবিধা হবে খেতে। কারণ, পাহাড়ি রান্না ঝাল ছাড়া কল্পনাই করা যায় না।
এরপর চলে গেলাম চেঙ্গি নদীর তীরে সময় কাটাতে। বৃষ্টির সময় না এলে চেঙ্গির আসল রূপ দেখা যায় না। সমতলের নদী থেকে এটা পুরো আলাদা—অনেক বেশি বাঁক আর স্রোত। বৃষ্টির পরে প্রমত্তা নদীতে গাছের গুঁড়ি, বাঁশ চোখে পড়ল। তবে বৃষ্টি শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই চেঙ্গি নদী আবার তার শান্ত রূপে ফিরে এল।
রাতে আমরা জামতলার একটি চাকমা হোটেলে গেলাম। এখানে আমাদের চাকমা বন্ধুদের পরামর্শে ভুনা শামুক খেলাম, চিংড়ি মাছের মতো খেতে। তবে বেশি মিল পাবেন কাঁকড়ার স্বাদের সঙ্গে।
পরদিন সকালে উঠে রওনা দিলাম ছোট মেরুং বাজারের দিকে। এখান থেকে আরও ভেতরে গিয়ে জুম চাষ দেখলাম এবং জুমঘরে বসে পাহাড়ি চাষি ও বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করলাম। এখানকার বেশির ভাগ আদিবাসী সরাসরি জুম চাষের সঙ্গে জড়িত। জুমে প্রথমে পাহাড় পুড়িয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে তার গর্ত করে, প্রতিটি গর্তে তিন থেকে চার-পাঁচ ধরনের বীজ বপন করা হয়। প্রধানত ধান, ভুট্টা, শসা ও বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ পাহাড়িদের মধ্যে জনপ্রিয়। জুমের মিষ্টি ভুট্টা পাহাড়িরা সেদ্ধ করে খায়, আমরাও খাওয়া শুরু করে দিলাম। পাহাড়িরা বিশেষ এক ধরনের সবজি রান্না করে ৩২ ধরনের তরকারি দিয়ে, সেই পাচন খেলাম আমরা সবাই। বিকেলে চেঙ্গি নদীতে নৌকা ভ্রমণ করে পুরো শহরের এক পাশ দিয়ে ঘুরে এলাম। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে নদীভ্রমণ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। যাঁরা খাগড়াছড়িতে ঘুরতে যাবেন, তাদের প্রতি অনুরোধ রইল, একবার অবশ্যই এটি চেষ্টা করে দেখবেন।
শহরের ভেতরে অসাধারণ সুন্দর পাহাড় আর ধানখেত থাকার কথা শুনে সেদিকে গেলাম। জায়গাটার নাম নিউজিল্যান্ড পাড়া। জানা গেল, অনেক আগে এক পাহাড়ি ভদ্রলোক এই এলাকা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘নিউজিল্যান্ডের মতো বাতাস;’ সেই থেকে এলাকার নাম হয়ে গেছে নিউজিল্যান্ড পাড়া। আমাদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে গেল, যিনি নামটা রেখেছেন, তিনি আদৌ নিউজিল্যান্ডে গিয়েছেন কি না। স্থানীয় বন্ধুদের কাছ থেকে জানা গেল, না, তিনি কখনো নিউজিল্যান্ডে যাননি। তিনি ক্রিকেট খেলা দেখতেন, তা থেকে ধারণা করেছেন, নিউজিল্যান্ডে প্রচুর বাতাস।
এখানে নিউজিল্যান্ড ক্যাফে নামের একটি রেস্তোরাঁ আছে। তাজা ফলের শরবত এবং নানা ধরনের স্ন্যাক্স পাবেন এখানে, ফ্রেঞ্চফ্রাই থেকে শুরু করে হালিম পর্যন্ত। তবে যাওয়ার আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য। চার বন্ধুর উদ্যোগে শুরু এই রেস্তোরাঁয় সামনের বার এলে ইন্টারনেটও পাওয়া যাবে বলে জানানো হলো আমাদের।
এই মৌসুমে আসার আরেকটা সুবিধা হলো তাজা, সস্তা ফল। শহরে ঢোকার ঠিক আগে প্রাকৃতিক পরিবেশে আনসারদের একটি অসাধারণ সুন্দর রেস্তোরাঁ আছে। এখানে সব সময় খাওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও বসে চেঙ্গি নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করলাম প্রতিদিন।
কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি খাগড়াছড়িতে যাওয়ার বাস আছে। এই বাসগুলো প্রথমে চট্টগ্রামে না গিয়ে সরাসরি ফেনী থেকে রামগড় হয়ে খাগড়াছড়িতে চলে যায়। শান্তি পরিবহন, সৌদিয়া ও এস আলমের সরাসরি বাস আছে। টিকিটের দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। বাসে সরাসরি যেতে আট ঘণ্টার মতো সময় লাগে। ট্রেন বা প্লেনে চট্টগ্রামে গিয়ে, সেখান থেকেও বাসে যাওয়া যায়, তবে ট্রেনে সময় বেশি লাগবে। থাকার জন্য পর্যটনের হোটেল আছে। খুবই সুন্দর, নদীর ঠিক পাশে। ভাড়া পড়বে দেড় হাজার টাকা, ডাবল বেড এসি রুম। এ ছাড়া শৈল সুবর্ণা আছে, ভাড়া একটু বেশি। শহরের মধ্যে আছে হোটেল জিরান। চাকমা আতিথেয়তা পেতে হলে এখানে থাকতে পারেন। এখানে এসি রুম নেই, ভাড়াও অনেক কম, ৩০০-৫০০ টাকার মধ্যে ডাবল রুম আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের আরও কিছু হোটেল আছে বিভিন্ন ভাড়ার মধ্যে।

আসিফ মাহফুজ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুলাই ২০, ২০১০

Sunday, August 8, 2010

বেড়ানো : জামালপুর

বেড়ানো : জামালপুর

০০ আলোকচিত্র ও লেখা মুস্তাফিজ মামুন ০০

রাজধানী থেকে সড়কপথে ১৮৭ কিলোমিটার এবং রেলপথে ১৭৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জেলা শহর জামালপুর। এ জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, কুড়িগ্রাম এবং শেরপুর জেলা, দক্ষিণে শেরপুর জেলা, পূর্বে ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলা, পশ্চিমে যমুনা নদী, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধা জেলা অবস্থিত। এ অঞ্চলের সাধক পুরুষ হযরত শাহ জামালের (র) নামে এর নামকরণ হয়েছে জামালপুর। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এ জেলার সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে।

হযরত শাহ জামাল-এর (র) সমাধি:

জামালপুর শহরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত এ অঞ্চলের সাধক পুরুষ হযরত শাহ জামাল-এর (র) সমাধি। একটি সমাধিক্ষেত্র ছাড়াও পুরনো একটি মসজিদ আছে এখানে।

দয়াময়ী মন্দির

জামালপুর শহরের জিরো পয়েন্টের কাছে অবস্থিত প্রাচীন মন্দির। প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রণে এ মন্দিরটি নির্মিত। প্রতিবছর অষ্টমী পূজা উপলক্ষ্যে এখানে প্রচুর লোক সমাগম হয়।

হস্তশিল্পের দোকান

জামালপুর হস্তশিল্পের জন্য বিখ্যাত। এ শহরে তাই হস্তশিল্পের বিপণিবিতানও অনেক। শহরের আশিক মাহমুদ কলেজ সড়কে এরকম অনেক বিক্রয় কেন্দ্র আছে, যেখানে অনেক কম দামে পাওয়া যাবে জামালপুরের বিখ্যাত নকশি কাঁথা ও সূচিকর্মের বিভিন্ন সামগ্রী।

হযরত শাহ কামাল-এর (র) সমাধি:

জেলার মোলান্দহ উপজেলার দুরমুট ইউনিয়নে ব্্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত হযরত শাহ কামাল-এর (র) সমাধি। এ অঞ্চলের বিস্তর্ীর্ণ এলাকা ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে বিলীন হলেও এ সমাধিক্ষেত্রটি আজও টিকে আছে। বৈশাখ মাসের শুরু থেকে এখানে মাসব্যাপি ওরস অনুষ্ঠিত হয়। ওরস উপলক্ষে পুরো মাসজুড়ে এখানে গ্রামীণ মেলা বসে। জামালপুর সদর থেকে বাস ও ট্রেনে সহজেই অঅসা যায় এখানে।

লাউচাপড়া

জামালপুর জেলার বকশিগঞ্জের লাউচাপড়ায় অবস্থিত পাহাড়িকা অবকাশ কেন্দ্র। এখানে চারিদিকে গারো পাহাড়ের সবুজ বন। পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকাবাঁকা একটি সিঁড়ি উঠে গেছে একেবারে চূড়ায়। সেখানে আবার রয়েছে মস্ত বড় এক ওয়াচ টাওয়ার। দশ-বারোটি সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠলে চারিদিকে সবুজ ছাড়া কিছুই আর চোখে পড়ে না। দূরে দেখা যায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের আকাশছোঁয়া সব পাহাড়। চারিদিকটা যেন ছবির মতো। এই পাহাড়ি জঙ্গলে আছে নানা জাতের পশু-পাখি। ধান পাকার মৌসুমে আবার মেঘালয় থেকে চলে আসে বুনো হাতির দল। কাঠঠোকরা, হলদে পাখি, কালিম পাখি আরো কত ধরনের পাখি চোখে পড়বে এখানে। পুরো জায়গাটি অবসর বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে জামালপুর জেলা পরিষদ। এ অবসর কেন্দ্রে প্রবেশে কোনো টাকা লাগে না। তবে কোনো বাহন নিয়ে গেলে তার জন্য পার্কিং ফি দিতে হবে। পার্কিং ফি প্রতিটি বাস কিংবা কোস্টারের জন্য ২০০ টাকা, মাইক্রোবাস ১০০ টাকা, জিপ, টেম্পো, কার ৫০ টাকা, বেবি টেক্সি, ঘোড়ার গাড়ি ২০ টাকা, মোটর সাইকেল, ভ্যান গাড়ি ১০ টাকা, রিকশা ৫ টাকা, বাই সাইকেল ২ টাকা। এছাড়া লেকে নৌ বিহার করতে জনপ্রতি লাগবে ১০ টাকা, ওয়াচ টাওয়ারে উঠতে ৩ টাকা এবং পিকনিক পার্টির রান্নাঘর ও প্রতি চুলা ব্যবহারের জন্য দিতে হবে ৫০ টাকা।

দিকলাকোনা নামে এখানে আছে গারো আদিবাসীদের ছোট্ট একটি গ্রাম। এ গ্রামে বাইশ পরিবারে রয়েছে একশ জন গারো। তারা সবাই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। এ গ্রামের মাতব্বর প্রীতি সন সারমা। ভীষণ সদালাপি এ লোকটির আতিথেয়তায় মুগ্ধ হবেন যে কেউ। প্রতিবছর বড়দিন, ইংরেজি নববর্ষ, ইস্টার সানডে উপলক্ষে এ গ্রামে হয় নানা উৎসব।

দিকলাকোনা গ্রামের শুরুতেই রয়েছে 'দিকলাকোনা সালগিত্তাল হোস্টেল'। খ্রিস্টান মিশনারিজ পরিচালিত এ হোস্টেলে প্রথম শ্রেণী থেকে তৃতীয় শ্রেণীর প্রায় ৭০জন ছাত্র-ছাত্রী থাকে। এখান থেকে শুরু করে গ্রামটি ঘুরে ফিরে গারোদের দৈনন্দিন জীবনের নানান কাজ কর্ম উপভোগ করতে পারেন।

লাউচাপড়ায় রাত কাটানো হতে পারে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এখানকার শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ রাতে যেন আরো শান্ত, আরো সি্নগ্ধ। রাতে এখানে থাকার জন্য দুটি রেস্ট হাউস অছে। একটি জামালপুর জেলা পরিষদের পাহাড়িকা বাংলো এবং অন্যটি ব্যক্তি মালিকানাধীন বনফুল রিসর্ট। জেলা পরিষদের রেস্ট হাউসে থাকতে হলে আগে থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। যোগাযোগ করতে হবে প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, জামালপুর। ফোন- ০৯৮১-৬২৭১৬, ০৯৮১-৬৩৫১৪, ০৯৮১-৬৩২৪০। তবে বেসরকারি বনফুল রিজর্টটি আরো বেশি সজ্জিত ও সুযোগ-সুবিধা সংবলিত। নিরাপত্তাও এখানে তুলনামূলক অনেক বেশি। এই রিসর্টে সাধারণ কক্ষের ভাড়া ১০০০ টাকা এবং তাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের ভাড়া ১৫০০ টাকা।

জায়গাটি জামালপুর জেলার অধীনে হলেও যাওয়ার সহজপথ হলো শেরপুর হয়ে। ঢাকা থেকে সরাসরি শেরপুরে যায় ড্রিমল্যান্ড পরিবহনের বাস। ভাড়া ১৮০-২০০ টাকা। শেরপুর থেকে বাসে বকশীগঞ্জের ভাড়া জনপ্রতি ২৫ টাকা। সেখান থেকে রিকশা কিংবা ভ্যানে লাউচাপড়ার ভাড়া জনপ্রতি ৩০-৪০ টাকা।

জেলা শহরে কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়ক ও রেল পথে আসা যায় জামালপুর। তবে সড়কপথের চেয়ে রেলপথটাই সুবিধাজনক। ঢাকার কমলাপুর থেকে আন্তঃনগর তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও অগি্নবীনা ট্রেন যায় জামালপুর। ভাড়া প্রথম শ্রেণী ১৫০ টাকা এবং সাধারণ শ্রেণী ৫০-৮০ টাকা।

ঢাকার মহাখালী বাস স্টেশন থেকে মহানগর ও রাজীব পরিবহনের বাস সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আধাঘণ্টা পরপর ছেড়ে যায়। ভাড়া ১৬০-১৮০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে প্রতিনিধি পরিবহন, সিলেট থেকে শাহজামাল পরিবহন, রাজশাহী ও বগুড়া থেকে পদ্মা পরিবহনের বাসে সরাসরি জামালপুর আসা যায়।

কোথায় থাকবেন

জামালপুর শহরে থাকার জন্য বেশ কিছু হোটেল আছে। শহরের সবচেয়ে ভালো হোটেল সকাল বাজারে হোটেল স্টার ইন্টারন্যাশনাল, ফোন- ০১৭১৩২১১৪৯৪। এ হোটেল শীতাতপ নিয়ান্ত্রিত ও সাধারণ মানের কক্ষ আছে। ভাড়া ৪০০-১২০০ টাকা। এছাড়া শহরের অন্যান্য সাধারণ মানের হোটেল হলো: গেইট পাড়ে হোটেল আল সিরাজ, ফোন-০৯৮১-৬২৫৯২। গেইেট পাড়ে হোটেল রাসেল, ফোন- ০৯৮১-৬৩২৯৪। স্টেশন রোডে হোটেল আল করিম, ফোন-০১৭১৬০৩৬৮০৮। মেডিকেল রোডে হোটেল সানোয়ার ইন্টারন্যাশনাল, ফোন- ০১৭২৫২৪৬৯৬০। পুরাতন বাস স্টেশনে হোটেল আল সামাদ, ফোন- ০৯৮১-৬৩৪০১"এসব হোটেলে ২০০-৫০০ টাকায় থাকা যাবে।